হোম > ফিচার > পাঠকমেলা

শরৎ এসেছে, বাবা আসেনি

ফারহানা মুনমুন

আকাশজুড়ে সাদা মেঘ। তার ফাঁক দিয়ে নরম রোদ এসে পড়েছে গ্রামের রাস্তায়। দূরের কাশফুলগুলো হালকা বাতাসে দুলছে। প্রকৃতি যেন সাদা শাড়ি পরে কোথাও যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। চারপাশে শরতের নির্মল সৌন্দর্য, অথচ সেই সৌন্দর্যের মাঝেও কোথায় যেন এক অদৃশ্য বিষণ্ণতা লুকিয়ে আছে।

স্বপ্ন জানালার পাশে বসে চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছিল। হঠাৎ তার চোখ পড়ল উঠানের পাশের বড় শিউলিগাছটার দিকে। গাছটি সাদা সাদা ফুলে ভরা। বাতাসে দুলতে দুলতে শিউলি ফুলগুলো ঝরে পড়ছে মাটিতে।

স্বপ্ন অনেক দিন পর বাড়িতে এসেছে। শহরের ব্যস্ত জীবন, ক্লাস, পড়াশোনা আর প্রতিদিনের নানা দায়িত্বের মধ্যে প্রকৃতির সঙ্গে তার দূরত্ব যেন ধীরে ধীরে বেড়ে গিয়েছিল। শহরের কোলাহল আর যান্ত্রিকতার ভিড়ে কোথায় যেন হারিয়ে ফেলেছিল নিজের সেই সহজ-সরল স্বভাবটাকে। অথচ গ্রামে আসার পর থেকে তার মনে হচ্ছে, বহুদিন পর সে যেন নিজেকেই আবার খুঁজে পেয়েছে। মাটির গন্ধ, পাখির ডাক, পুকুরের পানি আর শরতের আকাশ তাকে ফিরিয়ে দিয়েছে তার শৈশবের কাছে।

চায়ের কাপটা রেখে স্বপ্ন বাইরে বেরিয়ে এলো। শিউলিগাছের নিচ থেকে কয়েকটি ফুল তুলে নিয়ে ধীরে ধীরে পুকুরপাড়ে গিয়ে বসল। পুকুরের পানিতে নীল আকাশের ছায়া। দূরে কয়েকটি পাখি উড়ে যাচ্ছে। চারপাশের নীরবতা হঠাৎ স্বপ্নকে নিয়ে গেল বহু বছর আগের এক শরতের বিকালে। বাবা মারা গেছেন আজ চার বছর। এই শরৎকালেই বাবার সঙ্গে জড়িয়ে আছে কত শত স্মৃতি। মনে পড়তেই স্বপ্নের বুকটা হু হু করে উঠল। চোখের কোণে জমে উঠল অশ্রু।

স্বপ্ন ছিল বাবার খুব আদরের। প্রতিদিন বিকালে ছোট্ট স্বপ্ন বাবার হাত ধরে বাজারে যেত। একদিন এমনই এক বিকালে বাজারে যাওয়ার পথে রাস্তার পাশে বিশাল কাশবন দেখে স্বপ্ন হঠাৎ বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘বাবা, রাস্তার পাশে এই সাদা জিনিসগুলো কী? তুলা নাকি মেঘ?’

বাবা হেসে বলেছিলেন, ‘না, এগুলো তুলা কিংবা মেঘ নয়।’

স্বপ্ন আবার জানতে চেয়েছিল, ‘তাহলে এগুলোকে কী বলে, বাবা?’

বাবা মায়াভরা কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘এগুলোকে কাশফুল বলে।’

বাবা হয়তো আরো কিছু বলতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তার কথা শেষ হওয়ার আগেই ছোট্ট স্বপ্ন বাবার হাত ছেড়ে কাশবনের দিকে দৌড়ে গেল। কাশফুলের মাঝে ছুটতে লাগল, কখনো ডানে, কখনো বাঁয়ে। দু-একটি কাশফুল ছিঁড়ে হাতে নিল। বাবা দূরে দাঁড়িয়ে মুগ্ধ চোখে তার ছোট্ট মেয়ের দুষ্টুমি দেখছিলেন। কিছুক্ষণ পর স্বপ্ন একটি কাশফুল বাবার হাতে দিয়ে বলেছিল, ‘বাবা, তুমি পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো বাবা। আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি।’

