হোম > জুলাই বিপ্লব

জুলাই বিপ্লবের অন্তরালে : সিদ্ধান্ত, সংকট ও সাহস

সাদিক কায়েম

ফাইল ছবি

জুলাই বিপ্লব ছিল আপামর ছাত্র-জনতার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের এক ঐতিহাসিক নজির। এই বিপ্লবের শহীদরা তাদের শাহাদতের মাধ্যমে আমাদের নতুন বাংলাদেশ নির্মাণের পথ দেখিয়েছেন। তাঁদের শাহাদত, গাজীদের ত্যাগ ও সীমাহীন জুলুমের মধ্য দিয়েই আমরা কাঙ্ক্ষিত আজাদির পথে এগিয়ে যেতে পেরেছি।

বিপ্লবের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নীতিনির্ধারণ এবং মাঠপর্যায়ের সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আমি অনেক ঐতিহাসিক ঘটনার বাস্তব সাক্ষ্য হয়েছি। আন্দোলনের সবচেয়ে কঠিন সময়ে, যখন প্রথম সারির সমন্বয়কদের অনেকেই অনুপস্থিত ছিলেন, তখন দ্বিতীয় সারির সমন্বয়কদের সেফ হোমে রাখা, বিভিন্ন পর্যায়ের সঙ্গে সমন্বয় বজায় রাখা এবং যোগাযোগ অব্যাহত রাখার কাজ করতে হয়েছিল। এই পুরো প্রক্রিয়ায় সব ধরনের ছাত্র সংগঠন, রাজনৈতিক দল, মুক্তিকামী ছাত্র-জনতা, কওমি ও আলিয়া মাদরাসার শিক্ষার্থী, আলেমসমাজ, পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অনবদ্য ভূমিকা অনস্বীকার্য।

ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের সময়, ১৯ জুলাই থেকে ২৪ জুলাই পর্যন্ত প্রতিদিনের কর্মসূচি আমার এবং অন্যান্য নেতার ফোন নম্বর থেকেই সাংবাদিকদের কাছে প্রচার করা হয়। পাশাপাশি আমাদের টিম হার্ড কপি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মিডিয়া হাউসগুলোতে পৌঁছে দেয়।

সে সময় ফ্যাসিস্ট হাসিনার গণহত্যা, গুম ও দমন-পীড়নের কারণে অনেকেই মনে করেছিলেন আন্দোলন আর এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে না। কিন্তু আমরা আমাদের অবস্থান থেকে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার এবং সেটিকে হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনের পতনের আন্দোলনে পরিণত করার ব্যাপারে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিলাম।

২৬ জুলাই নাহিদ ও আসিফকে আবার ডিবি কার্যালয়ে তুলে নেওয়া হলে সেকেন্ড লেয়ারের সমন্বয়কদের আমরা সমন্বয়ের মাধ্যমে সেফ হোমে রাখার ব্যবস্থা করি। ওই সময় একটি প্রেস ব্রিফিং করার জন্য আব্দুল হান্নান মাসুদ আমার কাছে গণহত্যার তথ্য ও শহীদদের তালিকা চান। ওইদিন শেখ হাসিনা ঢাকা মেডিকেলে যান এবং বিভিন্নভাবে চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছিল যাতে হান্নান মাসুদেরা হাসিনার সঙ্গে দেখা করে। তখন আমি হান্নান মাসুদ ও অন্যান্য সমন্বয়ককে স্পষ্টভাবে বলি, যারা গণহত্যা করেছে, আমাদের ভাইদের শহীদ করেছে; যাদের হাতে আমাদের ভাইবোনদের রক্ত লেগে আছে তাদের সঙ্গে হাসপাতালে যাওয়া শহীদদের সঙ্গে প্রতারণার শামিল।

