২০২৪ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশের বুকে স্বৈরাচার যখন তার সব মুখোশ খুলে ফেলে সর্বশক্তি নিয়ে নিরস্ত্র জনগণের ওপর ঝাঁপায়া পড়ে হাজার হাজার মায়ের বুক খালি করে, অগণিত মানুষকে চিরতরে অন্ধ বানায়া দেয়, পঙ্গু বানায় অসংখ্য মানুষকে, নির্বিচারে বিনা অপরাধে হাজার হাজার মানুষকে জেলে ভরে, তখনো জাতির বিবেক বলে পরিচিত শিল্পী-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবীরা ফ্যাসিবাদের গোলামিতে ব্যস্ত। সেই সময় হাতে গোনা কিছু কবি-সাহিত্যিক জনগণের পক্ষে এবং স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে নিজের জান বাজি রাইখা কলম ধরছেন, যাদের অন্যতম হাসান রোবায়েত।
অন্যদের থেকে এই কবি আলাদা এই জায়গায় যে বেশিরভাগ কবি-সাহিত্যিক বিবেকের টানে কেবল গণ-অভ্যুত্থানের সময়ে তাদের কলম ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে কাজে লাগাইছেন, আর হাসান রোবায়েত সেই ২০১৮ সাল থেকেই নিজের জান হাতের মুঠোয় নিয়া পৃথিবীর নিকৃষ্ট স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে লড়াই করে যাচ্ছেন। অন্যদের কাছে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান হঠাৎ পাওয়া ফল, কিন্তু হাসান রোবায়েতের কবিতা বলে, এই বিপ্লব কবির দীর্ঘদিনের স্বপ্ন। অর্ধযুগের প্রস্তুতি নিয়া কবি বইসা আছেন—কবে তার জনগণ রাস্তায় নামবে। অবশেষে এত পরে যখন জনগণ ‘শাহাদাতের আগুনে খুনির আরশ পোড়াইতে’ রাস্তায় নামল, তখন বাঁধনহারা কবির কলমেও আগুনের ফুলকি ছুটতে শুরু করল। সৃষ্টি সুখের উল্লাসে একের পর এক বারুদমাখা স্লোগান মুখে মিছিলে ইমামের দায়িত্ব পালন করলেন।
১৫ জুলাই লিখলেন : আমরা কথা বলি কেননা নীরবতা ফ্যাসিস্টের ভাষা। পয়লা আগস্ট ২০২৪ : এক হইছে সারা দেশ/ খুনি চোদার টাইম শেষ। দোসরা আগস্ট ২০২৪ : সারা বাংলার ঢাকায় চোখ/ স্বৈরাচারীর পতন হোক। আর করিস না ঘোঁত ঘোঁত/ স্বৈরাচারী মাদারচোদ। তেসরা আগস্ট ২০২৪ : গণভবন দখল কর/ ওইটা এখন খুনির ঘর। জনগণের গণভবন/ বুইঝা নেয়ার টাইম এখন। চৌঠা আগস্ট ২০২৪ : এই জনতা রোধে কে? / ছাত্রলীগকে চোদে কে? এই জনতার গণঠাপে/ শেখ হাসিনার আরশ কাঁপে। পাঁচই আগস্ট লিখলেন : যদি আবরাহা কাছে আসে/ তবে কাবার বিজয়ও খুব দূরে নয়।
এই সময়ে লিখলেন জুলাইয়ের কবিতা সিঁথি। পরে ক্লাস সেভেনের পাঠপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত হয় এইই মহাকাব্যিক কবিতা। আমরা কয়েকটা চুম্বক লাইন পড়ি চলেন—
ভাই মরল রংপুরে সেই/ রংপুরই তো বাংলাদেশ/ নুসরাতেরা আগুন দিল/ দোজখ যেন ছড়ায় কেশ।
কওমি তরুণ দাঁড়ায়া ছিল/ কারবালারই ফোরাতে/ শাহাদাতের আগুন দিয়া/ খুনির আরশ পোড়াতে।
খোদার আরশ কাঁইপা ওঠে / শুইনা বাপের হাহাকার / ‘একটা মানুষ মারার জন্যে / কয়টা গুলি লাগে ছার?’
