১৮ জুলাই । উত্তাল একটি দিন। মাত্র দুদিন আগে রংপুরে পুলিশের নির্মম বুলেট কেড়ে নিয়েছে মেধাবী ছাত্র আবু সাঈদের তরতাজা প্রাণ। প্রতিবাদে সারা দেশের ছাত্রছাত্রী ফুঁসছিল। চট্টগ্রামেও ছিল সেই উত্তাল পরিস্থিতি। রাস্তায় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশ ও ছাত্রলীগের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া চলছিল। হঠাৎ তাদের ছোড়া বুলেট এসে লাগে তানভীরের গায়ে। সেখানেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন তানভীর।
বহদ্দারহাট এলাকায় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আন্দোলনরত ছিলেন উচ্চমাধ্যমিকের ছাত্র তানভীরও। ফ্লাইওভারের ওপর থেকে পুলিশ ও ছাত্রলীগের অস্ত্রধারী ক্যাডারদের গুলিতে তার জীবনপ্রদীপ নিভে যায়। এভাবেই ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার নির্দেশে পুলিশ ও দলীয় সশস্ত্র ক্যাডারদের তাণ্ডবে অঙ্কুরেই ঝরে যায় আরও একটি তাজা প্রাণ। সে সঙ্গে অকালমৃত্যু ঘটে পিতা বাদশা মিয়ার সব স্বপ্নের।
চট্টগ্রামের তানভীর সিদ্দিকী ছিলেন এক স্বপ্নবাজ কিশোর। পড়ালেখা করতেন চট্টগ্রামের আশেকান আউলিয়া ডিগ্রি কলেজে। জুলাইয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন শুরুর আগে দিয়েছেন এইচএসসি পরীক্ষা। দরিদ্র ঘরের প্রথম সন্তান তানভীরের বাবা বাদশা মিয়া একজন পান বিক্রেতা। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বাজারে পান বিক্রি করে সংসার চালাতে হিমশিম খান তিনি। তাই এসএসসি পরীক্ষার পর ছেলেকে লেখাপড়া বাদ দিয়ে সংসারের হাল ধরতে বলেন।
কিন্তু তানভীর বাবাকে আশার কথা শোনান এই বলে যে, লেখাপড়া করে বড় চাকরি করে সংসারের সব দুর্দশা দূর করব। তানভীরের এমন সাহসী কথায় ভরসা পেয়ে ঋণ করে ছেলেকে চট্টগ্রাম শহরে পাঠান তিনি। ছেলের শিক্ষার জন্য যা যা করা দরকার, তার সবই করতে প্রস্তুত ছিলেন বাদশা মিয়া।
তবে লেখাপড়া করে বড় হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে চট্টগ্রাম শহরে আসা তানভীরের স্বপ্ন পূরণের পথে হঠাৎ করেই বাধা হয়ে দাঁড়ায় সরকারি চাকরিতে কোটা পুনর্বহালে উচ্চ আদালতের রায়। এ রায়ের প্রতিবাদে যখন সারা দেশ ফুঁসে ওঠে, তখন বাবাকে না জানিয়ে তানভীরও আন্দোলনে শামিল হন।
তানভীরের বন্ধুদের ফোন পেয়ে শহরে ছুটে যান বাদশা মিয়া। তিনি তখনও জানতেন না তানভীরের গুলিবিদ্ধ হওয়ার কথা। আহত হয়েছে ভেবে ছেলের সঙ্গে দেখা করতে ছুটে যান তিনি। কিন্তু হাসপাতাল মর্গে সবার বিষন্ন চেহারা দেখে বুঝে যান তানভীর আর বেঁচে নেই।
তার আগের দিনই ছেলেকে টাকা পাঠিয়েছিলেন তিনি। তখনই শেষবারের মতো তার কথা হয়েছিল সন্তানের সঙ্গে।
এরপর আর সুযোগ হয়নি ছেলের কথা শোনার। হাসপাতাল মর্গ থেকে ছেলের নিথর দেহ নিয়ে তাকে ফিরতে হয় গ্রামে। জানাজায় দাঁড়িয়ে শোকস্তব্ধ পিতা বলেছিলেন, ‘আমি কারো কাছে বিচার চাই না। সন্তান হারানোর বিচারের ভার আমি আল্লাহর কাছে দিয়েছি।’
এর কিছুদিন পর আন্দোলনে নিহতদের ক্ষতিপূরণের ঘোষণা আসে সরকারের পক্ষ থেকে। এলাকার এমপি ডেকে পাঠালেন বাদশা মিয়াকে। নির্দেশ দিলেন ঢাকায় গিয়ে টাকা নিতে। তিনি হয়তো ভেবেছিলেন টাকার কাছে হার মানবে সন্তান হারানো একজন দরিদ্র পিতার শোক। কিন্তু বাদশা মিয়া ধরে রাখেন শহীদ ছেলের মর্যাদা। দৃঢ়কণ্ঠে বলেন, ‘ছেলের লাশ বিক্রি করে আমি টাকা নিতে পারব না।’
দেশের মানুষকে শেখ হাসিনার দুঃশাসন থেকে মুক্ত করার আন্দোলনে অংশ নিয়ে শহীদ হওয়া ছেলের ত্যাগের কোনো অপমান তিনি হতে দেননি।
এক নিরক্ষর পিতা- যার নুন আনতে পান্তা ফুরায়, তিনি ফ্যাসিবাদের কবল থেকে দেশ ও দেশের মানুষের মুক্তির জন্য উৎসর্গ করেছেন নিজের সন্তানকে। একইসঙ্গে তিনি ত্যাগ করেছেন অর্থের মোহও। অস্বীকার করেছেন সরকারের দেওয়া অনুদানের অর্থ নিতে। এমন যোগ্য পিতার যোগ্য সন্তান তানভীর সিদ্দিকী, যিনি মরে গিয়েও অমর হয়ে আছেন। অমর হয়ে থাকবেন যতদিন এই বাংলাদেশ থাকবে।