পরে হান্নান মাসুদ ও তার টিম গণস্বাস্থ্য হাসপাতালে আসিফ মাহমুদ ও নাহিদ ইসলামের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে চিকিৎসারত আহতদের খোঁজখবর নিতে কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে যান। আহতদের খোঁজখবর নেওয়া শেষে একটি সংবাদ সম্মেলন করার কথা ছিল। সেখানে হাসপাতাল ঘিরে ফেলে গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা। বাইরে ইন্টারনেট না থাকলেও হাসপাতালের ওয়াই-ফাই ব্যবহার করে হান্নান মাসুদ আমাকে ভয়েস মেসেজ পাঠান এবং গণহত্যা, গুম, মামলা ও শহীদদের তথ্য-প্রমাণ পাঠানোর অনুরোধ করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে আমি সহ-সমন্বয়ক মুসাদ্দিক আলী ইবনে মোহাম্মদ এবং ছাত্রদলের আব্দুল গাফফারের মাধ্যমে শহীদদের তালিকা প্রস্তুত ও গণহত্যার একশর বেশি ছবি প্রিন্ট করে তাদের কাছে পাঠাই।

উল্লেখ্য, ১৫ জুলাই থেকে ২৫ জুলাই পর্যন্ত আমাদের ডকুমেন্টেশন টিম সারা দেশের হাসপাতাল ঘুরে সাংবাদিক ও চিকিৎসকদের সহযোগিতায় শহীদ ও আহতদের তালিকা সংগ্রহ করে। যাত্রাবাড়ী, রামপুরা, বাড্ডাসহ বিভিন্ন এলাকার গণহত্যার ছবিও সংগ্রহ করা হয়। ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় ছাত্রশিবিরের একটি টিমকে রাজশাহী পাঠানো হয় এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও মহানগর শিবিরের মাধ্যমে সীমান্ত এলাকার সিম ব্যবহার করে সেই তথ্য ও ছবি দেশের বাইরে পাঠানো হয়।

হান্নান মাসুদ পরে আমাকে জানান, গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা তাদের ঘিরে ফেলেছে তাই সংবাদ সম্মেলন করা সম্ভব হচ্ছে না, তাদেরকে গোয়েন্দা সংস্থা উঠিয়ে নিয়ে যেতে পারে। ইতোমধ্যে নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদসহ প্রথম স্তরের সমন্বয়কদের ডিবি কার্যালয়ে তুলে নেওয়া হয়েছে। তখন আমি ছাত্রশিবির মহানগর উত্তরের তৎকালীন সেক্রেটারি রেজাউল করিম শাকিলের সঙ্গে যোগাযোগ করি। মহানগরের দায়িত্বশীলরা হাসপাতালে যান এবং তিনটি অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করে তাদের নিরাপদে সেখান থেকে বের করে আনেন। একটি অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করা হয় জামায়াত ঢাকা মহানগর দক্ষিণের অ্যাসিসট্যান্ট সেক্রেটারি দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মাধ্যমে, একটি সিবগাতুল্লাহ এবং আরেকটি রেজাউল করিম শাকিলের উদ্যোগে। গোয়েন্দা সংস্থার চোখকে ফাঁকি দিয়ে যেভাবে তাদের উদ্ধার করা হয়, এটা যেকোনো দুঃসাহসিক অভিযানকেও হার মানাবে।