খুনি এখন ঘুমাইতেছে / দিল্লি নামের স্বর্গতে / মা কান্দে পুতের খোঁজে / মর্গ থেইকা মর্গতে
গুম হইছে কত মানুষ / শহীদ কত মায়ের পুত / রক্ত দিয়া ওজু কইরা / পড়ত খুনি তাহাজ্জুদ।
তোমরা হয়তো যাইবা ভুলে/ খুনি হাসিনার ইতিহাস / সেই মায়ে রাখব মনে / যে ছুঁইছে পোলার লাশ।
বাংলাদেশের আপামর জনতা হাজার হাজার ‘নিশ্বাস নেয়, অথচ মরা’ কবির ভিড়ে একজন জিন্দা কবির সন্ধান পাইল। লাখ লাখ মানুষের মুখে এখন হাসান রোবায়েতের কবিতা। কাজী নজরুল ইসলামের পরে হাসান রোবায়েতই সেই কবি যার কবিতা দ্রোহে মিছিলে প্রতিবাদে কণ্ঠে তুলে নেওয়া গেল।
গণ-অভ্যুত্থানের সময় ভাইরাল হওয়া স্লোগান বা ক্লাস সেভেনের পাঠ্যবইয়ে সিঁথি কবিতা দিয়া হাসান রোবায়েতকে চেনা বা বিচার করা অন্যায় হবে। আমি নিজের কথা বলতে পারি। দীর্ঘদিন ধরে হাসান রোবায়েতকে চিনতাম। কিন্তু আর সবার মতো জুলাইয়ের নিদানকালে তিনি আমার কাছেও আপন ওঠেন। এর আগে উনার খুব বেশি কবিতা আমার পড়া হয় নাই।
গণ-অভ্যুত্থান সফল হওয়ার পরে কবির সঙ্গে যোগাযোগ ঘটল এবং উনার ১২টা কবিতার বই হাতে পাইলাম। সবগুলা বই পড়ার পরে নিজেকে অপরাধী মনে হইল। নিজেও একজন লেখক হিসাবে সময়ের এত বড় একজন কবিকে আমি চিনতে পারি নাই, পড়ি নাই, ইগনোর করে গেছি, এইটা অন্যায়।
বিষয়বস্তুর নিরিখে হাসান রোবায়েত অত্যন্ত সমৃদ্ধ কবি। তার কবিতার শক্তিমত্তা কেবল শৈল্পিক কারুকাজে নয়, শুধু ছন্দেও নয়, বরং বিষয়বস্তুর সাহসিকতা এবং আবেগের সততায়। তার কবিতায় কী নাই? আত্মপরিচয়, মানবিক সম্পর্ক, প্রেম, কাম, বিরহ, হিংসা, ঘৃণা, আত্মহত্যা, ভাষা রাজনীতি, রাষ্ট্র, রাষ্ট্রীয় জুলুম, গুম, ক্রসফায়ার, লোকাল ফ্যাসিবাদ, গ্লোবাল ফ্যাসিবাদ, সীমান্ত রাজনীতি, ভারতীয় আধিপত্যবাদ, সাম্রাজ্যবাদ, ফিলিস্তিন, পাহাড়ে সেনাশাসন, নদীশাসন, ইসলামি অনুষঙ্গ, কওমি মাদরাসা, জ্যোতির্বিদ্যা, উদ্ভিদবিদ্যা, ভাষাবিদ্যা, হস্তাক্ষরবিদ্যা, ইতিহাস, সংগীত—এইরকম অসংখ্য বিষয় ধরা পড়ছে। এত বিচিত্র সব বিষয়ে এত কবিতা লিখছেন রোবায়েত—সত্যিই বিস্ময়কর।
সাধারণত আধুনিক এবং উত্তরাধুনিক কবিরা নিজেদের ধর্ম থেকে আলাদা বা ‘নাস্তিক্যের’ আবরণে ঢাইকা রাখতে পছন্দ করেন। কিন্তু রোবায়েত এখানে একদম ব্যতিক্রম। উনি আল্লার কাছে গুনাহগার বান্দা হিসাবে হাজির হন। নিজের ধর্ম পালনে উদাসীনতা অপারগতা থাকলেও, আল্লাহ আর তার নবীর প্রতি হাসান রোবায়েতের টান লক্ষ করা যায়। তার কবিতায় বেশিরভাগ সময় অস্থিরতা, হতাশা, বিমর্ষতা, অর্থহীনতা ভয়ানকভাবে হাজির হইলেও আল্লার প্রতি ঈমানও দেখা যায়। সরাসরি কোরানের আয়াতেই সান্ত্বনা খোঁজেন কবি—ফাইন্না মাআল উসরি ইউসরা। কষ্টের পরেই আছে স্বস্তি।
