শাম অভিযানের সূচনা
বিকেন্দ্রীকৃত কমান্ড কৌশল
আবু বকর (রা.)-এর সামরিক কৌশলের সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো, তিনি একটি বিশাল বাহিনীর পরিবর্তে চারটি ভিন্ন ভিন্ন বাহিনী শাম অভিমুখে প্রেরণ করেছিলেন। আধুনিক ইতিহাসবিদরা, যেমন ফ্রেড ডোনার (Fred Donner) এবং হিউ কেনেডি (Hugh Kennedy) এই কৌশলের পেছনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ যুক্তি তুলে ধরেছেন—
ক. দ্রুত বিস্তার ও গোয়েন্দা বিভ্রাট : মুসলিমদের একটি বড় বাহিনী যদি একদিক থেকে আক্রমণ করত, তবে বাইজেন্টাইনরা সহজেই তাদের প্রতিরোধ করতে পারত। কিন্তু চারটি বাহিনী ভিন্ন দিক থেকে আক্রমণ শুরু করায় বাইজেন্টাইন গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছিল। তারা বুঝে উঠতে পারছিল না, মুসলিমদের মূল লক্ষ্য আসলে কোনটি। এর ফলে বাইজেন্টাইন প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে বিশাল শাম অঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে দিতে হয়েছিল, যা তাদের মূল শক্তিকে দুর্বল করে দিয়েছিল।
খ. বাইজেন্টাইন প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ভেঙে দেওয়া : বড় শহরগুলো কেন্দ্র করে শাম অঞ্চলে বাইজেন্টাইনদের মজবুত প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ছিল। আবু বকর (রা.)-এর লক্ষ্য ছিল গ্রাম ও মরুভূমি সীমান্তসংলগ্ন অঞ্চলগুলো আগে দখলে নেওয়া। চারটি বাহিনী যখন চারটি আলাদা রুট দিয়ে প্রবেশ করে, তখন বাইজেন্টাইনদের পারস্পরিক যোগাযোগের পথগুলো রুদ্ধ হয়ে যায়।
গ. বিকেন্দ্রীকৃত কমান্ড ও সমন্বয় : আবু বকর (রা.) সেনাপতিদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্ণ অধিকার দিয়েছিলেন। তিনি নির্দেশ দিয়েছিলেন, প্রতিটি বাহিনী নিজস্ব কৌশল গ্রহণ করবে এবং নিজ নিজ অঞ্চলের বিজয় নিশ্চিত করবে। তবে তিনি একই সঙ্গে একটি কঠোর আদেশ দিয়েছিলেন—‘যদি বাইজেন্টাইনরা একটি বিশাল বাহিনী নিয়ে কোনো এক সেনাপতির উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, তবে বাকিদের অবশ্যই তার সাহায্যে এগিয়ে যেতে হবে।’ এটি ছিল ইতিহাসের এক অনন্য ‘ডিসেন্ট্রালাইজড কমান্ড’ বা বিকেন্দ্রীভূত কমান্ড ব্যবস্থা।
মুসলিম বাহিনীর অগ্রযাত্রা
মদিনা থেকে যখন চারটি বাহিনী রওনার মাধ্যমে আরব-মরুর আকাশে এক নতুন ইতিহাসের সূর্যোদয় হলো। জুরফ থেকে একে একে বাহিনীগুলো যাত্রা শুরু করে। প্রথমে ইয়াজিদ ইবনে আবু সুফিয়ানের বাহিনী, তার পরদিন শুরাহবিলের বাহিনী, এরপর আবু উবাইদা এবং সবশেষে আমর ইবনুল আসের বাহিনী রওনা হয়।
সেনাবাহিনীগুলো মূলত হেজাজ থেকে উত্তরদিকে মরুভূমি পাড়ি দিয়ে সামনে অগ্রসর হতে থাকে। ইয়াজিদ এবং শুরাহবিল সেকালের উত্তরগামী মূল রুট, অর্থাৎ তাবুকের রাস্তা ধরে এগিয়ে যান। অন্যদিকে আমর ইবনুল আসের গন্তব্য ছিল ফিলিস্তিন। তাই তিনি উপকূলবর্তী আইলা (আধুনিক আকাবা) এবং ওয়াদিউল আরাবার পথ বেছে নেন। এই সফর ছিল অত্যন্ত দীর্ঘ এবং ক্লান্তিকর। মরুভূমির প্রচণ্ড উত্তাপ এবং পানির স্বল্পতা সত্ত্বেও মুসলিম সেনাদের মনোবল ছিল আকাশচুম্বী। তাদের পদচারণে উড়তে থাকা ধুলোবালি যেন এক নতুন ঝড়ের পূর্বাভাস দিচ্ছিল।