হাসপাতাল থেকে বের হওয়ার পর প্রথমে বনশ্রীতে একটি সেফ হোমের ব্যবস্থা করা হলেও হান্নান মাসুদ বারবার অনুরোধ করেন, তাদের যেন কোনো দূতাবাসের সহায়তায় নিরাপদ স্থানে রাখা হয়। পরে আমি যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের রাজনৈতিক কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করি এবং সমন্বয়কদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়ের অনুরোধ জানাই। তিনি জানান, ‘It’s not a Hollywood movie, দূতাবাস এভাবে কাউকে সেফ হোমে রাখতে পারে না’ তবে একজন সাংবাদিকের যোগাযোগ নম্বর দেন। পরে পর্যায়ক্রমে নেত্র নিউজের নাজমুল আহসান, একজন নারী সাংবাদিকের মাধ্যমে জুলকারনাইন সায়েরের সঙ্গে যোগাযোগ করি। জুলকারনাইন সায়েরের সহায়তায় একজন মানবাধিকার কর্মীর মাধ্যমে ২৬ জুলাই রাতে তাদের সেফ হোমে রাখার ব্যবস্থা করা হয়। এভাবে ২৬ জুলাই থেকে ৩৬ জুলাই পর্যন্ত সেকেন্ড লেয়ারের সমন্বয়কদের সমন্বয়ের মাধ্যমে বিভিন্ন সেফ হোমে রাখার ব্যবস্থা করি। আন্দোলনের কৌশল হিসেবে বিভিন্ন স্টেকের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে ছদ্মনাম ‘সালমান’ ব্যাবহার করতাম তবে সমন্বয়কসহ অন্যান্যের কাছে সাদিক কায়েম নামেই পরিচিত ছিলাম।

১৯ জুলাই থেকে ১ আগস্ট পর্যন্ত প্রথম সারির সমন্বয়কদের অনুপস্থিতিতে ছাত্রশিবিরের দায়িত্বশীল জাহিদুল ইসলাম, সিবগাতুল্লাহ সিবগা ও আমিরুলের নেতৃত্বে একটি টিমের পর্যালোচনার মাধ্যমে সুবিন্যস্তভাবে আন্দোলনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো। সিদ্ধান্ত হয়, সমন্বয়কেরা সেফ হোম থেকে বের হবেন না; বরং সেখান থেকেই ভিডিও বার্তার মাধ্যমে আন্দোলনের দিকনির্দেশনা দেবেন। একই সঙ্গে সফট কর্মসূচি ও মাঠের আন্দোলন; অর্থাৎ দুই ধরনের কর্মসূচির মাধ্যমে আন্দোলনকে বিস্তৃত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়। এজন্য নতুন ডিভাইস সংগ্রহ করে মহানগর উত্তর জনশক্তির মাধ্যমে তাদের কাছে পৌঁছে দিই এবং মাহিন সরকারের ফোনও তার বাসা থেকে এনে তার হাতে পৌঁছে দিই।

২৭ জুলাই অনলাইন প্রেস কনফারেন্সে গণহত্যার চিত্র ও শহীদদের তালিকা প্রকাশ করা হয়। আরাফাত হোসেন ভূঁইয়ার নেতৃত্বে এই তথ্য-উপাত্তগুলো আমাদের ডকুমেন্টেশন টিম অর্থাৎ ‘Student Against Oppression’ প্রস্তুত করেছিল। পরবর্তী কর্মসূচি হিসেবে সারা দেশে দেয়াল লিখন, চিত্রাঙ্কন এবং ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সমন্বয়কদের মুক্তির দাবি উত্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

হাসিনার পতনের সম্ভাবনা বাড়তে থাকলে বিভিন্ন স্থানে সমন্বয়কদের পদত্যাগের নাটক মঞ্চস্থ করা হয়। বয়ান তৈরি করার অপচেষ্টা চালানো হয়Ñ ‘আগে যেটা চেয়েছিলেন সেটার সঙ্গে ছিলাম, এখন যেটা চাচ্ছেন সেটার সঙ্গে নেই।’ এ সময় ঢাকা কলেজ ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বয়কদের একাংশ পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়, তাছাড়া রাষ্ট্রীয় এজেন্সি ব্যবহার করে সারা দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়কদের পদত্যাগের জন্য নানান ধরনের হুমকি দেওয়া শুরু করে। তখন বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি এস এম ফরহাদের সমন্বয়ে বিভিন্ন জেলা ও বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন কমিটি গঠন করে আব্দুল কাদেরের নামে প্রেরণ করা হয়, যাতে আন্দোলন থেমে না যায়।

