হোম > সাহিত্য সাময়িকী > প্রবন্ধ

আজাদির লড়াইয়ে ম্যাগনানিমাস হাদি

হিমেল রিফাত

সাতচল্লিশের আজাদির পরে যে পাকিস্তানি শোষণ আমাদের ওপর ভর করেছিল, সেটাকে পুঁজি করে ভারত এই অঞ্চলে আধিপত্যবাদের হাওয়া বইয়ে দেওয়ার নেশায় মত্ত হয়েছিল। র‌্যাডক্লিপ ও জওহরলাল নেহেরুর বন্ধুত্বের ওসিলায় আমাদের সীমান্তেও তখন অসম নীতির বণ্টনবৈষম্য তৈরি করে দিয়েছিল। ভারতের পাতানো ফাঁদে পূর্ব বাংলা ও পশ্চিম পাকিস্তানের শোষকরা একইসঙ্গে পা দিয়েছে বিধায় আজ এই অঞ্চলে এখনো আগ্রাসনের মটো রান করতে পারছে। সেই আগ্রাসনের স্বপ্নের জারিকৃত ধারাবাহিকতায় একাত্তরে গণমানুষের তীব্র আকাঙ্ক্ষার স্বাধীনতার পরও আমরা মুক্তির ভূমি পাইনি। সাংবাদিক আবুল আসাদের ‘কালো পঁচিশের আগে-পরে’ বইয়ের বর্ণনায় চোখ কপালে ওঠে—স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে কীভাবে ভারতীয়রা আমাদের সম্পদ লুট করেছে এবং কীভাবে আমাদের আজাদিকে তারা কবজা করে নিয়েছে সিমলা চুক্তির মাধ্যমে। স্বাধীনতার চুয়ান্ন বছর পেরিয়ে গেলেও আমরা এখনো ভারতীয় আধিপত্যবাদের থাবা থেকে বের হতে পারিনি, পারিনি কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতার স্বাদ নিতে। আর ভারতের এই আগ্রাসনকে ত্বরান্বিত করতে সব ধরনের বৈধতা উৎপাদন করেছে আওয়ামী লীগ নামের একটা মাফিয়া সংগঠন, সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের দালাল, বিক্রীত সেবাদাস বুদ্ধিজীবী, নৈতিকতা-বিবর্জিত শিক্ষক ও কথিত সুশীল সমাজ।

হাসিনার কৃতিত্ব ছিল সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের মটো ফলো করা। সে সাংস্কৃতিক দালালদের দিয়ে ফ্যাসিবাদের বৈধতা উৎপাদন করিয়েছিল। এই সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের মটো ভেঙে নয়া সাংস্কৃতিক ময়দান তৈরি এবং বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের সিলসিলায় সাংস্কৃতিক রাজনীতিটা পুনর্গঠনের দায়িত্ব হাতে নিয়েছিলেন জুলাই বিপ্লবের অন্যতম সম্মুখসারির সৈনিক শরীফ ওসমান হাদি। জুলাই বিপ্লবোত্তর বাংলাদেশের একজন ম্যাগনানিমাস রেভোল্যুশনারি আর্মি হচ্ছেন ওসমান হাদি। ইনকিলাব মঞ্চ নামে তিনি সাংস্কৃতিক রাজনীতির যে স্বপ্ন বাংলাদেশের মানুষদের দেখিয়েছেন এই ষোলো মাসে, তা গণমানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে আজাদির লড়াইয়ের থিম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। শরীফ ওসমান হাদি বুক চিতিয়ে দৃঢ় সংকল্প নিয়ে কালচারাল ফ্যাসিস্টদের নিশ্চিহ্ন করে দিয়ে নতুন সাংস্কৃতিক রানওয়েতে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছেন। তিনি বোল্ড স্ট্যাটমেন্ট দিয়ে ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরোধিতা করেছেন। তিনি জানেন, তার এই ভারতীয় আধিপত্যবাদবিরোধী অবস্থানের জন্য কী ভয়ংকর অনিশ্চয়তা তার জন্য অপেক্ষা করছে। তবুও তিনি আবরার ফাহাদের উত্তরসূরি হয়ে আজাদি মিছিলের সামনে বুলেটবিদ্ধ হয়ে শাহাদাতের আকাঙ্ক্ষা লালন করে তার স্বপ্নের পথে অবিচল গতিতে হেঁটে গেছেন। জীবন নিয়ে শঙ্কা হচ্ছে কি না—এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেছেন, ‘এসব অনিশ্চয়তার ভেতর দিয়েও ইনসাফ কায়েমের মতবাদ প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে শহীদ হয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টির সঙ্গে চিরকালের পথে এগিয়ে যাওয়া আমার আজন্ম আকাঙ্ক্ষার বিষয়।’ চিন্তা করেন, কী অবিশ্বাস্য আজাদি চিন্তা ও অদম্য মনোবলে তিনি বাংলাদেশপন্থি রাজনীতির গতিপথ অনুসরণ করেছেন! হাদি হৃদয়ে ভালোবাসা উজাড় করে শান্তি ও স্বাধীনতার পথে নিজেকে অর্পণ করার পণ করেছেন। এই সদিচ্ছার অপমৃত্যু নেই। “You can’t separate peace from freedom because no one can be at peace unless he has his freedom.” (Malcom X)

