দ্বিতীয় পর্ব
মন্বন্তর থেকে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত
১৭৭২ সালে ওয়ারেন হেস্টিংস বাংলায় ফোর্ট উইলিয়মের গভর্নর (১৭৭২-৭৪) নিযুক্ত হয়ে দেওয়ানি দায়িত্ব নিজ হাতে নেন। প্রথমেই তার চোখ যায় মুসলমানদের লাখেরাজ বা খাজনবিহীন জমির দিকে। তিনি হিসাব করেন, বাংলাদেশের প্রায় এক-চতুর্থাংশ লাখেরাজ জমির আয়ে মুসলমানদের শিক্ষাসহ বিভিন্ন দ্বীনি ও জনকল্যাণমূলক কাজ পরিচালিত হয়। তখন থেকেই ঔপনিবেশিক শাসকরা এসব জমি খাজনার আওতায় এনে কোম্পানির আয় বাড়ানোর এবং সেই সঙ্গে মুসলমানদের সাংস্কৃতিকভাবে আরো পঙ্গু করে দেওয়ার পরিকল্পনা করেন। এটি ছিল মুসলমানদের বিরুদ্ধে এক গুরুত্বপূর্ণ ফ্রন্টে এক ‘অঘোষিত যুদ্ধ’।
ওয়ারেন হেস্টিংস ১৭৭২ সাল থেকে পাঁচসালা ভূমি ইজারা বন্দোবস্ত চালু করেন। তখন তিনি পুরোনো জমিদারদের অনেকের জমিদারি নানা অজুহাতে কেড়ে নিয়ে সেগুলো ইংরেজদের সহযোগী বিশেষ শ্রেণির লোকদের কাছে নিলামে হস্তান্তর করেন। দুর্ভিক্ষের সময় অনাবাদি হওয়া বহু জমির মালিককে খাজনা আদায় না করার দায়ে কলকাতার ‘ঋণগ্রস্তদের কারাগারে’ আটক করে ১৭৭৩ সালে তাদের জমি নিলামে তোলা হয়। সেসব জমি কলকাতাকেন্দ্রিক তাদের সহযোগীর কাছে ইজারা দেওয়া হয়। এই লোকরা ইংরেজদের সব অপকর্মের সহযোগীরূপে হাজার রকম প্রতারণা-কৌশলের উদ্ভাবক ছিলেন। ছিয়াত্তরের মন্বন্তর সৃষ্টির পেছনে নির্দয় ও লোভী, চতুর ও শঠ এই লোকরা পরামর্শদাতা হিসেবে নিজেরাও বিপুল বিত্তের মালিক হয়েছিলেন।
ইংরেজরা বাংলার ভূমি ব্যবস্থাপনা থেকে পুরোনো অভিজ্ঞ জমিদারদের জমিদারদের হটিয়ে সে জায়গায় ভূমির সঙ্গে সম্পর্কহীন ও ভূমি ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে ধারণাহীন তাদের বশংবদদের ইজারাদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। ফলে বাংলার দুর্ভিক্ষক্লিষ্ট রায়তদের খাজনা পরিশোধের ভাগ্য সে যুগের সবচেয়ে লোভী ও নিষ্ঠুর লোকদের হাতে সোপর্দ হয়। তাদের চরম নিষ্ঠুর নিপীড়ন সইতে না পেরে বহু রায়ত ভিটেমাটি ছেড়ে পালিয়ে যান। কিছু লোক বিদ্রোহী দলে যোগ দেন।
১৭৭৭ সালে পাঁচসালা বন্দোবস্তের মেয়াদ শেষে কোর্ট অব ডিরেক্টরসের পরামর্শে হেস্টিংস ফের জমিদারদের সঙ্গে এক থেকে তিন বছর মেয়াদি বন্দোবস্ত করেন। ১৭৭৮-৭৯ সালে একসালা জমিদারি বন্দোবস্তের পরে ১০ বছর মেয়াদি জমিদারি বন্দোবস্ত হয়। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৭৬৫ থেকে ১৭৭৮ সাল পর্যন্ত খাজনা আদায় বাড়ানোর ধান্দায় ভূমি ব্যবস্থায় নানা পরিবর্তন এনে পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক করে তোলে। ১৭৮৬ সালের ১২ সেপ্টেম্বর কর্নওয়ালিসকে কিছু বিশেষ নির্দেশনা দিয়ে ফোর্ট উইলিয়মের গভর্নর জেনারেল করা হয়। তিনি ইংল্যান্ডের সামন্ততান্ত্রিক সার্ফপ্রথার ভূমিব্যবস্থার আদলে বাংলা, বিহার ও ওড়িশার ভূমিব্যবস্থা আমূল সংস্কারের প্রস্তাব করেন। তার ভয়ংকর ‘যুক্তি’ ছিল : ‘রায়তদের পুরোপুরি ক্রীতদাস না বানালে জমিদারের পক্ষে নিয়মিত সরকারি খাজনার কোটা অব্যাহত রাখা সম্ভব নয়।’
