হোম > সাহিত্য সাময়িকী > মুসলিম বিশ্বের ইতিহাস

মধ্যযুগ : বহুমুখী জ্ঞানচর্চার স্বর্ণসময়

ইলিয়াস মশহুদ

১২৩৬ সালে নির্মিত আলেপ্পোর ফেরদৌস মাদরাসা

বর্তমানে ‘মাদরাসা’ শব্দটি ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য ব্যবহৃত হয়। মুসলিম সভ্যতার স্বর্ণযুগে মাদরাসার ধারণা ছিল অনেক বিস্তৃত ও বহুমাত্রিক। সে সময়ের মাদরাসাগুলো শুধু ধর্মীয় জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র ছিল না, সেগুলো আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আদলে গড়ে ওঠা পূর্ণাঙ্গ শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে কাজ করত। সেখানে ধর্মীয় বিদ্যার পাশাপাশি ভাষা ও সাহিত্য, ইতিহাস, দর্শন, যুক্তিবিদ্যা, গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান, চিকিৎসাশাস্ত্র এবং প্রশাসনিক বিদ্যারও চর্চা হতো। এসব প্রতিষ্ঠান ছিল জ্ঞান-বিজ্ঞানের বৈশ্বিক বিকাশের প্রধানকেন্দ্র। মুসলিম বিশ্বের শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার ইতিহাসে আইয়ুবি শাসকদের (৫৬৯-৬৪৮ হি./ ১১৭১-১২৫০ খ্রি.) অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়। তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় মিসর ও শামজুড়ে গড়ে ওঠে অসংখ্য মাদরাসা, দারুল হাদিস ও সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার। এসব প্রতিষ্ঠান ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি বহুমুখী জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চার কেন্দ্র হিসেবে খ্যাতি লাভ করে। আইয়ুবি যুগে প্রতিষ্ঠিত কয়েকটি উল্লেখযোগ্য মাদরাসা নিয়ে লিখেছেন ইলিয়াস মশহুদ

৫৭২ হিজরিতে (১১৭৬ খ্রি.) সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ুবি বৃহত্তর সিরিয়ার অধিকাংশ অঞ্চলে নিজের শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য তিনি যখন মিসরে ফিরে আসেন, তখন সেখানে শিক্ষার বিস্তার ও সুন্নি ভাবধারার প্রচারের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণের বিশেষ উদ্যোগ নেন।

আইয়ুবি শাসনামলে সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ুবি এবং তার উত্তরসূরিদের তত্ত্বাবধানে জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা ও শিক্ষাকাঠামো প্রণয়নে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছিল। ফাতেমি আমলের শিয়া মতাদর্শের প্রভাব কাটিয়ে বৃহত্তর সুন্নি মতাদর্শ পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণের ক্ষেত্রে এ সময়টি গুরুত্বপূর্ণ।

আইয়ুবি শাসনামলে শিক্ষাবিপ্লবের প্রধান কেন্দ্র ছিল কায়রো, দামেস্ক এবং আলেকজান্দ্রিয়া। ফাতেমিদের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় প্রভাব মুছে সুন্নি মতবাদ রাষ্ট্রীয়ভাবে শক্তিশালী করা ছিল এই শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম লক্ষ্য। এসব মাদরাসা থেকে বিজ্ঞ আলেম, দক্ষ বিচারক, প্রশাসক এবং আমলা তৈরি হতেন। তারা রাষ্ট্র পরিচালনায় ভূমিকা রাখতেন। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বহুমুখী জ্ঞানচর্চার সুযোগ ছিল। কোরআন, হাদিস, তাফসির, ফিকহ, আরবি ব্যাকরণ (নাহু-সরফ), সাহিত্য এবং অলংকার শাস্ত্র (বালাগাত); যুক্তিবিদ্যা ও দর্শন, চিকিৎসা বিজ্ঞানসহ গণিতশাস্ত্রের চর্চাও অব্যাহত ছিল।

