চব্বিশের ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানের চূড়ান্ত দিন ৫ আগস্ট ছিল সাভার-আশুলিয়াবাসীর জন্য এক বিভীষিকাময় দিন। এদিন সাভার ও আশুলিয়ার ফ্যাসিস্ট সরকারের পুলিশ এবং দলীয় সশস্ত্র ক্যাডারদের গুলিতে ৬৮ জন নিহত হয়েছে, আহত হয়েছে ১ হাজারেরও বেশি। আর রক্তে রঞ্জিত হয়েছে এ এলাকার রাজপথ ও অলিগলি।
সাভারে নিহতদের মধ্যে মিরপুর এমআইএসটির ছাত্র আসহাবুল ইয়ামিন, টঙ্গির সাহাজউদ্দিন সরকার স্কুল অ্যান্ড কলেজের ছাত্রী নাফিসা হোসেন মারুয়া এবং কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবদুল কাইয়ুমের হত্যাকাণ্ড আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। আশুলিয়ায় পুলিশ মৃতদেহ ভ্যান গাড়িতে তুলে তা আগুনে পুড়িয়ে নিশ্চিহ্ন করার মতো নৃশংসতা দেখিয়েছে।
ফ্যাসিস্ট সরকার জুলাই-আগস্টে সাভার-আশুলিয়ার ঘরে ঘরে অভিযান চালিয়ে যে হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতন চালিয়েছে তা তখনকার মিডিয়ায় সার্বিকভাবে প্রকাশিত হয়নি। সে সময়ে জনমনে সৃষ্ট আতঙ্ক এখনও মানুষকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে।
সরেজমিনে স্থানীয় জনসাধারণ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে আলোচনায় জানা যায়, ছাত্র-জনতার আন্দোলনে বরাবরই উত্তাল ছিল রাজধানীর উত্তর-পশ্চিম প্রবেশদ্বার সাভার ও আশুলিয়া। পুলিশ ও আওয়ামী লীগ কর্মীদের হামলায় শুরুতেই রক্তাক্ত হয় এ এলাকার জনপদ। সাভার থানার অসি শাহ জামান ও আশুলিয়া থানার অসি এএফএম সায়েদ স্থানীয় জনতার কাছে জমদূত হিসেবে আবির্ভূত হয়।
জুলাই আন্দোলনে নিহতের ঘটনা বিবেচনায় সারা দেশে এলাকা হিসেবে সবচেয়ে বেশি হত্যাকাণ্ড হয়েছে সাভারে। এনাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ৫ আগস্ট অন্তত ৩১ জনের লাশ পাওয়া যায়। এছাড়া গুরুতর আহত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় পরবর্তী সময়ে আরও ১৫ জনের মৃত্যু হয়।
তাদের মধ্যে ছাত্র, শারীরিক প্রতিবন্ধী, শিশু, দিনমজুর, পোশাককর্মী, দোকানকর্মী রয়েছে। এ ঘটনাগুলোয় জুলাই আন্দোলনে মানবাধিকার লঙ্ঘনের চরম বিপর্যয়ের চিত্র ফুটে ওঠে। এদিন আহত হন সহস্রাধিক। তাদের মধ্যে অনেকের হাত-পা কেটে ফেলতে হয়েছে। ৫ আগস্ট লাশ গুম করার উদ্দেশ্যে আশুলিয়া থানার সামনে ৬ জনের মৃতদেহ পুড়িয়ে দেয় পুলিশ।
গুলি করে মোট হত্যা করেছে ২২ জন। যা ছিল সব পৈচাশিক ঘটনার অন্যতম। এ ঘটনার ভিডিও চিত্র নেট দুনিয়ায় বেশ ভাইরাল হয়। ধিক্কার জানায় বিশ্ব বিবেক। আশুলিয়া থানা এলাকায় বৈষম্যবিরোধী এ আন্দোলনে ৪৬ জন নিহতের খবর পাওয়া গেছে। এদের মধ্যে পুলিশের বিশেষ শাখা এসবির দুই সদস্য রয়েছেন। তাদেরকে বাইপাইল মোড়ে উড়াল সেতুর উপর বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা পা বেঁধে ঝুলিয়ে রেখেছিল।
জানা যায়, ১৪ জুলাই থেকে এই এলাকায় আন্দোলন বেশ গতি পায়। বৈষম্যবিরোধী দাবির পক্ষে ১৫ জুলাই প্রথম জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে দীর্ঘ সময় ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করে রাখে ছাত্ররা। শত শত যানবাহন আটকে পড়ে। এদিন তাদের সঙ্গে যোগ দেয় সাভারের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা।