কর্নওয়ালিস তার মতের পক্ষে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন লাভ করেন। এরপর হেস্টিংসের সময়ের দশসালা বন্দোবস্তের জমিদারদের চিরস্থায়ী জমিদার হিসেবে ঘোষণা করেন। এই বন্দোবস্তে অপরিবর্তনীয় পূর্বনির্ধারিত হারে রাজস্ব আদায়ের শর্তে জমিদারদের বিনামূল্যে জমির মালিকানাস্বত্ব দেওয়া হয়। তাদের জমিদারির এই মালিকানাস্বত্ব পুরুষানুক্রমে ভোগ-ব্যবহার-হস্তান্তর-বন্ধকীকরণের অধিকার দেওয়া হয়।
এই নতুন চিরস্থায়ী জমিদারি বন্দোবস্তের মাধ্যমে জমিদারদের পুরুষানুক্রমে জমিদারির মালিকানা দিয়ে ভবিষ্যৎ নিশ্চিত আরামদায়ক জীবনের নিশ্চয়তা দিয়ে জমির প্রকৃত মালিক রায়তদের জমির মালিকানা হরণ করে তাদের কার্যত ভূমিদাসে পরিণত করা হয়। ১৭৯৩ সালের ২২ মার্চ থেকে এই নতুন বন্দোবস্ত কার্যকর হয়। এই নতুন ভূমিব্যবস্থা ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’ নামে পরিচিত হয়। কর্নওয়ালিস ১৭৯৩ সালের মার্চে এই পরিবর্তন চূড়ান্ত করে অক্টোবরে গভর্নর জেনারেল হিসেবে তার দায়িত্ব শেষ করেন।
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাংলায় শাসন কায়েমের ভিত্তি ছিল ষড়যন্ত্র ও প্রতারণা। ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’ও তেমনি এক শঠতা ও বিশ্বাসভঙ্গের নজির। ব্রিটিশ সরকারের সিভিল সার্ভেন্ট উইলিয়াম হান্টার চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত চালুর প্রায় ১০০ বছর পর ১৮৭০-৭১ সালে চিরস্থায়ী ভূমি বন্দোবস্তকে ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ হিসেবে অভিহিত করে লেখেন : ‘বাংলায় ইংরেজদের কর্তৃত্ব কায়েম হয় দিল্লির বাদশাহর প্রধান রাজস্ব অফিসারের দায়িত্ব লাভের মাধ্যমে। মোটা অঙ্কের ঘুসের বিনিময়ে আর তলোয়ারের জোরে কেনা এই নিয়োগে আমাদের পদের নাম ছিল বাদশাহর দেওয়ান বা প্রধান রাজস্ব অফিসার। এ কারণে মুসলমানরা মনে করেন, তাদের প্রবর্তিত বিধিব্যবস্থাগুলো যথাযথভাবে মানতে আমরা বাধ্য। কারণ ওই বিধিব্যবস্থার অধীনেই আমরা প্রশাসনের দায়িত্ব পেয়েছিলাম। আমি মনে করি, চুক্তি রচনার সময় উভয় পক্ষ এটাই বুঝেছিল। এ সম্পর্কে সংশয়ের অবকাশ খুবই কম...। পুরোনো ব্যবস্থার ওপর আমরা প্রচণ্ড আঘাত হেনেছি, যা বোধ করি বিশ্বাসঘাতকতার পর্যায়েই পড়ে। লর্ড কর্নওয়ালিস এবং জন শোর এক-গাদা সংস্কারের কাজ করেন। এসবের পরিণাম ইংরেজ বা মুসলমান কেউই তখন বুঝতে পারেননি। ১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মধ্য দিয়ে সেসব সংস্কারের চূড়ান্ত পরিণতি ঘটে।’
কেন এই চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত
চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের জমিদারি ব্যবস্থার পক্ষে কর্নওয়ালিসের এই মনোভাবের মধ্য দিয়ে এ দেশের জনগণের প্রতি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির খ্রিষ্টান বণিকদের মনোভাবের স্বচ্ছ প্রতিফলন ঘটে। চিরস্থায়ী নতুন জমিদারি বন্দোবস্তের পক্ষে কর্নওয়ালিসের ঘোষিত একটি উদ্দেশ্যের বাইরেও আরো বেশ কয়েকটি কারণ সহজেই চিহ্নিত করা যায়Ñ
