বুসরা জয় ও আজনাদাইন যুদ্ধের প্রস্তুতি
খলিফার নির্দেশ পাওয়া মাত্রই খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ বাহিনী নিয়ে হীরা ত্যাগ করেন। কিন্তু তার সামনে বিশাল এক ভৌগোলিক বাধা। ইরাক থেকে শামে যাওয়ার প্রচলিত পথ দুটি। প্রথমটি উত্তর দিক দিয়ে ফোরাত নদীর তীর ঘেঁষে চলে গেছে; এই পথটি দীর্ঘ এবং রোমান গ্যারিসন দ্বারা সুরক্ষিত। দ্বিতীয়টি দক্ষিণ দিকে দুমাতুল জান্দাল হয়ে শাম; এই পথটি সুরক্ষিত হলেও অতিক্রম করতে মাসের পর মাস সময় লেগে যায়।
ইরাক থেকে শাম যাওয়ার জন্য খালিদের হাতে সময় ছিল মাত্র কয়েক সপ্তাহ। পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধারণ করে তিনি বাহিনীর অন্য সেনাপতিদের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন। তিনি রোমানদের নজর এড়িয়ে সরাসরি সিরিয়ার অভ্যন্তরে পৌঁছে যাওয়ার পথ সন্ধান করছিলেন। তিনি সেনাদলের মধ্যে থাকা অভিজ্ঞ বেদুইন যোদ্ধা ও পথপ্রদর্শক রাফে বিন উমাইরাকে ডাকেন।
রাফে বিন উমাইরা অলঙ্ঘনীয় একটি পথের সন্ধান দিলেন—সামাওয়া মরুভূমি। তিনি জানালেন, কুরাকির থেকে সুওয়া পর্যন্ত একটি পথ আছে। এই পথ ধরে এগিয়ে গেলে মরুভূমির অতিক্রম করে সবচেয়ে কম সময়ে শামে পৌঁছানো সম্ভব। কিন্তু সঙ্গে রাফে এই পথের অগম্যতা সম্পর্কেও জানালেন, ‘আল্লাহর কসম, এই পথ এমনই ভয়ংকর যে, একাকী কোনো মুসাফির নিজের প্রাণ হাতে নিয়ে তবেই এগোতে সাহস করে। পাঁচ পাঁচটি দীর্ঘদিন কেটে যায়, কিন্তু যাত্রাপথে কোথাও এক ফোঁটা পানির সন্ধান মেলে না। আর যদি কেউ সেখানে পথ হারায়—তবে তার পরিণতি নিশ্চিত মৃত্যু।’
সেনাপতি খালিদ সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন। তিনি বললেন, ‘মরা এই পথেই যাব। আল্লাহর সাহায্য আমাদের সঙ্গে থাকবে।’
ক্যামেল ওয়াটার স্টোরেজ টেকনিক
শুরু হলো এক মহা-অভিযাত্রা। এই যাত্রার প্রস্তুতির জন্য খালিদ অনন্য এবং অপ্রচলিত কৌশল গ্রহণ করেন। তিনি বিশটি বড় উট নির্বাচন করেন এবং সেগুলোকে প্রচুর পরিমাণে পানি পান করান। উটগুলোর তৃষ্ণা মেটা পর্যন্ত পান করাতে থাকেন। এরপর তিনি উটগুলোর মুখ শক্ত করে বেঁধে দেন, যাতে তারা পানি পান করা অবস্থায় কোনো খাবার না খেতে পারে বা জাবর কাটতে না পারে। এই মরুযাত্রার প্রতিটি দিনে মুসলিম বাহিনী নির্দিষ্টসংখ্যক উট জবাই করত এবং তাদের পাকস্থলীতে সংরক্ষিত পানি থেকে ঘোড়া ও সৈন্যদের তৃষ্ণা মেটাত। ঘোড়াগুলো ছিল বাহিনীর প্রধান শক্তি, তাই তাদের বাঁচিয়ে রাখা ছিল অপরিহার্য। এই অপ্রচলিত রণকৌশল ইতিহাসে ‘ক্যামেল ওয়াটার স্টোরেজ টেকনিক’ নামে বিখ্যাত হয়ে আছে।
মরুভূমির প্রখর তাপে সৈন্যদের প্রাণ তখন ওষ্ঠাগত। চারদিকে শুধু ধু-ধু বালুচর আর বাতাসের হাহাকার। কোনো ছায়া নেই, কোনো চিহ্ন নেই। সৈন্যরা যখন তৃষ্ণায় অবসন্ন হয়ে পড়ছিল, তখন খালিদ নিজে অগ্রভাগে থেকে তাদের উৎসাহ দিচ্ছিলেন। পঞ্চম দিনে পরিস্থিতি চরমে পৌঁছে যায়। রাফে বিন উমাইরা নিজেও তখন বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন। তার দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ হয়ে আসে। তার আশঙ্কা হচ্ছিল, মরুভূমির এই ভয়াবহ গরমে তিনি পথ হারিয়ে ফেলবেন।
