হোম > সাহিত্য সাময়িকী > বইপত্র

বাঙালি মুসলমানের হজসাহিত্যের খতিয়ান

হাসান ইনাম

বিশ্বায়ন ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতির এই যুগেও পরিবারের প্রবীণ কেউ যখন হজে রওনা দেন, তখন আশকোনা হজ ক্যাম্প এলাকায় একধরনের বেদনাবিধুর পরিবেশ তৈরি হয়। মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে গন্তব্যে পৌঁছানো সম্ভব জেনেও স্বজনদের চোখে ভাসে অনিশ্চয়তার ছায়া। বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগে হাজিরা সবার কাছে ক্ষমা চেয়ে নেন, যেন এটাই শেষ দেখা। মিটিয়ে দেন দেনা-পাওনা, কেউ কেউ ওয়ারিশদের উদ্দেশে অসিয়তও করে যান। এই আবেগঘন দৃশ্য কল্পনা করলেই বোঝা যায়, একশ কিংবা দেড়শ বছর আগে হজযাত্রা কতটা বন্ধুর, কতটা অনিশ্চিত ছিল।

‘বাঙালি মুসলমানের হজযাত্রা; ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও আদি চালচিত্র’ বইটিতে আমরা সেই সেকালের হজযাত্রার একটি জীবন্ত চালচিত্র দেখতে পাই। বই খুলতেই পাঠক থমকে যায় উৎসর্গপত্রে—‘আমার বংশের পূর্বপুরুষ, শ্রী শ্রী হাজী মিঠু বেপারী, তার স্মরণে।’ ফুটনোটে উল্লেখ আছে, নামটি কবরফলকে ঠিক এভাবেই লেখা। এই ছোট্ট তথ্যই অনেক কিছুর ইঙ্গিত দেয়। শতবর্ষ-প্রাচীন হজ ভ্রমণকাহিনিগুলোয়ও একই প্রভাব স্পষ্ট। লেখক সচেতনভাবেই সামনে এনেছেন বিষয়টি। মোহাম্মদ বদরুদ্দোজা কর্তৃক রচিত ভ্রমণবৃত্তান্ত প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯১৬ সালে। অপরদিকে ইয়াসিন আলী সরকারের হজ ভ্রমণকাহিনি লেখা হয় ১৯৩০ সালে। তাদের দুজনের রচনায় ফোর্ট উইলিয়ামের সংস্কৃতানুসারী বাংলা গদ্যের প্রভাব ছিল অনেক প্রকট। যেমন এক জায়গায় মোহাম্মদ বদরুদ্দোজা লিখছেন, ‘জেদ্দা হইতে উষ্ট্রযোগে মক্কা-মোয়াজ্জামাস্থ সম্মানিত কাবা মন্দিরে গমন করিতে হয়।’ ইয়াসিন আলী সরকার তার ডায়েরিতে লিখেছেন, ‘রাত্রিভর নিদ্রাদেবীর আশ্রয় পাইলাম।’ তবে ১৯২১ সালে প্রকাশিত খান বাহাদুর আহছানউল্লাহর হেজাজ ভ্রমণ এই দোষে দুষ্ট নয়। বিশ শতকের প্রথমার্ধের মুসলমান লেখকরা কেন বঙ্কিমীয় গদ্যভাষা ব্যবহারে এভাবে অভ্যস্ত হলেন, সেটি আলাদা গবেষণার দাবি রাখে।

প্রথম অধ্যায়ে লেখক কাবাঘর নির্মাণের ইতিহাস ও হজের উৎপত্তিগত প্রেক্ষাপট সংক্ষিপ্ত কিন্তু বস্তুনিষ্ঠভাবে তুলে ধরেছেন। একই অধ্যায়ে হজের সর্বজনীনতা নিয়েও আলোকপাত করা হয়েছে। অধ্যায়ের সবচেয়ে উপকারী অংশ নিঃসন্দেহে ‘হজকোষ’ বা হজ-সম্পর্কিত পরিভাষার ব্যাখ্যা।

দ্বিতীয় অধ্যায়ে বাঙালি মুসলমানের হজযাত্রার গমনপথ, হজে যাওয়ার ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা, হাজিদের সংখ্যা, বয়স ও সামাজিক বৈশিষ্ট্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এসেছে। কিন্তু এখানেই একটি বড় ধরনের তথ্যগত ত্রুটি চোখে পড়ে। বল্লাল সেনের আমলকে ‘৬০০ শতক’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে, অথচ ঘটনাটি ১১৭৮ সালের সঙ্গে সম্পর্কিত। আরো বিস্ময়কর হলো, কয়েক অধ্যায় পরেই একই রেফারেন্স ধরে মূল ঘটনার বিবরণ আবার সঠিকভাবে চলে এসেছে। ফলে মনে হয়, কোথাও কোথাও সম্পাদনার ঘাটতি রয়ে গেছে। এই অধ্যায়ে ১৯১৩-১৪ সালে প্রায় ২৮ হাজার বাঙালি মুসলমানের হজযাত্রা এবং ২০২৩ সালে তা এক লাখ ছাড়িয়ে যাওয়ার তথ্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি ১৯১৪ সালে সমগ্র পৃথিবী থেকে মাত্র এক লাখ ত্রিশ হাজার হাজির হজ পালন করার হিসাবও ঐতিহাসিক উপাদান।