২৮ জুলাই ছয় সমন্বয়কের আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষণার খবর আসে। হঠাৎ সংবাদমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, ডিবিতে থাকা ৬ সমন্বয়ক আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছে! এই ঘোষণা শুনে আমরা কিছুক্ষণের জন্য থমকে যাই। এটি আন্দোলনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। ছয় সমন্বয়কের ঘোষণার পর আমরা সিদ্ধান্ত নিই, রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে ‘বন্দুকের নলের মুখে আদায় করা কোনো বক্তব্য গ্রহণযোগ্য নয়’ সুতরাং আন্দোলন চলবে। ২৯ জুলাই বিক্ষোভ কর্মসূচি বাস্তবায়নে ঢাকার প্রেস ক্লাবের সামনে সহ-সমন্বয়ক মুসাদ্দিক আলী ইবনে মোহাম্মদ, শিবিরের মহানগর পূর্ব, পশ্চিম ও উত্তরের জনশক্তিসহ বিভিন্ন পর্যায়ের ছাত্র-জনতা রাজপথে নামেন। মুসাদ্দিক, আবিদ হাসান রাফিসহ আরো অনেকে পল্টন মোড় থেকে গ্রেপ্তার ও গুম হন।

৩০ জুলাই গণহত্যাকে আড়াল করতে খুনি হাসিনা ‘শোক দিবস’ ঘোষণা করলে আমরা সেটি প্রত্যাখ্যান করার সিদ্ধান্ত নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির তৎকালীন সভাপতি আব্দুল্লাহ আল মামুন তুষারের মাধ্যমে ছাত্রদল থেকে শোকমিছিল করার প্রস্তাব আসে যা আমাদের কাছে ওই মুহূর্তের জন্য সামঞ্জস্যপূর্ণ মনে হয়নি। এসএম ফরহাদ ও আলী আহসান জোনায়েদের পরামর্শক্রমে চোখ ও মুখে লাল কাপড় বেঁধে শোক প্রকাশ এবং ‘জুলাই ম্যাসাকার’সহ বিভিন্ন হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করে কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। ঢাবি শিবিরের তৎকালীন সাংগঠনিক সম্পাদক মহিউদ্দিন খান হ্যাশট্যাগগুলো নির্ধারণ করেন। চোখে ও মুখে লাল কাপড় বাঁধা ও ফেসবুক প্রোফাইল লাল করার মাধ্যমে আন্দোলন নতুনভাবে আবার উজ্জীবিত হয় এবং এই কর্মসূচিতে অনেক বেশি সাড়া পড়ে এবং এর ফলে সবাই আবার নতুনভাবে আন্দোলন ঝাঁপিয়ে পড়েন, এটা একটা গণরূপ ধারণ করে। এই কর্মসূচি নতুন করে আন্দোলনে গতি ফিরিয়ে আনে এবং নতুন মাত্রা যোগ করে।

এরপর গণগ্রেপ্তারের বিরুদ্ধে নতুন কর্মসূচির প্রয়োজন দেখা দিলে পরবর্তী কর্মসূচি কী দেওয়া যায়, সেটা নিয়ে আমরা আলাপ করছিলাম। আমরা আগে থেকেই চিন্তা করছিলাম, যেহেতু প্রতিদিন রাত হলেই যে ব্লক রেইড দিয়ে গণগ্রেপ্তার করা হয়, প্রত্যেক বাড়িতে বাড়িতে আতঙ্ক নেমে আসে, যেখানেই ছাত্রদের পায় তাদেরকে ধরে নিয়ে যায়। এটা বন্ধ করার জন্য আমরা একটা সুন্দর ও শক্তিশালী কর্মসূচির কথা চিন্তা করছিলাম। উদ্দেশ্য ছিল এর মাধ্যমে ইউএন, বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনসহ আন্তর্জাতিক কমিউনিটিকেও অবহিত করা এবং তাদেরকেও মুভমেন্টে সম্পৃক্ত করা।