ক. রায়তদের পুরোপুরি ক্রীতদাস বানানো : কর্নওয়ালিসের নিজের জবানি অনুযায়ী চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের প্রধান লক্ষ্য ছিল নিয়মিত খাজনা আদায়ের কোটা নিশ্চিত করতে ‘রায়তদের পুরোপুরি ক্রীতদাস বানানো’। সে বিবেচনায় নিয়মিত সরকারি খাজনার কোটা অব্যাহত রাখা এই চিরস্থায়ী জমিদারি বন্দোবস্তের প্রধান লক্ষ্য ছিল বলা যায়।
খ. ঔপনিবেশিক শাসনের স্থায়ী সমর্থক দল তৈরি : ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ইংরেজরা বিশ্বাসভঙ্গ, ষড়যন্ত্র ও প্রতারণার মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের পর তা স্থায়ী করার ব্যাপারে শুরু থেকেই বিভিন্ন সামরিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পদক্ষেপ নেয়। এ জন্য ইংরেজ তথাকথিত প্রাচ্যবাদী পণ্ডিতদের আমদানি করে ইতিহাসের সাম্রাজ্যবাদী বয়ান খাড়া করতে কলকাতায় এশিয়াটিক সোসাইটি গঠন, খ্রিষ্টান পাদরি ও নবদ্বীপকেন্দ্রিক আর্যবর্ণহিন্দু সংস্কৃতি পণ্ডিতদের দিয়ে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের মাধ্যমে পাদরি উইলিয়াম কেরির নেতৃত্বে মুসলমানদের জবানের ভাষা পরিবর্তনের ব্যাপক আয়োজন, সেই ধারায় শিক্ষাব্যবস্থা পরিবর্তনের পরিকল্পনা গ্রহণের পাশাপাশি মুসলমানদের আর্থিক মেরুদণ্ড গুঁড়িয়ে দেওয়ার নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়। এসব পদক্ষেপের অংশ হিসেবে মুসলমানদের আর্থিক সামর্থ্য ধ্বংস করে তাদের ওপর ইংরেজদের সহযোগী ও বশংবদ জমিদারি পত্তন করার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য বাঙালি বর্ণহিন্দু সহযোগী দালালশ্রেণির লোকদের ‘লাভজনক ভূসম্পত্তি নিশ্চিন্তে ও সুখে-শান্তিতে ভোগ করার’ সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা দিয়ে একটি নতুন জমিদারি বন্দোবস্ত চালু করা হয়, যাতে এই জমিদাররা নিজেদের কায়েমি স্বার্থেই ঔপনিবেশিক শাসন টিকিয়ে রাখার জন্য সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা করবেন। কর্নওয়ালিস এ প্রসঙ্গে বলেন : ‘আমাদের নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্যই ভূস্বামীদের আমাদের সহযোগী করে নিতে হবে। যে ভূস্বামী একটি লাভজনক ভূসম্পত্তি নিশ্চিন্তে ও সুখে-শান্তিতে ভোগ করতে পারে, তার মনে তার কোনোরূপ পরিবর্তনের ইচ্ছা জাগতেই পারে না।’
গ. জনবিদ্রোহ দমনের জন্য ‘চিরস্থায়ী ঢাল’ : বিশেষ শ্রেণির হিন্দুদের সহযোগিতায় মুসলিম শাসনের পতন ঘটানোর কারণে তারা সবসময় মুসলমানদের বিদ্রোহের ব্যাপারে শঙ্কিত ছিলেন। আঠারো শতকে শাসক ও জনগণের সংযোগ দুর্বল থাকায় পলাশীর যুদ্ধকে জনগণ এটাকে রাজায় রাজায় যুদ্ধ ভেবে এর সঙ্গে নিজেদের সংশ্লিষ্ট ভাবেননি। তবে আসল অবস্থা স্পষ্ট হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের মধ্যে প্রতিরোধ চেতনা জেগেছে। মীর কাসিম নবাবি মসনদের লোভ ছেড়ে যখন বিভিন্ন রণাঙ্গনে ইংরেজদের মোকাবিলা করছেন, ঠিক তখন ১৭৬৩ সালে ফকির মজনু শাহ মাত্র হাজারখানেক লোক নিয়ে জনবিদ্রোহের সূচনা করেন। ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের সময় তার অনুসারীর সংখ্যা চল্লিশ হাজারে দাঁড়ায়। সারা বাংলায় জনবিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে। ইংরেজদের কুঠি ও জমিদারদের কাচারিতে হামলা হয়। ইংরেজ বাহিনী মজনু শাহর বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে নানা জায়গায় নাকাল হয়। কোথাও জমিদাররা এলাকা ছেড়ে পালিয়ে বাঁচেন। ফকির মজনু শাহর ফকির বিদ্রোহ চলাকালেই শমশের গাজী, আবু তোরাব, মিয়াজান কাজীসহ নেতৃস্থানীয় বহু মুসলমানের নেতৃত্বে বাংলায় একের পর কৃষক-জনতার বিদ্রোহ ঘটে। এতে ঔপনিবেশিক ইংরেজরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন।
পলাশীর প্রহসনের পরপরই কর্নেল ক্লাইভ মুসলিম সমাজের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে কোর্ট অব ডিরেক্টরকে লিখেছিলেন : ‘মুসলমানরা সবসময়ই বিদ্রোহের জন্য প্রস্তুত। সাফল্যের বিন্দুমাত্র সম্ভাবনা আছে জানলেই তারা সঙ্গে সঙ্গে বিদ্রোহ সংঘটিত করবে।’ এরপর ক্লাইভ ১৭৬৮ সালে ওয়ারেন হেস্টিংসকে লেখা একটি চিঠিতে বাংলায় ঔপনিবেশিক শাসনের জন্য মুসলমানদের দিক থেকে বিপদ সম্পর্কে তার আশঙ্কার কথা জানিয়ে লেখেন : ‘এটা আপনি ধ্রুব সত্য বলে গ্রহণ করতে পারেন যে, আমাদের কাছ থেকে সহৃদয় ব্যবহার পেলেও মুসলমানরা কখনো আমাদের প্রতি তাদের মনোভাব পরিবর্তন করবেন না। তাদের নিজেদের বিপদের আশঙ্কাই শুধু তাদের চুক্তি বজায় রাখতে বাধ্য করতে পারে।’
মুসলমানদের বিরুদ্ধে ইউরোপীয় খ্রিষ্টানদের ৩০০ বছরের ক্রুসেডের পটভূমিতে বাংলায় ইংরেজ বণিকদের হিন্দুপ্রতি ও মুসলিমভীতি বা মুসলিম বৈরিতার ব্যাপারটি তাদের সব পরিকল্পনা ও কৌশল পুরো ঔপনিবেশিক আমলজুড়েই বিদ্যমান ছিল। আঠারো ও উনিশ শতকে এই মানসিকতার প্রভাব বেশি প্রকট ছিল। ১৮১৩ সালে সিলেক্ট কমিটির সামনে প্রদত্ত স্যার জন ম্যালকমের বক্তব্যেও সাধারণভাবে এর প্রতিফলন ঘটে। তিনি বলেন : ‘আমাদের প্রতি হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকদের অনুরক্তি আমাদের ভারত সাম্রাজ্যের নিরাপত্তার প্রধান উৎস।’ এ সম্পর্কে ক্যাপ্টেন টি মাকানের বক্তব্যেও কোনো ফারাক নেই। তিনি বলেছেন : ‘যদি মুসলমানরা এরূপ সামান্যতম আশাও দেখতে পায় যে, অন্য কোনো ইউরোপীয় শক্তির সঙ্গে যোগ দিলে তারা আমাদের দাসত্ব থেকে মুক্তি পাবে, তাহলে তারা সেই সুযোগ গ্রহণ করতে ইতস্তত করবে না। মুসলমানদের চেয়ে হিন্দুরা ব্রিটিশ শাসনের প্রতি অধিকতর বিশ্বস্ত।’ মুদ্রার অপর পিঠেও সে সুরের প্রতিধ্বনি করে কর্নেল টমাস মনরো বলেছেন : ‘যত দিন হিন্দু জনসাধারণ ব্রিটিশ শাসনের প্রতি অনুরক্ত থাকবে, তত দিন মুসলমানরা অসন্তুষ্ট থেকেও কোম্পানির সরকারের বিরুদ্ধে কিছু করতে পারবে না।’ আরো পরে ১৮৪৩ সালে লর্ড এলেনবারো লিখেছেন : ‘আমার দৃঢ় বিশ্বাস, মুসলমানরা আমাদের প্রতি দুশমনভাবাপন্ন। আর হিন্দুদের আস্থা অর্জন করা আমাদের শাসননীতির লক্ষ্য।’
