শত শত বছরের যাত্রায় বৈশাখ বদলেছে বারবার। কৃষির হিসাব থেকে খাজনার চাপ, সেখান থেকে রাজনৈতিক প্রতিরোধ, সেখান থেকে সাংস্কৃতিক উদ্যাপন এবং এখন সোশ্যাল মিডিয়ার ফিল্টারে মোড়া উৎসব। কিন্তু যা বদলায়নি সেটা হলো, বৈশাখ এলে মানুষ আকাশের দিকে তাকায়। শহরে থাকুক বা মাঠে, পান্তা খাক বা পিৎজা, কোথাও না কোথাও একটা পুরোনো প্রশ্ন জেগে ওঠে—এই বছরটা কেমন যাবে? এই প্রশ্নের সামনে মানুষ চিরকাল অসহায় ছিল, এখনো আছে। পার্থক্য শুধু এটুকু যে, আগে সেই অসহায়তা থেকে গান জন্ম নিত; এখন জন্ম নেয় রিল।
এই দীর্ঘ ইতিহাসের ধারায় হালখাতা গেছে, ব্রিটিশ গেছে, জমিদার গেছে, স্বৈরাচার গেছে; কিন্তু চৈত্রের শেষে, বৈশাখের শুরুতে কৃষকের গাওয়া গান ‘আল্লাহ মেঘ দে পানি দে’ রয়ে গেছে। কনসার্টে বাজছে, ফোনের স্পিকারে বাজছে, কোক স্টুডিওতে বাজছে। কেন? কারণ এই গান কোনো নির্দিষ্ট আমলের নয়। অসহায়তার মধ্যে আকাশের দিকে মুখ তুলে চাওয়া কোনো আমলেই পুরোনো হয় না।
এই গানটির জন্মকথা আমরা নিশ্চিত জানি না; কেউ বলেন গিরিন চক্রবর্তীর রচনা, কেউ বলেন জালালউদ্দিন নামের এক অজ্ঞাত কবির কথা, আর অনেক সূত্র বলে গীতিকার-সুরকার উভয়ই অজানা। তিনটি উত্তর পাশাপাশি বেঁচে আছে। আব্বাসউদ্দীন আহমদ এই গান লেখেননি, তিনি বহন করেছিলেন। তার গলায় এই গান যে রঙ পেয়েছিল, সেটা অনন্য। গানটার জন্ম কোনো কবির খাতায় নয়, সম্ভবত কোনো একটা শুকনো মাঠে, কোনো একটা বৈশাখের বিকেলে।
এই গানটি মূলত জারি গান। ফার্সিতে জারি মানে বিলাপ। বেশিরভাগ জারি গানের শিকড় কারবালার স্মৃতিতে, সেই যুদ্ধে ইমাম হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহু ও তার সঙ্গীরা পানিশূন্যতায় শহীদ ও অমর হয়েছিলেন। সেই তৃষ্ণার ইতিহাস বাংলায় এসে মিশে গেছে বাংলার মাঠের তৃষ্ণার সঙ্গে। এই মিলনটা কি পরিকল্পিত নাকি নিছক কাকতালীয়?
