হোম > সাহিত্য সাময়িকী > বইপত্র

খোয়াজ খিজিরের কেরামতি

পিন্টু রহমান

গোলাগুলির ধোঁয়া কেটে গেলে একজন সুফি দেখে, যেখানে লাশ থাকার কথা সেখানে পড়ে আছে কেবল ফুলের বিছানা—আর তার ওপরে শুয়ে আছে এক নবজাতক, যে জাতক একদিন নতুন ইতিহাস লিপিবদ্ধ করবে! কিন্তু ইতিহাসের পথ তো মসৃণ নয়, বন্ধুর! ফলে বাস্তবতা শোনায় ভিন্ন কথা—মুগ্ধ নামে কেউ নেই। আগে কিংবা পরে এই নামে কখনো কেউ ছিল না। বড়জোর একটি কালজয়ী উপন্যাসের কল্পিত চরিত্র হিসেবে তাকে বিবেচনা করতে পারেন।

কিন্তু মাঠের যোদ্ধারা এমন বক্তব্যের বিরোধিতা করে। প্রতিবাদ জানায়। সমস্বরে প্রতিবাদী হয়ে ওঠে। আদালতের সিদ্ধান্ত তাদের কাছে অবিবেচনাপ্রসূত মনে হয়, কেননা মুগ্ধ একজন যোদ্ধা। পুরো নাম মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ। চব্বিশের সফল গণঅভ্যুত্থানে তার বীরত্বগাথা দেশি-বিদেশিদের মনে মুগ্ধতা ছড়িয়েছে। কেউ কেউ ব্যথিত হয়েছে, নিঃশব্দে চোখের জল ঝরিয়েছে; বস্তুত ছেলেটির করুণ পরিণতির জন্য দুঃখ পায়নি এমন একজন মানুষ খুঁজে পাওয়াও দুষ্কর। সদা-হাস্যোজ্জ্বল একটি মুখ। হাসতে হাসতে মৃত্যুর হিমশীতল ছায়াতলে লুটিয়ে পড়েছিল।

সেদিন ছিল ১৮ জুলাই। অভ্যুত্থানকাল। প্রকৃতিতে ঘনায়মান সন্ধ্যার আবহ। ঘরফেরত মানুষের মধ্যে ঘরে ফেরার তাড়া। পাখিদের তাড়া বাসায় ফেরার। তাড়া নেই কেবল মুগ্ধ নামের ছেলেটির। ঢাকার উত্তরা ফ্রন্টে ছাত্র-জনতাকে পানি পান করাতে ব্যস্ত সে। শুধু উত্তরা নয়, আন্দোলনের একেবারে শুরু থেকে বিভিন্ন ফ্রন্টে পানির বোতল হাতে তাকে দৌড়াদৌড়ি করতে দেখা গেছে। বিপদের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তার সাহসী উচ্চারণ আন্দোলনকে বেগবান করেছে। শুধু আবেগ নয়, বাস্তবতার নিরিখে ঘোষণা করেছে—বন্ধুরা, ভয় আমাদের শৃঙ্খলিত করতে চায়; কিন্তু আমরা বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়ছি। ভয়কে জয় করেই মুক্তির পথে এগিয়ে যাব।

কিন্তু বেশিদূর এগোতে পারে না। একটি বুলেট তার কপাল বরাবর বিদ্ধ হলে থেমে যায় কোলাহল; বলগা হরিণের মতো ছুটে চলার গতি হঠাৎই স্তিমিত হয়। গুলিবিদ্ধ হওয়ার মুহূর্তে মুগ্ধ প্রত্যক্ষ করে, অভিন্ন ঘটনার পুনরাবৃত্তি আগেও ঘটেছে। ঘটতে দেখেছে সে। তার কাছে মনে হয়, এই মৃত্যু নতুন নয়, আগেও অনুভব করেছে; একই স্থানে, একই পরিস্থিতিতে। কিন্তু সাতচল্লিশ, বায়ান্ন, উনসত্তর নাকি একাত্তর—না, সময়কাল নিশ্চিত হতে পারে না। নিজেকে ক্রমেই শক্তিহীন অনুভূত হয়। পা দুটোও যেন মাটির সঙ্গে গেঁথে যেতে চায়। মনে হয়, পৃথিবীর কোনো প্রান্তে বোধহয় ভূমিকম্প শুরু হয়েছে। কেঁপে ওঠে আসমান-জমিন।

কাঁপে না কেবল শাসকের বুক। মুগ্ধর বুকে মৃত্যুপিপাসা। অথচ তখনো তার মুখে পানিবিষয়ক সংলাপ; খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে সম্মুখে হাঁটে। কপাল থেকে চুয়ে পড়া লাল রক্ত হাতের তালুতে নিয়ে দেখছিল আর হাসছিল। চারপাশে নিস্তব্ধতার আবরণ। ভাষাহীন চোখে বিমূর্ত কান্না। অথচ মুগ্ধ হাসে। তার চোখের আলো যেন ধীরে ধীরে নিভে যেতে উদ্যত। কেউ একজন দৌড়ে এসে তার হাত ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলে—আরেকটু সহ্য করো, ভাই। গাড়ির জন্য চেষ্টা চলছে। দ্রুতই তোকে হাসপাতালে নেব।

কিন্তু মুগ্ধ আর শুনতে পায় না। এক পলকের জন্য তার চোখে ভেসে ওঠে মমতাময়ী মায়ের মুখচ্ছবি, উড়তে থাকা পতাকা, স্লোগানের শব্দ—তারপর শেষ, নিভে যায় প্রদীপশিখা, শূন্যে মিলিয়ে যায় যাবতীয় কোলাহল।

মাঝে মাঝে মনে হয়, মৃত্যুর চেয়ে বড় ম্যাজিক আর হয় না। মৃত্যু-খেলায় কতশত ম্যাজিশিয়ানকে হার মানিয়েছে সে। মুগ্ধর লাশ নিয়ে শুরু হয় ভিন্ন আরেক সংকট। পরিচয়কেন্দ্রিক সংকট তীব্রতর হয়ে ওঠে। বাবা-মায়ের নাম-ঠিকানা জানাতে অক্ষম হলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অজ্ঞাত পরিচয় লাশ হিসেবে উল্লেখ করে। একজন যুবক লাশের দিকে তাকিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করে—এটা কীভাবে সম্ভব! আমরা দিনের পর দিন একসঙ্গে লড়েছি, অথচ নাম-ঠিকানা বলতে পারছি না!

