কোনো রাষ্ট্রের সভ্যতা ও সাংস্কৃতিক অগ্রসরতা বা পশ্চাৎপদতার অন্যতম সূচক হলো রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় পালিত ঈদ ও অন্যান্য উৎসব। এসব উৎসব কেন্দ্র করে যে আচার-অনুষ্ঠান ও উদযাপনের ধারা গড়ে ওঠে, তা থেকে সেই রাষ্ট্রের নাগরিকদের পারস্পরিক ঐক্য, সামাজিক সংহতি এবং সামষ্টিক সংস্কৃতির প্রকৃতি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়। মুসলিম সভ্যতার প্রেক্ষাপটে ঈদ ও অন্যান্য ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসবের উদযাপনরীতি পর্যবেক্ষণ করলে এই বাস্তবতাটি আরো সুস্পষ্টভাবে অনুধাবন করা সম্ভব।
উমাইয়া সালতানাতের অধীন বিভিন্ন অঞ্চলের মুসলমানরা ঈদুল ফিতর, ঈদুল আজহা এবং অন্যান্য উৎসব উপলক্ষে জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন করত। ঈদের দিনে তারা উন্নতমানের পোশাক পরিধান করত এবং আনন্দ-উৎসবের পরিবেশে দিনটি উদযাপন করত। অশ্বারোহীরা ঘোড়দৌড় ও নানা ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় অংশ নিত এবং উৎসবের আনন্দকে আরো বর্ণিল করে তুলত। উমাইয়া সালতানাতের অধীন অমুসলিম অধিবাসীরাও নিজেদের ধর্মীয় উৎসবগুলো স্বাধীন ও সহনশীল পরিবেশে পালন করত।
উমাইয়া সালতানাতে ঈদ আয়োজনের অনুষঙ্গ
উমাইয়া যুগে ঈদ-উৎসবের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল খলিফা ও গভর্নরদের শোভাযাত্রা। ইসলামের প্রথম যুগে খুলাফায়ে রাশিদিন সাধারণ জনতার মতো জীবনযাপন করতেন। তাদের সামনে-পেছনে কোনো প্রহরী থাকত না। তাদের ঘরের দরজায় কোনো দ্বাররক্ষী থাকত না। পরবর্তীকালে উমাইয়া ও অন্যান্য যুগে স্থানীয় জনগণের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ধরে রাখতে প্রাদেশিক গভর্নররা শোভাযাত্রার প্রচলন করেন।
আমিরুল মুমিনিন মুআবিয়া (রা.) ব্যক্তিগত নিরাপত্তার প্রশ্নে অত্যন্ত সতর্ক ও অনমনীয় ছিলেন। তিনি বর্শাধারী প্রহরী সঙ্গে নিয়ে চলাফেরা করতেন এবং নামাজের সময়ও নিজের সুরক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতেন। প্রাদেশিক গভর্নররাও খলিফাকে অনুসরণ করতেন। ইরাকে জিয়াদ ইবনে আবিহি লাঠি ও বর্শাধারী প্রহরীসহ চলাফেরা করতেন। এভাবেই ধীরে ধীরে শাসকের সামনে বর্শাধারী প্রহরীসহ চলার প্রথা একটি প্রতিষ্ঠিত রীতিতে পরিণত হয়।
প্রাচীন আরবে ঈদ-উৎসবের অন্যতম অনুষঙ্গ ছিল শিকার। সে সময় সাধারণত ধনুক-বাণ বা ফাঁদের মাধ্যমে শিকার করা হতো। ইসলামের বিজয়াভিযানের পর মুসলমানরা যখন রোমান ও পারসিকদের সঙ্গে যোগাযোগ ও মেলামেশা শুরু করে, তখন তাদের কাছ থেকে বিভিন্ন নতুন শিকার-পদ্ধতি শিখে নেয়। শিকারের ক্ষেত্রে তারা বাজ বা ঈগলের মতো প্রশিক্ষিত পাখির ব্যবহার শুরু করে। পাশাপাশি হরিণ ও বন্য গাধা শিকারের জন্য চিতা এবং শিকারি কুকুরও পোষ মানাত।