সালেহিয়া মাদরাসা

মিসরের কায়রো শহরে ইমাম শাফেয়ির মাকবারার কাছে ৫৭২ হিজরিতে (১১৭৬ খ্রি.) এই মাদরাসার নির্মাণকাজ শুরু হয়। এই মাদরাসার শিক্ষাধারা শাফেয়ি মাজহাব অনুযায়ী পরিচালিত হতো। ইমাম সুয়ুতি বলেন, ‘এই মাদরাসা হচ্ছে সব মাদরাসার তাজ। খ্যাতিমান আলেম নাজমুদ্দিন খুবুশানির তত্ত্বাবধানে এখানে শিক্ষাদান শুরু হয়।’

৫৭৮ হিজরিতে (১১৮৩ খ্রি.) জিলহজের শেষদিকে, যখন এর উন্নয়নকাজ চলছিল, তখন প্রখ্যাত পরিব্রাজক ইবনে জুবায়ের এই মাদরাসা পরিদর্শন করেন। তিনি উল্লেখ করেন, ‘এ অঞ্চলে সালেহিয়া মাদরাসার মতো অন্য কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মিত হয়নি। মাঠের বিশালতা এবং নির্মাণশৈলীর অনন্যতার দিক দিয়ে এটি অতুলনীয়। দর্শকের মনে হবে, এ যেন স্বাধীন একটি রাজ্য। এটি নির্মাণে অনেক অর্থ ব্যয় করা হয়। শায়খ খুবুশানি নিজেই এ মাদরাসার পরিচালক ছিলেন। সুলতান সালাহুদ্দিন তাকে এর দায়িত্ব দিয়ে বলেছিলেন, ‘এর সৌন্দর্যবৃদ্ধিতে আপনি ইচ্ছামতো ব্যয় করুন, খরচ বহনের দায়িত্ব আমাদের।’

ইবনে জুবায়েরের এই বক্তব্য থেকে নিশ্চিত হওয়া যায়, সুলতান সালাহুদ্দিন এসব মাদরাসার জন্য সৎ, যোগ্য, বিজ্ঞ এবং প্রসিদ্ধ আলেমদের শিক্ষক নির্বাচন করতেন।

হুসাইনি মাদরাসা

সুলতান সালাহুদ্দিন কায়রোতে (তথাকথিত) মাশহাদে হুসাইনি তথা হুসাইনের সমাধির পাশে একটি মাদরাসা নির্মাণ করেন এবং এই মাদরাসার জন্য বিপুল সম্পদ ওয়াকফ করেন। ইমাম মাকরিজি বলেন, ‘সুলতান আন-নাসির (সালাহুদ্দিন) ক্ষমতালাভের পর সেখানে দরস-তাদরিস এবং ফকিহদের অবস্থানের ব্যবস্থা করেন। তিনি বিখ্যাত ফকিহ বাহাউদ্দিন দিমাশকির হাতে এর পরিচালনার দায়িত্ব অর্পণ করেন। তিনি যে মিম্বরে বসতেন, এর পেছনেই ছিল (তথাকথিত) হুসাইন (রা.)-এর সমাধি।’

সুলতান আল-মালিকুল কামিলের শাসনামলে মুইনুদ্দিন হাসান ইবনে শায়খুশ শুয়ুখ উজিরের দায়িত্ব লাভ করলে তিনি এই মাদরাসার জন্য ওয়াকফ জমা করেন। এর দ্বারা বিশাল শিক্ষাভবন এবং ফকিহদের জন্য (আবাসিক) উঁচু বাড়িগুলো নির্মাণ করা হয়েছিল।

ফাতেমি যুগে বিস্তার ঘটা শিয়া মতবাদের ইতি টানা এবং সুন্নি মতাদর্শের বিস্তারের লক্ষ্যে সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ুবি একাধিক মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাই মাশহাদে হুসাইনিতে মাদরাসা নির্মাণের বিশেষ তাৎপর্য ছিল।

ফাজিলিয়া মাদরাসা

এ সময়ে নির্মিত অন্যতম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিল ফাজিলিয়া মাদরাসা। ৫৮০ হিজরিতে (১১৮৪ খ্রি.) কাজি আল-ফাজিল এই মাদরাসা নির্মাণ করেন এবং শাফেয়ি ও মালেকি মাজহাব পাঠদানের জন্য ওয়াকফ করেন। এই মাদরাসার জন্য অসংখ্য গ্রন্থও ওয়াকফ করা হয়েছিল। এর পরিমাণ প্রায় ১ লাখে পৌঁছে গিয়েছিল। পাশাপাশি এতিমদের শিক্ষার জন্যও জায়গা বরাদ্দ করা হয়েছিল। ইমাম মাকরিজি বলেন, ‘এই ফাজিলিয়া ছিল কায়রোর সবচেয়ে বড় ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।’