কবিতার দিকে খেয়াল করলে, শুরুর দিকে হাসান রোবায়েত আত্মকেন্দ্রিক কবি বলেই মনে হইছে। তখন তার কবিতায় হতাশা, অস্থিরতা, বিমর্ষতা, আত্মহত্যাপ্রবণতা দেখা যাইত। সময়ের সঙ্গে নিজেকে মানায়া নিতে পারছেন কবি। জাতির প্রয়োজনের সময় নিজের প্রতিভা কাজে লাগাইতে পারছেন। কবিতা হয়ে উঠছে অস্ত্র। তখন আর সে একা নয়। হক্কুল ইবাদাত আদায় শুরু করছেন কবিতা দিয়া।
হাসান রোবায়েতের কবিসত্তার জন্ম ও বাইড়া ওঠা হাসিনার ফ্যাসিবাদের ভেতর। কবি এই ফ্যাসিবাদ নিয়া চুপ কইরা থাকেন নাই। ২০১৮ সালেই আস্ত একটা বই লিইখা প্রতিবাদ জানাইছেন। বইয়ের নামও রাখছেন সাহস কইরা, এমন ঘনঘোর ফ্যাসিবাদে। সময়টা খেয়াল করার মতো। ২০১৮ সাল। ফ্যাসিবাদের বাম্পার ফলন। অথচ জনগণ তো বটেই সময়ের আগে চলা কবিরাও বুঝতে পারে নাই। তারা তখন স্বৈরাচারের পা চাটতে ব্যস্ত, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালির সুযোগ্য কন্যার শাসনের মুগ্ধ হয়ে জননী বলে জয়ধ্বনি করতেছিল।
অন্যদিকে হাসান রোবায়েত বেঁকে বসলেন, সময়কে চিনতে বিন্দু মাত্র ভুল করলেন না, বিদ্রোহ কইরা বসলেন ‘ফ্যাসিস্ট’ ঘোষণা দিয়া।
আসেন আঠারো সাল নামের কবিতাটা পড়ি—
ফ্যাসিবাদের দিনরাত্রি/ কোমর তোলে সাপ/ দিনাজপুরের লেবুর ঘ্রাণে/ অংশত সয়লাব/ দেখার কিছু ছিলই নাতো/ গুজব ছিল ঘাঁ/ রক্তঘুমে জিভ দেখালো/ মুসোলিনির মা—/ আঠারো কি সাল-ই শুধু/ হিংসা ঝরা বন/ সারা হাওয়ায় উড়ছে ধু-ধু/ অজস্র অ্যাপ্রোন।
ফ্যাসিস্ট নামে একটা কবিতা পড়ি, একই বইয়ের : চাঁদের বুড়ি ঘুম হয়েছে/ লাশ ভাসছে জলে/অন্ধকারের পিণ্ড নাচে/ ঢেউয়ের অঞ্চলে।/ কেউ দেখে নি শোনে নি কেউ/ আঠারো এই সাল/ প্রতিবেশীর ছাগল এসে/ খেয়েছে দুই গাল।/ আমরা সবাই কবর খুঁড়ি/ নিজের আঙিনায়/ চাঁদের বুড়ির দাফন হবে/ যাচ্ছি জানাজায়।/ নদীর পানি ছলাৎছলে/ হিংসাতে উন্মুখ/ চাঁদের ভেতর ফ্যাসিস্ট মোছে/ দুইনলা বন্দুক।
আমার পাঠে মনে হইছে, হাসান রোবায়েতের শক্তির জায়গা, সে কোনো আদর্শের কাছে নিজের মেরুদণ্ড বন্ধক রাখে নাই। মামুলি দেশপ্রেমের গোলামও না সে। দেশের অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতির প্রতি হতাশার চূড়ান্ত প্রকাশ হিসাবে তীব্র বেদনাবোধ থেকে উচ্চারণ করেন, ‘এই দেশেতে জন্ম যেন বৈদেশেতে মরি।’
অনায়াসে পাহাড়ে সামরিক শাসন, তনু হত্যা, কল্পনা চাকমার প্রসঙ্গ আনতে পারেন। ফলে দেশপ্রেম থাকলেও অন্ধ জাতীয়তাবাদের খরিদ্দার না হাসান রোবায়েত। সবসময় অন্যায়ের বিপক্ষে প্রতিবাদ করতে প্রস্তুত।