বাবা কিছুক্ষণ চুপ করে মেয়ের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। তারপর তার মাথায় হাত রেখে মৃদু হেসেছিলেন।

সেদিনের সেই হাসিটা আজও স্বপ্নের চোখে ভাসে। তারপর তারা দুজন বাজারের দিকে চলে গিয়েছিল। ছোট্ট স্বপ্ন বাবার হাত শক্ত করে ধরে হাঁটছিল। শরতের বাতাসে কাশফুলগুলো তখনো দুলছিল।

কিন্তু সময় তো কখনো থেমে থাকে না। একদিন শরৎ শেষ হয়ে গেল। পরেরবার মাঠে গিয়ে স্বপ্ন দেখল, চারপাশ ফাঁকা। কোথাও কোনো কাশফুল নেই। ছোট্ট স্বপ্ন তখন ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল। মেয়ের কান্না দেখে বাবা ভীষণ চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলেন। তখনো সে জানত না, জীবনের কোনো কোনো শূন্যতা একদিন চাইলেও আর পূরণ করা যায় না। আজ স্বপ্ন অনেক বড় হয়েছে। শরৎ আসে, শরৎ চলে যায়। কিন্তু বাবা আর আসেন না।

চার দিন হলো স্বপ্ন গ্রামে এসেছে। মাঠজুড়ে কাশফুল, উঠানজুড়ে শিউলি। প্রকৃতি যেন আগের মতোই সেজেছে। অথচ এসবের প্রতি তার আর আগের মতো কোনো আগ্রহ নেই। কারণ, প্রকৃতি বাবার শূন্যতা অনুভব করতে না পারলেও স্বপ্ন ঠিকই পারে।

মাঠভরা কাশফুল আর উঠানভরা শিউলি তার মনের শূন্যতা পূরণ করতে পারে না। তার কল্পনায় বারবার ফিরে আসে শুধু একটি দৃশ্য—এক শরতের বিকালে সে বাবার হাত ধরে কাশবনের পাশ দিয়ে হাঁটছে। বাবা কাশবন থেকে একটি ফুল ছিঁড়ে তার হাতে দিচ্ছেন। আর ছোট্ট স্বপ্ন সেই ফুল হাতে নিয়ে মনের আনন্দে ছুটে বেড়াচ্ছে।

স্বপ্ন চোখ মুছে আকাশের দিকে তাকাল। সাদা মেঘগুলো ধীরে ধীরে ভেসে যাচ্ছে। হঠাৎ একটি শিউলি ফুল এসে তার পাশে পড়ল। স্বপ্ন ফুলটি হাতে তুলে নিল। মনে হলো, বাবা যেন আজও তাকে কোনো এক শরতের বিকালে কাশফুল হাতে দিয়ে বলছেন, ‘ভয় পাস না, আমি তো আছি।’

কিন্তু বাস্তবতা বড় নির্মম। বাবা নেই। শুধু রয়ে গেছে তার স্মৃতি। স্বপ্ন মুঠোয় শিউলি ফুলগুলো শক্ত করে ধরে মৃদু স্বরে বলল, ‘বাবা, শরৎ আবার এসেছে। শুধু তুমি আসোনি।’

তার চোখ বেয়ে নেমে এলো কয়েক ফোঁটা অশ্রু। দূরের কাশবন তখনো বাতাসে দুলছিল। শিউলি ফুল ঝরছিল একের পর এক।

পাঠকমেলার সদস্য সভা

অনলাইনে নারীরা কীভাবে নিরাপদ থাকবেন

ভিন্নমত নিয়ে শিক্ষাঙ্গনে ঐক্য

ইবি পাঠকমেলার সদস্য আড্ডা

মাদারীপুরে পাঠকমেলার যাত্রা শুরু

শহীদ আনাস স্মরণে পাঠকমেলার পাঠচক্র

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় পাঠকমেলার মতবিনিময় সভা

আড্ডা থেকে সামনে চলার ভাবনা

ফ্যাসিবাদের আঁতুড়ঘর

মধুসূদনের সাগরদাঁড়িতে ইবি পাঠকমেলা