তখন রাফে চিৎকার করে বললেন, ‘সবাই একটি নির্দিষ্ট ঝোপের সন্ধান করুন। যদি আমরা ঝোপটা খুঁজে পাই, তবে বুঝব যে আমরা পানির কাছে চলে এসেছি। নয়তো আমাদের সবার মরণ নিশ্চিত।’ ঐতিহাসিক বর্ণনায় পাওয়া যায়, সেই ধু-ধু মরুভূমিতে অনেক খোঁজাখুঁজির পর এক কোণে একটি শুকিয়ে যাওয়া ঝোপ (Boxthorn Tree) পাওয়া যায়। সৈন্যরা যখন সেই জায়গাটি খুঁড়ল, তখন আল্লাহর অশেষ রহমতে সেখান থেকে একটি পানির ঝরনা বের হয়ে এলো। এই ঝরনাই মুসলিম বাহিনীকে মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরিয়ে আনার অসিলা হয়। অসাধ্যসাধন করার পর খালিদ তার বাহিনীকে নিয়ে ঝড়ের বেগে সিরিয়ার সীমান্তে উপস্থিত হন। ১৮ দিনের যাত্রাপথ পারি দেন মাত্র পাঁচ দিনে, রচনা করেন তৎকালীন সামরিক ইতিহাসের এক বিস্ময়।
সারপ্রাইজ অ্যাটাক
খালিদ সুওয়া নামক স্থানে পৌঁছান। তখন রোমানদের কল্পনায় ছিল না যে, ইরাক ফ্রন্ট থেকে কোনো বাহিনী মরুভূমির পথ ধরে এগিয়ে এসে তাদের পেছনে উদয় হবে। খালিদ তার ঝোড়ো গতি বজায় রেখে একে একে আরক, পালমিরা এবং কাসাম দখল করে নেন। এরপর তিনি দক্ষিণ দিকে বুসরা অভিমুখে রওনা হন।
বুসরা ছিল তৎকালীন গাসসানি শাসকদের রাজধানী এবং রোমান বাহিনীর শক্তিশালী ঘাঁটি। সেখানে সেনাপতি শুরাহবিল ইবনে হাসানা মাত্র চার হাজার সৈন্য নিয়ে রোমানদের এক বিশাল গ্যারিসনের বিরুদ্ধে লড়াই করছিলেন। রোমানরা যখন শুরাহবিলের বাহিনীকে ঘিরে ফেলার পাঁয়তারা করছিল, ঠিক সেই মুহূর্তে মরুভূমির ধুলো উড়িয়ে দিগন্তরেখা ভেদ করে খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের বাহিনী উপস্থিত হয়।
বুসরার উপকণ্ঠে এক আবেগঘন মুহূর্তের সৃষ্টি হয়। আবু উবাইদাহ ইবনুল জাররাহ এবং অন্য সেনাপতিরা যখন শুনলেন, খলিফার নির্দেশে খালিদ এসেছেন, তাদের মনে নতুন উদ্দীপনা তৈরি হলো। আবু উবাইদাহ অত্যন্ত বিনম্রতার সঙ্গে খালিদকে স্বাগত জানালেন। তিনি দ্রুত একটি সমন্বিত আক্রমণ পরিকল্পনা করলেন। বুসরা শহর অবরোধ করা হলো এবং খালিদের রণকৌশলের কাছে রোমানরা নতি স্বীকার করতে বাধ্য হলো। কিছুদিনের মধ্যে বুসরা শহর আনুষ্ঠানিকভাবে মুসলিমদের দখলে আসে।
রি-অর্গানাইজেশন অব কমান্ড
খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ কমান্ড গ্রহণ করার পরপরই শামের যুদ্ধকৌশলে আমূল পরিবর্তন আনেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, রোমানদের মতো একটি সুশৃঙ্খল ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বাহিনীকে হারাতে হলে শুধু সংখ্যা বা সাহস দিয়ে হবে না, বরং গতির সঙ্গে কৌশলের সফল প্রয়োগ করতে হবে।