মুসলিম বাহিনী যখন শাম সীমান্তে পৌঁছালে সেখানে বসবাসরত বিভিন্ন আরব গোত্র যেমন—লাখমিদ, জুধাম এবং শক্তিশালী গাসানিদদের মুখোমুখি হয়। গাসানিদরা ছিল বাইজেন্টাইনদের দীর্ঘদিনের অনুগত এবং খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী। অনেক ক্ষেত্রে তারা মুসলিম বাহিনীকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে। তবে কিছু গোত্র যারা বাইজেন্টাইনদের বৈষম্য ও অতিরিক্ত করের চাপে অতিষ্ঠ ছিল, তারা মুসলিমদের প্রতি এক ধরনের গোপন সমর্থন বা নিরপেক্ষতা প্রদর্শন করে। এটি ছিল মুসলিম বাহিনীর জন্য একটি বড় মনস্তাত্ত্বিক বিজয়।
শুরু হলো সংঘর্ষ ও ঝটিকা আক্রমণ
শাম সীমান্তে মুসলিম বাহিনীর পা রাখার সঙ্গে সঙ্গেই বাইজেন্টাইনদের আঞ্চলিক গ্যারিসনগুলোর সঙ্গে সংঘর্ষ শুরু হয়ে যায়। এই পর্যায়ে মুসলিমরা ছোট ছোট সংঘাতের মাধ্যমে বাইজেন্টাইনদের প্রতিরক্ষা ক্ষমতার গভীরতা মাপার চেষ্টা করে।
শাম অভিযানের প্রথম বড় সাফল্য আসে আমর ইবনুল আসের হাত ধরে। ৬৩৪ খ্রিষ্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসে গাজার কাছাকাছি ‘দাথিন’ নামক গ্রামে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ সংঘটিত হয়। বাইজেন্টাইন সেনাপতি সারজিয়াস (Sergius) একটি ছোট দল নিয়ে আমরকে বাধা দিয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু আমরের সুশৃঙ্খল আক্রমণের মুখে বাইজেন্টাইনরা পর্যুদস্ত হয় এবং সারজিয়াস নিহত হন। দাথিনের এই বিজয় সমগ্র শাম অঞ্চলে এই বার্তা ছড়িয়ে দেয় যে, আরবরা এবার শুধু লুণ্ঠন করতে আসেনি, বরং তারা স্থায়ীভাবে বিজয় নিশ্চিত করতে এসেছে।
একই সময়ে ইয়াজিদ ইবনে আবু সুফিয়ানের বাহিনী ওয়াদিউল আরবা অঞ্চলে বাইজেন্টাইনদের একটি দলকে পরাজিত করে দক্ষিণ সিরিয়ার বালকা অঞ্চলের দিকে অগ্রসর হয়। শুরাহবিল ইবনে হাসানাহ জর্ডান উপত্যকার গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলো দখলে নিতে শুরু করেন। আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ বাহিনী নিয়ে হোমসের দিকে অগ্রসর হতে থাকেন এবং জাবিয়া নামক স্থানে পৌঁছে কৌশলগত অবস্থান গ্রহণ করেন। প্রাথমিক এই সাফল্যগুলো মুসলিম বাহিনীর জন্য ছিল অত্যন্ত অনুপ্রেরণাদায়ক, তবে তারা জানত যে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের মূল শক্তির মুখোমুখি এখনো তাদের হতে হয়নি।
সাম্রাজ্যবাদী শক্তির পাল্টা আঘাত
শামে মুসলিম বাহিনীর প্রাথমিক বিজয়গুলো সম্রাট হিরাক্লিয়াসকে সজাগ করে দিন। যখন তিনি মুসলিমদের এই সুবিন্যস্ত আক্রমণের সংবাদ পেলেন তখন তিনি দ্রুত মার্চ করে রাজধানী হোমস এসে পৌঁছালেন। এই ‘মরুবাসী’ আরবদের সাফল্য তাকে ভাবিয়ে তুলল। তিনি বুঝতে পারলেন, বিচ্ছিন্ন ছোট ছোট গ্যারিসন দিয়ে মুসলিমদের আক্রমণের জোয়ার থামানো সম্ভব নয়। এখান থেকে প্রত্যেক মুসলিম সেনাপতির অধীন ফৌজের পৃথক পৃথক মোকাবিলা করার উদ্দেশ্যে তিনি ভিন্ন ভিন্ন ফৌজ প্রেরণ করলেন। মুসলিম বাহিনী একক নেতৃত্বে সমবেত হওয়ার পথ কার্যত তিনি বন্ধ করে দিতে চাইলেন। আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহর নেতৃত্বাধীন বাহিনীকে প্রতিহত করার জন্য ৬০ হাজার সৈন্যের এক বিশাল বাহিনী প্রস্তুত করলেন। ‘ফায়কার’ নামের এক সেনা কর্মকর্তার হাতে দলটির নেতৃত্ব তুলে দিলেন। ওদিকে হিরাক্লিয়াসের আপন ভাই ‘তাজারিক’-এর নেতৃত্বে নব্বই হাজার সৈন্যের আরেকদল ফৌজ আমর ইবনুল আসের মোকাবিলায় অগ্রসর হলো।
