বাংলায় মুসলমানদের উৎপত্তি-তত্ত্বের বিশ্লেষণ
খন্দকার ফজলে রাব্বির সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও তাৎপর্যপূর্ণ সমালোচনা ছিল রিসলির বাঙালি মুসলমানদের নৃতাত্ত্বিক পরিচয় সম্পর্কিত বয়ানের বিরুদ্ধে। রিসলির গ্রন্থের মূল্য স্বীকার করে তিনি বলেছেন, যে নাসিকামাত্রাকে রিসলি জাতিগত পার্থক্যের প্রধান সূচক ধরে নিয়েছেন, তা নির্ধারণের ক্ষেত্রে তিনি মুসলমানদের প্রতি বড় অবিচার করেছেন। কারণ হিন্দুদের পরিচয় নির্ধারণের ক্ষেত্রে তিনি তাদের সামাজিক সংগঠনের ক্রম অনুসারে বিন্যাস করেছেন। তিনি বিভিন্ন পেশা ও বর্ণ অনুযায়ী আলাদাভাবে তাদের পরিমাপ করেছেন এবং ফলাফল উপস্থাপন করেছেন। কিন্তু মুসলমানদের ক্ষেত্রে তিনি তাদের জাতি ও পেশার মধ্যে কোনো ভেদাভেদ করেননি। তিনি পুরো সম্প্রদায়কে সমষ্টিগতভাবে বিবেচনা করেছেন এবং তাদের গড় ফলাফল প্রকাশ করেছেন।
তিনি হিন্দুদের ১২টি বর্ণ ও পেশাগত গোষ্ঠীর জন্য আলাদা গড় নাসিকামাত্রা উল্লেখ করেছেন, অথচ মুসলমানদের ক্ষেত্রে ‘Musalmans’ শিরোনামের অধীনে সবাইকে একইভাবে বিচার করেছেন। খন্দকার রাব্বি বলেছেন, ‘প্রতিতুলনার ক্ষেত্রে সঠিক ফলাফল তখনই পাওয়া সম্ভব হবে, যখন একই পেশা বা একই সামাজিক অবস্থানের মানুষের শারীরিক বৈশিষ্ট্য অন্য জাতির একই ধরন ও স্তরের মানুষের সঙ্গে তুলনা করা হয়।’ রিসলির প্রতিবেদনে এই বিষয়টি অনুপস্থিত ছিল।
খন্দকার রাব্বি উল্লেখ করেছেন, রিসলি প্রদত্ত তথ্যগুলো যথাযথভাবে গ্রহণ করলেও হিন্দুদের জন্য উল্লিখিত ১২টি মানদণ্ডের গড় নির্ণয় করলে ফলাফল সম্পূর্ণরূপে বিপরীতমুখী হয়ে মুসলমানদের অনুকূলে চলে আসে।
আরো অধিক উদ্ঘাটনমূলক বিষয় ছিল রাব্বির সেই প্রকাশ যে, মুসলমানদের শারীরিক পরিমাপের জন্য রিসলি কীভাবে নমুনা নির্বাচন করেছিলেন, এ বিষয়ে খন্দকার রাব্বি চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেছেন। বইয়ে উল্লিখিত সাবজেক্টের নামগুলো দেখে সন্দেহ জাগে, শুধু মুসলমান সমাজের নিম্ন স্তরের (lowest orders) লোকদেরই তিনি গবেষণার জন্য নিরীক্ষা করেছেন। এই সন্দেহ নিরসনে তিনি এ বিষয় নিয়ে রিসলির গবেষণার সহযোগী হাসপাতাল সহকারী বাবু কমোদ বেহারি সামন্তের সঙ্গে কথা বলেন; বাংলার নৃতাত্ত্বিক পরিচয় নির্ণয়ের কাজ মূলত তার ওপরই ন্যস্ত ছিল।
