হোম > সাহিত্য সাময়িকী > প্রবন্ধ

কোরবান

শেখ ফাহিম ফয়সাল

জীবনে অনেক কিছু কোরবানি দিতে হলো। কখনো বলি, কোরবানি দেওয়া হবে। আবার বলি, জীবনে কম তো কোরবানি করিনি। আর প্রতিবারই শব্দটা আমাদের কানে একটা কথাই মনে করায়। তা হলো, ত্যাগের ও হারানোর বিষয়। বর্তমানে, বাংলা বাগধারায় কোরবানি মানে, প্রায় নিরঙ্কুশভাবে বিসর্জন, যা ছেড়ে দিতে হয়, যা খোয়াতে হয়, অথবা রক্ত ঝরানো। কোরবানি শব্দটা শুনলেই আমাদের মনে সেই ক্ষতির হিসাবটাই আসে।

অথচ ইন্ট্রারেস্টিং ব্যাপার হলো, এই শব্দটি নিজে কখনো ক্ষতির কথা বলে না। আমরাই বহু শতাব্দীর অভ্যাসে তাকে শুধু ক্ষতির অর্থের আয়নায় দেখতে শুরু করেছি। আমরাই ঠেলে দিয়েছি ক্ষতির দিকে। আর সে বেচারা নিজের আদি অর্থটিকে নিজের ভেতরে লুকিয়ে রেখেছে।

কোরবানি এসেছে আরবি কোরবান থেকে আর কোরবান দাঁড়িয়ে আছে আরবি হরফ ‘কাফ-রা-বা’ এই তিন অক্ষরের মূল থেকে। যে মূলের প্রাথমিক এমনকি কেন্দ্রীয় অর্থও ‘ক্ষতি’ নয়। এমনকি ত্যাগ বা রক্তপাতও না। বরং, নৈকট্য আসা, কাছে থাকা বা কাছে আসা। এই মূল থেকেই আসে কুরব—অর্থাৎ নিকটতা। আরো আসে কারিব, যে কাছের। কিংবা আসে তাকাররুব—অর্থাৎ ক্রমে কাছে এগিয়ে যাওয়া।

কোরবান মানে আক্ষরিকভাবে সেই বস্তু বা সেই কাজ, যার মধ্য দিয়ে কাছে আসা যায়।

শব্দটির ভেতরে হারানোর কোনো ইঙ্গিত পর্যন্ত নেই। আছে শুধু নৈকট্যে নিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি। সে নৈকট্য অর্জন করার মাধ্যম। পশুটি হারানোর জন্য কাটা পড়ে না, সে কাটা পড়ে একটা দূরত্ব ঘোচানোর উপলক্ষ হয়ে, খোদা ও বান্দার মধ্যে মিলনের মাধ্যম হয়ে। আর এই নৈকট্যের মূল বিষয়টি গোটা সেমিটিক জগতেও আছে বহু আগে থেকেই। হিব্রু ভাষায় উৎসর্গকে বলা হয় কোরবান, একই মূল থেকেই কিন্তু। আর সেখানে যে ক্রিয়াপদটি উৎসর্গ-প্রক্রিয়াকে বোঝায়। অর্থও এ রকম, যেমন : সরাসরি কাছে আনা বা কাছে নিয়ে যাওয়া। অর্থাৎ, এক প্রাচীন সেমিটিক চিন্তাধারাও উৎসর্গকে কখনো ‘খোয়ানো’ হিসেবে দেখেনি। দেখেছে নৈকট্যের একটা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সিঁড়ি হিসেবে।