কবির কবিতায় ডার্ক হিউমারের উপস্থিতি খেয়াল করার মতো। ‘জান ফুরালো মান ফুরালো বাঁচার উপায় কী!/ বর্গি না মা খুন করে যায় ডাইনিপাড়ার ঝি’—ধারণা করি কবি এইখানে হাসিনাকেই ইঙ্গিত করছেন। তাকে পুরাপুরি ডাইনির মর্যাদাও দেন নাই। ডাইনিপাড়ার চাকরানি বানায়া দিছেন। এইখানে হাস্যরস সৃষ্টি করছেন তা ভীতিকরভাবে অসাধারণ।
ভারতীয় আধিপত্যের ন্যাংটা থাবায় এবং তাদেরই গোলাম সরকারের যৌথ চেষ্টায় বাংলাদেশি শিল্পসাহিত্য এখন নিষ্প্রাণ, অন্তঃসারশূন্য। বাংলাদেশি মুসলমানদের কালচারাল রিপ্রেজেন্টেশন আর ধরা পড়ে না বললেই চলে। তারা কী চায়, কী ভালোবাসে, কী ঘেন্না করে, কী নিয়া হাসাহাসি করে, কী তাদের কষ্ট দেয়, তাদের দুঃখ কীসে—এই জিনিসটা যদি একটা দেশের শিল্প-সাহিত্যে ধরা না পড়ে, তাইলে জনগণই বা সেইসব শিল্পী-সাহিত্যিকদের আপন কইরা নিবে? এই জায়গায় হাসান রোবায়েত ব্যতিক্রম নাম। কবি প্রো-পিপল হইতে পারছেন। তার কবিতায় বাংলাদেশের ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে সব শ্রেণির মানুষের উপস্থিতি আছে বইলাই মানুষ তারে গ্রহণ করতেছে।
সময় যতই যাচ্ছে হাসান রোবায়েত জনগণের আরো কাছাকাছি হইতেছেন। উনার সাম্প্রতিক কবিতায় জনগণের মুখের ভাষা ধরা পড়তেছে। এই দেশে যদি সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজরা না আসত, তাইলে বাংলা ভাষা কেমন থাকত, বাংলা কবিতা কেমন হইতো, তার যেন একটা ছবি দেখা যায় হাসান রোবায়েতের সাম্প্রতিক কবিতাগুলিতে এবং ভালোভাবে সেই জিনিস ধরা পড়ছে তার কবিতার বই ছায়াকারবালায়। অধিকাংশ মানুষের মুখের ভাষা হওয়া সত্ত্বেও ইংরেজ কলোনাইজার আর কলকাতার বর্ণহিন্দু যতটুকু ছাটাই করছে, কবি তার প্রথম বইয়ের প্রথম কবিতাতেই সৎমায়ের আচরণ হিসাবে চিহ্নিত করছেন এবং সেই আদি এবং আসল বাংলা ভাষা, যা এই দেশের মানুষের ভাষা ছিল, ফিরায়া আনতে চেষ্টা করতেছেন হাসান রোবায়েত।
হাসান রোবায়েত অত্যন্ত প্রগতিশীল কবি। তার কল্পনাশক্তি অতুলনীয়। তার কাব্যসাহস দুর্দান্ত। শুরু থেকেই বিদ্রোহী। তবে বিদ্রোহী কবিতা বলতেই আমাদের কবি কাজী নজরুল ইসলামের কথা মনে পড়ে। রোবায়েত আর নজরুল একই সময়ের কবি না। নজরুল বিদ্রোহ করছেন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে। রোবায়েত বিদ্রোহ করে বসেন দেশি, বিদেশি, ভাষা, কালচারাল পলিটিকস, সিস্টেম, ন্যারেটিভ—সবকিছুর বিরুদ্ধে। তাই তাদের বিদ্রোহের ধরনও এক না। ভাষাও এক না। তাদের মিলাইতে চাওয়াও ঠিক না।
