মিলাদুন্নবী ঘিরে আজ আমরা মুসলিম বিশ্বের প্রায় প্রতিটি জায়গায় যে উৎসব দেখি, তার কোনো একক শুরু নেই; আছে বহু শুরু, বহু ভূগোল, বহু শতাব্দী জুড়ে ছড়িয়ে থাকা একটি দীর্ঘ যাত্রা। আর সেই যাত্রাটা বুঝতে হলে আমাদের ধীরে ধীরে হাঁটতে হবে। হাঁটতে হয় শতাব্দীর পর শতাব্দী, রাজদরবার থেকে খানকা, কবির কলম থেকে পথের মিছিল, একের পর এক ভূখণ্ড পেরিয়ে।
নবীজির নিজের জীবদ্দশায় তাঁর জন্মদিন উপলক্ষে ‘আলাদা’ কোনো অনুষ্ঠান বা উৎসবের প্রচলন ছিল না। কারণ, সাহাবায়ে কেরামের কাছে প্রতিটি সময়ই ছিল উৎসবের! প্রতি মুহূর্তে তাঁর দেখা পাওয়া, প্রতিটি মুহূর্তে জগতের সবচেয়ে সৌন্দর্য দেখতে পাওয়া—সে কত মনোহর দৃশ্য!
প্রথম প্রজন্মের মুসলিমদের কাছে নবীপ্রেম প্রকাশের মাধ্যম ছিল তাঁর সুন্নাহ অনুসরণ করা, তাঁর প্রতিটি হাদিস মুখস্থ রাখা, তাঁর জীবনের ঘটনা এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে মুখে মুখে বলে যাওয়া, রণাঙ্গনে তাঁর নাম নিয়ে অগ্রসর হওয়া, নামাজের প্রতিটি রাকাতে ভালোবেসে তাঁর প্রতি দরুদ পাঠ করা। কোনো নির্দিষ্ট দিনে সমবেত হয়ে আলাদা উৎসব করার রীতি তখনো জন্ম নেয়নি। কারণ, ভালোবাসা তখন বিচ্ছুরিত ছিল জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে; কোনো একটি দিনে ঘনীভূত হওয়ার প্রয়োজন পড়েনি। এই দীর্ঘ নীরবতা, প্রায় ৩৫০ বছরের নীরবতা, ভাঙে হিজরি চতুর্থ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে, মিসরের মাটিতে।
দশম শতাব্দীর কায়রো তখন এক জমজমাট রাজধানী, ফাতেমীয় খিলাফতের কেন্দ্র। এই রাজবংশ তখন শাসন করছে উত্তর আফ্রিকা থেকে শুরু করে পশ্চিম এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চল। ফাতেমীয় দরবারে বছরজুড়ে চলত একের পর এক আনুষ্ঠানিক উদযাপন—নওরোজ, রজবের প্রথম রাত, শাবানের মাঝামাঝি রাত। আর এই দীর্ঘ তালিকায় যুক্ত হয় নবীজির জন্মদিন।
নবীজির জন্মদিন পালিত হতো রবিউল আউয়ালের ১২ তারিখে, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায়, দরবারের জাঁকজমকে, মিষ্টান্ন বিতরণ ও প্রদীপ প্রজ্বালনের মধ্য দিয়ে। এই রীতি প্রায় ১০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে কায়রোর সমাজে টিকে ছিল, এখনো আছে। আজও কায়রোর অলিগলিতে মিলাদুন্নবী উপলক্ষে বিক্রি হয় রঙিন চিনির পুতুল, যাকে বলা হয় আরুসাতুল মাওলিদ। ছেলেদের জন্য ঘোড়সওয়ার আকৃতির আর মেয়েদের জন্য কনে সাজে সজ্জিত পুতুল—দোকানে দোকানে সাজানো থাকে বাহারি রঙের এই মিষ্টান্ন। আজও মিসরীয় পরিবারে সন্ধ্যার পর বিশেষ খাবার তৈরির আয়োজন হয়। রুজ বি লাবান নামের দুধ ও চাল দিয়ে তৈরি একটি মিষ্টি পায়েস ছোট ছোট পাত্রে করে প্রতিবেশী ও পথচারীদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। এই লোকজ ঐতিহ্যের শিকড় হাজার বছর আগের সেই ফাতেমীয় দরবারি সংস্কৃতিতেই প্রোথিত।
