সমকালীন আরবি সাহিত্যে মরক্কোর কথাসাহিত্যিক, গবেষক ও শিক্ষাবিদ লতিফা লাবসির (জন্ম ১৯৬৫ খ্রি.) এক উজ্জ্বল নাম। দীর্ঘদিনের গবেষণা ও গল্পকথনের অভিজ্ঞতাকে তিনি নিপুণভাবে গেঁথেছেন তার সাহিত্যকর্মে। বৈরুতভিত্তিক প্রকাশনা সংস্থা আল মারকাজ আস সাকাফি লিল কিতাব কর্তৃক প্রকাশিত তার কিশোর উপন্যাস ‘তিফু সাবিবা’ পাঠকমহলে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছে এবং সমালোচকদের কাছ থেকেও পেয়েছে সমান প্রশংসা। ভিন্নতাকে নতুন আলোয় দেখার দৃষ্টিকোণ উপস্থাপনের জন্য বইটি যেমন কিশোরদের কাছে অনন্য পাঠ, তেমনি প্রাপ্তবয়স্ক পাঠকও খুঁজে পান এতে গভীর মানবিক প্রতিধ্বনি। আরব বিশ্বে সাহিত্যের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ স্বীকৃতি ‘শেখ জায়েদ বুক অ্যাওয়ার্ড ২০২৫’ অর্জনের মাধ্যমে উপন্যাসটি পৌঁছেছে মর্যাদার উচ্চ শিখরে।
উপন্যাসের বিষয়বস্তু ও দৃষ্টিকোণ
উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্রে রয়েছে এক অটিস্টিক কিশোর রাজি, যার কাহিনি পাঠকের সামনে এসেছে ছোট বোন হিবার দৃষ্টিকোণ থেকে। মাত্র বারো বছরের হিবা তার ভাইয়ের ভিন্নতর জগৎকে পাঠকের সামনে তুলে ধরেছে ধৈর্য, ভালোবাসা ও বোঝাপড়ার অনন্য আলোকে। এখানেই লেখিকার সৃজনশীলতার বিশেষত্ব—অটিজম নিয়ে চিকিৎসাবিদ্যা বা শুষ্ক তথ্যানুগ ব্যাখ্যা নয়, বরং পারিবারিক বাস্তবতার ভেতর থেকে শিশুমনের জটিলতাকে তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন সরল অথচ হৃদয়স্পর্শী ভাষায়। ফলে কিশোর পাঠকের কাছে যেমন উপন্যাসটি সহজবোধ্য, তেমনি প্রাপ্তবয়স্ক পাঠকও খুঁজে পান নিজের জীবনের প্রতিধ্বনি। হিবার কণ্ঠে ভেসে আসে এক গভীর স্বীকারোক্তি—“অনেক বছর ধরে আমাকে সবাই ‘রাজির বোন’ বলেই ডাকে। প্রথমে বুঝতে পারিনি কেনো রাজি অন্যদের মতো নয়। ধীরে ধীরে উপলব্ধি করলাম, সে সত্যিই ভিন্ন—বিশেষ করে সেই দিন, যখন সে আমার প্রিয় পুতুল সাবিবা কেড়ে নিল।”
চরিত্র ও প্রতীক
উপন্যাসের চরিত্রগুলো কেবল ব্যক্তি নয়, বরং প্রতীকী অর্থে ভরপুর। রাজি (প্রত্যাশী), হিবা (দান), রাদিয়া (সন্তুষ্টি), আমাল (আশা)—প্রতিটি নাম যেন উন্মোচন করে কাহিনির ভেতরে মানবিক আশার নতুন দিগন্ত। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য প্রতীক হলো পুতুল সাবিবা। প্রথমে নিছক একটি খেলনা হলেও ধীরে ধীরে এটি হয়ে ওঠে রাজি ও বাইরের পৃথিবীর মাঝে এক সেতুবন্ধ। হিবার হাত ধরে কিংবা নিজের কণ্ঠে সাবিবা পরিণত হয় রাজির জীবনের এক ছায়াসঙ্গী—যে শুধু রাজির নয়, পাঠকেরও বিবেক-জাগানিয়া প্রতীক। সাবিবার কণ্ঠে উচ্চারিত হয় মর্মস্পর্শী সত্য—‘আমি রাজির বন্ধু হয়েছি, কারণ কেউ তার বন্ধু হতে চায়নি। রাজি আলাদা, কিন্তু তার ভিন্নতা ত্রুটি নয়।’ এই উচ্চারণ কেবল রাজির গল্প নয়, বরং সমাজে অবহেলিত অসংখ্য শিশুর অদৃশ্য কান্নার প্রতিফলন। সবিবা রাজির ভেতরের জগৎকে করেছে বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে যুক্ত। আর পাঠকের মনে জাগিয়ে তুলেছে মানবিক দৃষ্টিকোণ।
অটিজম চিত্রায়ণ
লেখিকা রাজিকে করুণার পাত্র হিসেবে উপস্থাপন করেননি; বরং তিনি দেখিয়েছেন ভিন্নতার সৌন্দর্য ও সংগ্রামের গভীরতা। নির্দিষ্ট রঙের টুথব্রাশ, নিয়ম মেনে চলা, বারবার সংখ্যা গোনা বা মুক্তার মালা গাঁথা—এসব আচরণ কেবল অটিজমের উপসর্গ নয়, বরং রাজির নিজস্ব জগতের নিয়ম। এই ভিন্নতর জগৎকে বোঝার চেষ্টা করে পুরো পরিবার। মা রাদিয়া ঘরের জিনিসপত্র গুছিয়ে দেন রাজির মতো করে, বাবা দ্বিধা ও দায়িত্বের টানাপোড়েনে পথ খোঁজেন, আর হিবা তার ভাইয়ের পৃথিবীকে আবিষ্কার করে নতুন চোখে। এখানে পরিবার হয়ে ওঠে সংগ্রামের মূল মঞ্চ, যেখানে ধৈর্য, ভালোবাসা আর সহানুভূতিই একমাত্র হাতিয়ার।
শিল্পকৌশল ও ভাষাশৈলী
তিফু সাবিবা বাস্তবতা ও কল্পনার সুনিপুণ মিশ্রণে রচিত এক অনন্য কাহিনি। হিবার দৃষ্টিকোণ পাঠককে নিয়ে যায় অটিজমের অন্তর্লোকের গভীরে, অথচ কখনো তা ভারী হয়ে ওঠে না। ভাষা চিত্রধর্মী ও সহজাত; ছোট ছোট ঘটনার মধ্য দিয়ে ফুটে উঠেছে সংগ্রামের বৃহৎ রূপ। প্রতিটি অধ্যায়ই যেন একটি ক্ষুদ্র জানালা—‘রাজি স্কুলে যায়’, ‘রাজি হাসলো না’, ‘হলুদ-সবুজ-নীল টুথব্রাশ’— এভাবে দৈনন্দিন জীবনের খুঁটিনাটি বিষয় হয়ে উঠেছে মানবিক উপলব্ধির উৎস।
মানবিকতা ও ভিন্নতার পাঠ
উপন্যাসটি পাঠকের সামনে স্পষ্ট বার্তা তুলে ধরে—ভিন্নতা মানেই ত্রুটি নয়। সমাজে প্রায়ই অস্থিরতা বা অমনোযোগিতার কারণে অটিজম আক্রান্ত শিশুদের অবহেলা করা হয়। অথচ লতিফা লাবসিরের কলমে এই ভিন্নতা রূপ নিয়েছে জীবনের অপরিহার্য সুরে, যা জ্বালিয়ে দিতে পারে মানবিকতার আলো।
সর্বোপরি তিফু সাবিবা নিছক একটি কিশোর উপন্যাস নয়; এটি মানবিক উপলব্ধির এক শক্তিশালী সেতু। লেখিকা দেখিয়েছেন, সাহিত্য কীভাবে চিকিৎসাবিদ্যার গণ্ডি পেরিয়ে সমাজকে সহানুভূতির আলোয় ভাসাতে পারে। ভিন্নতার ভেতরেও যে সৌন্দর্য আছে, সেই সত্য তিনি সহজ অথচ হৃদয়স্পর্শী ভাষায় পৌঁছে দিয়েছেন কিশোর থেকে প্রাপ্তবয়স্ক—সবার কাছে। তাই বলা যায়, তিফু সাবিবা কেবল সাহিত্যিক কৃতিত্ব নয়; এটি এক মানবিক আন্দোলন, যেখানে কল্পনা ও বাস্তবতা, সংগ্রাম ও ভালোবাসা মিলেমিশে গড়ে তুলেছে এক অনন্য জগৎ।