একজন মানুষের জীবনের মূল লক্ষ্য হলো, আল্লাহর একত্বে বিশ্বাস করা, তার ইবাদত করা এবং তার ইবাদাতের পথে প্রতিবন্ধক হয় এমন সব বাধা দূর করার চেষ্টা করা। আর ইসলামে জিহাদের বিধার প্রবর্তনের মূল উদ্দেশ্যও ছিল এটা। এই লক্ষ্য পূর্ণ ও উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য আল্লাহর রাসুল (সা.) সর্বতোভাবে চেষ্টা করেছেন। তিনি দেশ-বিদেশের রাষ্ট্রনায়ক ও গোত্রপ্রধানদের কাছে তাওহিদের দাওয়াত দিয়ে চিঠি পাঠিয়েছেন। তাদের সামনে আল্লাহর একত্বের বাণী তুলে ধরেছেন। তিনি তাওহিদের পথে কাঁটা হয়ে থাকা সব মানবিক প্রতিবন্ধকতা, জাহিলি রীতি-রেওয়াজ, আত্মিক বাধা-বিপত্তি ও ভৌত অন্তরায় দূর করার জন্য বিভিন্ন দিকে যুদ্ধ অভিযান পরিচালনা করেছেন এবং সেনাবাহিনী প্রেরণ করেছেন। ক্ষেত্রবিশেষে নবীজি (সা.) নিজেই যুদ্ধক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিয়েছেন। এসব যুদ্ধে প্রতিপক্ষের জন্য নবীজির নীতি ছিল তিনটিÑ
ক. ইসলামের দাওয়াত কবুল করো।
খ. ইসলামের গ্রহণ করতে না চাইলে জিজিয়া কর দিতে সম্মত হও।
গ. ওপরের কোনোটা গ্রহণ করতে না চাইলে যুদ্ধের ময়দানে অবতীর্ণ হও।
খেলাফত রাষ্ট্রের প্রথম খলিফা আবু বকর (রা.) সব ক্ষেত্রে নবীজির অনুসরণ করেছেন। আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর আনা দ্বীন বেশি থেকে বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য দিকে দিকে যুদ্ধ অভিযান প্রেরণ করেছেন।
আল্লাহর রাসুল (সা.) মুসলিমদের জন্য যুদ্ধ অভিযানের মূল রূপরেখা নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন। তার প্রদত্ত বিজয়ের সুসংবাদ উম্মাহর জন্য জাগতিক, মানসিক ও আত্মিক শক্তির এক সমৃদ্ধ ভান্ডারে পরিণত হয়েছিল।
খলিফা আবু বকর (রা.)-এর নেতৃত্বে পরিচালিত বিজয়াভিযানের অন্যতম লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল, আল্লাহর দ্বীন প্রচার করা এবং মানুষের ঘাড়ের ওপর চেপে বসা তাগুতশক্তিকে অপসারিত করা। তিনি এবং তার সঙ্গে থাকা মুসলিমরা আল্লাহ ও তার রাসুল প্রদত্ত বিজয় ও দ্বীন প্রতিষ্ঠার সুসংবাদের প্রতি পরিপূর্ণ বিশ্বাসী ছিলেন। এই দৃঢ় ঈমান ও অবিচল বিশ্বাসই ছিল খিলাফত রাষ্ট্রে মুসলিম বিজয়াভিযানের নৈতিক বৈশিষ্ট্য।
ইরাক বিজয়ে খলিফার পরিকল্পনা