পরবর্তীকালে হাইকোর্ট প্রাঙ্গণে আমরা এই কর্মসূচি করার কথা চিন্তা করি। যেহেতু ব্লক রেইড দিয়ে গণগ্রেপ্তার করার বিরুদ্ধে কর্মসূচি; তাই এর নাম কী দেওয়া যায় সেটার জন্য আমি বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারের সঙ্গে আলোচনা করি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির তৎকালীন দপ্তর সম্পাদক ও ডেইলি অবজারভারের তৎকালীন প্রতিনিধি তাওসিফুল ইসলামকে বলি একটা সুন্দর নাম দেওয়ার জন্য। তাওসিফ তখন তিনটি নাম প্রস্তাব করেÑ ‘মার্চ ফর জাস্টিস’, আর দুটি নাম যা আমার এই মুহূর্তে স্মরণে নেই। পরবর্তীকালে এই ‘মার্চ ফর জাস্টিস’ নামটাই কর্মসূচির নাম হিসেবে চূড়ান্ত করি। আমরা সিদ্ধান্ত নিই এই কর্মসূচি অর্থাৎ ‘মার্চ ফর জাস্টিস’ হাইকোর্ট এবং প্রত্যেক বিভাগীয় কোর্টে পালন করবো।

আমরা সাধারণত কর্মসূচি নির্ধারণ করে পুরো প্রেস রিলিজ প্রস্তুত করতাম। পরে একেক দিন একেক জনের নামে প্রেস রিলিজ পাঠানো হতো। ‘মার্চ ফর জাস্টিস’-এর পুরো কর্মসূচি ঠিক করে প্রেস রিলিজ লিখে সমন্বয়কদেরকে পাঠাই। তখন আমার সঙ্গে এটা নিয়ে আব্দুল হান্নান মাসুদ, রিফাত রশিদ ও আব্দুল কাদের এই তিনজনের কথা হয়। তখন তারা বলে, ভাই এ ধরনের মাঠের কর্মসূচি আমরা এখন না দিয়ে পরের দিন দিই, এটা বাস্তবায়ন যদি ঠিকমতো না হয় তাহলে ব্যাকফায়ার করবে। অর্থাৎ তারা এই রাজপথের কর্মসূচি দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিল না, তারা রাজি হচ্ছিল না। তারা আরেকদিন পরে দেওয়ার কথা বলছিল।

আমি বললাম, আমরা যখন যেকোনো কর্মসূচি ঘোষণা করি বা সিদ্ধান্ত নিই তখন আমাদের সামগ্রিক শক্তিমত্তা যাচাই করে তারপর দিই- সেই হিসেবে আল্লাহর ওপর ভরসা করে দাও, বাকিটা আমরা দেখতেছি। আব্দুল হান্নান মাসুদের পক্ষ থেকে প্রস্তাব ছিল পরবর্তী দিন লিফলেট বিতরণ করা, এরপর মাঠের কর্মসূচিতে যাওয়া। আমি পরে তাদের সঙ্গে কর্মসূচির ব্যাপারে অনড় অবস্থান দেখাই। সবশেষে কর্মসূচিটা চূড়ান্ত করি এবং ‘মার্চ ফর জাস্টিস’ কর্মসূচি প্রেস রিলিজ আকারে পুরোটা তৈরি করে সমন্বয়কদের নামেই প্রেস গ্রুপে দেওয়া হয়।

এই কর্মসূচিতে নামার জন্য বিভিন্ন পেশাজীবী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সাদা দল, জামায়াতপন্থি শিক্ষক, শিক্ষক নেটওয়ার্কের পাশাপাশি আইনজীবী এবং বিভিন্ন বিভাগীয় শহরের সমন্বয়ক সবার সঙ্গে আমরা যোগাযোগ করি। এই সমন্বয়ের ফলে ‘মার্চ ফর জাস্টিস’ কর্মসূচিতে গণমানুষের ঢল নামে। হাইকোর্টের সামনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শেহরীন আমিন ভূঁইয়া ছাত্রদের গ্রেপ্তার থেকে রক্ষা করতে লাঞ্ছিত হন। তবে আন্দোলনে সব মহলের সম্পৃক্ততায় কর্মসূচি নতুন মাত্রা পায়।