আর এখানে এসে শব্দতত্ত্ব ও মানুষের প্রাগৈতিহাস মিলে যায়। কারণ, ঐতিহাসিকভাবে আমরা দেখি যে, মানুষ যাকে কোরবানি করে, সে কিন্তু নিছক কোনো পশু না। আসলে, সে পরিবারের সবচেয়ে পুরোনো একজন সদস্য। গরু, ছাগল, ভেড়া, উট ইত্যাদি যে প্রাণীগুলো ঈদের সকালে আমাদের ছুরির সামনে আসে, তাদের প্রায় প্রতিটিকেই মানুষ পোষ মানিয়েছে আজ থেকে দশ-এগারো হাজার বছর আগে। কৃষিসভ্যতার একেবারে ঊষাকালে, উর্বর অর্ধচন্দ্রের পাহাড়-উপত্যকায়। বুনো ষাঁড়কে গরু বানানো, পাহাড়ি ছাগলকে গৃহস্থের ছাগল বানানো, এগুলো ছিল মানুষের ইতিহাসের অন্যতম দীর্ঘ ও ঘনিষ্ঠ চুক্তি। চুক্তি বলার কারণ হলো, এতে মানুষ ও পশু, দু-দলেরই লাভ ছিল, তাই চুক্তি বলা যায়।

যেখানে একটা গোটা প্রাণীগোষ্ঠীর বিবর্তনের গতিপথ মানুষ নিজের রান্নাঘরের দিকে নিয়ে এসেছে। অর্থাৎ, আমরা যাকে কোরবান করি, সে আক্ষরিক অর্থেই আমাদের কারিব বা কাছের জন এবং রক্তসম্পর্কহীন আত্মীয়ও! শুধু ব্যুৎপত্তির হিসেবেই না, রক্তে-মাংসে, হাজার বছরের সাহচর্যে। সেজন্যই তার নামকরণ ছিল, পশুর নামকরণের ইতিহাসও পুরোনো। আবার, এই নামকরণ ইসলাম ধর্মে, সুন্নতও। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতিটি জিনিসের নামকরণ করতেন। যেমন : তার বেশি ব্যবহৃত ঘোড়াগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত ছিল ‘আস-সাকব’। ‘আল-মুরতাজিজ’ নবীজির বিশেষ ঘোড়ার নাম। ‘কাসওয়া’ ছিল নবীজির বিখ্যাত উটনী। হিজরত ও বিদায় হজের সঙ্গে এই উটনী নাম বিশেষভাবে জড়িত। ‘আল-আদবা’ দ্রুতগতির আরেক উটনী। ‘দুলদুল’ ছিল খচ্চরের নাম। ইয়াফুর বা উফাইর ছিল গাধার নাম।

যা বলছিলাম।

বাংলার বদ্বীপে এই আন্তঃসম্পর্ক আরো গাঢ়, কারণ এখানে গরুকে কেউ কখনো শুধু ‘মাংস’ হিসেবে বিবেচনা করেনি। সে লাঙলের শক্তি, সে দুধের উৎস, সে জমির সার, সে সমগ্র কৃষি-অর্থনীতির অদৃশ্য এক মেরুদণ্ড। বাংলার কৃষক-সমাজটাই গড়ে উঠেছে এই গরু আর লাঙল আর জলকাদার ত্রিভুজের ভেতরে। ফলে কোরবানির পশুর গায়ে যে মায়াটুকু আমরা টের পাই, সেটা স্রেফ ভাবালুতা ভাবলে ভুল হবে। এটা ১০ হাজার বছরের পুরোনো এক সহাবস্থানের স্মৃতি।

এখানেই শব্দের ভেতরের প্যারাডক্সটা পূর্ণ হয়। যে শব্দের মজ্জাগত অর্থ হলো ঘনিষ্ঠতা, যে শব্দ গড়াই হয়েছিল আলিঙ্গনের জন্য, সেই শব্দ বাংলায় কিংবা হয়তো পুরো জগতেই বর্তমানে এসে দাঁড়িয়েছে শুধু ক্ষতের প্রতিশব্দ হয়ে। আমার মনে হয়, শব্দের ব্যুৎপত্তি আসলে একধরনের চাপাপড়া ধর্মতত্ত্ব।

