হোম > সাহিত্য সাময়িকী > প্রবন্ধ

শাহ ইসমাইল গাজী ও রিসালাতুশ শুহাদার পাণ্ডুলিপি

মাহমুদ আহমাদ

১৮৭৪ সালে ব্রিটিশ সিভিল সার্জন জর্জ হেনরি ড্যামান্ট জার্নাল অব দ্য এশিয়াটিক সোসাইটি অব বেঙ্গলে একটি প্রবন্ধ লিখেন। প্রবন্ধের শিরোনাম ছিলÑNotes on Shah Ismail Ghazi, with a sketch of the contents of a Persian M.S., entitled ‘Risalat ush-Shuhada’, found at Kanta Diar, Rangpur অর্থাৎ “শাহ ইসমাইল গাজী সম্পর্কিত টীকা এবং রংপুরের কাঁটাদুয়ারে প্রাপ্ত ‘রিসালাতুশ শুহাদা’ নামক একটি ফারসি পাণ্ডুলিপির বিষয়বস্তুর সংক্ষিপ্ত বিবরণ।”

এই প্রবন্ধে জর্জ হেনরি ড্যামান্ট দুটি বিষয়ে আলোচনা করেছেন। শাহ ইসমাইল গাজীর দরগা চিহ্নিতকরণ ও পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ এবং সতেরো শতকে রচিত তার জীবনীগ্রন্থ রিসালাতুশ শুহাদার পাঠোদ্ধার। প্রবন্ধের শুরুতে তিনি শাহ ইসমাইল গাজীর দরগা চিহ্নিত করেছেন। ড্যামান্ট বলেছেন, “রংপুর জেলায় শাহ ইসমাইল গাজীর স্মরণে চারটি দরগাহ বা মাজার নির্মিত হয়েছে। এর সবগুলোই পীরগঞ্জ থানার ঘোড়াঘাটের উত্তর-পূর্ব দিকে কয়েক মাইল দূরত্বে অবস্থিত। প্রধান দরগার অবস্থান কাঁটাদুয়ার নামক স্থানে। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, এই স্থানেই শাহ ইসমাইল গাজী সমাহিত রয়েছেন। এর প্রায় তিন মাইল পশ্চিমে ‘জালামাকামে’ আরেকটি দরগা রয়েছে। এই দরগাটি জঙ্গলের মধ্যে, প্রাচীন পরিখাবেষ্টিত একটি খণ্ডিত জমিনের উপর অবস্থিত। রংপুর থেকে প্রায় আঠারো মাইল দক্ষিণে, বগুড়া সড়কের পাশে আরো একটি দরগা রয়েছে। বলা হয়, এটা শাহ ইসমাইল গাজীর লাঠির স্মৃতিচিহ্নের উপর নির্মাণ করা হয়েছে। চতুর্থটি প্রকৃত অর্থে দরগাহ নয়, বরং পবিত্র স্থান মাত্র। সেখানে আমি কোনো স্থাপনা দেখতে পাইনি। এটি একটি বৃহৎ ঝিলের মধ্যবর্তী দ্বীপে অবস্থিত, যার নাম বড়ভিলা।”

রিসালাতুশ শুহাদার ঐতিহাসিক মূল্যায়ন

পীর মুহাম্মদ শাত্তারী রচিত এই গ্রন্থের মূল আলোচ্য বিষয় শাহ ইসমাইল গাজী। তার আরবে জন্মগ্রহণ থেকে বাংলায় তার শাহাদত পর্যন্ত অনেক ঘটনাই এই গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে। এই গ্রন্থে বিচ্ছিন্নভাবে রোকনুদ্দিন বারবাক শাহর আমলে বাংলার সমাজজীবন ও রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন সিদ্ধান্ত সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। মূল সূত্রের কাছাকাছি সময়ে লেখা, বিশ্বস্ত সূত্রের মৌখিক বর্ণনা উল্লেখ এবং অন্য আরেকটি রচনার সঙ্গে এর মিল থাকার কারণে বইটির ঐতিহাসিক সূত্র হিসেবে গবেষক মহলে গ্রহণযোগ্য।

পাণ্ডুলিপি প্রাপ্তিস্থান

ড্যামান্ট এই পাণ্ডুলিপি পেয়েছিলেন শাহ ইসমাইল গাজীর প্রধান দরগার খাদেমের কাছে। তিনি বলেছেন, ‘যে পাণ্ডুলিপি থেকে আমি এই বিবরণ সংগ্রহ করেছি, সেটি আমি কাঁটাদুয়ার দরগার ফকিরের কাছে পেয়েছি। তিনি আমাকে জানিয়েছেন, বহু প্রজন্ম ধরে এই পাণ্ডুলিপি তার পরিবারের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে। তবে লেখাপড়া না জানার কারণে তিনি নিজে পড়তে পারেননি এবং এর বিষয়বস্তুর সম্পর্কেও তার কোনো ধারণা নেই।’