এর পরবর্তী দিন কী কর্মসূচি দেওয়া যায় সেটা নিয়ে আমরা আলাপ করছিলাম। যেহেতু পুরো জুলাইয়ের শেষের দিকে গণহত্যা এবং গণগ্রেপ্তার করা হয়েছে ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট এবং কারফিউ জারি করার মাধ্যমে গণহত্যার ডকুমেন্টস জনপরিসরে খুব বেশি আসতে দেওয়া হয়নি, তাই আমরা এই ছবি ও ভিডিওগুলো আবার নতুনভাবে ফুটিয়ে তোলার জন্য সবাইকে স্মরণ করিয়ে দেওয়ার মতো একটা কর্মসূচির কথা ভাবছিলাম এবং স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলাপ আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছিলাম।

এই কর্মসূচির নাম প্রস্তাব করার জন্য সাংবাদিক তাওসিফুল ইসলামকে বলি। তাওসিফুল ইসলাম ‘রিমেম্বারিং আওয়ার হিরোস’ এই নামটা প্রস্তাব করে। পরবর্তীকালে এস এম ফরহাদের সঙ্গে কথা বলে এই নামটা চূড়ান্ত করে পুরো প্রেস রিলিজ তৈরি করি। এই ‘রিমেম্বারিং আওয়ার হিরোস’ কর্মসূচিতে আমাদের উদ্দেশ্য ছিল পুরো জুলাইয়ের শেষের দিকে যে গণহত্যা হয়েছে এবং যে হামলাগুলো হয়েছে, সব চিত্র আমরা সবার কাছে ফুটিয়ে তুলে আমাদের হিরোদের স্মরণ করব এবং আমরা নতুনভাবে সংঘবদ্ধ হব। প্রেস রিলিজগুলো আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় পাঠানোর জন্য ইংরেজি ভাষায় ট্রান্সলেট করার ক্ষেত্রে তাওসিফ এবং রায়হান উদ্দিন সহযোগিতা করে।

১ আগস্ট ‘রিমেম্বারিং আওয়ার হিরোস’ নামে দেশব্যাপী গণহত্যার প্রকৃত চিত্র ছড়িয়ে দেওয়ার কর্মসূচিতে দেশব্যাপী ব্যাপক সাড়া পড়ে। এদিন দুপুরে ছয় সমন্বয়ক মুক্তি পাওয়ার পর অনেকের মধ্যেই তাদের নিয়ে নানা ধরনের সন্দেহ ও অবিশ্বাস তৈরি হয়। এ সময় অভ্যন্তরীণ সমন্বয়হীনতা দূর করে পরবর্তী কর্মসূচির ব্যাপারে আলোচনা করি।

২ আগস্ট জুমার দিনে গণমিছিল, মসজিদে দোয়া এবং খুতবায় গণহত্যার প্রকৃত চিত্র তুলে ধরার কর্মসূচি আব্দুল কাদেরের নামে পাঠানো হয়। সমন্বয়কেরা ফিরে আসার আগেই প্রেস রিলিজ পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল, ফলে কর্মসূচি পরিবর্তনের সুযোগ ছিল না। এটি নিয়ে সমন্বয়হীনতা তৈরি হলে আমি পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে এটি সমাধান করি।