ততদিনে রিদ্দা ও ধর্মদ্রোহের যুদ্ধ শেষ হয়েছে। আরবের বিদ্রোহী গোত্রগুলো দমন করা হয়েছে। তাদের অনেকেই আবার ইসলামে ফিরে এসেছে এবং বাহ্যিকভাবে আরব ভূখণ্ডে শান্তিশৃঙ্খলা ফিরে এসেছে। তাই ইসলাম বিস্তারের লক্ষ্যে খলিফা আবু বকর (রা.) সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোয় সামরিক অভিযান পরিচালনা করার সিদ্ধান্ত নিলেন। খলিফার পরিকল্পনার অনেকটা জুড়ে ছিল ইরাক। তিনি ইরাকে অভিযান পরিচালনার জন্য কয়েকটি বাহিনী প্রস্তুত করেন।
এক. খালিদ ইবনে ওয়ালিদের সেনাবাহিনী
খালিদ (রা.) সে সময় ইয়ামামায় ছিলেন। অল্প কিছুদিন আগেই মুসাইলামার নেতৃত্বে পরিচালিত হানিফা গোত্রের সেনাবাহিনীকে চরমভাবে পরাজিত করেছেন। খলিফা তার কাছে চিঠি পাঠালেন। তাকে নির্দেশ দিলেনÑ‘সৈনিকদের নিয়ে আপনি ইরাক চলে যান। উবুল্লাহর আক্রমণের মাধ্যমে অভিযান শুরু করবেন।’
সেনাপতি খালিদের প্রতি খলিফার বিশেষ কিছু নির্দেশনা দিয়েছিলেন। তাকে বলেছিলেন, ‘আপনি উচ্চ ভূমি দিয়ে ইরাক প্রবেশ করবেন। মানুষের সঙ্গে সদ্ভাব স্থাপন করবেন। তাদের ইসলামের দাওয়াত দেবেন। আপনার আহ্বানে সাড়া দিলে তাদের মুসলিম হিসেবে বিবেচনা করবেন। সাড়া না দিলে তাদের জিজিয়া কর দিতে বলবেন। এটাকেও তারা প্রত্যাখ্যান করলে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবেন।’
‘আপনি কাউকে জোরপূর্বক ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করবেন না। একবার মুরতাদ হয়ে যাওয়া ব্যক্তি আবার ইসলাম গ্রহণ করলেও তাকে বিশ্বাস করবেন না, তার থেকে সাহায্য-সহযোগিতা গ্রহণ করবেন না। আর পথিমধ্যে যে মুসলিম ব্যক্তির সঙ্গেই সাক্ষাৎ ঘটবে, আপনি তাকে নিজের বাহিনীর অন্তর্ভুক্ত করে নেবেন।’
খালিদ (রা.)-এর সহায়ক হিসেবে এরপর খলিফা ছোট ছোট বাহিনী ও সেনাদল প্রস্তুত করতে উদ্যোগী হলেন।
দুই. ইয়াজ ইবনে গানামের সেনাবাহিনী
ইয়াজিদ ইবনে গাসাম সে সময় হিজাজ ও নাবাজের মাঝামাঝি কোনো স্থানে ছিলেন। নাবাজ হচ্ছে বসরা ও মক্কার মধ্যবর্তী একটি শহর। খলিফা আবু বকর (রা.) চিঠি পাঠিয়ে তাকে ইরাক অভিযানে এগিয়ে যেতে বললেন। তাকে ইরাকের উত্তর-পূর্বদিকে ধরে অগ্রসর হয়ে মুসাইখ থেকে অভিযান শুরুর নির্দেশ দিয়ে চিঠিতে লিখলেন, ‘মুসাইখে পৌঁছা পর্যন্ত আপনি এগিয়ে যেতে থাকেন এবং সেখান থেকে অভিযান শুরু করবেন। এরপর ইরাকের উঁচু অঞ্চল দিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে থাকবেন। খালিদের সেনাবাহিনীর সঙ্গে সাক্ষাৎ হওয়া পর্যন্ত আপনি থামবেন না।’
এরপর তিনি এ নির্দেশের সঙ্গে আরো যোগ করলেনÑ‘যে ফিরে যেতে চায়, তাকে অনুমতি দিবেন। আপনারা অনিচ্ছুক ব্যক্তিকে সঙ্গে নিয়ে যুদ্ধ শুরু না করবেন না। কাউকে জোরপূর্বক যুদ্ধে অংশগ্রহণে বাধ্য করবেন না। যার ইচ্ছা করবে সে অগ্রসর হবে, আর ডান ইচ্ছা নেই সে চলে যাবে।’