হয়তো কোনো একদিন কোনো একজন গাইতে গিয়ে দুটো বেদনাকে একসঙ্গে রেখে দিয়েছিলেন এবং সেটাই থেকে গেছে। ধর্মীয় বিষাদ আর কৃষিজীবী বাস্তবতা যখন একই সুরে মেলে, তখন যে সংগীত জন্ম নেয়, তার শক্তি অন্যরকম। কারণ সে দুটো আলাদা তৃষ্ণাকে একই কণ্ঠে ধারণ করে।
বহুবার ভেবেছি, বাঙালির যে খোদাবিশ্বাস, সেটা কি আসলে মসজিদ-মাদরাসা থেকে আসা? মনে হয়, তার চেয়েও বেশি বিশ্বাস ও ভক্তি এসেছে এই মাঠ থেকে। এই শুকনো মাটি থেকে। এই অনিশ্চিত আকাশ থেকে। বাঙালি কৃষক মসজিদে যাওয়ার আগেও জানত যে তার ওপরে কেউ একজন আছেন, যিনি বৃষ্টি দেন বা না দেন। সেই জানার তখন কোনো নাম ছিল না। পরে নাম হয়েছে; কিন্তু অনুভূতিটা আগে থেকেই ছিল। নৃবিজ্ঞানীরা যখন বাংলার গ্রামীণ আচার-অনুষ্ঠান নিয়ে কাজ করেন, তখন একটা জিনিস বারবার উঠে আসে, বাঙালির ধর্মবোধ কখনো পুরোপুরি শাস্ত্রনির্ভর ছিল না, এটা ছিল প্রকৃতিনির্ভর। ইসলাম আসার আগে যে বিশ্বাস ছিল, ইসলাম আসার পরেও সেটার একটা ধারা বেঁচে রইল। শুধু ভাষাটা বদলাল—‘দেবতার কাছে বৃষ্টি চাওয়া’ থেকে ‘আল্লাহর কাছে বৃষ্টি চাওয়া’। বাহ্যিকভাবে পরিবর্তন হলো, কিন্তু ভেতরের কাঠামো রইল একই। সেই কাঠামো হলো, ‘আমি অসহায়, আমার ওপরে কেউ আছেন এবং আমি সরাসরি তার কাছে চাইতে পারি। কোনো মধ্যস্থতাকারী লাগে না। শুকনো মাঠে দাঁড়িয়ে গলা তুলে চাওয়া যায়।’
বাংলার সাহিত্যিক মন, সে কিছু শুরু করার আগে, কিছু না পেলে, এমনকি পেলেও খোদার কথা ভাবে। সেটার প্রকাশ একেকভাবে হতে পারে; কেউ বলেন, ‘আমার মাথা নত করে দাও,’ আবার কেউবা বলেন, ‘আল্লাহ আমার প্রভু, আমার নাহি কো ভয়।’
প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে যে মানুষ বৃষ্টির ওপর নির্ভর করে বেঁচেছে, তার শরীর ধীরে ধীরে একটা বিশেষ সংবেদনশীলতা তৈরি করে নেয় আকাশের প্রতি, মাটির প্রতি এবং বাতাসের প্রতি। এই সংবেদনশীলতাই বাঙালির সংস্কৃতির ভিত্তি। এখানে ধর্ম এসেছে, দর্শন এসেছে, কবিতা এসেছে; কিন্তু সবকিছুর তলায় পলিমাটি হিসেবে রয়ে গেছে সেই প্রাথমিক সম্পর্ক।
মাটি আর আকাশের মাঝখানে মানুষ দাঁড়িয়ে আছে এবং দুটোর কোনোটির ওপরেই তার কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।
বৈশাখ মাসে বাংলার চেহারাটা একটু আলাদা হয়। এই আলাদা হওয়াটা শুধু তাপমাত্রার বিষয় নয়। বছরের বাকি সময় অনেক কিছু ঢাকা থাকে সবুজে ঢাকা, পানিতে ঢাকা কিংবা ছায়ায় ঢাকা। বৈশাখে সেই ঢাকনা উঠে যায়। মাটির আসল রঙ বেরিয়ে পড়ে। ফাটলগুলো দেখা যায়। শুকনো নদীর বুক দেখা যায়। আর আকাশ, বৈশাখের আকাশ একটা বিশেষ ধরনের নির্দয় রূপ ধারণ করে। সেখানে কোনো মেঘ নেই, কোনো ছায়া নেই, শুধু একটা অসীম নীল, যার ভেতর দিয়ে রোদ সরাসরি নেমে আসছে। এই আকাশের সামনে দাঁড়িয়ে কৃষক যখন তার মাঠের দিকে তাকায়, তখন সে একটা হিসাব করে। সেই হিসাবে অনেক কিছু থাকে কত বিঘা জমি, কতটা বীজ, কতদিনের খাবার মজুত আছে। কিন্তু হিসাবের শেষে একটা জায়গায় এসে থেমে যায়। সেখানে শুধু একটা প্রশ্ন থাকেÑবৃষ্টি আসবে কি? কবে?
