শালীনতা, পরিচয় ও আধুনিকতার মেলবন্ধন
বিশ্বজুড়ে মুসলিম নারীদের মধ্যে ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে ‘মডেস্ট ফ্যাশন’ বা শালীনতা-নির্ভর ফ্যাশন। বিশেষ করে ইউরোপে এই শব্দটি সাধারণত ইসলামি নীতিমালা-অনুপ্রাণিত পোশাকের সঙ্গে যুক্ত হলেও বর্তমানে এটি আরও বিস্তৃত একটি সাংস্কৃতিক ও ফ্যাশন আন্দোলন হিসেবে পরিচিত—যেখানে সৌন্দর্য, শালীনতা, সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং আধুনিক ভোক্তা সংস্কৃতি একত্রে মিশে গেছে।
এর সর্বশেষ উদাহরণ দেখা গেছে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে, যেখানে গত এপ্রিল মাসে প্রথমবারের মতো প্যারিস মডেস্ট ফ্যাশন উইক অনুষ্ঠিত হয়। ১৬ থেকে ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত চলা এই আয়োজনে ঐতিহাসিক হোটেল লে মারোয়া প্রাঙ্গণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রায় ৩০টি ব্র্যান্ড তাদের সংগ্রহ উপস্থাপন করে।
এই ফ্যাশন শোতে ছিল এমব্রয়ডারি করা সাটিনের টেইলার্ড পোশাক, ঢিলেঢালা লম্বা গাউন, আধুনিক কাঠামোর সিলুয়েট এবং ঐতিহ্যবাহী মুসলিম পোশাকের নতুন ব্যাখ্যা। আলোচনায় ছিল ফরাসি ব্র্যান্ড সৌতুরার একটি ডিজাইন—ক্রিস্টাল-সজ্জিত ক্রোশে ব্যালাক্লাভা সহ ডেনিম ড্রেস, যা ফ্রান্সে ২০১০ সাল থেকে নিষিদ্ধ পূর্ণ মুখ ঢাকার নিকাবের শৈল্পিক প্রতীকী রূপ হিসেবে দেখা হয়।
ফ্যাশন ইভেন্টের জন্য প্যারিসকে বেছে নেওয়া ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। ধর্মনিরপেক্ষতা ও ধর্মীয় প্রতীক নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ক থাকা দেশটিতে এমন একটি আয়োজন শুধু বাণিজ্যিক নয়, বরং সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক বার্তাও বহন করে।
আয়োজক প্রতিষ্ঠান থিংক ফ্যাশন, যারা এক দশকেরও বেশি সময় ধরে আন্তর্জাতিক মডেস্ট ফ্যাশন উইক পরিচালনা করছে, বলছে এই খাত এখন আর প্রান্তিক নয়, বরং বৈশ্বিক ফ্যাশন শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ডিনারস্ট্যান্ডার্ডের ‘স্টেট অব দ্য গ্লোবাল ইসলামিক ইকোনমি’ রিপোর্টে বলা হয়েছে, ২০২৮ সালের মধ্যে মুসলিম ভোক্তাদের পোশাক খাতে ব্যয় প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।
এই প্রবৃদ্ধির পেছনে রয়েছে মুসলিম জনসংখ্যার বৃদ্ধি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তার এবং শিক্ষিত তরুণ নারীদের একটি নতুন প্রজন্ম, যারা আধুনিক ফ্যাশনের ভাষায় নিজেদের পরিচয় প্রকাশ করতে চান।
গত এক দশকে আন্তর্জাতিক বড় ব্র্যান্ডগুলোও এই বাজারে আগ্রহ দেখিয়েছে। ডিকেএনওয়াই, টমি হিলফিগার, মাইকেল কর্স, ম্যানগো এবং এইচঅ্যান্ডএমের মতো ব্র্যান্ড রমজান বা মধ্যপ্রাচ্যের বাজার লক্ষ্য করে বিশেষ কালেকশন চালু করেছে। শুরুতে এসব উদ্যোগ নির্দিষ্ট অঞ্চলে সীমিত থাকলেও পরে মডেস্ট ফ্যাশনের নান্দনিকতা মূলধারার ফ্যাশনেও প্রভাব ফেলেছে—যেমন লম্বা হেমলাইন, উঁচু গলা, লেয়ারিং ও ঢিলেঢালা সিলুয়েট।
এই পরিবর্তনে মুসলিম ফ্যাশন ইনফ্লুয়েন্সারদের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। দিনা তোরকিয়া, আসসিয়া আল ফারাজ এবং মারিয়া আলিয়ার মতো ব্যক্তিত্বরা ইনস্টাগ্রাম ও ইউটিউবকে ব্যবহার করে বৈশ্বিক পর্যায়ে মুসলিম নারীদের প্রতিনিধিত্ব তৈরি করেছেন, যা পরে বড় ব্র্যান্ডগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
তবে মডেস্ট ফ্যাশনের এই উত্থানের পেছনে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের সামাজিক পরিবর্তনের গভীর প্রেক্ষাপটও। এক সময়ে আবায়া ছিল মূলত সাদামাটা ও কার্যকর পোশাক, যা সাধারণত কালো রঙে তৈরি হতো। এটি ধীরে ধীরে আরব উপদ্বীপে নারীদের পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকে পরিণত হয়।
গত দুই দশকে বিশেষ করে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের বড় শহরগুলোতে নতুন প্রজন্মের ডিজাইনাররা আবায়াকে পুনর্নির্মাণ শুরু করেছেন—এমব্রয়ডারি, আধুনিক কাট, উন্নত কাপড় এবং বৈশ্বিক ফ্যাশনের প্রভাব যুক্ত করে।
এর একটি উদাহরণ সৌদি ডিজাইনার ইসরা আল্লাফ, যিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন ব্র্যান্ড দ্য আনটাইটেলড প্রজেক্ট। তিনি ঐতিহ্যবাহী পোশাককে আধুনিক প্রিন্ট, রঙের বৈচিত্র্য এবং পরীক্ষামূলক ডিজাইনের মাধ্যমে পুনর্নির্মাণ করেন। তাঁর মতে, এই কাজ হলো “ফিউশন কালচার”—যেখানে ঐতিহ্য ও বৈশ্বিক আধুনিকতার সংমিশ্রণে নতুন সাংস্কৃতিক পরিচয় তৈরি হয়।
তথ্যসূত্র: এশিয়া নিউজ
এসআর