একইভাবে ঘোড়দৌড়ও উমাইয়া সালতানাতের ঈদ-উদযাপনের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ ছিল। আরবদের সমসাময়িক বহু জাতির মধ্যে ঘোড়দৌড় প্রচলিত ছিল। প্রাচীনকালে আরবরাও ঘোড়া নিয়ে প্রতিযোগিতায় অংশ নিত এবং এ নিয়ে গর্ব করত। পরবর্তীকালে ঘোড়দৌড় আরব-মুসলিম সমাজে বিনোদনের প্রধানতম মাধ্যম হয়ে উঠেছিল। উমাইয়া খলিফা হিশাম ইবনে আবদুল মালিকের যুগে ঘোড়দৌড়ের প্রচলন বৃদ্ধি পেয়েছিল। তিনি একাধিক ‘ঘোড়দৌড়ের ময়দান’ স্থাপন করেন এবং প্রতিযোগিতার জন্য উৎকৃষ্ট ঘোড়া সংগ্রহে বিপুল অর্থ ব্যয় করতেন। তার শাসনামলে প্রায় চার হাজার ঘোড়া দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশ নিত। তবে খলিফা উমর ইবনে আবদুল আজিজের মতো উমাইয়া খলিফাদের কেউ কেউ এ ধরনের প্রতিযোগিতায় অনাগ্রহী ছিলেন।
ইসলামের সূচনাকালে মুসলমানরা জীবনযাপনে কঠোরতা ও সরলতা অবলম্বন করত; খাদ্য ও পোশাকেও তারা সংযম ও পবিত্রতা বজায় রাখত। কিন্তু ইসলামের বিজয়যাত্রা দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ার পর মুসলমানরা পারস্য ও রোম-সংস্কৃতির ধারক বিভিন্ন নগরে বসবাস করতে শুরু করে। তারা সেখানের সভ্যতা ও নগরজীবন দ্বারা প্রভাবিত হতে শুরু করে। ফলে উমাইয়া যুগে আরবরা ইয়েমেন ও কুফা থেকে আনা ওয়াশি (নকশাদার বস্ত্র) ব্যবহারের দিকে ঝুঁকে পড়ে। এসব বস্ত্র দিয়ে তারা চাদর, পায়জামা, পাগড়ি ও টুপি তৈরি করত। খলিফা সুলায়মান ইবনে আবদুল মালিকের নকশাদার বস্ত্রের প্রতি খুবই অনুরাগী ছিলেন। তার পরিবার, কর্মচারী বা সঙ্গীদের কেউই এ ধরনের বস্ত্র পরিধান না করলে তার দরবারে উপস্থিত হতে পারত না।
পেশা, সামাজিক মর্যাদা এবং সম্পদভেদে সেকালের মুসলমানদের পোশাকও ভিন্ন ভিন্ন হতো।
উমাইয়া যুগের পোশাকের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল নকশাদার বুনন। পারস্যের সম্রাটরা তাদের পোশাকে স্বর্ণের সুতা দিয়ে নাম বা বিশেষ চিহ্ন লিখে নিত। উমাইয়া খলিফারা সেই প্রথা গ্রহণ করলেও সাধারণত শুধু নিজেদের নামই লিখতেন। খলিফা ও গভর্নরদের জন্য প্রাসাদের ভেতরে বিশেষ কর্মশালা ছিল, সেখানে তাদের পোশাক বোনা হতো। এসব কর্মশালাকে বলা হতো ‘দারুত তরাজ’ (বয়নশালা)। গভর্নররা এবং সৈন্যরাও খলিফার নাম সূচিকর্ম করা পোশাক পরতেন। আর যদি কোনো গভর্নর বিদ্রোহ করতেন, তখন পোশাক থেকে খলিফার নাম মুছে ফেলতেন।
অনুবাদ : আহমাদ ফাহমি