দেশের চলমান আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে জাতীয় নির্বাচন। এ সময় দেশের চলমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে আছেন উদ্যোক্তা ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। এমন প্রেক্ষাপটে তাদের পথচলা গতিশীল রাখতে রাজধানীতে শীতকালীন উদ্যোক্তা মেলার আয়োজন করে বি এইচ বিজনেস ক্লাব। গত ১৭ থেকে ১৯ জানুয়ারি রাজধানীর আফতাবনগরে অনুষ্ঠিত হয় শীতকালীন উদ্যোক্তা মেলা। অনিশ্চয়তার সময়টিতেও উদ্যোক্তাদের উজ্জীবিত রাখাই এই আয়োজনের মূল লক্ষ্য ছিল বলে আয়োজকেরা জানান।
কয়েক বছর ধরে উদ্যোক্তাদের নিয়ে মেলা, সেমিনার ও উদ্যোক্তা উৎসব আয়োজন করছে বি এইচ বিজনেস ক্লাব। এবারের এই আয়োজন ছিল তুলনামূলকভাবে আরো সংগঠিত ও সময়োপযোগী।
এই মেলায় অংশ নেন প্রায় অর্ধশতাধিক উদ্যোক্তা। একই ছাদের নিচে তারা তাদের পণ্য ও ব্র্যান্ড সরাসরি ক্রেতাদের সামনে তুলে ধরেন। ফ্যাশন, জুয়েলারি, কসমেটিকস, কিডস কালেকশন ও হোম ডেকরের মতো নানা ধরনের পণ্যের স্টল ছিল মেলায়। সবচেয়ে বেশি ভিড় লক্ষ করা গেছে ফুড স্টলগুলোয়, যেখানে দর্শনার্থীদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। মেলায় অংশগ্রহণকারী প্রতিটি উদ্যোক্তাকে সম্মাননা হিসেবে ক্রেস্ট প্রদান করা হয়।
এবারের মেলায় অংশ নেওয়া অনেক উদ্যোক্তার জন্য এটি ছিল প্রথমবারের মতো নিজেদের পণ্য ও ব্র্যান্ড সরাসরি মানুষের সামনে তুলে ধরার সুযোগ। অনেকেই ভালোবাসা ও যত্ন দিয়ে নিজেদের হাতে তৈরি পণ্যের স্টল সাজিয়েছেন, যা দর্শনার্থীদের দৃষ্টি কেড়েছে। এ বিষয়ে উদ্যোক্তারা জানান, ‘মেলায় সরাসরি ক্রেতাদের হাতে পণ্য তুলে দিতে পারা দারুণ অভিজ্ঞতা। মেলার আয়োজকদের সাহায্যে আমাদের উদ্যোগ সম্পর্কে অনেকেই জানতে পারছেন। এটা আমাদের এগিয়ে নিতে সহায়তা করবে।’
উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি এখানে ছিলেন ব্র্যান্ড প্রমোটার ও আমন্ত্রিত অতিথিরা, যারা উদ্যোক্তাদের উৎসাহ ও দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। যদিও মেলার মূল আকর্ষণ ছিলেন উদ্যোক্তারাই, তবে তাদের অনুপ্রাণিত করতে উপস্থিত ছিলেন বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বরা।
প্রধান অতিথি হিসেবে অনুষ্ঠানে ছিলেন উদ্যোক্তা ও ‘আমরা করব জয়’ প্ল্যাটফর্মের উপদেষ্টা জোহুরা হালিম লাভলি। তিনি বলেন, ‘একই ছাদের নিচে পরিশ্রমী উদ্যোক্তাদের একত্র করা সাহসী উদ্যোগ।’
বিশেষ অতিথি হিসেবে পুরো অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন বি এইচ বিজনেস ক্লাবের উপদেষ্টা ও ‘ফারজানা বুটিকস’-এর প্রতিষ্ঠাতা ফারজানা আফরিন। তিনি আরো বলেন, উদ্যোক্তাদের জন্য নিয়মিত মেলার আয়োজন জরুরি, কারণ এতে অফলাইনে ক্রেতাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ ও নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠে।