বাংলার কৃষক কীভাবে চিন্তা করে এই প্রশ্নটা সহজ মনে হয়, কিন্তু উত্তরটা জটিল। সে একসঙ্গে একাধিক জগতে বাস করে। একটা জগৎ বাস্তব, যেখানে আছে জমি, বীজ, ঋণ, হাট ও মহাজন; আরেকটা জগৎ অদৃশ্য, যেখানে আছে আকাশ, খোদা, ভাগ্য ও রহমত। এই দুটো জগৎকে সে আলাদা রাখে না। তার কাছে বাস্তব আর অদৃশ্য, পরস্পর পরস্পরের মধ্যে সবসময় আসা-যাওয়া করছে। মাঠে বীজ বোনার সময় সে দোয়া পড়ে। সে বলছে, আমি যতটুকু পারি করছি, বাকিটা তোমার হাতে। এই ভাগাভাগির মধ্যে একটা বিনয় আছে, একটা সততা আছে, যেটা কখনো কখনো আধুনিক ঔপনিবেশিক শিক্ষিত মানুষের মধ্যে ভাব ও ধারণার বাইরে।
মনোবিজ্ঞানের ভাষায় বলতে গেলে, এটা একটা বিশেষ ধরনের ‘Locus of Control’ বা নিয়ন্ত্রণের কেন্দ্র। আধুনিক মনোবিজ্ঞান বলে, যে মানুষ মনে করে সে নিজেই তার জীবন নিয়ন্ত্রণ করে, সে মানসিকভাবে সুস্থ। কিন্তু বাংলার কৃষক হাজার বছর আগেই একটা ভিন্ন সত্য আবিষ্কার করেছিল। কিছু জিনিস নিয়ন্ত্রণের বাইরে এবং সেটা স্বীকার করে নেওয়াটাই ছিল মুক্তির পথ। এই স্বীকারোক্তি ছিল গভীর উপলব্ধির, কোনো দুর্বলতার নয়। আর সেই উপলব্ধির ভাষাই হলো গান। যেমন করে চৈত্রের শেষে, বৈশাখের শুরুতে অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকা কৃষক গেয়ে ওঠেন এই গান—
‘আল্লাহ মেঘ দে, পানি দে, ছায়া দে রে তুই,
আল্লাহ মেঘ দে।’
প্রথম লাইনেই তিনটা চাওয়াÑমেঘ, পানি ও ছায়া। মেঘ মানে বৃষ্টির পূর্বশর্ত, সাড়া পাওয়া। শুকনো আকাশে এক টুকরো মেঘ দেখলে কৃষকের বুকে প্রশান্তি চলে আসে। পানি হলো বাস্তবতা। এটা না হলে সংসার চলে না। কিন্তু ছায়া? ছায়া হলো মানবিক মর্যাদার চাওয়া। চরম কষ্টের মধ্যেও মানুষ যখন একটু আরামের কথা ভাবে, তখন বোঝা যায় ভেতরে এখনো কিছু একটা জ্বলছে।
বাংলায় ‘তুই’ হলো সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সর্বনাম—মা শিশুকে বলে, বন্ধু বন্ধুকে বলে; কিন্তু খোদাকে ‘তুই’ বলে সম্বোধন করা কোনো ধর্মতত্ত্বের বইতে পাওয়া যাবে না। এটা বাংলার মাঠের ভাষা। এটা সেই মানুষের ভাষা, যে জানে ওপাশে কেউ শুনছে এবং তার সঙ্গে নির্ভরতার একটা পুরোনো সম্পর্ক আছে, যা কখনো কখনো ভয়ের সম্পর্ক বলে ভ্রম হয়। এই ‘তুই’-এর মধ্যে পুরো বাঙালির সঙ্গে খোদার সম্পর্ক আছেÑদূরত্বহীন, আনুষ্ঠানিকতাহীন, একেবারে সরাসরি।
মনোবিজ্ঞানে চরম চাপের মুহূর্তে মানুষ প্রায়ই ‘রিগ্রেশন’ করে, শৈশবের আচরণের ধরনে ফিরে যায়—শিশু যেভাবে মায়ের কাছে বায়না করে, কাঁদে, একই কথা বারবার বলে। এই গানের ভাষায় সেই শৈশবী কণ্ঠের একটা ছায়া আছে। ‘তুই মেঘ দে’—একটা দাবি, কোনো স্বাভাবিক অনুরোধ নয়। শিশুর মতো দাবি এবং সেই দাবির মধ্যে একটা বিশ্বাস কাজ করছে—তিনি শুনবেন, শুনবেনই; না হলে এত জোর দিয়ে বলার কী মানে? এই বিশ্বাসটাই গানের শক্তির প্রথম স্তর।
‘আসমান হইল টুডা টুডা
জমিন হইল ফাডা,
মেঘরাজা ঘুমাইয়া রইছে
মেঘ দিব তোর কেডা।’
‘টুডা টুডা’ এই দ্বিরুক্তি কেন? শুধু জোর দেওয়ার জন্য? বাংলায় দ্বিরুক্তি একটা বিশেষ কাজ করে, যেটা একক শব্দ পারে না, এটা একটা চলমান ধারা তৈরি করে। ‘ভাঙা’ মানে ঘটে গেছে। কিন্তু ‘টুটা টুটা’ মানে হচ্ছে এবং হতেই থাকছে। আকাশটা শুধু ভাঙেনি, সে ভাঙতেই আছে। স্থির বিপদের একটা শেষ আছে। কিন্তু যেটা ক্রমাগত খারাপ হচ্ছে, তার শেষ কোথায়?
