খেলাফত রাষ্ট্রের শাম অভিযান
প্রথম পর্ব
আবু বকর (রা.)-এর খেলাফতকালে শাম ফ্রন্টের বাস্তব চিত্র ছিল অত্যন্ত জটিল। মুসলিম বাহিনীর চারটি শাখা ভিন্ন ভিন্ন সেনাপতির অধীনে ভিন্ন ভিন্ন লক্ষ্য অভিমুখে অগ্রসর হচ্ছিল। আমর ইবনুল আস ফিলিস্তিন ফ্রন্টে, ইয়াজিদ ইবনে আবু সুফিয়ান দামেস্কে, শুরাহবিল ইবনে হাসানা জর্ডান উপত্যকায় এবং আবু উবাইদাহ ইবনুল জাররাহ হোমসের দিকে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করার চেষ্টা করছিলেন।
যদিও প্রাথমিক পর্যায়ে কয়েকটি খণ্ডযুদ্ধে মুসলিম বাহিনী সাফল্য অর্জন করেছিল এবং সীমিত পরিসরে কিছু কৌশলগত অবস্থান দখল করতে সক্ষম হয়েছিল, তথাপি এই সাফল্য ছিল মূলত বিচ্ছিন্ন ও আঞ্চলিক পর্যায়ের। এই জয়গুলো বৃহত্তর পরিসরে সামরিক বাস্তবতায় স্থায়ী প্রাধান্য নিশ্চিত করার জন্য যথেষ্ট ছিল না। এদিকে বাইজেন্টাইন সম্রাট হেরাক্লিয়াস পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করে ধীরে ধীরে তার সুবিশাল ও সুসংগঠিত সামরিক শক্তিকে সক্রিয় করতে শুরু করেন। সাম্রাজ্যের বিভিন্ন প্রদেশ থেকে সৈন্য সমাবেশ, অভিজ্ঞ জেনারেলদের পুনর্বিন্যাস, রসদ ও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন এবং সীমান্ত প্রতিরক্ষাকে আক্রমণাত্মক রূপ দেওয়ার মাধ্যমে তিনি বৃহৎ পরিসরে মুসলিম বাহিনীকে প্রতিরোধ করার প্রস্তুতি নিতে থাকেন।
ঐতিহাসিক বর্ণনা থেকে জানা যায়, মুসলিমদের শাম অঞ্চল থেকে চিরতরে বিতাড়িত করার লক্ষ্যে সম্রাট হেরাক্লিয়াস আনতাকিয়া (Antioch) ও হোমস থেকে সৈন্য সংগ্রহ করে কয়েক লাখ সদস্যের এক বিশাল বাহিনী প্রস্তুত করছিলেন।
এই পরিস্থিতিতে মুসলিম বাহিনীর প্রধান সমস্যা ছিল সমন্বয়হীনতা। বাহিনীর চারটি ইউনিট ভিন্ন ভিন্ন ফ্রন্টে অবস্থান করছিল এবং তাদের মধ্যে তাৎক্ষণিক যোগাযোগ স্থাপনের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা ছিল না। আলাদা আলাদা হয়ে এই ঝটিকা আক্রমণ শুরুতে মুসলিম বাহিনীর ছোট ছোট বিজয় দিলেও ক্রমেই পরিস্থিতি কঠিন হয়ে আসছিল। বাইজেন্টাইনরা তখন ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ নীতি গ্রহণ করে প্রতিটি মুসলিম ইউনিটকে আলাদাভাবে ঘিরে ফেলার পরিকল্পনা করছিল। বিশেষ করে আজনাদাইনের প্রান্তরে যখন প্রায় ৯০ হাজার থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার রোমান সৈন্য সমবেত হওয়ার খবর মদিনায় পৌঁছায়, তখন খলিফা আবু বকর (রা.) উপলব্ধি করেন, এই চারজন যোগ্য সেনাপতি থাকা সত্ত্বেও তাদের বর্তমান কমান্ড স্ট্রাকচার বাইজেন্টাইনদের এই সংঘবদ্ধ আক্রমণের সামনে যথেষ্ট ভঙ্গুর।
যুদ্ধক্ষেত্রে এই অনিশ্চয়তা কেবল সেনাপতিদের নয়, সাধারণ সৈন্যদের মনেও একধরনের উদ্বেগের সৃষ্টি করেছিল। তারা জানতেন, বাইজেন্টাইনরা নিজেদের মাটিতে লড়াই করছে এবং তাদের সাপ্লাই চেইন ও রসদ সরবরাহ ব্যবস্থা এবং কৌশলগত সুবিধা অনেক বেশি।