সামন্ত তাকে জানান, তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো সম্ভ্রান্ত বা উচ্চবংশীয় মুসলমানের পরিমাপ নেননি; বরং কেবল নিম্নশ্রেণির মুসলমানদের শারীরিক গঠন নিরীক্ষা করেছিলেন। কারণ রিসলির স্পষ্ট নির্দেশ ছিল—পূর্ব বাংলার নিম্নশ্রেণির মুসলমানদের শারীরিক গঠনই কেবল পরিমাপ করতে হবে; যাদের শারীরিক বৈশিষ্ট্য স্বাভাবিক ও সুগঠিত, তাদের পরিমাপও নথিভুক্ত করা যাবে না। এ কারণে তিনি পূর্ব বাংলার কয়েকটি কারাগার পরিদর্শন করে সেখানে বন্দিদের নিরীক্ষা করেন এবং সেগুলো রিসলির কাছে পাঠিয়ে দেন। পরে সামন্তের পাঠানো নথির আলোকে রিসলি গবেষণাকর্ম সম্পাদন করেন।
কমোদ বাবুর ভাষ্য অনুযায়ী, রিসলির এই নির্দেশনার প্রকৃত কারণ তার কাছেও এক রহস্যপূর্ণ ছিল। এই পরিস্থিতিতে খন্দকার রাব্বি প্রশ্ন তুলেছেন—এ অবস্থায় মুসলমানদের সম্পর্কে রিসলির মতামত কীভাবে ন্যায়সংগত বা নিরপেক্ষ হতে পারে? (The Origin of the Musalmans of Bengal, খন্দকার ফজলে রাব্বি, পৃষ্ঠা: ৫০)
বেভারলি ও রিসলির ধারণার ত্রুটি ও অসংগতিগুলো তুলে ধরে রাব্বি জোর দিয়ে বলেছেন, ‘প্রায় ছয় শতাব্দী ধরে দেশটি মুসলিম শাসনের অধীনে থাকার কারণেই আজ এখানে এত বিপুলসংখ্যক মুসলমানের অস্তিত্ব দেখা যায়।’
তিনি যুক্তি দেন, মালদা জেলার মধ্যে গৌড়ের ধ্বংসাবশেষের অবস্থান এবং তার পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোয় মুসলমানদের তুলনামূলকভাবে বেশি সংখ্যায় পাওয়া যাওয়াও যুক্তিসংগতভাবে এই ধারণাকে শক্তিশালী করে যে, তারা সেই প্রাচীন মুসলিম রাজধানীতে বসবাসরত জনগোষ্ঠীর বংশধর।
মুসলিম বাংলার রাজধানী প্রথমে ছিল গৌড়ে। পরে তা স্থানান্তরিত হয় রাজমহলে; রাজমহল থেকে ঢাকায়; এবং ঢাকা থেকে মুর্শিদাবাদে। এসব জেলা ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে বিপুলসংখ্যক মুসলমানের উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। এখান থেকে ধারণা করা যায়, এদের অধিকাংশই কিংবা তাদের উল্লেখযোগ্য অংশ এই অঞ্চলে দীর্ঘদিন শাসন করা শাসকগোষ্ঠীর বংশধর। (The Origin of the Musalmans of Bengal, খন্দকার ফজলে রাব্বি, পৃষ্ঠা: ৩২-৩৩)
খন্দকার রাব্বি আলোচনার শেষে কিছু প্রাচীন মুসলিম পরিবারের বিবরণ এবং সে সময়ে তাদের পেশার কথা উল্লেখ করেন। এর পাশাপাশি তিনি বেভারলি ও রিসলির লেখায় মুসলমানদের প্রতি যে ‘অন্যায়’ করা হয়েছে, তা সংশোধনের জন্য শাসকদের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি শাসকদের অনুরোধ করেন, ‘আমাদের (বাংলার মুসলমানদের) উৎপত্তি ও বংশানুক্রম-সংক্রান্ত প্রশ্নটি ইতিহাসের আলোকে ভালোভাবে অনুসন্ধান ও তদন্ত করে দেখা হোক এবং তদন্তের ফলাফল অফিশিয়াল রেকর্ডে সংরক্ষণ করা হোক।’ (The Origin of the Musalmans of Bengal, খন্দকার ফজলে রাব্বি, পৃষ্ঠা: ৩৪)