সাভার বাসস্ট্যান্ড, আশুলিয়ায় বাইপাইল এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে ছাত্র-জনতা বিক্ষোভ করে সড়কে অবস্থান নেয়। ১৮ জুলাই সাভার বাসস্ট্যান্ডে রাজধানীর মিরপুর মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির (এমআইএসটি) মেধাবী শিক্ষার্থী শাইখ আশহাবুল ইয়ামিনকে উপর্যুপরি গুলি করে মুমূর্ষু অবস্থায় সাঁজোয়া যানে ঘুরিয়ে ফেলে দেওয়া হয়। রাজপথে পড়ে থাকা অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনাটি দেশি-বিদেশি মিডিয়ায় এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত ও ব্যাপক আলোচিত হয়। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের শুরুতেই পুলিশের পাশাপাশি আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ ক্যাডাররা ছাত্র-জনতাকে দমন করতে অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে সাভারের রাজপথে অবস্থান নেয়।
১৮, ১৯ ও ২০ জুলাই পুলিশ, ছাত্রলীগ, আওয়ামী লীগের ক্যাডাররা সাভার, আশুলিয়া ও জাতীয় স্মৃতিসৌধের সামনে অন্তত ১০ জনকে গুলি করে হত্যা করে। এ দিন প্রায় শতাধিক বিএনপি ও জামায়াত নেতার বাড়ি-ঘরে হামলা চালিয়ে ভাংচুর ও লুটপাট করে পুলিশ। স্থানীয় একটি দৈনিক পত্রিকা অফিসেও হামলা করে ভাংচুর এবং লুটপাট চালায়।
১ আগস্ট থেকে সাভার উপজেলার প্রতিটি অলিগলিতে পুলিশ ও র্যাব যৌথভাবে হাজার হাজার গুলি ছুড়ে জনমনে আতঙ্ক ও ভীতি ছড়াতে থাকে। ৩ আগস্ট সাভারের সিআরপি সড়ক এবং দেওগা গলিতে দুজনকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করে। দেওগা সড়কে মুরগির দোকানি কোরবান আলী ও কর্মচারী ফারুককে দোকান খোলা রাখায় প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যার ঘটনা সাভারে ব্যাপক চাঞ্চলের জন্ম দেয়।
৫ আগস্টের তাণ্ডব যেভাবে
৫ আগস্ট মার্চ টু ঢাকা কর্মসূচি সফল করতে জাহাঙ্গীরনগর থেকে ছাত্রছাত্রীদের একটি বড় মিছিল ঢাকার দিকে যাত্রা করে। বিএনপি-জামায়াত এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মী ও সাধারণ জনতাসহ প্রায় ২০/২৫ হাজার প্রতিবাদী মানুষ এ মিছিলে অংশ নেয়। মিছিলটি সিএন্ডবি বাসস্ট্যান্ড, বিপিএটিসি, রেডিও কলোনি, শিমুলতলাসহ বেশ কয়েক স্থানে থেমে থেমে দুপুর ১২টার দিকে সাভার বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছে। এ সময় সাড়ে দশটায় নিউমার্কেটের সামনে থেকে দুজনের গুলিবিদ্ধ রক্তাক্ত লাশ আশুলিয়ার দিকে নিয়ে যেতে দেখা যায়।
সরকার দলীয় সন্ত্রাসীরা রেডিও কলোনি, সিআরপি গলি, রাবেয়া ক্লিনিক গলি, থানা রোডে জনগণের উপর গুলি চালায়। বেলা ১টার দিকে পাকিজার মোড়ে ঢাকা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবদুল্লাহিল কাফি ও সাভার সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শাহিদুল ইসলামের নেতৃত্বে পুলিশ জনতার উপর এলোপাতাড়ি গুলি করে।
ঘটনাস্থলেই কলেজ ছাত্রী নাফিসা হোসেন মারুয়া, নিউ মার্কেটের সামনে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সাভারের বাসিন্দা আবদুল কাইয়ুম, শিক্ষার্থী মুন্না, শিক্ষার্থী শ্রাবণ গাজী, সাফওয়ান আখতার, আবদুল আহাদ সৈকত, রাজমিস্ত্রীর সহযোগী সুজন মিয়া, ভ্রাম্যমাণ হকার আল আমিনসহ আরও ৪/৫ জন।