শরীফ ওসমান হাদিকে শেষ করা গেলেও হাজারো হাদি মুখিয়ে রবে তার অসমাপ্ত কাজগুলো সম্পন্ন করার জন্য। সুতরাং হাদিকে শেষ করা পসিবল নয়। হাদি সমুজ্জ্বল প্রদীপের আলোয় চকচক করবেন আজাদির লড়াইয়ের আইকন হিসেবে।

শরীফ ওসমান হাদি যে দর্শনের চোখ দিয়ে বাংলাদেশকে দেখতে চেয়েছেন, তা বাস্তবায়ন করা গেলে পৃথিবীর ভূস্বর্গ হয়ে উঠবে এই জমিন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাজনীতি বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করে বনানীস্থ একটা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন তিনি। দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার চিন্তা ও স্বপ্ন লালন করে ওসমান হাদি হয়ে ওঠেন রাজনৈতিক চরিত্র। শিক্ষকতা, সাংস্কৃতিক রাজনীতি, জাতিসত্তার রাজনীতি ও দেশের সভরেন্টির পাহারাদার হওয়ার পাশাপাশি তিনি একজন কবিও। সীমান্ত শরীফ ছদ্মনামে তিনি লেখালেখি করেছেন। ২০২৪ সালে তার প্রথম কবিতাগ্রন্থ প্রকাশিত হয়Ñ‘লাভায় লালশাক পুবের আকাশ’। বইয়ের উৎসর্গপত্র দেখলেই যে কেউ তার কবিতার দর্শনে মুগ্ধ হতে বাধ্য। উৎসর্গপত্রে তিনি লিখেছেন—

‘আব্বা,

যার ডাকে লাল হয়ে ওঠে শিমুলবাগান;

ঝড়ের রাইতে আজও কানে বাজে আব্বার আজান।’

তার এই দুই লাইনে তিনি তার দর্শনের সঙ্গে পরিচয় করিয়েছেন আমাদের। বিশ্বাসের গন্তব্য ও ভালোবাসা সঙ্গে নিয়ে ঈমানের সবুজ চোখ জ্যান্ত হয়ে থাকে বাবার প্রতি তার প্রেমে। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আমি আমার সততা, নৈতিকতা ও আদর্শ সবটাই বাই জেনেটিক্যালি আমার আব্বার কাছ থেকে পেয়েছি।’ রাষ্ট্র নিয়ে সাইকোপ্যাথ কিলার হাসিনা উন্নয়নের নামে যে তামাশা করে স্বৈরশাসনের বৈধতা নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন, সেই নির্মাণকে চুরমার করার স্বপ্ন ওসমান হাদির ভেতর জাগ্রত ছিল। তিনি তার কবিতায় স্যাটায়ার দিয়ে সেই উন্নয়নের কলকব্জা নড়ানোর চিন্তা লালন করতেন।

‘খোদাকে বললাম, আমি মরতে চাই

তিনি বললেন, বেঁচে আছ কে বলল?

সহস্রাব্দ উন্নয়নের সাক্ষী হিসেবে

রাজা তোমাকে মমি করে রেখেছেন।’ (আমায় ছিঁড়ে খাও হে শকুন, লাভায় লালশাক পুবের আকাশ)

রাষ্ট্রের উন্নয়নের মিথ্যা কার্পেট পায়ে মাড়িয়ে ওসমান হাদি মাটির মানুষ হতে চাইতেন। তার স্বপ্নের ভেতর স্বদেশের লাল-সবুজের পতাকা ও মানচিত্র উড্ডীন থাকত মহাকাব্যের মতো। সে যে মননে ও মস্তিষ্কে তীব্র দেশপ্রেম লালন করত, সেই মস্তিষ্ক নিয়ে তার শঙ্কাও ছিল বোঝা যায় তার কবিতায়—

‘দোহাই শুধু মস্তিষ্কটা খেয়ো না আমার

তাহলে শীঘ্রই দাস হয়ে যাবে তোমরাও।’ (আমায় ছিঁড়ে খাও হে শকুন, লাভায় লালশাক পুবের আকাশ)

ভাগ্যের নির্মম বাস্তবতা হচ্ছে, ভারতীয় আধিপত্যবাদের সেবাদাস ও আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসী দুর্বৃত্তরা বিপ্লবী শরীফ ওসমান হাদিকে ঠিক তার মস্তিষ্ক বরাবর বুলেটবিদ্ধ করেছে। তিনি যে চিন্তা ও স্বপ্ন লালন করেছেন স্বদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার তাগিদে, সেই চিন্তার দাসত্বকে তারা ভীষণ ভয় পেত। তাই মস্তিষ্কের সুস্থতা কামনা করেছেন কবি; নাহয় শীঘ্রই সবাইকে দাসত্বের ভেতর বন্দি হওয়ার দুঃসংবাদ শুনতে হবে বলে শঙ্কিত ছিলেন ওসমান হাদি। শুধু বাংলাদেশের মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং রাষ্ট্রের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আধিপত্যবাদবিরোধী আইকন হিসেবে ছিলেন না তিনি। সারা বিশ্বের সকল প্রান্তে মজলুম মানুষের জন্য তার প্রেম অনন্ত যৌবন খুঁজে পায়। তিনি পৃথিবীর ইতিহাসে ক্রমাগত চলমান গাজার নৃশংসতা পাঠ করেছেন তার কবিতায়।