সুপ্রকাশ রায় লিখেছেন : পুরো উনিশ শতক ধরে বাংলার কৃষক যখন প্রাণপণে ঔপনিবেশিক শাসন ও জমিদারি শোষণ-পীড়নের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে অকাতরে প্রাণ বিসর্জন দেন, সেই পুরো সময় এই জমিদারশ্রেণি ও তাদের আশ্রিত বর্ণ হিন্দু অন্যান্য শ্রেণির লোকরা বিদেশি ইংরেজ খ্রিষ্টানদের ঔপনিবেশিক শাসন টিকিয়ে রাখতে ধনবল ও জনবল নিয়ে সংগ্রামরত কৃষকদের বিপক্ষে দাঁড়ায়।
ঘ. বাংলাকে ইংল্যান্ডের পণ্যের স্থায়ী বাজার বানানো : ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সমসাময়িক বিশ্বের অন্যতম শিল্পোন্নত বাংলার শিল্পের কারিগরদের ধ্বংসের মাধ্যমে এই জনপদের শিল্প-কারখানার বিনাশ ঘটায়। বাংলাকে ইংল্যান্ডের শিল্পের কাঁচামালের স্বল্পমূল্যের জোগানদার খামারÑবাজার এবং ইংল্যান্ডের কারখানার পণ্য বেশি দামে বিক্রির বাজারে পরিণত পরিকল্পনা করেছিল। এ সময় ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের সময়ে অজস্র কাঁচা টাকা কামিয়ে নব্য ধনী হয়ে ওঠা তাদের তাঁবেদার কলকাতাকেন্দ্রিক বাঙালি বর্ণহিন্দু শ্রেণিটির কিছু লোক শিল্পপতি হওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিলেন। ইংরেজরা তাদের এই খায়েশ দমন করতে তাদের জমানো বেশুমার কাঁচা নগদ টাকায় চিরস্থায়ী জমিদারি স্বত্ব কিনতে প্রলুব্ধ করেন। কর্নওয়ালিসের হিসাব ছিল : এই সহযোগী শ্রেণির লোকরা জমিদারি কিনে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে অনায়াসে অলস, বিলাসী, ব্যভিচারী, অনাচারী-অত্যাচারী পরগাছার জীবনে অভ্যস্ত হয়ে বিদেশি শাসনের সোনার শিকল গলায় পরে মামলা-মোকদ্দমা-কাইজ্যায় জড়িয়ে সময় গুজরান করবে। আর নিজেদের শ্রেণিস্বার্থে ব্রিটিশদের অনুগত ঢাল-তলোয়ার হয়ে জনগণের বিক্ষোভ-বিদ্রোহ দমনে কাজ করবেন। কর্নওয়ালিস ১৭৯৩ খ্রিষ্টাব্দের ৬ মার্চ লন্ডনে ডিরেক্টর বোর্ডকে লেখা চিঠিতে তাদের এই পরিকল্পনার বিষয়ে বলেনÑবেশ কিছু নেটিভের হাতে বিপুল পরিমাণে মূলধন জমেছে। জমিদারির (চিরস্থায়ী) বন্দোবস্ত নিশ্চিত করলে শিগগিরই তারা সে সঞ্চিত অর্থ জমিদারিতে বিনিয়োগ করবে।
বেনিয়ানি-দেওয়ানি করে যারা অর্থ উপার্জন করেছিলেন তাদের মধ্যে কিছু লোক শিল্প স্থাপনের চেষ্টা করেন। তাদের মধ্যে দ্বারকানাথ ঠাকুর ও মতিলাল শীলের মতো দু-একজন নামকরা লোকও ছিলেন। কিন্তু তাদের এমন ইচ্ছা ঔপনিবেশিকদের স্বার্থের সঙ্গে খাপ খায়নি। ইংরেজরা কৃষক-প্রজাদের রক্তচোষা এই নব্য ধনীদের পিঠ চাপড়ে দিয়ে ‘রাজা-মহারাজা’ ও ‘ব্ল্যাক জেমিন্দার’ হওয়ার জন্য জমিতে অর্থ বিনিয়োগের পরামর্শ দেন। সেই মুগ্ধতা ও চিত্তচাঞ্চল্য নিয়ে তারা তাদের অবৈধ নগদ কামাইয়ের মোটা অংশ ইংরেজদের পকেটে জমা দিয়ে নতুন নতুন জমিদারি কেনেন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মচারীদের তাঁবেদারি ছেড়ে স্বাধীন শিল্পপতি না হয়ে তারা তাঁবেদারিতে চ্যাম্পিয়নশিপের প্রতিযোগিতায় লেগে থাকেন।