আর উৎসর্গ জিনিসটা কত পুরোনো, সেটি মনে রাখলে আমাদের ভেতরকার একটা অস্বস্তিও খানিকটা বোঝা যায়। ধর্মীয় উৎসর্গ মানবসভ্যতার প্রাচীনতম আচারগুলোর একটি। ইব্রাহিমি ধর্মগুলোর জন্মেরও বহু আগের। পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি প্রাচীন সংস্কৃতি কোনো না কোনোভাবে প্রাণী উৎসর্গ করেছে আর প্রায় প্রতিটি সংস্কৃতিই সেই ভারটা বইবার জন্য নিজের মতো করে কিছু মতামত গড়ে তুলেছে। সেই ভাইরাল দাবিটার কথা মনে পড়ল, যা কয়েক বছর আগেও প্রতি কোরবানির ঈদে ঘুরে বেড়াত। সেখানে বলা হয়, বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে দেখা গেছে বা গবেষণায় দেখা গেছে, ধর্মীয় রীতিতে উৎসর্গের জন্য নির্দিষ্ট পশু নাকি কোরবানির সময় ব্যথা পায় না। শুধু মুসলমানরাই নন, নানা ধর্মের কিছু মানুষই নিজেদের পবিত্র উৎসর্গের পশু সম্পর্কে এ ধরনের কথা বলে থাকেন। আমার নিজের কাছে দাবিটা বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় না। যে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা হাজির করা হয় বা কোনো কোনো পুরোনো গবেষণা, যেখানে দাবি করা হয়েছিল ধর্মীয় পদ্ধতির কোরবানিতে যন্ত্রণা কম, সেগুলোও মীমাংসিত নয় মোটেও। এই যে দাবিগুলো করা হচ্ছে, এই ভাষ্যের বরাত দেওয়া হচ্ছে বিজ্ঞানকে! ধর্মীয় শাস্ত্র বললে মেনে নিতাম, কিন্তু এই জায়গায় বিজ্ঞান থেকে ধর্মের সার্টিফিকেট নেওয়া হচ্ছে। খালিদ মহিউদ্দিন কয়েক বছর আগে সলিমুল্লাহ খানকে এই প্রশ্ন করেছিল যে, স্যার, ধর্মের কি বিজ্ঞানের বৈধতা নেওয়া দরকার আছে? উত্তর কী দিয়েছিল মনে নেই। তবে এই প্রসঙ্গে নগরবাউল জেমস বলেছিলেন, জাকলাকা জাকলাকা জাকলাকা দেহ দোলা না।

প্রসঙ্গে ফিরি।

প্রাণী কল্যাণের বহু বিশেষজ্ঞ আজও মনে করেন কাটার মুহূর্ত থেকে চেতনা লোপ পাওয়ার মাঝখানের সময়টুকু যন্ত্রণাহীন নয়। অর্থাৎ লোকজ আশ্বাস আর আধাবৈজ্ঞানিক বিশ্বাস, কোনোটাই সত্যিকারের না। জীবন্ত শরীর যা টের পায়, এই শরীরও সম্ভবত তা-ই টের পায়।

কিন্তু এর পাশাপাশি একটা তৃতীয় ব্যাখ্যা আছে, যাকে এই দুটোর সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা ঠিক নয়। সেটি হলো, সেই মুহূর্তে আল্লাহ তার রহমতের চাদরে প্রাণীটিকে আবৃত করে নেন। এই কথাটা মাপজোখের আওতার কথা না, অদৃশ্যের কথা। তাই, গবেষণাগারেও যাচাই করা যায় না। এটা অন্য এক স্তরের জ্ঞান। লোকমুখের ওই ‘ব্যথা পায় না’ দাবি আর এই রহমতের ব্যাখ্যা এক জিনিস নয়। প্রথমটি একটা যাচাইযোগ্য জাগতিক দাবি, যা যাচাইয়ে টেকে না আর দ্বিতীয়টি বিশ্বাসের ব্যাপার, যেটি মানা যায় এবং আমি এটা মানি।

বাস্তুতন্ত্রের প্রশ্ন তো আছেই, এটা বাইরে, মানুষ ও পশুর এই যে মৈত্রী, এই যে সত্যিকারের মায়া আমাদের ভেতরে নড়ে ওঠে, এটা সহজ ব্যাপার না।