আরেকজন বলে—কী অদ্ভুত! একজন বীর যুদ্ধের ময়দানে শহীদ হয়েছে; আর আমরা কেউ তার পরিচয় জানি না। একজন বীর যোদ্ধার পরিচয় এতটা অজ্ঞাত থাকতে পারে কীভাবে!

অজ্ঞাত এক বৃদ্ধ শোনায় পৌরাণিক গল্প। লোকটি দাবি করে, ইতিহাসের এক পুরোনো দলিলে নাকি মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধর মৃত্যুর বিবরণ লিপিবদ্ধ আছে, যা কয়েক শতাব্দী আগের!

বৃদ্ধের কথা তারা পাত্তা দেয় না। নিজস্ব ভাবনায় চিন্তাভাবনা করে। পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা যে হয়নি, তা নয়; কিন্তু সব চেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। কাছের বন্ধুরা অনুশোচনার আগুনে পলে পলে দগ্ধ হয়। বন্ধুর নাম-ঠিকানা বলতে না পারা স্রেফ বোকামি। এমন বোকামির কারণেই হয়তো একজন শহীদের নামের সঙ্গে খোয়াজ খিজিরের নাম যুক্ত হয়ে যায়। তাছাড়া মুগ্ধ যে মুগ্ধ নয়, কিংবা মুগ্ধ যে প্রকৃতপক্ষে খোয়াজ খিজির, তার সপক্ষে টেকসই যুক্তি খাড়া হয়ে যায়। একটা ছেলে একই সঙ্গে ভিন্ন ভিন্ন ফ্রন্টে সংযুক্ত থাকে কীভাবে! শনির আখড়ার সহযোদ্ধা বুঝতে পারে না—বন্ধুর লাশ কেন উত্তরায়! লাশ দিনকয়েক হাসপাতালের মর্গে সংরক্ষণ করা ছিল। দ্রুততার সঙ্গে ছবিসহ লাশের খবর ফেসবুকের পাতায় পাতায় চাউর হয়ে গিয়েছিল। হত্যাদৃশ্যে বিশ্ববাসী বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছিল। এমন হাসিমুখেও মৃত্যুকে আলিঙ্গন করা সম্ভব! অতএব যদি আত্মীয়-স্বজন থাকত, তবে নিশ্চয়ই ছুটে আসত। যুক্তি মন্দ নয়।

কিন্তু মুগ্ধ তাহলে কে! কী তার পরিচয়!

পরিচয় শনাক্ত হয় না বলেই আদালতের অভিমত—মুগ্ধ নামে কেউ নেই। কখনো ছিল না।

তাহলে যুদ্ধের ময়দানে শহীদ হলো কে! খোয়াজ খিজির। কিন্তু তার তো মৃত্যু নেই! ঘাড় নেড়ে বিজ্ঞজন জানায়—হ্যাঁ, মৃত্যু নেই; আবেহায়াতের কল্যাণে কিয়ামত পর্যন্ত মৃত্যু তাকে স্পর্শ করবে না।

আবেহায়াত সম্পর্কে যারা অজ্ঞ, তারা জিজ্ঞেস করে—কী সেই আবেহায়াত! তার সঙ্গে খোয়াজ খিজিরের সম্পর্ক কী!

খোয়াজ খিজির আল্লাহর নবী। নবুয়তের দায়িত্ব নিয়ে পৃথিবীতে এসেছিলেন। দায়িত্ব পালনে অনীহা ছিল না; কিন্তু মায়াময় পৃথিবীর সমান্তরালে নিজের সংক্ষিপ্ত আয়ু নিয়ে অখুশি ছিলেন। অখুশির কথা ফেরেশতারাও জানত। তারাই একদিন জানিয়েছিল—পৃথিবীতে এমন কুয়া আছে, যে কুয়ার পানি পান করলে কিয়ামত পর্যন্ত মৃত্যু স্পর্শ করবে না।

চতুর্দিকে সাজসাজ রব। বাবা খোয়াজ খিজির আবেহায়াত নামক ওই কুয়ার খোঁজে রাস্তায় নামেন। সঙ্গে নিয়েছিলেন জুলকারনাইন বাদশাহকে। কেননা উভয়ই সুদীর্ঘ আয়ুপ্রত্যাশী। প্রত্যাশামাফিক এগিয়ে চলেন অভীষ্ট লক্ষ্যে। কিন্তু বাদশাহ নামদারের দুর্ভাগ্য, কুয়ার কাছে গিয়েও পানি পান করতে পারেননি। সামান্য পানি যা পেয়েছিলেন, পায়ে হোঁচট লেগে মাটিতে পড়ে যায়; বোতল ভেঙে গড়িয়ে পড়ে সাধের আবেহায়াত!