এমন পরিস্থিতিতে প্রয়োজন ছিল এমন একজন নেতার, যিনি কেবল একজন দক্ষ যোদ্ধাই নন, বরং যুদ্ধক্ষেত্রের জটিল বাস্তবতাকে গভীরভাবে অনুধাবন করতে সক্ষম এক অসামান্য রণকৌশলী; যিনি বিচ্ছিন্ন বাহিনীকে একত্রিত করতে পারেন, দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন এবং প্রতিপক্ষের শক্তিকে তাদের বিরুদ্ধে কাজে লাগাতে পারেন। তিনি হবেন এমন একজন নেতা—যার উপস্থিতিই সৈন্যদের মনে নতুন প্রাণের সঞ্চার করবে এবং শত্রুপক্ষের মনে ভীতি ও সংশয় ছড়িয়ে পড়বে, যার রণধ্বনি একসময় রোম ও পারস্য উভয় পরাশক্তির প্রান্তরজুড়ে প্রতিধ্বনিত হয়েছে এবং যার কৌশলগত প্রজ্ঞা যুদ্ধের ময়দানে কঠিনতম পরিস্থিতিতে বহুবার প্রমাণিত হয়েছে।
পরিস্থিতি যখন ক্রমেই জটিল থেকে জটিলতর হয়ে উঠছিল এবং শাম ফ্রন্টে মুসলিম বাহিনীর বিচ্ছিন্ন অবস্থান মারাত্মক দুর্বলতায় পরিণত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিচ্ছিল, তখন খেলাফত কেন্দ্র মদিনায় বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে পর্যালোচনা চলতে থাকে। একপর্যায়ে স্পষ্ট হয়, এই সংকট মোকাবিলায় সাধারণ কোনো সামরিক নেতৃত্ব যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন এমন একজনের, যিনি পুরো যুদ্ধপরিস্থিতিকে নতুনভাবে বিন্যস্ত করতে সক্ষম হবেন। ফলে অত্যন্ত জরুরি ও দূরদর্শী একটি সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়; আর তখনই ইতিহাসের মঞ্চে নতুন তাৎপর্য নিয়ে আবির্ভূত হন ‘সাইফুল্লাহ’ (আল্লাহর তরবারি) হিসেবে খ্যাতিমান খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ।
ইরাকের অপরাজেয় সেনাপতি
খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের শাম অভিযানে নামার আগে আমাদের সংক্ষেপে তার ইরাক ফ্রন্টের সাফল্যের দিকে তাকাতে হবে। কারণ ইরাক অভিযানের সাফল্য তাকে খলিফার চোখে শামের রক্ষাকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। ধর্মদ্রোহ প্রতিরোধ যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে খেলাফতের অভ্যন্তরীণ সংহতি যখন নিশ্চিত হলো, তখন খালিদকে ইরাকের পারস্য সাম্রাজ্যের সীমান্তসংলগ্ন অঞ্চলে অভিযানে পাঠানো হয়েছিল।
ইরাক ফ্রন্টে খালিদের সামরিক সাফল্য ছিল এককথায় অভূতপূর্ব। তিনি সেখানে এমন কিছু কৌশল ব্যবহার করেছিলেন, যা সমসাময়িক বড় বড় সাম্রাজ্যের কাছে ছিল কল্পনাতীত। ‘ব্যাটল অব চেইনস’ (জাতুস সালাসিল) যুদ্ধে পারস্য সেনাপতি হরমুজের বিরুদ্ধে তার বিজয় ছিল দ্রুতগতির রণকৌশলের এক বড় উদাহরণ। এরপর উল্লাইসের যুদ্ধে তিনি এক ভয়াবহ পরিস্থিতিতে রক্তনদী বইয়ে দেওয়ার শপথ করেছিলেন এবং পারস্য ও খিষ্টান আরব জোটকে চূড়ান্তভাবে পরাজিত করেছিলেন। এই যুদ্ধ তার সামরিক সক্ষমতা ও সংকল্পের এক উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত।
খালিদের যুদ্ধনীতির প্রধান স্তম্ভ ছিল গতি ও বিস্ময়। তিনি শত্রুকে কখনো গুছিয়ে ওঠার সময় দিতেন না। আধুনিক সমর বিশ্লেষক ফ্রেড ডোনার এবং হিউ কেনেডির মতে, খালিদ ছিলেন প্রথম সারির একজন জেনারেল যিনি ‘অপারেশনাল আর্ট’ ও সামরিক অভিযানের শিল্পকে মরুভূমির প্রেক্ষাপটে নিখুঁতভাবে প্রয়োগ করেছিলেন। তিনি জানতেন, কখন পিছু হটতে হবে এবং কখন সর্বাত্মক আক্রমণ চালাতে হবে। তার অধীন অশ্বারোহী বাহিনী ছিল তৎকালীন বিশ্বের সবচেয়ে গতিশীল ইউনিটগুলোর একটি।