এ ঘটনায় আহত হয় সহস্রাধিক ছাত্র-জনতা। পরে শেখ হাসিনার হেলিকপ্টার যোগে পালিয়ে যাওয়ার খবর পেয়ে ছাত্র-জনতা বিজয় উল্লাসে মিছিল নিয়ে আবার ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে নেমে আসে।
বেলা পৌনে ৩টার দিকে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহিল কাফি আওয়ামী লীগ নেতা রাজিব ও ছাত্রলীগ নেতা আতিককে সঙ্গে নিয়ে দুই কার্টুন বন্দুকের গুলি থানার সামনে নিজ গাড়ি থেকে রাস্তায় ফেলে ক্যাডারদের মধ্যে বণ্টন করে দেন। পুলিশসহ ক্যাডাররা ৫টার দিকে ছাত্র-জনতাকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়তে থাকে।
বেশ কয়েকজন এ সময় হতাহত হলেও ছাত্র-জনতা কিছুতেই পিছু হটছিল না। যার ফলে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে পুলিশ গুলি করতে করতে থানা থেকে ঢাকা আরিচা মহাসড়কের দিকে এগিয়ে যায়। পুলিশের সঙ্গে এ সময় অন্য কয়েকটি বাহিনীর সদস্যরা ছিল। এ সময় এলোপাতাড়ি গুলিতে থানা রোড ও সাভার বাসস্ট্যান্ডে অন্তত ৩০ জন নিহত হয়।
৫ আগস্ট আশুলিয়া থানার গেটের বিপরীতে ভ্যানের ওপর রাখা রক্তাক্ত নিথর দেহগুলো পুড়িয়ে দেয় পুলিশ। এ সংক্রান্ত ভিডিও ভাইরাল হয়। নির্মম ঘটনার ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, পুলিশের ভেস্ট পরা ব্যক্তিদের মধ্যে ঢাকা জেলা উত্তর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) পরিদর্শক (তদন্ত) আরাফাত হোসেন ও অন্যরা ডিবি পুলিশের সদস্য।
ঘটনা সম্পর্কে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বিকাল ৪টার দিকে আন্দোলনকারীরা থানার সামনে এলে পুলিশ এলোপাতাড়ি গুলি চালায়। এ সময় গুলিতে বেশ কয়েকজন নিহত হয়। ওই মরদেহগুলোই ভ্যানে তুলে পুড়িয়ে ফেলে ও গুমের চেষ্টা করে পুলিশ।
এ ঘটনায় নেতৃত্ব দেন আশুলিয়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) নির্মল চন্দ্র, ওসি এএফএম সায়েদ, উপ-পরিদর্শক (এসআই) আফজালুল, এসআই জলিল, এসআই মো. রাকিবুল, এসআই আবুল হাসান, এসআই হামিদুর রহমান, এসআই নাসির উদ্দিন, এসআই আব্দুল মালেক, সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) সুমন চন্দ্র গাইন, এএসআই বিশ্বজিৎ রায়, কনস্টেবল মুকুল, কনস্টেবল রেজাউল করিমসহ কতিপয় পুলিশ সদস্য।
এছাড়া আশুলিয়া থানার আওয়ামী লীগ সভাপতি ফারুক হাসান তুহিন ওরফে তুহিন কুলু, ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি নাদিম হোসেন, যুবলীগের আহ্বায়ক কবির হোসেন সরকার, ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি শামীম হোসেন, যুবলীগের আলমগীর হোসেন, ছাত্রলীগ সভাপতি সোহাগ, সেক্রেটারি টিটু, সাভার থানা ছাত্রলীগের সভাপতি আতিকুর রহমান আতিক, সাভার উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আলী হায়দার নেতৃত্ব দেন। রেডিও কলোনির বাসিন্দা সামিউল সোহেল বলেন, পুলিশ সাভারের অলিতেগলিতে যে হাজার হাজার গুলি বর্ষণ করে, এসব বুলেটের কি কোনো জবাবদিহিতা নেই।
জুলাই আন্দোলনের সাভার-আশুলিয়ার এ নৃশংসতা ও প্রশাসনের হিংস্রতার ভীতি এবং আতঙ্ক এখনও জনমনে বিরাজমান বলে স্থানীয়রা জানায়।