একদল মানুষ, যারা পাড়া-মহল্লায় মিলাদ শুনত, তারা বক্তব্যের সত্যতা স্বীকার করে। হুজুরের বয়ানে এমন কথা অনেক দিন অনেকবার শুনেছে। এও শুনেছে যে, বাবা খোয়াজ খিজির পরবর্তী সময়ে পানির বাদশাহি লাভ করেছেন। সমুদ্রের গহিনে তার সাম্রাজ্য। অতএব, পানির মতো পরিষ্কার—পানির বাদশাহ পানি নিয়ে আন্দোলনের ময়দানে উপস্থিত হয়েছিলেন, যোদ্ধাদের সঞ্জীবনী শক্তি বৃদ্ধিতে সাহায্য করেছিলেন। একজন খোয়াজ খিজির শুধু উম্মতে মুহাম্মদি নয়, অন্যান্য নবী-রাসুলেরও স্বজন। স্বজন হিসেবে মুসা নবীকে পথ দেখিয়েছিলেন। উপহার দিয়েছিলেন ঐতিহাসিক চশমা। আখেরি নবীর মৃত্যুতেও উপস্থিত ছিলেন। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান আমাদের মুক্তির সোপান, কারো মতে দ্বিতীয় স্বাধীনতা। পরাধীনতার শিকল ভাঙতেও দ্বিধা করেননি। মুগ্ধ পরিচয়ে ছাত্র-জনতাকে যিনি পানি পান করিয়েছেন, তিনি অন্য কেউ নন; স্বয়ং খোয়াজ খিজির।

খিজিরের প্রতি ছাত্রদের বিদ্বেষ নেই, বরং তারা কৃতজ্ঞ; কৃতজ্ঞচিত্তে মুগ্ধ কিংবা আল্লাহর একজন নবীর অবদানের কথা স্বীকার করে। পতিত স্বৈরাচারের দোসরও খোয়াজের অবদান অস্বীকার করে না, অজ্ঞাত স্থান হতে বিবৃতি প্রদান করে—ছাত্র-জনতা নয়, আমরা পরাজিত হয়েছি ঐশ্বরিক শক্তির কাছে। আর ওই শক্তির উৎস ছিল খোয়াজ খিজির।

মা-হারা এতিম সন্তানরা বাবা খিজিরের প্রতি বিক্ষুব্ধ; বিক্ষুব্ধচিত্তে জানান দেয়—আমরাও দেখে নেব, খোয়াজ খিজির কত কেরামতি জানে! মাতাজি কামরূপ-কামাখ্যায় গিয়ে জাদরেল একজন গুনিনের শরণাপন্ন হয়েছেন। তিনি কথা দিয়েছেন, যাবতীয় কেরামতি খতম করে দেবেন। প্রয়োজনে পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটাবেন।

বিস্ফোরণ যে ঘটবে, এমন আলামত অবশ্য দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। ফেলানীর লাশ ছুঁয়ে অশনিসংকেত। সংখ্যালঘু নির্যাতনের মিথ্যা অপবাদ। ঠুনকো অজুহাতে বাদে বাদে অসহযোগিতা। সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া। সাধারণ কৃষকদের হয়রানি করা। শূন্যে গুলি ছুড়ে জনগণকে ভীত-সন্ত্রস্ত করা। মিডিয়ার সম্মুখে বৃথা আস্ফালন—থাকবে না, থাকবে না।

নেতাগোত্রীয় দালাল আরো কয়েক কাঠি সরস—বাদীর বাচ্ছা! পেয়েছিছ কী! ছাত (সাত) মিনিটে দখল হয়ে যাবে।

সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এতিম সন্তানরা; দালালের চোখে চোখ লাগিয়ে অখণ্ডতার স্বপ্ন দেখে। রাতের আঁধারে দিবাস্বপ্ন—তাদের মা নাকি ওই দেশের প্রধানমন্ত্রী হবে!

কানার শখ ভোরে উঠে সকালের সূর্য দেখবে! না, সূর্য দেখার ওই স্বপ্ন কিছুতেই পূরণ হওয়ার নয়। আমাদের ছাত্র-জনতা কিছুতেই পূরণ হতে দেবে না। আগের যেকোনো সময়ের চাইতে বিডিআরের জওয়ানরা শক্তিশালী অবস্থানে। সেনা-জনতার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় তৈরি করা হয়েছে শক্তিশালী নিরাপত্তা বলয়। ওই বলয় ভেদ করে দেশের অভ্যন্তরে ঢোকার চেষ্টা করলে সমুচিত জবাব দেওয়া হবে। জবাব দিতে আমাদের সন্তানরা প্রস্তুত। তারা হুমকি-ধমকিকে পাত্তা দেয় না। জুলাই যাবতীয় আগ্রাসন রুখে দিয়েছে। পালাতে বাধ্য করেছে স্বৈরশাসককে। এখন কেবল স্বপ্ন; আগামীর স্বপ্ন। আবু সাঈদ, মুগ্ধ, ওয়াসিম আকরাম, ইয়ামিনসহ নাম না-জানা অসংখ্য শহীদের স্বপ্ন পূরণে ব্যর্থ হলে ইতিহাস তাদের ক্ষমা করবে না। ইতিহাসের পথ ধরে ঐতিহ্যের কাছাকাছি পৌঁছে যায়। বাবা খোয়াজ খিজিরের সাক্ষাৎ প্রত্যাশা করে। মনে মনে ভাবে, তার সঙ্গে সাক্ষাৎ হলে শহীদ মুগ্ধর বিষয়ে সুরাহা হতো। সাক্ষাৎ বিষয়ে বিজ্ঞজনের অভিমত—তার দেখা পাওয়া সহজ নয়, কষ্টকর; তোমরা কি কষ্ট সহ্য করতে পারবে!

ছাত্র-জনতা দৃঢ়প্রত্যয়ী। মুষ্টিবদ্ধ হাতে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে—না পারার কী আছে! দেড় দশক ধরে জেঁকে বসা স্বৈরাচারকে যারা হঠাতে পারে, তাদের কাছে অসাধ্য বলে কিছু নেই।

তাহলে যাও, দুই সাগরের সঙ্গমস্থল অভিমুখে রওনা দাও। ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলে সেখানেই মিলতে পারে বাবা খোয়াজ খিজিরকে।

বলেন কী! দুই সাগরের সঙ্গমস্থল!

সত্যি বলছি। চিনতে অসুবিধা হলে প্লেটে করে একটা মৃত মাছ সঙ্গে নিও। ওই মাছটিই পথ চিনিয়ে নিয়ে যাবে!

তাই বলে মৃত মাছ!

মুসা নবীও তাই নিয়েছিলেন। মৃত মাছ জ্যান্ত হয়ে পানিতে লাফ দিলে ভাববে, লক্ষ্যভেদ অত্যাসন্ন।

বন্ধুর পথ। সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। এতেও সমস্যা হতো না; যদি না রাষ্ট্র-সংস্কার আন্দোলন চলমান থাকত। চলমান সংস্কার কর্মসূচি এগিয়ে নিতে অখণ্ড মনোযোগ প্রয়োজন। অতএব সাক্ষাতের বিষয়টি আপাতত স্থগিত। ভিন্ন পথে তারা সমাধানে পৌঁছাতে আগ্রহী। আগ্রহী ব্যক্তি এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সমন্বয়ে ছাত্ররা গোলটেবিল বৈঠক আহ্বান করে। নিজেদের করণীয় সম্পর্কে আলাপ-আলোচনা করে। যুদ্ধক্ষেত্রে ঐশ্বরিক শক্তির সংশ্লিষ্টতা নতুন নয়, বরং অনেক বেশি পুরাতন। ১৭ মার্চ ৬২৪ খ্রিষ্টাব্দে মদিনার দক্ষিণ-পশ্চিমে ৮০ মাইল দূরে বদর উপত্যকায় অনুষ্ঠিত মদিনার মুসলমান এবং কুরাইশদের মধ্যে সংঘটিত যুদ্ধে মুসলমানদের পক্ষে ফেরেশতামণ্ডলী অংশগ্রহণ করেছিলেন। এ বিষয়ে আল-কোরআনে স্পষ্ট ইঙ্গিত আছে। বৈঠকে উপস্থিত একজন বিজ্ঞ আলেম ছাত্রদের সমস্যা খানিকটা হলেও অনুধাবন করতে সক্ষম; তিনি জিজ্ঞেস করেন—তোমরা কি কোনো কারণে দ্বিধান্বিত; নাকি বিজয় উদ্‌যাপনে অস্বস্তি!

অস্বস্তির কথা মুখে প্রকাশ না করলেও হাবভাবে বুঝতে অসুবিধা হয় না; গণঅভ্যুত্থানে ঐশ্বরিক শক্তির উপস্থিতি নিয়ে তারা দ্বিধাগ্রস্ত। দ্বিধার পাহাড় ডিঙাতে আলেম মহাশয় আবার বলেন—তোমরা ভ্রান্তিতে রয়েছ, হে যুবক! সমস্ত ক্ষমতা কেবল মহান সৃষ্টিকর্তার। তিনি যাকে ইচ্ছা তাকে জয়ী এবং অন্যকে পরাজিত করেন। আমি ও আমরা ওসিলা মাত্র। বদরের যুদ্ধে ফেরেশতারা অংশগ্রহণ করেছিল বলে সাহাবিদের মর্যাদা কি কমে গেছে? না, কখনোই তা নয়। জমিনের ফয়সালা আসে আসমান থেকে। তিনিই উত্তম বিচারক। বিগত দেড় দশক ধরে সরকারের বিরুদ্ধে বিরোধী রাজনৈতিক দলসমূহ আন্দোলন-সংগ্রামে লিপ্ত। অবর্ণনীয় ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে বারবার ব্যর্থ হয়েছে। অথচ সৃষ্টিকর্তার কী রহমত; তোমাদের অংশগ্রহণে গণঅভ্যুত্থান সফল এবং সার্থক হয়েছে। নিশ্চয়ই তোমরা সাফল্যের অংশীদার। কিন্তু তারা, যারা গত দেড় দশক আন্দোলন-সংগ্রাম করে আসছে, তাদের অবদানকে অস্বীকার করবে কীভাবে!

তাই তো! কীভাবে অস্বীকার করব!

বাস্তবতাকে অস্বীকার করার উপায় নেই। বাস্তবের নিরিখে ভবিষ্যৎ সাজাতে হয়। ছাত্র-জনতা নিজেদের মতো করে কর্মপরিকল্পনা বিন্যস্ত করে। পূর্বাপর ঘটনা বিশ্লেষণ করে। বিজ্ঞানের ওপর আস্থা রাখার প্রত্যাশা। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে লাশের শরীরে ভিন্নমাত্রিক গবেষণা চলতে পারে। ফলে হতাশার মাঝে প্রজ্বলিত হয় সম্ভাবনার আলোকশিখা। কবর থেকে শহীদ মুগ্ধর লাশ উত্তোলনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়। কেউ কেউ আপত্তি করলেও সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের কারণে ওই আপত্তি ধোপে টেকেনি! কিন্তু তখনো কেউ আন্দাজ করতে পারেনি, খোয়াজ খিজিরের আরো বড় কেরামতি তাদের জন্য অপেক্ষা করছে। অপেক্ষার প্রহর শেষ হলে উপস্থিত ছাত্র-জনতা বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে যায়। গলিত কিংবা অর্ধগলিত কোনো লাশই কবরের মধ্যে নেই! পরিপাটি করে সাজানো রয়েছে ফুলের বিছানা। বিছানার ওপর শুয়ে আছে নবজাতক এক শিশু। শিশু তার আপন সারল্যে হাত-পা নেড়ে খেলে আর উপস্থিত জনতার পানে তাকায়। বিমুগ্ধ চোখে তাকিয়ে রয় বিশ্ব। এ শিশু কোনো সাধারণ শিশু নয়, খোদার দেওয়া শিশু, যে শিশুর হাতে নির্মিত হবে আমাদের আগামী।

গোলাগুলির আবহ স্তিমিত হলে সাধকজন প্রত্যক্ষ করেন, লাশের পরিবর্তে ফুল; যেখানে লাশ থাকার কথা সেখানে কেবল ফুলের বিছানা—আর বিছানার ওপরে শুয়ে আছে এক নবজাতক; যে জাতক নাকি নতুন আঙ্গিকে ইতিহাস লিপিবদ্ধ করবে! স্রোতাকুল বিস্মিত। ইতিহাসের পথ মসৃণ নয়, বরং খুব বেশি বন্ধুর; ফলে শংসয়বাদী পরাণে উচ্চারিত হয় ভিন্নবয়ান- কে মুগ্ধ! মুগ্ধ নামে কেউ নেই! আগে কিংবা পরে এই নামে কখনো কেউ ছিল না। বড়জোর একটি কালজয়ী উপন্যাসের কল্পিত চরিত্র হিসেবে তাকে বিবেচনা করতে পারেন।

