বাংলাদেশের করপোরেট অফিসগুলোয় একটি বিষয় প্রায়ই দেখা যায়। বস নতুন কোনো কাজ দিলেই কেউ কেউ অস্বস্তিতে পড়ে যান। কাজটি কীভাবে এড়ানো যায়, কী অজুহাত দেওয়া যায়—সেটাই হয়ে ওঠে বড় চিন্তা। অথচ একবারও কি ভেবে দেখেছেন, বস আপনাকে কাজ দেন কেন? আপনার ক্ষতি করার জন্য, নাকি আপনার ওপর আস্থা আছে বলেই? অবশ্যই সব ক্ষেত্রে এমন নয়। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে কাজের চাপ অন্যায্য হতে পারে, ব্যবস্থাপনাও সব সময় আদর্শ হয় না। কিন্তু বেশিরভাগ কর্মক্ষেত্রে কোনো একজন কর্মীকে বারবার দায়িত্ব দেওয়ার পেছনে তার সক্ষমতার ওপর আস্থার বিষয়টিও থাকতে পারে। অফিসে এত মানুষ থাকতে আপনাকেই যদি কোনো কাজ দেওয়া হয়, তাহলে সেটিকে শুধু ‘অতিরিক্ত কাজের চাপ’ হিসেবে না দেখে একবার অন্যভাবেও ভাবুন—এটি হয়তো নিজের সক্ষমতা দেখানোর একটি সুযোগ।
ধরুন, আপনার নিয়মিত দায়িত্বের বাইরে একটি কাজ দেওয়া হলো। আপনি শুধু নির্দেশ অনুযায়ী কাজটি শেষ না করে নিজের সৃজনশীলতা ব্যবহার করলেন। কাজটি এমনভাবে করলেন, যাতে বস বুঝতে পারেন—আপনি শুধু নির্দেশ পালন করেন না, সমস্যার সমাধান নিয়েও চিন্তা করেন। এই অতিরিক্ত সক্ষমতাগুলোই একসময় আপনার পেশাগত পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠতে পারে।
অন্যদিকে আপনি যদি সবসময় কাজ এড়িয়ে চলেন, অজুহাত দেন, কিংবা ‘এটা আমার কাজ নয়’ বলে দায়িত্ব থেকে সরে যান, তাহলে ধীরে ধীরে আপনার সম্পর্কে একটি ধারণা তৈরি হতে পারে—‘এই মানুষটি কাজ এড়িয়ে চলে।’ ক্যারিয়ারে এমন ধারণা তৈরি হওয়া কখনোই ভালো নয়। অনেকে আবার বলেন, ‘বস শুধু আমাকেই কাজ দেয়। অন্য কাউকে দেখে না।’ এই কথাটি বলার আগে একটু অন্যভাবে ভাবুন।
বস আপনাকে যোগ্য মনে করেন বলেই হয়তো আপনাকে কাজ দেন। কাজ করতে করতে আপনি সবার নজরে আসবেন। হয়তো একটু দেরিতে, কিন্তু আপনার কাজের পরিচয় একসময় তৈরি হবেই। কাজ এড়িয়ে গিয়ে দীর্ঘ মেয়াদে কারো আস্থা অর্জন করা কঠিন। আর কোনো কাজই পুরোপুরি ফেলনা নয়। আজ যে কাজটি করতে আপনার এক ঘণ্টা লাগে, অভিজ্ঞতা হওয়ার পর সেটিই হয়তো ১৫ মিনিটে করতে পারবেন। কাজের মধ্য দিয়েই দক্ষতা তৈরি হয়। অন্যরা ধীরে ধীরে আপনার ওপর নির্ভর করতে শুরু করবে। বস হয়তো একদিন অন্য কাউকে বলবেন, ‘ওই কাজটা তো শফিক করে।’ সেখান থেকেই তৈরি হবে আপনার একটি আলাদা পরিচয়। প্রয়োজন হলেই মানুষ আপনার কাছে আসবে। আপনার গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে। একই সঙ্গে অন্যের ওপর আপনার নির্ভরতাও কমবে। তবে এর অর্থ এই নয় যে, আপনি অসীম কাজের চাপ নীরবে সহ্য করবেন।
ধরুন, আপনার ওপর সত্যিই অনেক কাজ জমে গেছে। এক কাজ শেষ করতে না করতেই আরেক কাজ এসে হাজির হচ্ছে। দম ফেলারও সময় নেই। তখন শুধু ‘আমি পারছি না’ বা ‘আমার ওপর অনেক চাপ’—এভাবে অভিযোগ না করে আগে কাজের একটি তালিকা তৈরি করুন। কোন কাজ করতে কত সময় লাগছে, কোন কাজটি আগে শেষ করা জরুরি, কোন কাজের ডেডলাইন কখন, কোন কাজটি অন্য কাজের ওপর নির্ভরশীল—এসব তথ্য সাজিয়ে বসকে বুঝিয়ে বলুন।
এখানে কথা বলার ধরনটিও গুরুত্বপূর্ণ। আক্রমণাত্মকভাবে বললে সমস্যা তৈরি হতে পারে। কিন্তু তথ্য-উপাত্ত দিয়ে শান্তভাবে বোঝাতে পারলে একজন ভালো বস আপনার পরিস্থিতি বুঝতে পারবেন।
আমার ২১ বছরের কর্মজীবনের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, অনেকেই কাজের চাপ নিয়ে প্রচুর হইচই করেন। মনে হয়, কাজের চাপে তিনি বুঝি শেষ হয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু বস যখন প্রশ্ন করেন, ‘সারা দিন কী কী কাজ করেন, কোন কাজে কত সময় লাগে’—তখন অনেকেই আর সঠিকভাবে কিছু দেখাতে পারেন না। কারণ শুধু মুখের কথায় কাজের চাপ বোঝানো কঠিন। আপনাকে তথ্য দিয়ে দেখাতে হবে—আপনার ওপর আসলে কতটা কাজ আছে এবং কোথায় সময় ব্যয় হচ্ছে।