উপরে আকাশ ভাঙছে, নিচে মাটি ফাটছে; মানুষ মাঝখানে। এই দুই বিপর্যয়ের মাঝখানে দাঁড়ানো মানুষটার অবস্থা একটা ঐতিহাসিক অবস্থানও। বাস্তবিক জগতে হাজার বছর ধরে বাংলার কৃষক দুই চাপের মাঝখানে ছিল। বাংলার কৃষক সবসময় দুই চাপের মাঝখানে ছিলÑউপর থেকে প্রকৃতির চাপ, খরা, বন্যা, ঝড়; নিচ থেকে অর্থনীতির চাপ, খাজনা, ঋণ, বাজার।
ব্রিটিশ আমলে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পর এই চাপটা আরো জোরালো হলো। ফসল হোক না হোক, খাজনা দিতেই হবে। খরায় মাঠ পুড়লে মহাজনের কাছে যেতে হবে, ঋণ নিতে হবে, শেষে জমিও যাবে। এই কাঠামোয় বৃষ্টি মানে, আবারও অস্তিত্ব ফিরে পাওয়া।
‘মেঘরাজা ঘুমাইয়া রইছে।’ এই লাইনে আমি সবসময় একটা দ্বিতীয় অর্থ পাই। মেঘের রাজা ঘুমাচ্ছে, এটা প্রকৃতির কথা। কিন্তু রাজা ঘুমালে প্রজার কী হয়, এই প্রশ্নটা শুধু প্রকৃতির ক্ষেত্রে নয়। বাংলার ইতিহাসে কতবার রাজা ঘুমিয়েছে। জমিদার জানত মাঠ পুড়ছে, খাজনা মাফ হয়নি। ব্রিটিশ প্রশাসন জানত দুর্ভিক্ষ আসছে, রপ্তানি বন্ধ হয়নি। ১৯৪৩ সালে বাংলায় ৫০ লাখ মানুষ মারা গেছে—প্রকৃতির দুর্ভিক্ষে নয়, মানুষের তৈরি দুর্ভিক্ষে। ‘মেঘরাজা ঘুমাইয়া রইছে’—এই লাইন একটা রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার জমাটবাঁধা বেদনা। সাহিত্য এভাবেই কাজ করে, একটা কথা বলতে গিয়ে অনেক কথা বলে দেয় এবং সেই অনেক কথার প্রমাণ দাবি করা যায় না, কারণ সেগুলো কখনো সরাসরি বলাই হয়ে ওঠেনি।
‘মেঘ দিব তোর কেডা’ এই কথাটা আসলে, বসে ভেবে বলা কোনো প্রশ্ন নয়। এটা বের হয় তখন, যখন মানুষ চারদিকে তাকিয়ে আর কাউকে খুঁজে পায় না। মাঠ ফেটে গেছে, আকাশ ফাঁকা, যাওয়ার মতো কোনো দরজা খোলা নেই। সেই সময়টায় সে যুক্তি দেয় না, হিসাবও করে না; শুধু একটু যেন বলে, ‘তুই না দিলে, আর কে দিবে?’
(বাকি অংশ আগামী সংখ্যায়)