এদিকে ফ্যাসিবাদী শেখ হাসিনার পতনের পর সম্ভাব্য সরকার বা জাতীয় সরকারের গাঠনিক রূপ কী হবে সেটি নিয়ে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। এক দফা, অসহযোগ আন্দোলনের বিষয়বস্তু এবং আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি ও রূপরেখা প্রচার এসব নিয়ে মাহফুজ আলম, আসিফ মাহমুদ, নাহিদ ইসলাম, রাফে সালমান রিফাত, আলী আহসান জোনায়েদ, সিবগাতুল্লাহসহ অন্যান্য স্টেকহোল্ডারের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা করি। আমরা আলোচনা করে ঢাকাকে দশ ভাগ করে বিভিন্ন পয়েন্টে দায়িত্বও বণ্টন করি।

৩ আগস্ট ‘ড্রিম প্রজেক্ট’ নামে গণভবন দখলের প্রাথমিক পরিকল্পনা থাকলেও সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় ৪ আগস্ট শাহবাগে দুপুর ১২টায় অবস্থান কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। আওয়ামী লীগের কর্মসূচির সময় বিবেচনায় এনে আমি আসিফ মাহমুদকে বলি, আমাদের কর্মসূচি সকালে দিতে হবে; নইলে ছাত্রলীগ-যুবলীগ আগেই অস্ত্র নিয়ে শাহবাগে অবস্থান নেবে এবং বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটতে পারে এতে আমরা শাহবাগের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারাতে পারি। পরে সময় এগিয়ে এনে সকাল থেকেই ছাত্র-জনতার অবস্থান কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়া হয়।

৪ আগস্ট দুপুরে দফায় দফায় হামলা ও গণহত্যার মধ্যে আমাদের সঙ্গে আলোচনা না করেই প্রথমে ৬ আগস্ট ‘মার্চ টু ঢাকা’ এবং ৫ আগস্টের জন্য অন্য কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। তখন আমি আসিফ মাহমুদকে বলি, আর দেরি করা যাবে না; এখনই ‘মার্চ টু ঢাকা’ ঘোষণা করতে হবে, তা না হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পার, ফ্যাসিবাদী সরকার সব নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিতে পারে। এরপর সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে ঘোষণা করা হয়Ñ পরশু নয়, পরদিনই অর্থাৎ ৫ আগস্টই ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি হবে।

ছাত্র-জনতা রাজপথে নেমে আসে। মুক্তির আশায় সকাল থেকেই বিভিন্ন স্থানে অবস্থান শুরু হয়। বাঁধভাঙা গণজোয়ারের মুখে পুলিশের আগ্নেয়াস্ত্র পরাজিত হয়। দুপুরের আগেই ফ্যাসিবাদী শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়; সেই মুহূর্তে নতুন আজাদির সূচনা ঘটে।

লেখক : সহসভাপতি, ডাকসু।

চবিতে ‘আজাদীর বই উৎসব’, শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ

‘অথচ বেগম খালেদা জিয়া বারবার বলেছেন, বাহাত্তরের সংবিধানকে ডাস্টবিনে নিক্ষেপ করা উচিত’

‘জুলাই সনদ অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়নের কথা বলে তারা পাতায় পাতায় অস্বীকার করে যাচ্ছেন’

‘ওসমান হাদির চিন্তা, বারুদমাখা কথা শতাব্দীর পর শতাব্দী টিকে থাকবে’

‘খুনিরা হাদিকে হত্যা করেছে, তার চিন্তা ও আদর্শকে হত্যা করতে পারেনি’

‘খুনিরা ভেবেছিল হাদিকে হত্যা করলে ফ্যাসিস্টবিরোধী লড়াই থেমে যাবে, কিন্তু এ লড়াই থামবে না’

জুলাইয়ের স্মরণসভায় হেফাজত আমিরকে আমন্ত্রণ জানালেন ইশরাক

শহীদ কাইয়ুমের পরিবারের বেঁচে থাকার লড়াই

আ.লীগ নেতাদের হুমকিতে ঘরছাড়া জুলাই শহীদ রোমানের পরিবার

অভ্যুত্থানের পর সরকারবিহীন টালমাটাল তিনদিন