মাঠের যোদ্ধারা বক্তব্যের বিরোধিতা করে প্রতিবাদমুখর হয়ে ওঠে। কেননা, ছেলেটি যোদ্ধা। যুদ্ধের ময়দানে তার বীরত্বগাঁথা দেশি-বিদেশিদের মনে মুগ্ধতা ছড়িয়েছে। কেউ কেউ ব্যথিত হয়েছে, নিঃশব্দে চোখের জল ঝরিয়েছে; বস্তুত ছেলেটির করুণ পরিণতির জন্য দুঃখ পায়নি এমন একজন মানুষ খুঁজে পাওয়াও দুস্কর। সদা-হাসোজ্জ্বল একটি মুখ। হাসতে-হাসতে মৃত্যুর হিমশীতল ছায়াতলে লুটিয়ে পড়েছিল। সেদিন ছিল ১৮ জুলাই। অভ্যুত্থানকাল। প্রকৃতিতে ঘনায়মান সন্ধ্যার আবহ। ঘরফেরত মানুষের মধ্যে ঘরে ফেরার তাড়া, পাখিদের তাড়া বাসায় ফেরার; তাড়া নেই কেবল মুগ্ধ নামের ছেলেটির। ঢাকার উত্তরাফ্রন্টে ছাত্র-জনতাকে পানি পান করাতে ব্যস্ত সে। শুধু উত্তরা নয়, আন্দোলনের একেবারে শুরু থেকে বিভিন্ন ফ্রন্টে পানির বোতল হাতে তাকে দৌড়াদৌড়ি করতে দেখা গেছে। বিপদের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তার সাহসী উচ্চারণ আন্দোলনকে বেগবান করেছে। শুধু আবেগ নয় বাস্তবতার নিরিখে ঘোষণা করেছে- বন্ধুরা, ভয় আমাদের শৃঙ্খলিত করতে চায়; কিন্তু আমরা বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়ছি। ভয়কে জয় করেই মুক্তির পথে এগিয়ে এগিয়ে যেতে হবে।

কিন্তু বেশিদূর এগোতে পারে না, রাষ্ট্রপক্ষের একটি বুলেট তার কপাল বরাবর বিদ্ধ হলে থেমে যায় কোলাহল; বলগা হরিণের মতো ছুটে চলার গতি হঠাৎই স্থিমিত হয়। গুলিবিদ্ধ হওয়ার মুহূর্তে প্রত্যক্ষ করে, অভিন্ন ঘটনার পুনরাবৃত্তি আগেও ঘটেছে; ঘটতে দেখেছে সে। তার কাছে মনে হয়, এই মৃত্যু নতুন না আগেও অনুভব করেছে; একই স্থানে, একই পরিস্থিতিতে। কিন্তু সাতচল্লিশ বায়ান্ন উনসত্তর নাকি একাত্তর- না, সময়কাল নিশ্চিত হতে পারে না। নিজেকে ক্রমশ শক্তিহীন অনুভূত হয়। পা'দুটোও যেনো মাটির সাথে গেঁথে যেতে চায়। মনে হয়, প্রথিবীর কোনো প্রান্তে বোধহয় ভুমিকম্প শুরু হয়েছে। কেঁপে ওঠে আসমান-জমিন।

কাঁপে না কেবল গাদ্দার শাসকের বুক। যোদ্ধার বুকে মৃত্যুপিপাসা। অথচ তখনো তাঁর মুখে পানি বিষয়ক সংলাপ; খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে সম্মুখে হাটে আর বলে- পানি লাগবে, পানি! পানি লাগবে, পানি!

কপাল থেকে চুঁয়ে পড়া লালরক্ত হাতের তালুতে নিয়ে দেখছিল আর হাসছিল। চারপাশে নিস্তব্ধতার আবরণ। ভাষাহীন চোখে বিমূর্ত কান্না অথচ মুগ্ধ হাসে। তার চোখের আলো যেনো ধীরে ধীরে নিভে যেতে উদ্যত। কেউ একজন দৌড়ে এসে হাত ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলে- আরেকটু সহ্য কর ভাই, গাড়ির জন্য চেষ্টা চলছে; দ্রুতই তোকে হাসপাতালে নেবো।

কিন্তু শুনতে পায় না, মুহূর্তের জন্য চোখে ভেসে ওঠে মমতাময়ী মায়ের মুখচ্ছবি, পতপত করে উড়তে থাকা পতাকা, দূর থেকে ভেসে আসা স্লোগানের শব্দ— তারপর শেষ, নিভে যায় প্রদীপশিখা, শূন্যে মিলিয়ে যায় যাবতীয় কোলাহল। মাঝে মাঝে মনে হয়, মৃত্যুর চেয়ে বড় ম্যাজিক আর হয় না। মৃত্যুখেলায় কতশত ম্যাজেশিয়ানকে হার মানিয়েছে সে। তাঁর লাশ নিয়ে শুরু হয় ভিন্ন আরেক সংকট। পরিচয়কেন্দ্রিক সংকট তীব্রতর হয়ে ওঠে। পিতামাতার নাম-ঠিকানা জানাতে অক্ষম হলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অজ্ঞাত পরিচয় লাশ হিসেবে উল্লেখ করে। একজন যুবক তখন লাশের পানে তাকিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করে- এটা কীভাবে সম্ভব! আমরা দিনের পর দিন একসঙ্গে লড়েছি, অথচ নাম-ঠিকানা বলতে পারছি না!

কী অদ্ভুত! একজন বীর যুদ্ধের ময়দানে শহীদ হয়েছে; আর আমরা কেউ তার পরিচয় জানি না। একজন বীর যোদ্ধার পরিচয় এতটা অজ্ঞাত থাকতে পারে কীভাবে!