এর পাশাপাশি হিরাক্লিয়াস তার বিশাল সাম্রাজ্যের সব প্রান্ত থেকে সৈন্য সংগ্রহের নির্দেশ দিলেন। তিনি আর্মেনিয়া, এশিয়া মাইনর এবং স্থানীয় খ্রিষ্টান আরবদের নিয়ে এক বিশাল সেনাদল গঠনের কার্যক্রম শুরু করলেন। এই বিশাল সেনাবাহিনী যখন জর্ডান ও ফিলিস্তিনের মধ্যবর্তী ‘আজনাদাইন’ নামক স্থানে জমায়েত হতে লাগল, তখন পরিস্থিতি মুসলিমদের জন্য প্রতিকূল হয়ে উঠল। প্রতিটি ফ্রন্টে বাইজেন্টাইনদের নিয়মিত সেনাদল তখন সম্মুখযুদ্ধের জন্য প্রস্তুত ছিল।
বাইজেন্টাইনদের এই বিশাল সমাবেশের খবর যখন মুসলিম সেনাপতিদের কাছে পৌঁছাল, তখন তারা বুঝতে পারলেন, বিচ্ছিন্নভাবে থাকা এখন আর নিরাপদ নয়। বাইজেন্টাইনরা সংখ্যায় ছিল মুসলিমদের তুলনায় প্রায় তিন থেকে চার গুণ বেশি। মুসলিম সিপাহিরা এই সুরতহাল দেখতে পেয়ে পত্রযোগে পরস্পর পরামর্শ করলেন। তারা সবাই একমত হলেনÑসবাইকে এক স্থানে সমবেত হতে হবে। পাশাপাশি তারা মদিনায় বর্ধিত সামরিক সহায়তার আবেদন পাঠালেন। খলিফা আবু বকর (রা.) তাদের সেই প্রস্তাবের সঙ্গে একমত হলেন এবং নির্দেশ পাঠালেন যে, আপনারা খানিকটা পেছন দিকে সরে এসে ইয়ারমুক নদীর তীরে কোনো জুতসই এলাকায় শিবির স্থাপন করুন। রণক্ষেত্রের এই নতুন পরিস্থিতি নির্দেশ করছিল যে, একটি চূড়ান্ত ও বড় আকারের যুদ্ধ আসন্ন এবং এর মাধ্যমে নির্ধারিত হবে শাম অঞ্চলের ভাগ্য।
মহাবীর খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের শামের রণাঙ্গনে আগমন
মুসলিম বাহিনীর চার ইউনিট অসামান্য বীরত্বে প্রাথমিক বিজয় ছিনিয়ে নিলেও এ পর্যায়ে তারা বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের এক বিশাল লৌহকপাটের সামনে এসে পৌঁছেছে। আজনাদাইনে জমায়েত হওয়া বাইজেন্টাইনদের সেই বিশাল সমুদ্রসম বাহিনীর সামনে কয়েক হাজার সৈন্যের ছোট কয়েকটি দল যেন এক অসম্ভব চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে যায়।
মদিনায় বসে আবু বকর (রা.) পরিস্থিতির গুরুত্ব গভীরভাবে উপলব্ধি করলেন। তিনি জানতেন, এই মুহূর্তে শামের রণাঙ্গনে শুধু আবেগ বা সাহস যথেষ্ট নয়; বরং সেখানে প্রয়োজন এমন এক সামরিক প্রতিভা যিনি অসম যুদ্ধে বিজয় ছিনিয়ে আনতে সিদ্ধহস্ত। খলিফার দৃষ্টি নিবদ্ধ হলো ইরাকের দিকে, যেখানে এক দুর্জয় বীর একের পর এক পারসিক দুর্গ জয় করে চলেছেন। আবু বকর (রা.) তার বিখ্যাত উক্তিটি করলেন—‘আল্লাহর কসম! আমি শয়তানের প্ররোচনা এবং রোমানদের অহংকারকে খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের মাধ্যমে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেব।’
ইরাক ফ্রন্ট থেকে খালিদ ইবনুল ওয়ালিদকে অবিলম্বে শাম ফ্রন্টে যাওয়ার নির্দেশ পাঠানো হলো। কিন্তু সমস্যা ছিল একটাই—শাম পর্যন্ত পৌঁছানোর জন্য যে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে, তাতে অনেক সময় লেগে যাবে। অথচ আজনাদাইনে মুসলিম বাহিনীগুলো হয়তো আর বেশিদিন টিকতে পারবে না। এক সংকটময় মুহূর্তে দাঁড়িয়ে খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ গ্রহণ করলেন মানব ইতিহাসের অন্যতম দুঃসাহসিক এক সিদ্ধান্ত—মরুভূমির এক অগম্য ও পানিশূন্য পথ দিয়ে সিরিয়ায় প্রবেশের এক অসম্ভব মহাযাত্রা।
পরবর্তী পর্বে আমরা তুলে ধরব খালিদ ইবনুল ওয়ালীদের সেই কিংবদন্তিতুল্য মরুভূমি অভিযান এবং শামে পৌঁছে কীভাবে তিনি বিচ্ছিন্ন চারটি বাহিনীকে এক সুতোয় গেঁথে বাইজেন্টাইনদের দর্প চূর্ণ করেছিলেন, সেই রোমহর্ষক কাহিনি। শাম বিজয়ের ইতিহাস তখন এক নতুন ও রক্তিম মোড় নিতে যাচ্ছিল।