ছায়াকারবালা কাব্যগ্রন্থে ধর্ম, মিথ, পুরাণ—সব একাকার করে ফেলছেন কবি। ভেঙে ফেলছেন সময়ের কাঠামো। অনায়াসে হোসেন আর কৃষ্ণকে পাশাপাশি আনতে পারেন। যশোদা আর ফাতেমাকে রাখতে পারেন একই কাতারে। কৃষ্ণকে তিস্তার পাড়ে শহীদ দেখাইতে পারেন। রাধাকে বন্দি দেখাইতে পারেন। চাঁদ সওদারগরকে ক্রসফায়ারে নিহত দেখাইতে পারেন। স্বৈরাচার হাসিনাকে ফেরাউনের সঙ্গে তুলনা করতে পারেন। হোসাইন ও ফেলানীকে ভাইবোন কল্পনা করতে পারেন। দুইজনেই এজিদদের হাতে নির্যাতিত ও নিহত।
বাংলাদেশ আর তার মানুষ যে ভালো নাই, অন্যায়ে নীরব থাকে, এইটাও কবির অসহ্য। তার দুঃখ ব্যঙ্গে তেতে ওঠে: ‘বাংলা এখন বোবা/ জিভকাটা দেশ।’ তাই লেখেন, ‘আমরা কথা বলি কেননা নীরবতা ফ্যাসিস্টের ভাষা।’ মানুষের প্রতিবাদহীনতায় কবি কটাক্ষ করেন, ‘গণ ও তন্ত্র ফেলে/ শিখেছি আঙুল চোষা/ উপরে দেখতে মানুষ/ ভেতরে তীব্র খোসা।’
এইসব সাহসী এবং স্পষ্ট উচ্চারণের কারণে ফ্যাসিবাদী শক্তিরা হাসান রোবায়েতকে পছন্দ করবে না, তা আর বলার দরকার নাই। তার এই সাহসকে সাধুবাদ জানাই। তিনি তো চাইলে আর দশজন সভাকবির মতন হইতে পারতেন, হন নাই যে সেইটা তার পারসোনাল চয়েজ। বাংলা ভাষার পাঠক হিসাবে আমরা ভাগ্যবান।
কবিতা শব্দনির্ভর, ছন্দনির্ভর, ইমেজনির্ভর। তবে কবিতা শব্দ, ছন্দ, ইমেজনির্ভর হইলেও এইসব ছাড়ায়া যাওয়া ব্যাপার। সাহিত্য যদি লেখকের সহিত পাঠকের মিলনকে বোঝায়, তাইলে রোবায়েত সাহিত্য সৃষ্টিতে সফল হইছেন। একজন নগণ্য পাঠক, সমালোচক এবং একজন লেখক হিসাবে সেইটা আমার পক্ষ থেকে স্বীকারোক্তি। কোনো দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছাড়াই বলতে চাই, হাসান রোবায়েত আমাদের সময়ের শ্রেষ্ঠ কবিদের একজন। তার কবিতা পড়া বন্ধ রাখলে কবির কিছু যাবে আসবে না, পাঠক হিসাবে আমরাই বরং রসগ্রহণ থেকে মাহরুম হবো।
আমাদের ব্যর্থতা এই যে গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া এই কবিকে আমরা যথেষ্ট কদর করতে পারি নাই। ব্যক্তি উদ্যোগেই বলেন, কিংবা রাষ্ট্রীয় উদ্যোগেই বলেন। স্বৈরাচারের গুণগ্রাহী এবং ফ্যাসিবাদে ইন্ধনজোগানো কবি-সাহিত্যিকরা, যারা নিজেদের বিবেক বিক্রি করে দিয়ে বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে বেইমানি করছে, তারা এখনো রাষ্ট্রীয় নানান সম্মাননা, পুরস্কার পাচ্ছে। অথচ হাসান রোবায়েতের মতো জনগণের বন্ধু কবি-সাহিত্যকরা স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসেই শুধু নয়, পৃথিবীর ইতিহাসেই এক বিরাট গণঅভ্যুত্থানে তার কাব্য-প্রতিভা দিয়া নেতৃত্ব দিয়াও এখনো যথাযথ সম্মান পাচ্ছেন না, বরং বঞ্চিত হচ্ছেন। এই ব্যর্থতার লজ্জা যেন জাতি হিসাবে আমাদের দীর্ঘদিন বহন করতে না হয়, সেই আশাই রাখি।