কোরবানির একটা গরু হয়ে ওঠা ঠিক কেমন, সেই অভিজ্ঞতাটা আমাদের কাছে চিরকাল বন্ধ। ফলে ‘সে ব্যথা পায় কি পায় না’ এই প্রশ্নটা শেষ পর্যন্ত এমন একটা প্রাচীরে গিয়ে ঠেকে, যার ওপাশে আমাদের কোনো জানালা নেই। আর তারপর আসে সবচেয়ে কঠিন একটা বিষয়। ধর্মীয় কারণেই তো পশুটিকে আমরা উৎসর্গ করি, কিন্তু সেই উৎসর্গের আসল মর্মটা কি আমরা সত্যিই ছুঁতে পারি? একটা অপরাধবোধ মাথা তোলে। মনে হয়, আল্লাহ না করুন, কোরবানিটা যদি কবুল না হয়, তাহলে তো প্রাণীটা আমার কারণে শুধু শুধু প্রাণ দিল! অথচ তার তো কোনো দোষ নেই, দোষ নেই শাস্ত্রেরও। দোষ যদি কোথাও থাকে, সে আমার নিয়তে, আমার অপ্রস্তুত অন্তরে। এই ভাবনাটা এক ধরনের আধ্যাত্মিক মাথাঘোরা তৈরি করে আর ঠিক তখনই মন চায় কোরবানির বাইরের রক্ত-মাংস পেরিয়ে, তার আত্মিক মর্মের কাছাকাছি পৌঁছাতে।

এই অস্বস্তিটা আমাদের কালে আরো তীব্র, আর সেটারও একটা ইতিহাস আছে। মধ্যযুগের বাঙালি কৃষকের কাছে প্রাণী জবাই কোনো লুকোনো ব্যাপার ছিল না। তার গরু তার উঠানেই বাঁধা থাকত, তার অর্থনীতির ভেতরেই থাকত আর জবাইটাও হতো খোলা চোখের সামনে, শিশুরাও দেখত।

শিল্পবিপ্লব এসে এই সম্পর্কটা পাল্টে দিল। আধুনিকতা কসাইখানার দেয়াল তুলে হত্যাকে শহুরে চোখের আড়ালে সরিয়ে নিল, ঊনবিংশ শতকের নগরে গড়ে উঠল আলাদা কসাইখানা আর সভ্যতা ক্রমে শহরের মানুষকে শিখিয়ে দিল কীভাবে মাংস খেতে হয় অথচ মৃত্যুটা কখনো না দেখেই! অথচ আমার নানা ভাইয়ার মুখে শুনেছি, একটা মুরগি জবাই করলেও অনেক মায়া লাগে, যা আজকাল আর লাগে না। কারণ, আমরা চোখের সামনে তা দেখতে পাই না, কীভাবে কাতরাতে কাতরাতে একটা প্রাণ চলে যায় শূন্যতায়।

আজকের কোরবানির পশু ক্রমেই হয়ে উঠছে খামারে মোটাতাজা করা একটা পণ্য, সম্পূরক খাবারে ফোলানো, কোনোদিন মাঠ না-দেখা একটা শরীর, যাকে আমরা চিনি ঈদের তিন দিন আগে থেকে। আর শিল্পায়িত পশুপালনের এই জলবায়ু-ভার, এর মিথেন, এর জমি-পানি-খাদ্যের হিসাব তো আছেই। ফলে ঈদের সকালে শহুরে মুসলমানের ভেতরে যে অপরাধবোধটা জাগে কি না জানি না। অন্তত অপরাধবোধ জাগা উচিত।

যে প্রাণীটা মাত্র তিন দিন আগে পণ্য হিসেবে ঘরে এলো, তার সঙ্গে সত্যিকারের মায়ার সম্পর্ক পাতানোও কঠিন। মধ্যযুগের কৃষক, যে গরুর সঙ্গে এক বছর ঘর করেছে, তার বিদায়ের ভার আর আমাদের তিন দিনের পরিচয়ের ভার এক নয়।