কামিলিয়া মাদরাসা

আল-মালিকুল কামিল ইবনে আদিল হাদিস শাস্ত্রের প্রতি খুব আগ্রহী ছিলেন। কায়রোতে তিনিই কামিলিয়া মাদরাসা নামে সর্বপ্রথম হাদিসের জন্য বিশেষায়িত মাদরাসা নির্মাণ করেন। ৬২২ হিজরিতে (১২২৫ খ্রি.) এই মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করা হয়। প্রথমে হাদিস শাস্ত্রে অভিজ্ঞ আলেমদের কাছে, পরে শাফেয়ি মাজহাবের ফকিহদের কাছে এর দায়িত্ব হস্তান্তর করা হয়। বিখ্যাত হাদিসবিশারদ হাফিজ ওমর ইবনে হাসান আন্দালুসিকে এই মাদরাসার পরিচালক নিযুক্ত করা হয়।

সমন্বয়ধর্মী মাদরাসা

বাগদাদের মুসতানসরিয়া মাদরাসার আদলে আস-সালেহ নাজমুদ্দিন আইয়ুব ইবনে কামিল ফাতেমিদের পূর্ব-প্রাসাদের কাছে ৬৩৯ হিজরিতে (১২৪১ খ্রি.) একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণ করেন। তিনি প্রতিষ্ঠানে সমন্বিতভাবে চার মাজহাবের পাঠদান করা হতো। ইমাম মাকরিজি বলেন, ‘তিনিই প্রথম ব্যক্তি, যিনি বৃহত্তর মিসরে স্থানে এক ছাদের নিচে চার মাজহাবের শিক্ষা চালু করেছিলেন।’

শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের জন্য সুযোগ-সুবিধা

আইয়ুবি শাসনামলে শিক্ষা ছিল সম্পূর্ণ অবৈতনিক এবং রাষ্ট্রীয় বা ওয়াকফ করা সম্পদ দ্বারা পরিচালিত। শিক্ষার্থীদের জন্য থাকা-খাওয়া এবং মাসিক বৃত্তির ব্যবস্থা ছিল। শ্রেষ্ঠ আলেম ও বিজ্ঞদের এসব মাদরাসায় শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হতো। তাদের সামাজিক মর্যাদা ও বেতন ছিল অত্যন্ত সম্মানজনক। সালেহিয়া মাদরাসার অধ্যাপক নাজমুদ্দিন আল খুবুশানিকে মাসিক ভাতা হিসেবে ৪০ দিনার, মাদরাসার ওয়াকফ সম্পদ দেখাশোনার জন্য ১০ দিনার, প্রতিদিন ৬০ রিতিল রুটি এবং দুই মশক নীলনদের পানি বরাদ্দ ছিল। প্রতিটি বড় মাদরাসায় গবেষণার কাজে ব্যবহারের জন্য সমৃদ্ধ লাইব্রেরি ছিল।

আইয়ুবি রাজবংশের নারীরাও শিক্ষাবিস্তারে বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন। সালাহুদ্দিনের বোন জুমুররুদ খাতুন এবং পরিবারের অন্য নারীরা দামেশকে বহু মাদরাসা ও খানকাহ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

আইয়ুবি শাসকদের এই শিক্ষাবিপ্লবের ফলে আড়াই শতাব্দী পর মিসর আবার বাগদাদ ও কর্ডোভার মতো ইসলামি সভ্যতার প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল।

শিক্ষার বিস্তার ও মাদরাসা প্রতিষ্ঠার সোনালি অধ্যায়

আইয়ুবি শাসকদের মাদরাসা নির্মাণের প্রচেষ্টা শুধু কায়রোতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। মিসরের অন্যান্য শহরেও তা বিস্তৃত হয়েছে। ফাইয়ুম শহরে দুটি মাদরাসা নির্মাণ করা হয়। ৫৭৭ হিজরিতে (১১৮১ খ্রি.) আলেকজান্দ্রিয়াতে সালাহুদ্দিন আইয়ুবি একটি মাদরাসা নির্মাণ করেন। ওয়াকফ সম্পদের মাধ্যমে এসব মাদরাসার শিক্ষকদের জীবিকার ব্যবস্থা হতো।

