হোম > সাহিত্য সাময়িকী > বইপত্র

মধ্যযুগের দরজা খুলে দেওয়া ইতিহাসবিদ

আব্দুল করিম

গুলজার গালিব খান

ইতিহাস রাজা-বাদশাহর নামধাম নয়; ইতিহাস মানে মানুষের পথচলা, নদীর ঘ্রাণ, মাটির রঙ, জনপদের বদল, ভাষার ভেতর লুকিয়ে থাকা যুগের ছাপ। এই ইতিহাসকে যারা কাগজের শুকনো পাতার ভেতর থেকে টেনে এনে জীবন্ত করে তোলেন, ইতিহাসবিদ আবদুল করিম তাদেরই একজন। বাংলাদেশের ইতিহাসচর্চায় তার নাম উচ্চারিত হয় নীরব শ্রদ্ধা নিয়ে, প্রায় অনুচ্চারণের মতো। ড. আবদুল করিম শুধু বাংলার মধ্যযুগের ইতিহাস লেখেননি, উজ্জ্বল ইতিহাসের ওপর চাপিয়ে দেওয়া আন্ধারও সরাতে চেয়েছেন।

আবদুল করিম ছিলেন মধ্যযুগীয় বাংলার এক ধৈর্যবান খনক। চাপা পড়া দলিল, শিলালিপি, পুথি, বিদেশি ভ্রমণকথা আর রাজদরবারের নথি ঘেঁটে এমন এক বাংলা খুঁজেছেন, যে বাংলা বহুদিন ধরে ভুল বয়ানের আড়ালে ঢাকা পড়ে ছিল। তার গবেষণার বড় অংশ ঘুরেফিরে এসেছে মুসলিম শাসনামলের বাংলা, সমাজজীবন, প্রশাসন, সংস্কৃতি, ভাষা আর জনজীবনের দিক। তার গবেষণা আমাদের দেখায়—বাংলার মধ্যযুগ অন্ধকারে ঢাকা ছিল না; এ সময়েই বাংলার রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠা, বাংলা রাষ্ট্র নির্মাণ, বাঙালি জাতির বিকাশ ও প্রতিষ্ঠা।

বাংলাদেশের ইতিহাস বুঝতে মধ্যযুগ এত জরুরি কেন—এই প্রশ্নের উত্তরও আব্দুল করিমের কাজের ভেতর লুকিয়ে আছে। কারণ আজকের বাংলার ভাষা, খাদ্য, পোশাক, আচার-রীতি, নগর গঠন—এসবের বড় অংশের ভিত তৈরি হয়েছে মধ্যযুগে। এ সময়েই বাংলা এক স্বতন্ত্র জনভূমি হিসেবে শক্ত হয়ে ওঠে। নতুন জনপদ গড়ে ওঠে, ইসলাম ছড়িয়ে পড়ে গ্রামবাংলায়, ফারসি-আরবি-তুর্কি শব্দ মিশে তৈরি হয়েছে মূলধারার বাংলা সাহিত্যের ভাষা; আবার স্থানীয় রীতিও টিকে থাকে নিজের ঢঙে।

কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে মধ্যযুগ নিয়ে দুটি চরম বয়ান চালু ছিল। একদল মধ্যযুগকে বহিরাগত বিজেতাদের যুগ বলে দেখিয়েছে, আরেকদল বানিয়েছে নিখাদ গৌরবের কিস্‌সা। আব্দুল করিম এই দুই চিৎকারের মাঝখানে দাঁড়িয়ে দলিলের ভাষায় কথা বলেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, ইতিহাস সাদা-কালো নয়; সেখানে সংঘাত আছে, আবার মেলবন্ধনও আছে। শাসন আছে, আবার সহাবস্থানও আছে। তার এই ভারসাম্যপূর্ণ চোখ বাংলাদেশের ইতিহাসচর্চাকে অনেক বেশি প্রাপ্তবয়স্ক করেছে।

আবদুল করিম শুধু সুলতানদের কাহিনি লেখেননি; তিনি জানতে চেয়েছেন সাধারণ মানুষের জীবন কেমন ছিল, কীভাবে বদলেছে বাংলার গ্রাম, কোন পথে এসেছে নতুন ভাষা, কীভাবে গড়ে উঠেছে শহর, কারা বানিয়েছে মসজিদ এবং কারা লিখেছে পুথি। ইতিহাসকে তিনি কেবল সিংহাসনের গল্প হতে দেননি; মানুষের ঘরের উঠোনে নামিয়ে এনেছেন।