ফাতেমীয়দের এই উদ্যোগের পর প্রায় ২০০ বছর কেটে যায়। সুন্নি মুসলিম বিশ্বে তখনো এই ধরনের আনুষ্ঠানিক স্মরণের প্রচলন হয়নি। এই নীরবতা ভাঙে সপ্তম হিজরি শতাব্দীতে, ইরাকের উত্তরাঞ্চলের ছোট্ট রাজ্য ইরবিলে, যেখানে সিংহাসনে বসে আছেন আবু সাঈদ মুজাফফর উদ্দিন কুকুবুরি—একজন সুন্নি শাসক, বিদ্যানুরাগী ও কাব্যরসিক বলে ইতিহাসে পরিচিত। ৬০৪ হিজরি সাল থেকে তিনি একেবারে নতুন করে, বিপুল আড়ম্বরে এই স্মরণকে পুনরুজ্জীবিত করেন। আর এবার তা হয়ে ওঠে সুন্নি মুসলিম বিশ্বের প্রথম বড় আকারের মিলাদ উদযাপন।
ইতিহাসবিদ ইবনে খাল্লিকান তাঁর বিখ্যাত জীবনীগ্রন্থে এই আয়োজনের বিবরণ রেখে গেছেন। অন্যান্য সূত্র অনুযায়ী, কুকুবুরি প্রতিবছর এই উৎসবের পেছনে ব্যয় করতেন প্রায় ৩ লাখ মুদ্রা, যা সেই সময়ের হিসাবে একটি বিশাল অঙ্ক। দিনের বেলায় অনুষ্ঠিত এই উৎসবে শাসক নিজে উপস্থিত থেকে নেতৃত্ব দিতেন। বিশাল তাঁবু খাটানো হতো শহরের বাইরে। সেখানে সমবেত হতেন দূরদূরান্তের আলেম, কবি, সুফি-সাধক ও সাধারণ মানুষ। কোরআন তিলাওয়াত হতো নিরবচ্ছিন্নভাবে, খুতবায় আলোচনা হতো সিরাত, নবী পরিবার তথা আহলে বাইতকে নিয়ে। পশু কোরবানি করে বিপুল ভোজের আয়োজন করা হতো, হাজারো মানুষকে একসঙ্গে বসিয়ে খাওয়ানো হতো। রাতে জ্বলে উঠত অসংখ্য মোমবাতি ও মশাল। শহরের অলিগলি আলোকিত হয়ে উঠত সেই আলোয়। আর সুফি দরবেশরা সমবেত হয়ে সামা ও জিকিরের মাহফিল বসাতেন, নাচ ও সুরের মধ্য দিয়ে আধ্যাত্মিক উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতেন।
এই উৎসবে আকৃষ্ট হয়ে সেই সময়ের একজন পণ্ডিত, স্পেন থেকে আসা আবুল খাত্তাব ইবনে দিহয়া, মিলাদ উদযাপনের সমর্থনে একটি গোটা গ্রন্থ রচনা করে বাদশাহকে উপহার দেন। নাম দেন ‘কিতাবুত তানবীর’। বাদশাহ এই গ্রন্থ পড়ে এতটাই সন্তুষ্ট হন যে লেখককে পুরস্কার দেন এক হাজার স্বর্ণমুদ্রা। কুকুবুরির এই উদ্যোগের পরই মূলত সুন্নি মুসলিম বিশ্বে মিলাদ উদযাপনের রীতি একের পর এক শহরে, একের পর এক রাজ্যে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। ধীরে ধীরে তা হয়ে ওঠে সুন্নি মুসলিম সংস্কৃতির একটি পরিচিত অংশ।
কুকুবুরির ইরবিল থেকে সময় আরো দুই শতাব্দী এগিয়ে আমরা পৌঁছাই উসমানীয় সাম্রাজ্যে, চতুর্দশ শতাব্দীর শেষভাগে, বুরসা শহরে, যেখানে বসবাস করতেন কবি সুলাইমান চেলেবি। তিনি রচনা করেন একটি দীর্ঘ কবিতা, তুর্কি ভাষায়, নাম ‘মেভলিদ ই শরিফ’। নবীজির জন্ম থেকে শুরু করে তার জীবনের বিভিন্ন পর্ব এই কবিতায় বর্ণিত হয় গভীর ভক্তি ও কাব্যিক সৌন্দর্যের সঙ্গে। বিশেষত নবীজির জন্মমুহূর্তের বর্ণনায় যে আবেগময় ছন্দ ব্যবহার করা হয়েছে, তা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে শ্রোতাদের চোখে পানি এনে দিয়েছে।