অজ্ঞাত এক বৃদ্ধ শোনায় পৌরাণিক গল্প। লোকটি দাবি করে ইতিহাসের এক পুরনো দলিলে নাকি মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধর মৃত্যুর বিবরণ লিপিবদ্ধ আছে, যা কয়েক শতাব্দী আগের! বৃদ্ধের কথা তারা পাত্তা দেয় না, নিজস্ব ভাবনায় চিন্তাভাবনা করে। পরিচয় সনাক্তের চেষ্টা যে হয়নি তা নয়, কিন্তু সব চেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। কাছের বন্ধুরা অনুশোচনার আগুনে পলে-পলে দগ্ধ হয়। বন্ধুর নাম-ঠিকানা বলতে না পারা স্রেফ বোকামি। এমন বোকামির কারণেই হয়তো একজন শহীদের নামের সাথে খোয়াজ খিজিরের নাম যুক্ত হয়। তাছাড়া মুগ্ধ যে মুগ্ধ নয় কিংবা মুগ্ধ যে প্রকৃতপক্ষে খোয়াজ খিজির; স্বপক্ষে টেকসই যুক্তিও খাড়া হয়ে যায়। একটা ছেলে একই সঙ্গে ভিন্ন ভিন্ন ফ্রন্টে সংযুক্ত থাকে কিভাবে! শনির আখড়ার সহযোদ্ধা বুঝতে পারে না, বন্ধুর লাশ কেনো উত্তরায়! লাশ দিনকতক হাসপাতালের মর্গে সংরক্ষণ করা ছিল। দ্রুততার সাথে ছবিসহ লাশের খবর ফেসবুকের পাতায়-পাতায় চাউর হয়ে গিয়েছিল। হত্যাদৃশ্যে বিশ্ববাসী বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছিল। এমন হাসিমুখেও মৃত্যুকে আলিঙ্গন করা সম্ভব! অতএব, যদি আত্মীয়-স্বজন থাকতো তবে নিশ্চয়ই ছুটে আসতো।

কিন্তু মুগ্ধ তাহলে কে! কী তার পরিচয়!

পরিচয় সনাক্ত হয় না বলেই বিজ্ঞজনের অভিমত- মুগ্ধ নামে কেউ নেই, কখনো ছিল না।তাহলে যুদ্ধের ময়দানে শহীদ হলো কে!

দীপ্ত কন্ঠের উচ্চারণ- খোয়াজ খিজির।

কিন্তু উনার তো মৃত্যু নেই!

ঘাড় নেড়ে অন্য আরেকজন জানায়- হ্যাঁ মৃত্যু নেই; আবেহায়াতের কল্যাণে কেয়ামত পর্যন্ত মৃত্যু তাকে স্পর্শ করবে না।

আবেহায়াত সম্পর্কে যারা অজ্ঞ, তারা জিজ্ঞেস করে- কী সে'ই আবেহায়াত! তার সাথে খোয়াজ খিজিরের সম্পর্ক কী!

খোয়াজ খিজির আল্লাহর নবী। নবুয়তের দায়িত্ব নিয়ে পৃথিবীতে এসেছিলেন। দায়িত্ব পালনে অনীহা ছিল না; কিন্তু মায়াময় পৃথিবীর সমান্তরালে নিজের সংক্ষিপ্ত আয়ু নিয়ে অখুশি ছিলেন। অখুশির কথা ফেরেশতারাও জানতো। তারাই একদিন জানিয়েছিল- পৃথিবীতে এমন কুয়া আছে, যে কুয়ার পানি পান করলে কিয়ামত পর্যন্ত মৃত্যু স্পর্শ করবে না।

যেই কথা সে'ই কাজ। চর্তুদিকে সাজ-সাজ রব। বাবা খোয়াজ খিজির আবেহায়াত নামক ওই কুয়ার খোঁজে রাস্তায় নামে। সঙ্গে নিয়েছিলেন জুলকারনাইন নামক একজন বাদশাকে। কেননা উভয়ই সুদীর্ঘ আয়ুপ্রত্যাশি। প্রত্যাশামাফিক এগিয়ে চলে অভিষ্ঠ লক্ষ্যে। কিন্তু বাদশা নামদারের দুর্ভাগ্য, কুয়ার কাছে গিয়েও পানি পান করতে পারেনি। সামান্য পানি যা পেয়েছিল, পায়ে হোঁচট লেগে মাটিতে পড়ে যায়; বোতল ভেঙে গড়িয়ে পড়ে সাধের আবেহায়াত!

একদল মানুষ; যারা পাড়া-মহল্লায় মিলাদ শুনতো তারা বক্তব্যের সত্যতা স্বীকার করে। হুজুরের বয়ানে এমন কথা অনেকদিন অনেকবার শুনেছে। এও শুনেছে যে, বাবা খোয়াজ খিজির পরবর্তীতে পানির বাদশাহী লাভ করেছেন। সমুদ্রের গহীনে তার সম্রাজ্য।

অতএব, ইহা জলের মতো পরিষ্কার- পানির বাদশা পানি নিয়ে আন্দোলনের ময়দানে উপস্থিত হয়েছিলেন, যোদ্ধাদের সঞ্জীবনী শক্তি বৃদ্ধিতে সাহায্য করেছিলেন।

একজন খোয়াজ খিজির শুধুমাত্র উম্মতে মুহাম্মদী নয় অন্যান্য নবী-রাসুলেরও স্বজন। স্বজন হিসেবে মুসা নবীকে তিনি পথ দেখিয়েছিলেন, উপহার দিয়েছিলেন ঐতিহাসিক চশমা। আখেরি নবীর মৃত্যুতেও উপস্থিত ছিলেন।

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান আমাদের মুক্তির সোপান। ওই অভ্যুত্থানে মুগ্ধ পরিচয়ে ছাত্র-জনতাকে যিনি পানি পান করিয়েছেন তিনি আর অন্য কেউ নয়; স্বয়ং খোয়াজ খিজির। খিজিরের প্রতি ছাত্রদের বিদ্বেষ নেই বরং কৃতজ্ঞ; কৃতজ্ঞচিত্তে মুগ্ধ কিংবা আল্লাহর একজন নবীর অবদানের কথা স্বীকার করে। পতিত স্বৈরাচারের দোসরও খোয়াজের অবদান অস্বীকার করে না, অজ্ঞাত স্থান হতে বিবৃতি প্রদান করে- ছাত্র-জনতা নয় আমরা পরাজিত হয়েছি ঐশ্বরিক শক্তির কাছে। আর ওই শক্তির উৎস ছিল খোয়াজ খিজির।

