স্বপ্ন দেখতেন তার তৈরি করা ড্রোন উড়বে দেশ-বিদেশের আকাশে। কিন্তু এক নিমিষেই পুলিশের গুলিতে শেষ হয়ে গেল তার সব আশা-আকাঙ্ক্ষা।
মেকানিকক্যাল ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন জাহিদুজ্জামান তানভীন। ১৮ জুলাই দুপুরে রাজধানীর উত্তরার আজমপুরে একটি ব্যাংকের এটিএম বুথ থেকে টাকা তুলতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে শহীদ হন তিনি। তার গলা ভেদ করে বেরিয়ে যায় গুলি । বুকে ছিল অসংখ্য ছররার চিহ্ন। তানভীন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার ভিটি বিশারা গ্রামের প্রকৌশলী শামসুজ্জামানের একমাত্র সন্তান।
উত্তরার আজমপুর কাঁচাবাজারের কাছ জামতলায় ভাড়া বাসায় বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকতেন তানভীন। তার বাবা শামসুজ্জামান ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার, মা বিলকিস জামান গৃহিণী। একমাত্র বোনও বিএসসি ইঞ্জিনিয়ার। তিনি যুক্তরাষ্ট্রে বাস করেন।
শহীদ তানভীন গাজীপুরের ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি থেকে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ২০২২ সালে স্নাতক শেষ করেন। পরে তিন বন্ধু মিলে ‘অ্যান্টস’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। প্রতিষ্ঠানটি জরিপের কাজ করার পাশাপাশি অনলাইনে ড্রোন বিক্রিও করতো। তানভীন এই প্রতিষ্ঠানের ‘চিফ টেকনিক্যাল অফিসার’ ছিলেন। ২০১৮ ও ২০১৯ সালে বুয়েট নেভাল ডিপার্টমেন্টের আয়োজনে বিশ্ববিদ্যালয়ের বেস্ট শিফ ডিজাইন প্রতিযোগিতা এবং ২০২০ ও ২১ সালে আননেমড এরিয়াল প্রতিযোগিতায় জয়লাভ করে তানভীন ও তার দল।
এ ছাড়াও ‘ন্যাশনাল অ্যারোনটিক্স অ্যান্ড স্পেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এনএএসএ-নাসা) আয়োজিত ইউরোপিয়ান রোভার চ্যালেঞ্জ প্রতিযোগিতায় তানভীন ও তার গ্রুপ বিশ্বে দশম এবং এশিয়ার মধ্যে প্রথম স্থান অর্জন করে। পরে ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজিক্যাল, মেকানিক্যাল অ্যান্ড প্রোডাকশন বিভাগের প্রথম ও দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী থাকাকালীন তানভীন বুয়েট আয়োজিত ‘মডেল শিপ প্রপালশান কম্পিটিশন’-এ অংশ নিয়ে পুরস্কার অর্জন করেন। দেশের গণ্ডি পার হয়ে তিনি ও তার দল যুক্তরাজ্যভিত্তিক ইনস্টিটিউশন অব মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং আয়োজিত ইউএএস এয়ারক্রাফট সিস্টেম কম্পিটিশনে চ্যাম্পিয়ন হয়ে তার প্রতিভার স্বাক্ষর রাখতে শুরু করেন। এ প্রতিযোগিতায় ছয়টি পুরস্কারের মধ্যে তিনটিই লাভ করেন তানভীন ও তার দল।
শহীদ তানভীনের মা বিলকিস জামান বলেন, ‘আমার ছেলে বাইরে গেল সকাল সাড়ে ১১টা থেকে ১২টার মধ্যে। এটিএম বুথ থেকে টাকা তুলতে দরজার সামনে এগিয়ে সালাম দিয়ে বের হয়ে গেল। সালাম দেওয়ার পর সালামের উত্তর দিলাম। এতটুকুই ছেলের সঙ্গে আমার শেষ কথা।
তিনি আরও বলেন, আমি তখন বাসায় ছিলাম। ওর মোবাইল দিয়ে কেউ একজন আমাকে কল করে বলল, আপনার ছেলে গুলি খাইছে। হাসপাতালে আসেন। শুনে আমি দ্রুত উত্তরায় কুয়েত-মৈত্রী হাসপাতালে যাই। গিয়ে দেখি হাসপাতালের বাথরুমে (তাৎক্ষণিকভাবে ডোমঘর বানানো) আমার কলিজার টুকরোর লাশ পড়ে আছে। এছাড়া আরও চারটি লাশ ছিল সেখানে ।
বিলকিস বলতে থাকেন, ছোটবেলা থেকেই প্রযুক্তির প্রতি গভীর মনোযোগ ছিল তার। প্রযুক্তিই ছিল তার ধ্যানজ্ঞান। সে কখনো কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত ছিল না। ড্রোন নিয়েই ব্যস্ত থাকতো। আইসিটি ডিভিশনের অধীনে ২০২১ সালে ইনোভেশন গ্র্যান্ড প্রতিযোগিতা জিতে অনুদান পাওয়া ১০ লাখ টাকা দিয়ে ড্রোন বানানোর প্রতিষ্ঠান ‘অ্যান্টস’ গড়ে তোলে। দেশের বাইরে যেতে চায়নি। দেশে ও দেশের বাইরে ব্যবসা-বাণিজ্য করে সফল হতে চেয়েছিল। ওর আব্বু বিসিএস পরীক্ষা দিতে বলছিল। তানভীন বলেছিল, ‘মা,আমি ব্যবসা করব। কোনোদিনই সরকারি চাকরি করবো না। তাহলে কেন বিসিএস পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নেবো?’
তানভীনের চাচা মোকাররম হোসেন বলেন, মরদেহ আনতে গেলে পুলিশ ও হাসপাতালের ডাক্তাররা বাধা দিয়েছেন। অনেক বাগবিতণ্ডার পর তার মরদেহ উদ্ধার করি বিকালে। পরে আজমপুরে প্রথম জানাজা করার পর মরদেহ নবীনগরে নিয়ে আসি। রাত সাড়ে ১০টায় তার দাফন সম্পন্ন হয়।
স্থানীয়রা জানান, ১৮ জুলাই রাত ১০টায় দূর থেকে শোনা যাচ্ছিল অ্যাম্বুলেন্স আসার শব্দ । গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির মাঝে গ্রামের বাড়ির সামনে এসে থামলো তার মরদেহ বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স। স্বজনরা লাশ নামিয়ে বাড়ির ভিতর নিয়ে গেলেন। দ্রুত আনুষঙ্গিক সব কাজ শেষ করে জানাজা হলো ভিটি বিশারা বাজারের পাশের মাঠে। এ সময় সেখানে অবস্থান করছিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার(নবীনগর সার্কেল) ও নবীনগর থানার ওসিসহ অর্ধশত পুলিশ সদস্য।
বিপুল সংখ্যক পুলিশের উপস্থিতির কারণে ভয়ে অনেকে জানাজায় অংশ নিতে আসেননি। পুলিশও চিন্তায় ছিল লাশ নিয়ে যদি এলাকাবাসী মিছিল শুরু করে দেন। একপর্যায়ে তড়িঘড়ি করে লাশ দাফন করা হয়।
জানাজার আগে শহীদ তানভীনের বাবা গ্রামবাসীর কাছে আবেদন জানান তার একমাত্র ছেলের কবরের পাশে একটি নামফলক স্থাপনের অনুমতি দিতে। এভাবেই সমাপ্তি ঘটল একটি জীবন এবং তার লালিত সব স্বপ্নের।