পাণ্ডুলিপির রচয়িতা ও রচনার কারণ

ড্যামান্টপ্রাপ্ত পাণ্ডুলিপির শুরুতে রচয়িতার নাম ও রচনার কারণ লিপিবদ্ধ রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ‘আল্লাহর সবচেয়ে অধম বান্দা এবং আকিল মুহাম্মদ ফারখারীর ছেলে পীর মুহাম্মদ শাত্তারী বর্ণনা করেন, হিজরি ১০৪২ সনের শাবান মাসের ২২ তারিখের সকালে (২২ ফেব্রুয়ারি ১৬৮৮ খ্রিষ্টাব্দ), তিনি ও তার সঙ্গীরা আরব বংশোদ্ভূত মহান শহীদ শাহ ইসমাইল গাজীর সমাধির সন্নিকটে বসে ছিলেন। সেই সময় কাঁটাদুয়ার ও জালামাকামের দরগাহগুলোর খাদেম শায়খ কবির, শায়খ লতিফ, শায়খ মাসউদ এবং অন্যান্য খাদেমরা শাহ ইসমাইল গাজীর জীবনের কিছু স্মরণীয় ও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা বিশ্বস্ততার সঙ্গে বর্ণনা করেন। শ্রোতারা গভীর মনোযোগ ও আগ্রহের সঙ্গে সেই বৃত্তান্ত শোনেন এবং মনে করেন, উল্লিখিত ঘটনাগুলো সংরক্ষণের জন্য গ্রন্থাকারে লিপিবদ্ধ করা উচিত। এই গুরুদায়িত্ব অর্পিত হয় এই অধমের ওপর। সম্রাট শিহাবুদ্দিন মুহাম্মদ শাহজাহান বাদশাহে গাজীর শাসনামলে (আল্লাহ তার রাজত্ব ও শাসন চিরস্থায়ী করুন) তিনি নিষ্ঠার সঙ্গে এই কাজ সম্পন্ন করেন এবং গ্রন্থটির নাম রাখেন ‘রিসালাতুশ শুহাদা’। তার আশা, যদি এতে কোনো ভুলত্রুটি থেকে থাকে, তবে বিদ্বানগণ সংশোধন করে দেবেন।’

পাণ্ডুলিপির সারকথা

এই পাণ্ডুলিপিতে মূলত শহীদ শাহ ইসমাইল গাজীর বংশ, তার বাংলা আগমন, জীবনের বিশেষ ঘটনা এবং শাহাদতের কারণ ও বিবরণ তুলে ধরেছেন। পাণ্ডুলিপিতে বলা হয়েছেÑ

ইলিয়াস শাহী বংশের সুলতান রোকনুদ্দিন বারবাক শাহর শাসনামলে ইসমাইল গৌড়ে আসেন। সেখানে তিনি একটি বৃহৎ জলাভূমির ওপর সেতু বা বাঁধ নির্মাণ করে সুলতানের অনুগ্রহ অর্জন করেন। পরবর্তীকালে তাকে মাদারান বা ওড়িশার রাজা গজপতীর বিরুদ্ধে অভিযানে পাঠানো হয়। তিনি ওড়িশার রাজাকে পরাজিত করেন। তিনি কামরূপের রাজা কামেশ্বরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে বিজয় অর্জন করেন।

ঘোড়াঘাটের হিন্দু প্রশাসক ইসমাইলের খ্যাতি ও প্রতিপত্তিতে ঈর্ষান্বিত হয়ে তার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ আনে এবং বলে, তিনি কামরূপের রাজার সঙ্গে জোট বেঁধে একটি স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠার ষড়যন্ত্র করছেন। এই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ইসমাইলকে দমন করার জন্য সৈন্যবাহিনী পাঠানো হয় এবং তার শিরচ্ছেদ করা হয়।

জর্জ হেনরি ড্যামান্ট বলেছেন, এই পাণ্ডুলিপিতে প্রদত্ত বিবরণের অনেক কিছু আশ্চর্যজনকভাবে হুগলিতে মি. ব্লখম্যান কর্তৃক সংগৃহীত কিংবদন্তির সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। (এশিয়াটিক সোসাইটির কার্যবিবরণী, এপ্রিল ১৮৭০, পৃষ্ঠা ১১৭ দ্রষ্টব্য)

সেই কিংবদন্তিতে বলা হয়েছে, ইসমাইল সাফল্যের সঙ্গে ওড়িশা আক্রমণ করেছিলেন এবং এক হিন্দুর মিথ্যা অভিযোগে রাজাদেশে তার শিরশ্ছেদ করা হয়। স্বয়ংসম্পূর্ণ এই দুটি সূত্রের সাক্ষ্যের ভিত্তিতে আমার মত হলো, উল্লিখিত ঘটনাকে ঐতিহাসিক সত্য হিসেবে গ্রহণ করা যায়।

পাণ্ডুলিপির বর্তমান অবস্থা

১৮৭৪ সালে লেখা জর্জ হেনরি ড্যামন্টের প্রবন্ধে রিসালাতুশ শুহাদার ইংরেজি তরজমা রয়েছে। এশিয়াটিক সোসাইটির জার্নালের ৪৩ নম্বর ভলিউম মূল ফার্সি পাঠ তুলে ধরা হয়েছে। ইতিহাসের আগ্রহী পাঠকদের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হতে পারে।

বাংলার সমাজ ও সংস্কৃতি পুনর্গঠনে সুফিসাধকেরা কেন গুরুত্বপূর্ণ

ভাষার রাজনীতি রাজনীতির ভাষা

কালচারাল ফ্যাসিজম এবং বিপ্লবোত্তর সাহিত্য

ভাষা ও ভাবের লেনা-দেনা

হারিয়ে যাওয়া একুশে ফেব্রুয়ারি

ধর্মদ্রোহ প্রতিরোধ যুদ্ধ ও সাহাবিদের মতবৈচিত্র্য

খিলাফত রাষ্ট্রের যুদ্ধনীতি

ইসলামে রাষ্ট্রনীতি ও রাষ্ট্রগঠন

সাহরি ও ইফতারের মহিমা

শবেবরাত উৎসব : বাংলাদেশের সংস্কৃতি