উদ্যোক্তাদের উৎসাহ বাড়াতে আয়োজকদের পক্ষ থেকে ছিল সংগীতানুষ্ঠান, যা পুরো আয়োজনকে আরো প্রাণবন্ত করে তোলে। সংগীতানুষ্ঠানের পাশাপাশি মেলায় ছিল বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে ফ্যাশন শো। বিনা মূল্যে এই ফ্যাশন শোতে অংশ নেন একাধিক উদ্যোক্তা, যারা নিজেদের তৈরি পোশাক ও জুয়েলারি নিজস্ব মডেলের মাধ্যমে প্রদর্শনের সুযোগ পান। আয়োজকদের পক্ষ থেকে আরো ছিলেন ব্র্যান্ড প্রোমোটার ও জনপ্রিয় মডেলরা, যারা সৃজনশীল উপস্থাপনার মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের ব্র্যান্ড তুলে ধরেন দর্শনার্থীদের সামনে।
বি এইচ বিজনেস ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা জান্নাতুল ফেরদৌস জান্নাত বলেন, ‘আমার প্রত্যেকটা মেলায় একটাই লক্ষ্য থাকে—উদ্যোক্তাদের পাশে থাকা। তারা আমার দিকে তাকিয়ে আসেন স্টল নিতে, তাই আমার মূল উদ্দেশ্য তাদের সফলতা। মেলার মাধ্যমে যদি তাদের প্রচার হয়, তাহলেই তারা উৎসাহিত হবেন।’
মেলা আয়োজনে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে ছিলেন তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধিরা। তাদের মধ্যে রয়েছেন শিক্ষার্থীরাও। তারা জানান, পড়াশোনার পাশাপাশি এই কাজের সুযোগ আমাদের বড় বড় দায়িত্ব গ্রহণ করতে শেখাচ্ছে, পাবলিক স্পিকিং সহজ করে দিচ্ছে।
স্বেচ্ছাসেবকদের সম্মাননা স্বরূপ পুরস্কার ও সার্টিফিকেট প্রদান করেন বি এইচ বিজনেস ক্লাবের সম্মানিত উপদেষ্টা ফারজানা আফরিন।
মেলার বাইরেও বি এইচ বিজনেস ক্লাবের কার্যক্রম নিয়মিত চলমান রয়েছে। উদ্যোক্তাদের দক্ষতা উন্নয়নে তারা আয়োজন করে বিভিন্ন ওয়ার্কশপ, যেখানে প্রোডাক্ট ফটোগ্রাফি, অনলাইন ব্যবসা পরিচালনা ও অফলাইন নেটওয়ার্কিংয়ের মতো বিষয়গুলো বাস্তবমুখীভাবে শেখানো হয়।
আয়োজকেরা জানান, উদ্যোক্তাদের জন্য নির্ভরযোগ্য কার্যকর প্ল্যাটফর্ম তৈরি করাই বি এইচ বিজনেস ক্লাবের মূল উদ্দেশ্য। সরকারি উদ্যোগ সীমিত হয়ে আসার প্রেক্ষাপটে বেসরকারি পর্যায়ে এমন আয়োজন উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করছে। ভবিষ্যতেও নিয়মিত মেলা, প্রশিক্ষণ ও নেটওয়ার্কিং কার্যক্রমের মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের পাশে থাকার ঘোষণা দিয়েছে বি এইচ বিজনেস ক্লাব। এসব উদ্যোগই বি এইচ বিজনেস ক্লাবকে সাহস ও সম্ভাবনার প্রতীকে পরিণত করেছে। উদ্যোক্তাদের কল্যাণে ভবিষ্যতেও এ ধরনের আয়োজন অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছেন আয়োজকেরা।
লেখক : কলামিস্ট ও শিক্ষার্থী