হোম > জুলাই বিপ্লব

শহীদি মৃত্যু কামনা করে সেদিনই গুলিবিদ্ধ হন

মাহমুদুল হাসান আশিক

হাসিনা সরকারের পদত্যাগের এক দফা দাবিতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন রাজশাহীতেও তুঙ্গে উঠেছিল। এই আন্দোলনের অন্যতম নেতা ছিলেন রাজশাহী মহানগর ছাত্রশিবিরের সাংগঠনিক সম্পাদক এবং রাজশাহী কলেজের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র মোহাম্মদ আলী রায়হান ।

৪ আগস্ট কর্মসূচি সফল করার পর গ্রেফতার এড়াতে স্থানীয় এক পুলিশ কর্মকর্তার বাসায় আশ্রয় নেন তিনি। ৫ আগস্ট ফজরের নামাজের পর মোনাজাতে শহীদি মৃত্যু কামনা করেন তিনি। সেই রাতে তার সঙ্গে থাকা সহযোদ্ধারা জানিয়েছেন এসব তথ্য।

এরপর সেদিন সকালে আন্দোলনে অংশ নেওয়ার পর আওয়ামী সন্ত্রাসীদের গুলিতে গুরুতর আহত হন রায়হান। গুলি এসে লাগে তার মাথায়। তাকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৮ আগস্ট শাহাদত বরণ করেন তিনি। এর আগে তিনি যেদিন গুলিবিদ্ধ হন সেদিনই আন্দোলনে আসে বিরাট সফলতা। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা প্রবল গণরোষের মুখে দুপুরেই পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নেন।

রায়হানের এক সহযোদ্ধা জানিয়েছেন, সরকারের পদত্যাগের এক দফা দাবিতে সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনে ৪ আগস্টের কর্মসূচি সফল করার পর গ্রেফতার এড়াতে নিরাপদ আশ্রয় খুঁজছিলেন রায়হান। সঙ্গে থাকা দুই সহযোদ্ধা নাজির আহমেদ সুপ্ত ও মারুফ মোর্তজাকে নিয়ে রাতে পুলিশের এক উপ-পরিদর্শকের বাসায় আশ্রয় নেন তারা।

এই পুলিশ কর্মকর্তা আন্দোলনের সময় বাসায় না থাকায় তার ছেলে শিবির নেতাদের থাকতে দেন। সেখানে ভোরে ফজর নামাজে ইমামতি করে মোনাজাতে নিজের জীবনের সব ভুলত্রুটির জন্য মহান রবের দরবারে ক্ষমা প্রার্থনার পর শহীদি মৃত্যু কামনা করেন রায়হান।

তারা আরও জানান, ৫ আগস্টের কর্মসূচি সফল করার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ছাত্র-জনতাকে সন্ত্রাসী হামলা থেকে রক্ষা করতে মিছিলের সামনের ও পেছনের কয়েকটি সারিতে ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের থাকার সিদ্ধান্ত হয়।

পরিকল্পনা অনুযায়ী ৫ আগস্ট সকালে তালাইমারী নর্দান মোড়ে এসে রায়হান নেতাকর্মীদের বলেন, ‘যদি সামনের দিক থেকে আক্রমণ হয়, পেছনের দিক থেকে ছাত্র-জনতাকে বের করে দেবে। আর পেছন দিক থেকে আক্রমণ হলে সামনের দিক থেকে বের করে দেবে।’ আঘাত এলে যেন তার শরীরেই আগে লাগে জানিয়ে আলী রায়হান বলেন, ‘যদি শহীদও হয়ে যাই, তবু সামনের সারিতেই থাকব, ছাত্রদের রক্ষা করব।’

মিছিলের সামনের সারির ডানপাশে থেকে ছাত্র-জনতাকে নেতৃত্ব দিয়ে রায়হান যাচ্ছিলেন জিরো পয়েন্টের দিকে। মিছিল আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের সামনে যেতেই দেখা যায় পুলিশের সঙ্গে সশস্ত্র অবস্থান নিয়েছে দলটির সন্ত্রাসীরাও। আন্দোলনকারীরা কাছাকাছি আসতেই তাদের লক্ষ্য করে কয়েকটি ককটেল নিক্ষেপ করে সন্ত্রাসীরা।