মা-হারা এতিম সন্তানগণ বাবা খিজিরের প্রতি বিক্ষুব্ধ; বিক্ষুব্ধচিত্তে জানান দেয়- আমরাও দেখে নেবো, খোয়াজ খিজির কতো কেরামতি জানে! মাতাজি কামরূপ-কামাখ্যায় গিয়ে জাদরেল একজন গুনিনের শরণাপন্ন হয়েছেন। তিনি কথা দিয়েছেন, খোয়াজের যাবতীয় কেরামতি খতম করে দেবেন। প্রয়োজনে পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটাবেন।

বিস্ফোরণ যে ঘটবে, এমন আলামত অবশ্য দৃশ্যমান হতে শুরু হয়েছে। ফেলানীর লাশ ছুঁয়ে অশনি সংকেত। সংখ্যালঘু নির্যাতনের মিথ্যা অপবাদ, ঠুনকো অজুহাতে বাদে বাদে অসহযোগিতা, সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া; সাধারণ কৃষকদের হয়রানি করা, শূন্যে গুলি ছুঁড়ে জনগণকে ভীত-সন্ত্রস্ত করা, মিডিয়ার সন্মুখে বৃথা আস্ফালন- থাকবেনা, বাংলাদেশ থাকবেনা।

নেতাগোত্রীয় দালাল আরো কয়েক কাঠি সরস হয়ে বলে- বাদীর বাচ্ছা! পেয়েছিছ কী! ছাত (সাত) মিনিটে বাংলাদেছ দখল হয়ে যাবে।

সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এতিম সন্তানরা; দালালের চোখে চোখ লাগিয়ে অখন্ড ভারতের স্বপ্ন দেখে তারা। রাতের আঁধারে দিবাস্বপ্ন, তাদের মা নাকি ওই ভারতবর্ষের প্রধানমন্ত্রী হবে!

ইস, শখ কত! কানার শখ ভোরে উঠে সকালের সূর্য দেখবে!

না, সূর্য দেখার ওই স্বপ্ন কিছুতেই পূরণ হওয়ার নয়। আমাদের ছাত্র-জনতা কিছুতেই পূরণ হতে দেবে না। আগের যেকোনো সময়ের চাইতে বিডিআরের জওয়ানরা শক্তিশালী অবস্থানে। সেনা-জনতার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় তৈরি করা হয়েছে শক্তিশালী নিরাপত্তা বলয়। ওই বলয় ভেদ করে দেশের অভ্যন্তরে ঢোকার চেষ্টা করলে সমুচিত জবাব দেওয়া হবে। জবাব দিতে আমাদের সন্তানরা প্রস্তুত। পাশ্ববর্তী দেশের হুমকি-ধামকিকে পাত্তা দেয় না। জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে যাবতীয় আগ্রাসন রুখে দিয়েছে। পালাতে বাধ্য করেছে একজন স্বৈরশাসককে। এখন কেবল স্বপ্ন; দেশগঠনের ব্রতী নিয়ে আগামীর স্বপ্ন দেখে। আবু সাঈদ, মুগ্ধ, ওয়াসিম আকরাম, ইয়ামিনসহ নাম না-জানা অসংখ্য শহীদের স্বপ্ন পূরণে ব্যর্থ হলে ইতিহাস তাদের ক্ষমা করবে না। ইতিহাসের পথ ধরে ঐতিহ্যের কাছাকাছি পৌঁছে যায়। বাবা খোয়াজ খিজিরের সাক্ষাৎ প্রত্যাশা করে। মনে মনে ভাবে, উনার সাথে সাক্ষাৎ হলে শহীদ মুন্ধর বিষয়ে সূরাহা হতো। সাক্ষাৎ বিষয়ে বিজ্ঞজনের অভিমত- উনার দেখা পাওয়া সহজ নয়, কষ্টকর; তোমরা কী কষ্ট সহ্য করতে পারবে!

ছাত্রজন দৃঢ় প্রত্যয়ী। মুষ্টিবদ্ধ হাতে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে- না পারার কী আছে! দেড়দশক ধরে জেঁকে বসা স্বৈরাচারকে যারা হঠাতে পারে, তাদের কাছে অসাধ্য বলে কিছু নেই।

তাহলে যাও; দুই সাগরের সঙ্গমস্থল অভিমুখে রওনা দাও। ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলে সেখানেই মিলতে পারে বাবা খোয়াজ খিজিরকে।

উপস্থিত জনতা বিস্মিত- বলেন কী! দুই সাগরের সঙ্গমস্থল!

মুচকি হেসে বলেন- সত্যি বলছি। চিনতে অসুবিধা হলে প্লেটে করে একটা মৃত মাছ সঙ্গে নিও। ওই মাছটিই পথ চিনিয়ে নিয়ে যাবে!

মাছ কেমন করে পথ দেখাবে, ঠিক বোধগম্য নয়; তাই অবিশ্বাসী নয়নে জানতে চায়- তা'ই বলে মৃত মাছ!