অভিন্ন বক্তব্যের চিঠিতে খলিফা খালিদ ও ইয়াজকে নির্দেশ দিলেন, ‘... অতঃপর আপনারা প্রতিযোগিতার মাধ্যমে হীরার দিকে অগ্রসর হবেন। আপনাদের মধ্যে যে আগে হীরায় পৌঁছাবেন, সে সেনাবাহিনী পরিচালনা করবেন। হীরায় সমবেত হয়ে আপনারা পারস্যের সীমান্ত প্রহরী ও সামরিক চৌকিগুলো ভেঙে দেবেন এবং মুসলিমদের ওপর পেছন থেকে আক্রমণের পথ রুদ্ধ করে দেবেন। এরপর আপনাদের একজন হীরায় অবস্থান করে মুসলিমদের পাহারায় থাকবেন। অন্যজন পারসিকদের শক্তি-গৌরবের কেন্দ্র মাদায়েনে প্রবল আক্রমণ করবেন।’
তিন. মুসান্না ইবনে হারিসার সেনাবাহিনী।
মুসান্না ইবনে হারিসা ইতোমধ্যে খলিফার দরবারে উপস্থিত হয়ে তাকে পারসিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। তিনি খলিফাকে বলেছিলেন, ‘আমার কওমের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার দায়িত্ব আমাকে প্রদান করুন।’ খলিফা তাকে ইরাক অভিযানের দায়িত্ব দিলেন। তিনি ইরাকে গিয়ে যুদ্ধ করতে শুরু করলেন।
একসময় তিনি সাহায্য চেয়ে ভাই মাসউদ ইবনে হারিসাকে খলিফা আবু বকরের কাছে পাঠালেন। আবু বকর তখন মুসান্নার উদ্দেশে লিখলেন, ‘আমি আপনার জন্য ইরাকে খালিদ ইবনে ওয়ালিদকে পাঠিয়েছি। আপনার গোত্র ও সঙ্গে থাকা সৈন্যদের নিয়ে তাকে অভ্যর্থনা জানাবেন। তাকে সহযোগিতা করবেন, সমর্থন দেবেন এবং কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করবেন। তার কোনো নির্দেশ অমান্য করবেন না এবং তার কোনো মতের বিরোধিতা করবেন না। তিনি যতদিন আপনার সঙ্গে অবস্থান করবেন, তিনিই আমির থাকবেন। আর যদি তিনি অন্য কোথাও চলে যান, তবে আপনি আগের মতো আপনার দায়িত্বে বহাল হবেন।’
মুসান্নার গোত্রে মাজউর ইবন আদী আনুগত্য পরিত্রাগ করে খলিফার কাছে পত্র লিখে নিজের বীরত্ব, অশ্বচালনার দক্ষতা ও স্থানীয় জনপদ সম্পর্কে তার জ্ঞানের কথা উল্লেখ করে এবং সাওয়াদের দায়িত্ব প্রার্থনা করে। মুসান্না এ বিষয়ে সিদ্দীক (রা.) কে অবহিত করে জানান, মাজউর অল্পসংখ্যক সঙ্গী নিয়ে তার বিরোধিতা করছে এবং বিষয়টি সম্পর্কে খলিফার সিদ্ধান্ত কামনা করেন।
উত্তরে সিদ্দীক মাজউকে নির্দেশ দেন, সে যেন খালিদ ইবনে ওয়ালিদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তার অধীনেই অবস্থান করে। একই সঙ্গে তিনি মুসান্নাকেও লিখে জানালেন—মাজউরকে খালিদের সঙ্গেই থাকতে বলা হয়েছে এবং খালিদ ইরাক ত্যাগ না করা পর্যন্ত মুসান্নাও যেন নিজ অবস্থানে অবিচল থাকেন।
(বাকি অংশ পড়ুন পরের সংখ্যায়)