ইবনে জুবায়ের বলেন, ‘এ অঞ্চলের (আলেকজান্দ্রিয়া) গর্ব এবং এ অঞ্চলের সুলতানের কৃতিত্বের অনন্য নিদর্শন হচ্ছে, এখানকার মাদরাসাগুলো এবং শিক্ষার্থী ও ইবাদতগুজার ব্যক্তিদের জন্য নির্মিত সরাইখানা।’

তারা দূরদূরান্ত থেকে এখানে আসতেন। তাদের প্রত্যেকেই আশ্রয়ের জন্য বাসস্থানের ব্যবস্থা ছিল। বিষয়ভিত্তির শিক্ষার জন্য স্বতন্ত্র শিক্ষকের উপস্থিতি ছিল। একজন কর্মকর্তা সবসময় তদারকি করতেন।

ইবনে জুবায়ের বলেছেন, ‘আলেকজান্দ্রিয়ায় অধিকাংশ মসজিদ ছিল যৌথ (অর্থাৎ, মসজিদ ও মাদরাসার সমন্বয়ে গঠিত)। তার প্রত্যেকটিতেই সুলতানের পক্ষ থেকে ইমাম নিয়োজিত ছিল। তাদের কারো মাসিক বেতন ছিল পাঁচ মিসরি দিনার, আবার কারো এর চেয়ে বেশি বা কম। এ ছিল সুলতানের অন্যতম মহৎ কর্ম।’

সুলতান সালাহুদ্দিন বাইতুল মাকদিসে শাফেয়ি মাজহাবের এবং দামেশকে মালেকি মাজহাবের অনুসারীদের জন্য মাদরাসা নির্মাণ করেছিলেন। তাকিউদ্দিন ওমর এডেসায় একটি মাদরাসা নির্মাণ করেন। আল-আজিজ ওসমান ইবনে সালাহুদ্দিন দামেশকে ভাই আল-আফজালের মাধ্যমে আজিজিয়া মাদরাসা; মুয়াজ্জম ঈসা মুয়াজ্জামিয়া মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। একইভাবে সালাহুদ্দিনের ভাই সাইফুল ইসলাম দামেশকে একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। এ শহরেই আল আশরাফ মুসা ইবনে আদিল দারুল হাদিস আশরাফিয়া নির্মাণ করেন।

জামে বনু উমাইয়ার কাছে কাজি আল-ফাজিল দারুল হাদিস ফাজিলিয়া নির্মাণ করেন। সালাহুদ্দিনের বোন সিত্তুশ শাম দামেশকে একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। এমনিভাবে তার আরেক বোন রাবেয়া খাতুনও দামেশকে একটি মাদরাসা নির্মাণ করেন।

আলেপ্পো শহরও আইয়ুবিদের প্রচেষ্টায় অনেক মাদরাসা প্রতিষ্ঠা হয়। আল-মালিকুজ জাহির হানাফি এবং শাফেয়িদের জন্য একটি যৌথ মাদরাসা নির্মাণ করেন। শুধু শাফেয়ি মাজহাবের জন্য ইবনু শাদ্দাদ সালেহিয়া নামে আরেকটি মাদরাসা নির্মাণ করেন।

এভাবে আইয়ুবি আমলে সাম্রাজ্যের নানা প্রান্তে অসংখ্য মাদরাসা নির্মিত হয়েছে। এমনকি ইজ্জুদ্দিন ইবনে শাদ্দাদ শুধু দামেশকেই চার মাজহাবের ৯২টি মাদরাসা ছিল বলে উল্লেখ করেছেন।

ইরাক অঞ্চলে অন্যান্য বিজয়

মুসলিম বিশ্বের টুকরো ইতিহাস

নৌপ্রযুক্তিতে মুসলিম সভ্যতার অবদান

আব্বাসী খেলাফতের শাহি রান্নাঘরে

সুলতানা শাজারাতুদ দুর

খেলাফতে রাশেদার শাম অভিযান : আজনাদাইনের যুদ্ধ

আলজাজারির বিস্ময়কর উদ্ভাবন

বঙ্গে মুসলিম অভিবাসন

আজনাদাইনের যুদ্ধ

বিশ্ব ইতিহাসের ‘টার্নিং পয়েন্ট’