সাধক নির্ভার- হ্যাঁ বাবা, মুসা নবীও নিয়েছিল; মৃত মাছ জ্যান্ত হয়ে পানিতে লাফ দিলে ভাববে লক্ষ্যভেদ অত্যাসন্ন।

বন্ধুর পথ। সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। এতেও সমস্যা হতো না; যদি না রাষ্ট্র-সংস্কার আন্দোলন চলমান থাকতো। চলমান সংস্কার কর্মসূচি এগিয়ে নিতে অখণ্ড মনোযোগ প্রয়োজন। অতএব সাক্ষাতের বিষয়টি আপাতত স্থগিত, ভিন্ন পথে তারা সমাধানে পৌঁছাতে আগ্রহী; আগ্রহী ব্যক্তি এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সমন্বয়ে বৈষম্যবিরোধী আন্দলোনের ছাত্ররা গোলটেবিল বৈঠক আহ্বান করে। নিজেদের করণীয় সম্পর্কে আলাপ-আলোচনা করে। যুদ্ধক্ষেত্রে ঐশ্বরিক শক্তির সংশ্লিষ্টতা নতুন নয় বরং অনেক বেশি পুরাতন। ১৭ মার্চ ৬২৪ খ্রিস্টাব্দে মদিনার দক্ষিণ-পশ্চিমে ৮০ মাইল দূরে বদর উপত্যকায় অনুষ্ঠিত মদিনার মুসলমান এবং কুরাইশদের মধ্যে সংঘটিত যুদ্ধে মুসলমানদের পক্ষে ফেরেশতামন্ডলী অংশগ্রহণ করেছিলেন। এ বিষয়ে মহাগ্রন্থ আল-কুরআনে সুস্পষ্ট ইঙ্গিত আছে। বৈঠকে উপস্থিত একজন বিজ্ঞ আলেম ছাত্রদের সমস্যা খানিকটা হলেও অনুধাবন করতে সক্ষম; তিনি জিজ্ঞেস করেন- তোমরা কি কোনো কারনে দ্বিধান্বিত; নাকি বিজয় উদযাপনে অস্বস্তি!

অস্বস্তির কথা মুখে প্রকাশ না করলেও হাবভাবে বুঝতে অসুবিধা হয় না; গণঅভ্যুত্থানে ঐশ্বরিক শক্তির উপস্থিতি নিয়ে তারা দ্বিধাগ্রস্ত। দ্বিধার পাহাড় ডিঙাতে আলেম মহাশয় পুনরায় বলেন- তোমরা ভ্রান্তিতে রয়েছো, হে যুবক! সমস্ত ক্ষমতা কেবলমাত্র মহান সৃষ্টিকর্তার। উনি যাকে ইচ্ছে তাকে জয়ী এবং অন্যকে পরাজিত করেন। আমি ও আমরা উসিলামাত্র। বদরের যুদ্ধে ফেরেশতারা অংশগ্রহণ করেছিল বলে সাহাবীদের মর্যাদা কি কমে গেছে? না, কখনোই তা না। জমিনের ফয়সালা আসে আসমান থেকে। তিনিই উত্তম বিচারক। বিগত দেড়দশক ধরে সরকারের বিরুদ্ধে বিরোধী রাজনৈতিক দলসমূহ আন্দোলন-সংগ্রামে লিপ্ত ছিল, অবর্ণনীয় ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে; কিন্তু কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে বারবার ব্যর্থ হয়েছে। অথচ সৃষ্টিকর্তার কী রহমত; তোমাদের অংশগ্রহণে গণঅভ্যুত্থান সফল এবং সার্থক হয়েছে। নিশ্চয়ই তোমরা সাফল্যের অংশীদার। কিন্তু তারা, যারা গত দেড়দশক আন্দোলন-সংগ্রাম করে আসছে; তাদের অবদানকে অস্বীকার করবে কিভাবে!

তাইতো!

কিভাবে অস্বিকার করবো!

বাস্তবতাকে অস্বীকার করার উপায় নেই। বাস্তবের নিরিখে ভবিষ্যৎ সাজাতে হয়। ছাত্র-জনতা নিজেদের মতো করে কর্মপরিকল্পনা বিন্যস্ত করে। পূর্বাপর ঘটনা বিশ্লেষণ করে। বিজ্ঞানের উপর আস্থা রাখার প্রত্যাশা, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে লাশের শরীরে ভিন্নমাত্রিক গবেষণা চলতে পারে। ফলে হতাশার মাঝে প্রজ্বলিত হয় সম্ভাবনার আলোক শিখা। কবর থেকে শহীদ মুগ্ধর লাশ উত্তোলনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়। কেউ কেউ আপত্তি করলেও সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের কারণে ওই আপত্তি ধোপে টেকেনি! কিন্তু তখনো কেউ আন্দাজ করতে পারেনি, খোয়াজ খিজিরের আরো বড় কেরামতি তাদের জন্য অপেক্ষা করছে। অপেক্ষার প্রহর শেষ হলে উপস্থিত ছাত্র-জনতা বিস্ময়ে বিমুঢ় হয়ে যায়। গলিত কিংবা অর্ধগলিত কোনো লাশই কবরের মধ্যে নেই! সেখানে পরিপাটি করে সাজানো রয়েছে ফুলের বিছানা। বিছানার ওপর শুয়ে আছে নবজাতক এক শিশু। শিশু তার আপন সারল্যে হাত-পা নেড়ে খেলে আর উপস্থিত জনতার পানে তাকায়। বিমুগ্ধ চোখে তাকিয়ে রয় বিশ্ব। এ শিশু কোনো সাধারণ শিশু নয়- দেবশিশু; যে শিশুর হাতে নির্মিত হবে আগামীর বাংলাদেশ।

বাঙালি মুসলমানের আকিদা

বাঙালি মুসলমানের শিকড়প্রশ্ন

মিরাজ রহমানের নতুন বই দ্য সিক্রেটস অব রিজিক অ্যান্ড বারাকাহ

কিশোর উপন্যাস তিফু সাবিবা : অটিজম ও মানবতার গল্প

বাঁকবদলের ক্রান্তিলগ্নে হাত বাড়িয়ে

বাংলার হারানো শহর খলিফাতাবাদ

মাহমুদুর রহমানের নতুন বই ‘আত্মপরিচয়ের বর্মে হেজেমনি মোকাবেলা’

‘হোয়াই নেশনস ফেইল’

সামাজিক ও রাজনৈতিক পট-পরিবর্তনের উপাখ্যান

তরুণ কবি এমদাদ হোসেনের নতুন বই ‘বেদনার দুর্দিনে তুমি আমার প্রার্থনা হও’