উসমানীয় সমাজে এই কবিতা এমনভাবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে, তা আর শুধু জন্মদিনের উৎসবে সীমাবদ্ধ থাকে না। বিয়ের অনুষ্ঠান, নবজাতকের নামকরণ, এমনকি মৃত্যুর পর শোকপালনের অনুষ্ঠানেও এই কবিতা আবৃত্তি করার রীতি চালু হয়ে যায়। ঘরে ঘরে সন্ধ্যাবেলায় পরিবার সমবেত হয়ে এই কবিতা শোনার একটি নিয়মিত অভ্যাস গড়ে ওঠে। মায়েরা সন্তানদের কোলে নিয়ে এই কবিতার সুরে ঘুম পাড়াতেন, বৃদ্ধরা এই কবিতা মুখস্থ বলে যেতেন।
উসমানীয় যুগে সুলাইমান চেলেবির এই কবিতার পাশাপাশি আরো অনেক কবি নিজস্ব মেভলিদ রচনা করেছেন। প্রতিটি অঞ্চলের নিজস্ব সুর ও পরিবেশনার রীতি তৈরি হয়েছে। আজও তুরস্কে রবিউল আউয়াল মাসে রাষ্ট্রীয়ভাবে পালিত হয় মেভলিদ কান্দিলি। মসজিদে মসজিদে এই ঐতিহ্যবাহী কবিতা আবৃত্তি করা হয়, মিনার থেকে বিশেষ আলোকসজ্জা করা হয়, সন্ধ্যাবেলায় ঘরে ঘরেও একই রীতি অনুসরণ করা হয়। উসমানীয়দের হাতে মিলাদ উদযাপন তাই মূলত হয়ে ওঠে একটি সাহিত্যিক ও পারিবারিক অনুষ্ঠান—রাজপথের জাঁকজমকের চেয়ে অনেক বেশি ঘরোয়া, অনেক বেশি কাব্যকেন্দ্রিক, অনেক বেশি নিভৃত।
একই সময়ের কাছাকাছি ভারতীয় উপমহাদেশে মোগল দরবারে এই স্মরণ মিশে যায় আরেক ধরনের কাব্যসংস্কৃতির সঙ্গে। দরবারি কবিরা নবীপ্রশস্তিতে কবিতা রচনা করতেন সম্রাটদের পৃষ্ঠপোষকতায়। দিল্লি ও আগ্রার দরবারে নাত রচনা একটি মর্যাদাপূর্ণ সাহিত্যিক চর্চা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। এই একই উপমহাদেশে, দাক্ষিণাত্যে, পরে গড়ে ওঠে মাওলিদ উদযাপনের এক জমকালো ধারা, বিশেষত হায়দরাবাদে, যা আজও ধর্মীয় সভা, রাতব্যাপী প্রার্থনা, বিশাল সমাবেশ, কুচকাওয়াজ ও বর্ণিল সাজসজ্জার জন্য বিখ্যাত। অমুসলিম-প্রধান দেশ হয়েও ভারত এই ক্ষেত্রে মুসলিম বিশ্বের অন্যতম বড় আয়োজক হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। রাস্তায় রাস্তায় সবুজ রঙের আলোকসজ্জা, মসজিদে মসজিদে সমবেত নাত পাঠ এবং রাত জেগে ধর্মীয় আলোচনার এক গভীর সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে।