বাঙালি হাজিদের বয়স ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের প্রসঙ্গ টেনে শতবর্ষী রচনাগুলো থেকে রেফারেন্স টেনে লেখক দেখিয়েছেন, সেই শুরু থেকেই শেষ বয়সে হজে যাওয়ার অভ্যাস এই অঞ্চলের মুসলমানদের। এই পর্যবেক্ষণ কেবল সামাজিক তথ্য নয়; এটি বাঙালি মুসলমানের ধর্মচর্চার বাস্তব চরিত্রও বোঝায়। একই সঙ্গে লেখক মক্কা-মদিনার উন্নয়নে বাংলার মুসলিম শাসকদের অবদানের কথাও এনেছেন, বিশেষত গিয়াসউদ্দিন আজম শাহের প্রসঙ্গ। এই অংশ আরো বিস্তৃত হতে পারত, কিন্তু সংক্ষিপ্ত ইঙ্গিত হিসেবেও তা গুরুত্বপূর্ণ। হজপথে কিংবা হজকালীন মৃত্যুর প্রসঙ্গ এসে যখন জানা যায়, জাহাজে মৃত্যু হলে কখনো কখনো লাশ সমুদ্রে ভাসিয়ে দিতে হতো, তখন সেকালের হজযাত্রার কঠোর বাস্তবতা পাঠককে নাড়া দেয়। ভাস্কো দা গামার হাতে হাজিবাহী জাহাজ লুট ও যাত্রী হত্যার কথা উল্লেখ করেছেন লেখক; সত্যেন সেনের বই ‘মসলার যুদ্ধ (১৯৬৮)’-এ উল্লেখ আছে এই ন্যক্কারজনক বর্ণনার।

বইয়ে বাঙালি মুসলমানের হজবিবরণী অংশটি বিশেষভাবে আকর্ষণীয়। এখানে ১৯১৪ সালের হজের খরচের যে হিসাব দেওয়া হয়েছে, তা অনেকটা এমন—জাহাজভাড়া ৭০ টাকা, উটভাড়া ১০ টাকা, মক্কায় ঘরভাড়া ৪ টাকা, আরাফার তাবু ২ টাকা, মক্কা থেকে মদিনা যেতে উটভাড়া ৬০ টাকা, পাসপোর্ট ১ পয়সা। বইয়ের অন্য এক জায়গায় লেখক দেখিয়েছেন, তখন আরব দেশের তুলনায় ভারতবর্ষের টাকার মান কত বেশি ছিল।

হজসাহিত্যে রাজনৈতিক ইতিহাস, এই দৃষ্টিকোণটি সচরাচর আলোচিত হয় না। অথচ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে ও পরে আরবের ক্ষমতার পালাবদল, উসমানি খেলাফতের প্রভাব হ্রাস, হেজাজের নিয়ন্ত্রণ হারানো, ব্রিটিশ সমর্থনে সৌদ শক্তির উত্থান, জেদ্দার রাজনীতি—এ সবকিছু হজযাত্রীদের চোখে-দেখা বিবরণে উঠে এসেছে। ফলে পাঠক বুঝতে পারেন, হজের পথ ধরে আরবের ইতিহাসও পড়া যায়। মক্কা ও মদিনার তুলনামূলক গুরুত্ব, হাজিদের কাছে মদিনার আলাদা আবেগ, সেকালের মদিনার আর্থসামাজিক অবস্থা—এসব বর্ণনা বিশেষভাবে স্মরণযোগ্য। খান বাহাদুর আহছানউল্লাহর ‘হেজাজ ভ্রমণ’ এ প্রসঙ্গে একটি শক্তিশালী সূত্র হয়ে উঠেছে।

আরব জাতির অতিথিপরায়ণতা, সামাজিক রীতি, একই আরব সমাজের দুই বিপরীত রূপের চিত্র। পথে লুটতরাজ আছে, আবার গৃহে গেলে মেহমানদারিও আছে। এই দ্বৈততা লেখক ভালোভাবে তুলে এনেছেন। খান বাহাদুর আহছানউল্লাহর পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, সে সময় আরবে পর্দাপ্রথা ভারতীয় উপমহাদেশের মতো কঠোর ছিল না। মোহাম্মদ হাননান প্রাচীন পাণ্ডুলিপি থেকে সরাসরি বর্ণনা এনে দেখিয়েছেন, আগে কাবা চত্বরে চার মাজহাবের চার জামাত হতো।

বইয়ের শেষদিকে গবেষক-পাঠকের জন্য সবচেয়ে মূল্যবান কিছু তথ্য আছেÑকলিকাতা হজ-কমিটির ১৯৩৫ সালের ঘোষণাপত্র, ১৯৩৫ সালের হজ-গাইড, ১৯২০ সালের হজের খরচ, ১৯৩৫ সালের আবশ্যক ব্যয়ের তালিকা, পাকিস্তান আমলে ১৯৬০ সালের হজ ব্যয়, ২০২৩ সালের হজ খরচ, ২০২৫ সালের হজ ব্যবস্থাপনা। বিশেষ করে পুরোনো নথিপত্রের সংযোজন বইটির একটি বড় প্রাপ্তি।

মিথ্যার যুগে সত্যের প্রতি একজন সাংবাদিক

রিসলি-বেভারলির তত্ত্বের সমালোচনা

বাঙালি মুসলমানের আকিদা

খোয়াজ খিজিরের কেরামতি

বাঙালি মুসলমানের শিকড়প্রশ্ন

মিরাজ রহমানের নতুন বই দ্য সিক্রেটস অব রিজিক অ্যান্ড বারাকাহ

কিশোর উপন্যাস তিফু সাবিবা : অটিজম ও মানবতার গল্প

বাঁকবদলের ক্রান্তিলগ্নে হাত বাড়িয়ে

বাংলার হারানো শহর খলিফাতাবাদ

মাহমুদুর রহমানের নতুন বই ‘আত্মপরিচয়ের বর্মে হেজেমনি মোকাবেলা’