‘সভ্যতার এ শ্বেত শতাব্দীতে

গাজায় বারুদ নাচে উদ্দাম বিমানে

সহস্র সংসার হয়ে যায় প্রকাশ্য হিরোশিমা

চাম্বল পাতার মতো উড়ে যায় শিশুদের প্রাণ

মায়েরা খুলি কুড়িয়ে জোড়া দেয় ছিন্নভিন্ন মাথা

রক্তের ফিনকিতে ছিঁড়ে যায় আজরাইলের খাতা!’ (আগুন কি আলো নয়? লাভায় লালশাক পুবের আকাশ)

এই যে ফিলিস্তিনে আগ্রাসী ইসরাইলের চালানো গণহত্যার মানচিত্র ওসমান হাদি তার কবিতায় হাজির করেছেন মহাকবিদের ঢঙে। বর্ণনা ও উপস্থাপন যেন রূপকের রঙিন বাস্তবতার মতো সত্য। তার এই দেশপ্রেম, সাংস্কৃতিক রাজনীতি, সাহিত্যচর্চা, ইনটেলেকচুয়াল থট এবং আধিপত্যবাদবিরোধী চেতনা আমি আমার জীবনের রাজনৈতিক মটো হিসেবে নির্ধারণ করেছি।

জার্মান যাজক মার্টিন নিমোলার সেই পরিস্থিতি নির্মাণ করেছেন তার কবিতায়—

❝যখন তারা অন্যদের নিতে এলো, আমি চুপ রইলাম।

কারণ আমি তাদের একজন ছিলাম না।

শেষে যখন তারা আমাকে নিতে এলো—

তখন কথা বলার মতো আর কেউ রইল না।❞

বন্দুকের শুট যদি হাদি ভয় পেত তাহলে সে ‘জান দেব জুলাই দেব না’ বলে রাজপথে নেমে আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে সিনা টানটান করে ভয়েস রেইজ করত না। জান দেওয়ার মতো বিপন্ন ও সংকটাপন্ন অবস্থায় পর্যবসিত হয়ে ওসমান হাদি জানান দিয়েছেন, জীবনের বিনিময়েও জুলাই অক্ষত ও সবুজ রাখব আমরা এবং এভাবে বন্দুক দিয়ে বা হত্যা করে কণ্ঠ থামানো গেলে আবরার ফাহাদের পর পরম্পরায় এসে আজকের ওসমান হাদি দাঁড়াত না। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মানুষ আজাদি মিছিলে মুখর করতে পারে বুকের জমিন। ১৯৩৫ সালে জন্ম নেওয়া জার্মানির আরেক কবি কার্ল মাইকেল তার ‘দেশ’ কবিতায় আমাদের কথা বলা ও গানের আওয়াজ তোলার কথা স্মরণ করিয়ে দেন—

‘আমাদের কথা বলতে দিন

আমরা বোবা নই/আমরা পাথর নই

আমাদের মৃতদেহেরও ইচ্ছা আছে

আমাদের গান গাইতে দিন

আমরা বন্দুক নই

তোমাদের আঙুলের অপেক্ষায়

আমার ট্রিগার/না খেয়ে মরে যাবে না।’

আমরা কথা বলবই। আবরার ফাহাদ ও ওসমান হাদিদের স্বপ্নের আধিপত্যবাদবিরোধী বাংলাদেশ গড়ার এই বিপ্লবে আমরা অনন্তকাল প্রোজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো সরগরম করতে থাকব ভূখণ্ডে। বন্দুকের সামনে দাঁড়িয়েও স্বদেশের কথা বলব এবং মরে গিয়েও বাংলাদেশপন্থিদের চেতনায় আগ্রাসনবিরোধী স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখব।

হাছন মানসের ধারা ও তার সাহিত্য (শেষ পর্ব)

আত্মজীবনী: যেভাবে বেড়ে উঠি

যে স্বপ্ন ছফাকে ঘুমোতে দেয়নি

বই কীভাবে বিপ্লবকে প্রভাবিত করে?

কবিরা যা বলেন

৭০ বছর পূর্তি: বাংলা একাডেমির ভবিষ্যৎ

উপন্যাস : অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ

৩৬ জুলাই: ঐতিহ্যবাদী বিপ্লব ও বাঙালি মুসলিম ফিউচারিটি (১ম পর্ব)

লেইস ফিতা ও জাদুর বাক্স

হুমায়ূন আহমেদ ও বাংলা কথাসাহিত্যের ঘরে ফেরা (শেষ পর্ব)