বাংলাদেশের ইতিহাসকে তিনি দিল্লিকেন্দ্রিক বা উপমহাদেশকেন্দ্রিক দৃষ্টির বাইরে এনে বাংলার নিজস্ব জমিনে দাঁড় করিয়েছেন। আব্দুল করিম দেখালেন, বাংলার সমাজের নিজস্ব চলন ছিল, নিজস্ব রূপ ছিল, এমনকি মুসলিম শাসনও এখানে এসে আলাদা ঢং নিয়েছিল। এই দৃষ্টি পরের প্রজন্মের গবেষকদের বাংলাদেশকে দেখার নতুন চোখ দিয়েছে।

তার কাজের ভেতর এক ধরনের মাটির গন্ধ আছে। তিনি ইতিহাসকে দূরের জিনিস বানাননি। তার ভাষা ছিল সহজ, যুক্তি ছিল ঠান্ডা, আর অনুসন্ধান ছিল গভীর। তিনি আবেগে ভেসে যাননি, আবার ইতিহাসকে প্রাণহীনও করেননি। এ কারণেই তার বই আজও গবেষক, ছাত্র, পাঠক—সবার কাছে দরকারি।

আজকের বাংলাদেশে ইতিহাস নিয়ে যখন টানাটানি বাড়ছে, তখন আব্দুল করিমকে নতুন করে পড়া আরো জরুরি হয়ে উঠেছে। কারণ তিনি শিখিয়েছেন—ইতিহাস মানে পক্ষ নেওয়া নয়, ইতিহাস মানে সত্যসন্ধান। সেই সত্য কখনো মসজিদ-মন্দিরের শিলালিপিতে লেখা থাকে, কখনো থাকে গানের কথায়, কখনো নদী বদলের গল্পে, কখনো মানুষের মুখে মুখে। আব্দুল করিম তাই কেবল ইতিহাসবিদ নন; তিনি যেন হারিয়ে যাওয়া বাংলার আবিষ্কারক পথচিহ্ন।

তার গবেষণা-বইগুলোকে কয়েকটি শ্রেণিতে ভাগ করা যায়—জাতীয় ইতিহাস, আঞ্চলিক ইতিহাস, সামাজিক ইতিহাস, সাহিত্যবিষয়ক গবেষণা, মুদ্রাবিষয়ক গবেষণা, অনুবাদ/সম্পাদনা, আত্মজীবনী প্রভৃতি।

জাতীয় ইতিহাস : বাংলার ইতিহাস (১২০০-১৮৫৭), বাংলার ইতিহাস : সুলতানি আমল, বাংলার ইতিহাস : মোগল আমল, ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাস : মুসলমান আমল, ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিম শাসন, মুসলিম বাংলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য, Murshidkuli Khan and His Times প্রভৃতি।

সামাজিক ইতিহাস : বাংলার মুসলমানদের সামাজিক ইতিহাস।

আঞ্চলিক ইতিহাস : বাঁশখালির ইতিহাস ও ঐতিহ্য, ঢাকা দ্য মোগল ক্যাপিটাল, চট্টগ্রামে ইসলাম, দ্য রোহিঙ্গাস : এ শর্ট অ্যাকাউন্ট অব দেয়ার হিস্টোরি অ্যান্ড কালচার, কক্সবাজারের ইতিহাস, ঢাকাই মসলিন প্রভৃতি।

সাহিত্যবিষয়ক গবেষণা : বাংলা সাহিত্যের কালক্রমÑমধ্যযুগ, আরকান রাজসভায় বাঙ্গালা সাহিত্য (১৬০০-১৭০০ খ্রিষ্টাব্দ) প্রভৃতি।

মুদ্রাবিষয়ক গবেষণা : Corpus of the Muslim Coins of Bangal

অনুবাদ/সম্পাদনা : শরীয়তনামা, সুলতান ফীরূজশাহ তুঘলক বিরচিত, আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ : জীবন ও কর্ম প্রভৃতি।

আত্মজীবনী : সমাজ ও জীবন – প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড।

তার মোট গবেষণা গ্রন্থের সংখ্যা প্রায় চল্লিশটি। দেশি-বিদেশি জার্নালে প্রকাশিত গবেষণা প্রবন্ধও চল্লিশের বেশি।

বাঙালি মুসলমানের হজসাহিত্যের খতিয়ান

মিথ্যার যুগে সত্যের প্রতি একজন সাংবাদিক

রিসলি-বেভারলির তত্ত্বের সমালোচনা

বাঙালি মুসলমানের আকিদা

খোয়াজ খিজিরের কেরামতি

বাঙালি মুসলমানের শিকড়প্রশ্ন

মিরাজ রহমানের নতুন বই দ্য সিক্রেটস অব রিজিক অ্যান্ড বারাকাহ

কিশোর উপন্যাস তিফু সাবিবা : অটিজম ও মানবতার গল্প

বাঁকবদলের ক্রান্তিলগ্নে হাত বাড়িয়ে

বাংলার হারানো শহর খলিফাতাবাদ