এমন মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন আসলে নিজে নিজে কোনোদিন থামবে না। এখানে এসে একটা জরুরি কথা মনে রাখা দরকার। আমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণকারী, আর সেই আত্মসমর্পণের ভেতরে আমাদের আকলও—অর্থাৎ ইন্টেলেক্ট। আমাদের বিচারবুদ্ধি, যুক্তির ক্ষমতাও এর অন্তর্ভুক্ত। আমাদের বুদ্ধির সাধ্য কম নয়, সে বহু কিছুরই তল পায়। আকলকে আল্লাহর কাছে সঁপে দেওয়ার মানে হলো এইটুকু মেনে নেওয়া যে, কোনটায় আমার কল্যাণ আর কোনটায় অকল্যাণ, সেটা আমার চেয়ে ভালো জানেন আল্লাহ। খোদার প্রতিটি নির্দেশের গভীরতম যুক্তি পর্যন্ত আমরা পৌঁছাতে পারিনি। এই যে হজের মৌসুম চলছে, কেন সাফা-মারওয়া দৌড়াতে হবে? বিবি হাজেরা পানির জন্য দৌড়েছিলেন, সেটি আল্লাহর পছন্দ হয়েছে, তাই। এখানে যুক্তি চলবে না। খোদার আদেশ, ব্যাস! অথবা, ঠিক কেন দিনে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ এই নির্দিষ্ট আকারেই আদায় করতে হবে? আকলের মূল কারণটা যুক্তি দিয়ে টেনে বের করতে পারবে না। আকল হয়তো প্রশ্ন তুলবে, একটা কাওয়ালির ভেতরে, দরগার আঙিনায় সামার সুরের ভেতরে খোদাকে যে নিবিড় টানে খোঁজা যায়, সেই আত্মিক আকুতিটুকুই আমার জন্য যথেষ্ট নয় কেন, ভক্তিগীতির ওই বিহ্বলতাই কেন আমার জন্য যথেষ্ট না? কেন আমাকে নামাজও পড়তে হবে। কিন্তু এই প্রশ্নের কোনো বুদ্ধিগ্রাহ্য জবাব হয় না, কারণ এখানে বান্দার আকল তার নিজের সীমানার কিনারায় এসে দাঁড়িয়েছে আর তার কাছে এখন যা চাওয়া হচ্ছে, তা যুক্তি নয়, বরং, আত্মসমর্পণ।

আর আমাদের এই উত্তরাধুনিককাল, যন্ত্রবুদ্ধির এই কাল, আকলের সীমানা বোঝার জন্য আমাদের হাতে অদ্ভুতভাবে একটা টাটকা দৃষ্টান্ত তুলে দিয়েছে। আমরা যুক্তি করতে পারে এমন যন্ত্র বানিয়েছি আর প্রতিদিন দেখছি সেই যন্ত্র কী সাবলীল আত্মবিশ্বাসে, কী সুসংহত যুক্তিবিন্যাসে এমন উত্তর তৈরি করছে, যা আসলে নির্ভুলভাবে ভুল! যাকে বলা হচ্ছে হ্যালুসিনেশন। যুক্তির কারখানা তার বাগ্মিতার চূড়ায় উঠে সবচেয়ে বিভ্রান্ত হতে পারে। জ্ঞান তার গায়ে একটা পর্দা টেনে রাখতে পারে অথচ ভাষা ততক্ষণ ঝলমল করতেই থাকে।

এটা থেকে শিক্ষা একটাই। সাবলীলতা আর যুক্তির ক্ষমতা সত্যের সমান না, কখনোই না। অর্থাৎ, আমাদের কালের মানুষ ওই যন্ত্রটার ভেতরেই রোজ একটা প্রমাণ পেয়ে যাচ্ছে যে, আকলের আত্মবিশ্বাস কখনোই আকলের সত্যতার সনদ নয়।