সম্ভবত এই সমালোচনা এবং সে সময়ে উত্থাপিত আরো অন্যান্য আপত্তির কারণে ১৯০১ সালের আদমশুমারির সময় সরকার একটি পরিপত্র জারি করে। সেই পরিপত্রে বাংলার বিভিন্ন জেলার হিন্দু ও মুসলিম কর্মকর্তা এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিজ নিজ এলাকার জনগণের বংশগত উৎস ও চরিত্র সম্পর্কে মতামত দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
এই আহ্বানের পরিপ্রেক্ষিতে বহু মুসলিম কর্মকর্তা ও ব্যক্তিগত উদ্যোগে অনেক মানুষ আদমশুমারি কার্যক্রমের দায়িত্বে নিয়োজিত এইচ রিসলির কাছে এ বিষয়ে বেশ বিস্তৃত বিবরণসহ মতামত পাঠান। এসব মতামতের অধিকাংশই মূলত ফজলে রাব্বির বক্তব্যের সমার্থক ছিল। (Manuscripts European, E. 295/17; রিসলে সংগ্রহ, ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরি)। দুর্ভাগ্যবশত পরবর্তী সময়ে প্রকাশিত আদমশুমারির প্রতিবেদনে এসব মতামত অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। এছাড়া বেভারলি ও রিসলির মতামত খণ্ডন করে রচিত খন্দকার ফজলে রাব্বির গ্রন্থটি কোনো সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পায়নি। ফলে স্বাভাবিকভাবেই গ্রন্থটি তেমন প্রচার পায়নি এবং এতে উপস্থাপিত মতামত ও যুক্তিগুলো পরবর্তীকালে এই বিষয়ের গবেষকদের কাছে পৌঁছায়নি।
অন্তত ১৮৯৭ সালে প্রকাশিত টি ডব্লিউ আরনল্ডের ‘The Preaching of Islam’ গ্রন্থের ক্ষেত্রে এই ঘটনা ঘটেছিল। এই গ্রন্থে লেখক যখন বাংলায় ইসলামের বিস্তার নিয়ে আলোচনা করেন, তখন তিনি মূলত বেভারলি-রিসলি তত্ত্বেরই পুনরাবৃত্তি করেন। উইলিয়াম হান্টারের বই ও আদমশুমারির প্রতিবেদন ছিল তার রচিত গ্রন্থের প্রধান তথ্যসূত্র। (The Preaching of Islam, টি ডব্লিউ আরনল্ড, পৃষ্ঠা: ২৮০-২৮৩, ২৯১)
বাংলার মুসলমানদের উৎপত্তি সম্পর্কে বেভারলি-রিসলি তত্ত্ব স্পষ্টতই একপক্ষীয় ও একপেশে দৃষ্টিভঙ্গি। এই প্রসঙ্গে রাব্বির কাজটি যদিও বেভারলি-রিসলির মন্তব্যের বিপরীত দিকে অনেক বেশি ঝুঁকে পড়েছে, তবু এটি নিঃসন্দেহে একটি ভারসাম্য সাধনকারী উপাদান হিসেবে বিবেচিত হয়। প্রকৃতপক্ষে এত দীর্ঘ সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পরে এবং নির্ভরযোগ্য তথ্যের স্বল্পতার কারণে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন। তবুও সমসাময়িক ও নিকট-সমসাময়িক সূত্রে যেসব ক্ষেত্রে বহির্বিশ্ব থেকে মুসলমানদের বাংলায় অভিবাসন এবং স্থানীয় মানুষের ইসলামে ধর্মান্তরের উদাহরণ পাওয়া যায়, সেগুলো নিয়ে পর্যালোচনা করলে আশা করি সত্যের কাছাকাছি পৌঁছানো সম্ভব হবে।