বাংলায় এই আয়োজন রূপ নিয়েছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক মাধ্যমে—পুঁথিসাহিত্যে। ষোড়শ শতাব্দীতে সৈয়দ সুলতানের মতো কবিরা রচনা করেন ‘নবীবংশ’ কাব্য। নবীজির জীবনকাহিনি বাংলার নিজস্ব পয়ার ছন্দে বিবৃত হয়। আরবের মরুভূমির কাহিনি বাংলার নদীবিধৌত জনপদের ভাষায় ধরা দেয়। এই কাব্যে রাজকীয় জাঁকজমক নেই; আছে গ্রামবাংলার সহজ শ্রোতার কাছে পৌঁছানোর একটি আন্তরিক প্রচেষ্টা। কোনো কথক গ্রামের চণ্ডীমণ্ডপে বসে যেভাবে পুরাণকথা বলতেন, ঠিক সেই একই ঢঙে নবীজির জীবনকাহিনি বলা হয়েছে এই পুঁথিতে। শেখ পরানের মতো কবিরাও এই ধারাকে আরো সমৃদ্ধ করেছেন। আর এভাবেই গড়ে উঠেছে বাংলার নিজস্ব একটি নাত ঐতিহ্য, যা আরবি-ফারসি মূল উৎস থেকে প্রেরণা নিলেও পুরোপুরি বাংলার রঙে রঙিন হয়েছে।
সাগর পেরিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়, জাভা দ্বীপে ইসলাম প্রবেশের পর সেখানকার সুলতানি দরবারগুলো এই স্মরণকে মিশিয়ে নেয় নিজস্ব সাংস্কৃতিক রীতির সঙ্গে। জাভার দরবারে গামেলান বাদ্যযন্ত্রের সুরে, স্থানীয় মেলা ও বাজারের আবহে নবীজির জন্মদিন পালিত হতে থাকে। ইসলামি ভক্তি ও জাভানীয় দরবারি সংস্কৃতির এক অনন্য মিশ্রণ ঘটে সেখানে, যা আজও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মুসলিম সংস্কৃতির একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য হয়ে আছে।
উত্তর আফ্রিকার অন্যান্য অঞ্চলও এই উৎসব নিজস্ব রূপ পেয়েছে। তিউনিসিয়ার কাইরাওয়ান শহরে মানুষ নবীজির প্রশংসায় নাশিদ আবৃত্তি করেন সমবেতভাবে, আর ঘরে ঘরে তৈরি হয় আসিদা জগগুউ নামের একটি বিশেষ মিষ্টান্ন। গমের আটা, বাদাম ও মধু দিয়ে তৈরি এই খাবার পরিবারের সবাই মিলে ভাগ করে খান। মরক্কোয় ফেজ শহরকে ঘিরে গড়ে ওঠা প্রাচীন ইসলামি ঐতিহ্যের প্রেক্ষাপটে মিলাদ উদযাপনের নিজস্ব একটি ধারা আছে।
প্রতিটি অঞ্চল তার নিজস্ব খাদ্যসংস্কৃতি ও ভাষায় এই একই আনন্দকে ধরে রেখেছে শতাব্দীর পর শতাব্দী—কোথাও মিষ্টান্নে, কোথাও কবিতায়, কোথাও সমবেত গানে।
বিংশ শতাব্দীতে উপমহাদেশের আরেক প্রান্তে, পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের হরিপুরে, সিরিকোট শরিফ নামের একটি খানকা। সেখানকার কাদেরিয়া তরিকার পীর সৈয়দ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ ১৯৭৪ সালে চট্টগ্রামে প্রবর্তন করেন এক নতুন ধরনের মিলাদ উদযাপন—রাজপথে শোভাযাত্রার আকারে, যাকে বলা হয় ‘জশনে জুলুস’। তিনি এই শোভাযাত্রার নেতৃত্ব দেন ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত। তাঁর ইন্তেকালের পর এই দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন তাঁরই পুত্র সৈয়দ মুহাম্মদ তাহের শাহ, যিনি ১৯৮৭ সাল থেকে আজ পর্যন্ত অন্তত ৫১ বারের বেশি এই জুলুসের নেতৃত্ব দিয়েছেন, প্রতিবছর পাকিস্তান থেকে চট্টগ্রামে এসে।
চট্টগ্রামের এই শোভাযাত্রা স্থানীয়ভাবে জন্ম নেওয়া বাঙালি সুফি ঐতিহ্য না হলেও বর্তমানে বিপুল জনপ্রিয়তা পাওয়া একটি রীতি, যা ঈদে মিলাদুন্নবীর মূল বিষয় হয়ে উঠেছে।