ইউনিফাইড কমান্ড ও সংহতি : খালিদ প্রথম যে কাজটি করেন, তা হলোÑচারটি বিচ্ছিন্ন বাহিনীকে একীভূত করা। তিনি ঘোষণা করেন, এখন থেকে যুদ্ধের ময়দানে একক নেতৃত্ব থাকবে এবং একজনের পক্ষ থেকে সিদ্ধান্তে আসবে। তিনি সব সেনাপতিকে সমবেত করে একটি ‘মার্চিং ফরমেশন’ তৈরি করেন। এটি রোমানদের পিন্সার মুভমেন্টকে রুখে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল।
মোবাইল গার্ডের প্রবর্তন : ইরাক অভিযানের অভিজ্ঞ সৈন্যদের নিয়ে সেনাপতি খালিদ একটি এলিট অশ্বারোহী ইউনিট গঠন করেন। এই বাহিনী ইতিহাসে ‘মোবাইল গার্ড’ বা ‘طليعة متحركة’ নামে পরিচিত। এই বাহিনীটি ছিল অত্যন্ত হালকা অস্ত্রধারী কিন্তু অবিশ্বাস্য ধরনের গতিশীল। যুদ্ধের যেকোনো সংকটময় মুহূর্তে তারা যেকোনো উইংয়ে সাহায্য করতে পারত।
মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ ও দ্বন্দ্বযুদ্ধ (مبارزون) : খালিদ দ্বন্দ্বযুদ্ধের প্রথাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যান। তিনি তার বাহিনীর শ্রেষ্ঠ যোদ্ধাদের নিয়ে একটি দল গঠন করেন, যারা যুদ্ধের শুরুতেই রোমান কর্মকর্তাদের চ্যালেঞ্জ করত। আজনাদাইনের প্রস্তুতির সময় তিনি তার সৈন্যদের মনে এই বিশ্বাস ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন, রোমানদের সংখ্যা যত বড়ই হোক না কেন, তাদের সাহস মুসলিমদের সমান নয়।
Terrain বা ভূখণ্ডের ব্যবহার : খালিদ সবসময় মরুভূমির কাছাকাছি রণক্ষেত্র বেছে নিতেন। পরিস্থিতি প্রতিকূলে চলে গেলে তার বাহিনী সহজেই মরুভূমিতে পিছিয়ে যাওয়ার সুযোগ রাখতেন। ভারী বর্ম পরিহিত রোমান সৈন্যদের পক্ষে সেখানে তাদের অনুসরণ করা সম্ভব ছিল না। এই ‘হিট অ্যান্ড রান বা ‘কার ওয়া ফার (كرّ و فرّ )’ কৌশল রোমানদের মন্থর গতির ইনফ্যান্ট্রিকে পর্যুদস্ত করতে শুরু করে।
খালিদ শামে এসে শুধু বুসরা জয়ই করেননি, বরং তিনি রোমান সম্রাট হেরাক্লিয়াসকে একটি পরিষ্কার বার্তা দিয়েছিলেন—এই ভূখণ্ডের নতুন অধিপতিরা এখন সুসংগঠিত। ইতিহাসবিদরা একমত, যদি খালিদ সে সময় মরুভূমি পাড়ি দিয়ে শামে না পৌঁছাতেন, তবে হয়তো শামের বিজয় কয়েক দশক পিছিয়ে যেত অথবা মুসলিমরা রোমানদের বিশাল চাপে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হতো। হিউ কেনেডি এবং ফ্রেড ডোনারের মতো আধুনিক গবেষকরা এই অভিযানকে ‘মিলিটারি মাস্টারি’ বা সামরিক দক্ষতার এক অনন্য নজির হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
আজনাদাইন
এখন মুসলিম বাহিনী প্রস্তুত। নেতৃত্ব পুনর্গঠিত। ৪৬ হাজার সৈন্য নিয়ে খালিদ এখন ধাবিত হচ্ছেন আজনাদাইনের দিকে, যেখানে সম্রাট হেরাক্লিয়াসের ভাই থিওডোরাসের নেতৃত্বে বিশাল এক রোমান বাহিনী অপেক্ষমাণ। সামনে আমরা দেখব সেই ভয়াবহ সংঘর্ষের চিত্র, যেখানে প্রথমবারের মতো রোমান সাম্রাজ্যের মেরুদণ্ড ভেঙে দেবেন আরবের এই অপরাজেয় বীর ও তার সহযোদ্ধারা। আজনাদাইনের সেই মহাযুদ্ধের পটভূমি এখন পুরোপুরি প্রস্তুত।