জুলাই মাসের উত্তাল সময়। ঢাকা শহর স্তব্ধ করে দিতে ইন্টারনেট বন্ধ করে কারফিউ জারি করে আন্দোলন দমিয়ে রাখতে বদ্ধপরিকর আওয়ামী লীগ সরকার। তবুও দমিয়ে রাখা যাচ্ছে না ছাত্রদের। তাদের সঙ্গে যুক্ত হয় মুক্তিকামী জনতা। কারফিউর মধ্যেও ঢাকার জায়গায় জায়গায় দফায় দফায় চলছিল সংঘর্ষ, রক্তে ভিজে যাচিছল রাজপথ । শহীদ হন হাজারো ছাত্র-জনতা। এমনই এক উত্তাল দিনে যাত্রাবাড়ীর শনিরআখড়ার বাসিন্দা আহসান হাবিব রাস্তায় নামেন। উদ্দেশ্য মুক্তিকামী ক্লান্ত জনতাকে খিচুড়ি রান্না করে খাওয়ানো। খিচুড়ি খাওয়ানোর সুযোগ আর পাননি তিনি। রান্নারত অবস্থাতেই তার বুক লক্ষ করে গুলি ছোড়ে পুলিশ। ১৯ জুলাই শহীদ হন তিনি।
পেশায় আহসান ছিলেন গাড়িচালক। দিন এনে দিন খেতেন। চার সন্তানের বাবা আহসানের সংসারে টাকা-পয়সার কমতি থাকলেও কখনও সুখের কমতি ছিল না। সন্তানদের তিনি কখনও অপূর্ণতার স্বাদ পেতে দেননি। দিনরাত কষ্ট করে সবাইকে খুশি রাখতেন।
স্বৈরাচার হাসিনার বিরুদ্ধে আন্দোলনে আবু সাঈদ ও মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ শহীদ হন। তাদের দেখে বারবার ছটফট করছিলেন আহসান হাবিব। সিদ্ধান্ত নিলেন তিনিও মাঠে নামবেন। আন্দোলনের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র শনিরআখড়ায় ১৭ জুলাই থেকে ঝাঁপিয়ে পড়েন তিনি । আন্দোলনের সময় গাড়ি চালিয়ে এসে যোগ দিতেন মিছিলে। পাশাপাশি সব সময় চেষ্টা করতেন ছাত্রদের পানিসহ অন্যান্য জিনিস সরবরাহ করে সাহায্য করতে। পরিবারের অজান্তে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে বসে বিভিন্ন কৌশলগত পরামর্শ করতেন কীভাবে আন্দোলন করবেন, কীভাবে কোন জায়গায় গেলে পুলিশের পক্ষে গুলি করা কঠিন হবে ইত্যাদি।
ঢাকায় কারফিউ শুরু হওয়ার পর থেকে চারদিকে নেমে আসে স্থবিরতা। বন্ধ হয়ে যায় কাজ। কিন্তু আহসান হাবিব এমন মানুষ ছিলেন না যিনি ঘরে বসে সময় কাটাবেন। ১৯ জুলাই আন্দোলনের বেদনাদায়ক ভিডিওগুলো দেখে তিনি স্থির থাকতে পারলেন না। মনস্থির করলেন কিছু একটা করতে হবে। মাঠে নেমে ক্লান্ত শরীরে আন্দোলনকারীদের দেখে তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন সবার জন্য রাজপথেই খিচুড়ি রান্না করবেন।
তৎক্ষণাৎ প্রয়োজনীয় সামগ্রী জোগাড় করে রান্নার প্রস্তুতি নেন। হাঁড়ি-পাতিল নিয়ে তিনি শুরু করেন রান্না। কিন্তু রান্নার কাজ শেষ করতে পারলেন না। হঠাৎ ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার মধ্যে একদল পুলিশ সেখানে এসে উপস্থিত হয়। তারা আহসানকে রান্না করতে দেখে ঠাণ্ডা মাথায় বন্দুক তাক করে বুক বরাবর গুলি ছোড়ে। মুহূর্তেই তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন।