তাই কোরবানির পশু আসলে দাঁড়িয়ে আছে এসব বিষয়ের মিলনস্থলে। সে সেই কারিব-প্রাণী, ১০ হাজার বছর ধরে যাকে আমরা ঘরের দিকে টেনে এনেছি, পরিবারের সদস্য বানিয়েছি। তাকে আমরা কোরবানি করি এমন একটা কাজে, যার নামের অর্থই নৈকট্য। এমন একটা যন্ত্রণার মুখোমুখি হয়ে, যা আমরা পুরোপুরি জানতে পারি না আর এমন একটা হাতে, যে হাত তার নিজের আপত্তিটুকু পর্যন্ত আত্মসমর্পণ করে দিয়েছে। কোরআনে কোরবান শব্দ যেখানে প্রথম উচ্চারিত হয়, সেটি হাবিল ও কাবিলের ঘটনায়। দুই ভাই দুটি কোরবানি পেশ করল, একজনেরটি কবুল হলো, একজনেরটি হলো না, আর তারপরই ঘটল মানবেতিহাসের প্রথম খুন, ভাইয়ের হাতে ভাইয়ের মৃত্যু। অর্থাৎ, যে শব্দের মানে নৈকট্য, তার প্রথম আবির্ভাবই জড়িয়ে গেল রক্তের সম্পর্কের ভেতরকার সবচেয়ে নিষ্ঠুর ফাটলের সঙ্গে। শব্দটি গোড়া থেকেই দুই মেরু নিজের ভেতরে ধরে রেখেছে। কাছে আসার সম্ভাবনা। আর সেই কাছে আসা ব্যর্থ হলে যে অতল দূরত্ব নেমে আসে, তারও সতর্কবাণী। কোরবানির আসল কাজ সম্ভবত, মানুষের ভেতরের হিংসাটাকে একটা বিকল্প শিকারের দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া ও সামলে রাখা। ইসমাইল আলাইহিস সালামের বদলে নেমে আসা দুম্বা যেন সেই বদলে-দেওয়ার সবচেয়ে বিশুদ্ধ রূপ, প্রিয়তমের কণ্ঠনালি থেকে ছুরির ফলা সরে গিয়ে যেখানে একটা প্রাণী এসে দাঁড়ায়।

সুফি পরিভাষায় কুরব নিজেই একটি মাকাম ও নৈকট্যের স্তর। আর সেই বিখ্যাত হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ বলেন, বান্দা নফল ইবাদতের মধ্য দিয়ে আমার দিকে ক্রমাগত এগিয়ে আসতে থাকে, ইয়াতাকাররাবু, যতক্ষণ না আমি তাকে ভালোবেসে ফেলি। কোরবানি আর কুরব তাই একই মূলের দুই ফসল। ঈদের সকালে যে পশুটি মাটিতে শোয়, সে আসলে এক অভ্যন্তরীণ নৈকট্যলাভের দৃশ্যমান চিহ্নমাত্র, আসল কোরবানিটা ঘটে অন্যখানে।

তাই কাল সকালে যখন আমরা অভ্যাসবশে বলব, কোরবানি দেওয়া হবে, তখন না জেনেও আমরা একই সঙ্গে বলছি যে, কাছে আসা হবে। আর যে অপরাধবোধ ও মায়া, আমাদের ভেতরে নড়ে ওঠে, সেটা হয়তো আমাদের বিশ্বাসের কোনো ফাটল নয়, বরং সম্ভবত, সেটা উৎসর্গেরই একটা অংশ। কারণ, এক ফোঁটা মায়াবিহীন যে প্রাণীটা কোরবানি হয়, সে নিছক মাংস। আর ঠিক সেই মায়াটুকুই কাজটাকে কসাইয়ের কাজ থেকে আলাদা করে কোরবান করে তোলে।

ফররুখ কেন পড়ব

মোগল স্থাপনায় দাক্ষিণাত্যের ছাপ

ঔপনিবেশিক বাংলার জমিদারপ্রথা ও বাঙালি মুসলমান

যুগে যুগে কাবা আক্রমণ ও হজ কাফেলায় হামলার ইতিহাস

সমকালে কাজী নজরুল

নতুন যুগে কাজী নজরুল

মৃত্যুক্ষুধায় সমাজ ও সংস্কৃতি

ঔপনিবেশিক বাংলার জমিদার ও বাঙালি মুসলমান

মুসলিমদের জ্ঞানচর্চার কাঠামোগত প্রতিষ্ঠা

খালেদ ইবনে ওয়ালিদের অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রা