এতে লোকজন কিছুটা ছত্রভঙ্গ হলেও রায়হানদের সাহসী নেতৃত্বে সামনে অগ্রসর হতে থাকে ছাত্র-জনতা। এ সময় পাশের একটি শাখা সড়ক ও মূল সড়ক থেকে দেশি-বিদেশি অস্ত্র হাতে সামনে এগোতে থাকে সন্ত্রাসীরা। আলী রায়হানরা তখন দু’পাশের সড়কেই ইটপাটকেল ছুড়ে তাদের গতিরোধ করছিলেন।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, আওয়ামী সন্ত্রাসীরা কেউ দু’হাতে দুটি আবার কেউ একটি করে বিদেশি পিস্তল ও শটগান দিয়ে গুলি শুরু করে। তখন সময় দুপুর ১টা ১৫ মিনিট। সে সময়ই হাতে গুলিবিদ্ধ হন আল-মারুফ (২৭)। আহত মারুফকে মোটরসাইকেলে তোলার সময় একটি গুলি এসে লাগে আলী রায়হানের মাথায়। মুহূর্তেই মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি।

রায়হানকে দ্রুত মোটরসাইকেলে বসিয়ে রামেকের জরুরি বিভাগে নিয়ে যাওয়া হয়। এরই মাঝে খবর ছড়িয়ে পড়ে দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন ফ্যাসিস্ট হাসিনা। ছাত্র-জনতার আন্দোলন বিজয় মিছিলে রূপ নেয়। অন্যদিকে অপারেশন করে রায়হানের মাথা থেকে গুলি বের করতে তাকে অ্যাম্বুলেন্সযোগে ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়। নগরীর কাজলা এলাকায় এলে আওয়ামী সন্ত্রাসীরা

অ্যাম্বুলেন্সটি ভেঙে ফেলে। বাধ্য হয়ে রায়হানকে ফিরিয়ে আনা হয় রামেক হাসপাতালে।

তখনও পরিবার জানে না রায়হান গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুপথযাত্রী। আলী রায়হানের বাবা দিনমজুর মুসলেম উদ্দিন সেদিন অন্যের জমিতে কাজ করছিলেন। ছেলের গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবর পেয়ে স্ত্রী ও অন্য সন্তানদের নিয়ে দ্রুত ছুটে যান রামেক হাসপাতালে। অপারেশন করে গুলি বের করা গেলেও তার অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকে এবং ৮ আগস্ট চিকিৎসাধীন অবস্থায় শাহাদত বরণ করেন রায়হান।

৯ আগস্ট জুমার নামাজের পর লাখো মানুষের উপস্থিতিতে রাজশাহী কলেজ প্রাঙ্গণে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানের ইমামতিতে শহীদ রায়হানের প্রথম জানাজা সম্পন্ন হয়। এরপর রাজশাহীর পুঠিয়ার মঙ্গলপাড়ায় দ্বিতীয় জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তার লাশ দাফন করা হয়।

১২ আগস্ট সন্ধ্যায় রাজশাহী নগরীর আলুপট্টি মোড়কে শহীদ আলী রায়হান চত্বর হিসেবে ঘোষণা করেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক সালাউদ্দিন আম্মার। জুলাই বিপ্লবে ১৭ জুলাইয়ের পর থেকে রায়হান রাজশাহীর আন্দোলনের অন্যতম একটি অংশ ছিলেন বলে আমার দেশকে জানান তিনি।

রায়হান হত্যাকাণ্ডে ১৯ আগস্ট রাজশাহীর বোয়ালিয়া থানায় ৫০ জনের নাম উল্লেখ এবং ১২ শ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করে মামলা করেন তার ছোট ভাই রানা ইসলাম।

বিকেএসপিতে জুলাই বিপ্লবে আহত যোদ্ধাদের বিশেষ প্রশিক্ষণ ক্যাম্পের সনদ প্রদান

দ্রুত ফাঁসির রায় কার্যকর চায় শহীদ শিশুদের পরিবার

বাবুগঞ্জে ৩ শহীদ পরিবারের প্রতিক্রিয়া, ‘রায় ঘোষণা নয়, দ্রুত কার্যকর চাই’

জুলাই যোদ্ধাকে বাদী সাজিয়ে বানোয়াট মামলা

অর্থাভাবে অপারেশন করাতে পারছেন না জসিম

মাদরাসা ও সংসার হারিয়ে দিশেহারা জুলাইযোদ্ধা শফিকুর

গুলি খেয়ে কাতরাচ্ছিলেন তাইম, দাঁড়িয়ে উপভোগ করছিল পুলিশ

স্বামী হত্যাকারীদের ফাঁসি চান শহীদ মিজানুর রহমানের স্ত্রী

টিয়ারশেলের স্প্লিন্টারের যন্ত্রণা বয়ে বেড়াচ্ছেন রাফি

অবহেলার শিকার শহীদ নুরুল মোস্তফার পরিবার