স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত তাকে উদ্ধার করে প্রথমে দেশবাংলা হাসপাতালে নিয়ে যান। কিন্তু সেখানে তাকে কোনো চিকিৎসা দেওয়া হয়নি। বাধ্য হয়ে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন পরিবারের সঙ্গে শেষ কথা বলতে , বারবার মোবাইলে কল দেয়ার চেষ্টা করেন। তবে ইন্টারনেট ও মোবাইল নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন থাকায় তা সম্ভব হয়নি।
এলাকার পরিচিত মুখ হওয়ায় স্থানীয়দের মুখে মুখে আহসানের গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ে। সেই সূত্র ধরে খবর পৌঁছে যায় তার পরিবারের কাছে। খবর পেয়ে তার বড় মেয়ে ফাতেমা হাসপাতালে যান। সেখানে গিয়ে তিনি দেখতে পান তার বাবাকে হাসপাতালের মেঝেতে ফেলে রাখা হয়েছে। চারপাশে আরও অনেক আহত মানুষ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে।
ফাতেমা ছুটে গিয়ে বাবা বাবা বলে ডাকতে থাকেন। ডাক্তারদের বারবার অনুরোধ করেন যেন তার বাবার চিকিৎসা শুরু করা হয়। কিন্তু তার আরজি উপেক্ষা করে এক ডাক্তার তাকে ধমক দিয়ে চুপ থাকতে এবং চলে যেতে বলেন। তবুও তিনি অনুনয়-বিনয় করতে থাকেন। অনেকক্ষণ পর এক ডাক্তার এগিয়ে এসে পরীক্ষা করেন এবং জানান, আহসান মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছেন।
বাবার মৃত্যুর খবর জেনে ফাতেমা মুহূর্তেই পিতৃশোকে পাথর হয়ে যান। কিছুক্ষণ পর অচেতন হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। মৃত্যুর খবর পেয়ে আত্মীয়-স্বজনদের কেউ কেউ এসে পৌঁছান হাসপাতালে। কিন্তু তাদের কাছে লাশ হস্তান্তর করতে অস্বীকৃতি জানায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। তাদের জানানো হয়, যাত্রাবাড়ী থানার ওসির অনুমোদন ছাড়া লাশ হস্তান্তর করা যাবে না। হতবিহ্বল হয়ে পড়েন পরিবারের সদস্যরা।
থানায় যাওয়ার পর তারা দেখলেন এ যেন হয়রানির নতুন জাহান্নাম। আশা ছিল অন্তত লাশটা তাদের নিতে দেবে; কিন্তু তাদের জন্য অপেক্ষা করছিল লজ্জাজনক ব্যবহার, অবমাননা আর নির্মম হয়রানি।
থানার ভেতরে পুলিশ সদস্যদের বাজে ভাষায় গালিগালাজ এবং চেক করার নামে হেনস্তার শিকার হন আহসানের স্ত্রী ও ভাগ্নে। এমনকি একজন পুলিশ তার ভাগ্নের বুক বরাবর বন্দুক তাক করে শরীর চেক করার নির্দেশ দেন।
এর পরদিনও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ লাশ ফেলে রাখে। দিন গড়িয়ে রাত নামলেও পরিবারের কষ্টের শেষ হয় না। একসময় শাহবাগ থানার ওসিকে অনুনয়-বিনয় করে তবেই লাশ নেওয়ার অনুমতি পান তারা।
বাবাকে হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন তার সন্তানরা। শহীদ আহসানের ছোট সন্তানের বয়স মাত্র এক বছর। সে এখনো মোবাইলে তার বাবার ছবির দিকে তাকিয়ে থাকে, চুমু খায়, যেন ফোনের ভেতর থেকে সাড়া দেবেন বাবা। সে জানে না তার বাবা আর কোনোদিন সাড়া দেবে না।
সম্পাদনা : ইলিয়াস