খালিদের সক্ষমতা কেবল তরবারি চালানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি ছিলেন একজন দক্ষ মনস্তাত্ত্বিক রণকৌশলী। তিনি জানতেন কীভাবে শত্রুর মনে ত্রাস সৃষ্টি করতে হয়। হীরা শহর জয়ের পর তিনি যখন সেখানকার আভিজাত্যপূর্ণ লোকদের খেলাফত রাষ্ট্রের বশ্যতা স্বীকার করতে বাধ্য করলেন এবং বিপুল পরিমাণ জিজিয়া আদায় করে মদিনায় পাঠালেন, তখন প্রমাণিত হলো, খালিদ কেবল একজন বিধ্বংসী ব্যক্তি নন, বরং একজন সফল প্রশাসক ও দক্ষ রণকুশলী। পারস্য সাম্রাজ্যের বড় বড় দুর্গ ও গ্যারিসনগুলো যখন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ছিল, তখন সমগ্র আরব বিশ্বে খবর ছড়িয়ে পড়ছিল যে, খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ যেখানেই যান, বিজয় সেখানেই নিশ্চিত। এই অজেয় ভাবমূর্তিই তাকে শামের সেই কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য সবচেয়ে যোগ্য প্রার্থী করে তুলেছিল।
ইরাক রেখে শামে কেন
৬৩৪ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসের মাঝামাঝি সময়। খলিফা আবু বকর (রা.)-এর কাছে শাম ফ্রন্ট থেকে সাহায্য চেয়ে বার্তা আসতে শুরু করলে খলিফা খালিদকে চিঠি লিখে নির্দেশ দিলেন, ‘আপনার অর্ধেক সৈন্য নিয়ে আপনি ইরাক ত্যাগ করুন এবং অবিলম্বে শামের বাহিনীর সাহায্যে মার্চ করুন। কাজ শেষ করে আবার ইরাকে ফিরে আসবেন।’ খলিফার এই সিদ্ধান্ত খুব ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। কারণ ইরাক থেকে খালিদকে সরিয়ে নেওয়ার অর্থ ছিল পারস্য সীমান্তে মুসলিমদের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল করে দেওয়া এবং অর্জিত বিজয়গুলোকে ঝুঁকির মুখে ফেলা। মুসান্না ইবনে হারিসার মতো দক্ষ যোদ্ধা সেখানে থাকলেও খালিদের অনুপস্থিতিতে পারসিকরা যে পাল্টা আক্রমণ করবে, তা প্রায় সুনিশ্চিত ছিল। তবুও তিনি এই সিদ্ধান্ত নিলেন। এর পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ ছিল।
এক হলো, শাম ফ্রন্টে তখন চারজন অভিজ্ঞ সেনাপতির মধ্যে সমন্বয় থাকলেও কোনো ‘সুপ্রিম কমান্ডার’ ছিল না। সামরিক বিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘প্যারালাইসিস অব কমান্ড’ বলা হয়। খলিফা জানতেন, সম্রাট হেরাক্লিয়াসের বিশাল সুসংগঠিত বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়তে একজন একক ও প্রভাবশালী কমান্ডারের প্রয়োজন, যার নির্দেশ সবাই বিনা বাক্যে পালন করবে।
দ্বিতীয়ত, মদিনার জন্য ইরাকের চেয়ে শামের (সিরিয়া) ফ্রন্টটি বেশি বিপর্যস্ত ও বিপদের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ছিল। রোমানরা যদি শামে জয়লাভ করে, তবে তারা সরাসরি মদিনার ওপর আক্রমণ চালানোর পথ পেয়ে যেত। তাই রোমানরা যখন বিশাল সৈন্য নিয়ে আত্মবিশ্বাসী ছিল, তখন খালিদের মতো একজন ‘আনপ্রিডিক্টেবল’ জেনারেলের আগমন তাদের মনোবল ভেঙে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল।