বাংলায় মুসলমানদের উৎপত্তি-তত্ত্বের বিশ্লেষণ (পর্ব-২)
পরবর্তী সময়ে পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশের ওপর কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ সুদৃঢ় করার লক্ষ্যে মুহাম্মদ বিন তুঘলক লখনৌতি, সোনারগাঁও ও সাতগাঁও অঞ্চলে সৈন্যসামন্ত ও উচ্চপদস্থ আমলাসহ তিনজন যুগ্ম প্রশাসক নিযুক্ত করেন। পরিস্থিতির বিবর্তনে এই রাজকর্মকর্তাদের সবাই শেষ পর্যন্ত এই বঙ্গভূমিকেই নিজেদের স্থায়ী ঠিকানা হিসেবে বেছে নেন। এমনকি বাংলার এই অভিবাসন প্রক্রিয়ায় প্রকৃতির রুদ্ররোষও এক বিচিত্র ভূমিকা পালন করেছিল। রাজধানী দিল্লি ও তৎসংলগ্ন এলাকায় যখন পরপর দুবার ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয় এবং মুহম্মদ বিন তুঘলকের সব ত্রাণ প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়, তখন তিনি নিরুপায় হয়ে রাজধানীর রুদ্ধদ্বার উন্মোচন করে দুর্গতদের নিজ নিজ অভিপ্রায় অনুযায়ী গন্তব্য সন্ধানের অনুমতি দেন। জীবন বাঁচাতে এবং অন্নের সংস্থানে সেই বাস্তুচ্যুত মানুষদের একটি বিশাল অংশ পরিবার-পরিজনসহ সুজলা-সুফলা বাংলায় আশ্রয় গ্রহণ করেন। [তাবাকাতে আকবরী, অরিজিন (Origin) ইত্যাদি গ্রন্থে উদ্ধৃত, প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা : ১৫।] একইভাবে অযোধ্যার শাসনকর্তা ইয়ামিনুল মুলকের বিদ্রোহ ব্যর্থ হলে তার অনুসারী ও সৈন্যরাও সুলতানের ক্রোধ থেকে বাঁচতে বাংলায় পাড়ি জমান। [তারিখে ফেরেশতা, পৃষ্ঠা : ১৩৯।]
দিল্লিতে খিলজি ও তুঘলক শাসনকালে বাংলার বুকে বিভিন্ন মুসলিম গোষ্ঠীর এই যে নিরবচ্ছিন্ন এবং বিপুল আগমন, তা এই জনপদে ক্ষমতার এক নতুন মেরূকরণ তৈরি করে। এরই চূড়ান্ত ফলাফলে ৭৩৪ হিজরি (১৩৪২ খ্রিষ্টাব্দে) প্রতিষ্ঠিত হয় বিখ্যাত ইলিয়াস শাহি রাজবংশ। এই রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা হাজী ইলিয়াস, তার প্রতিষ্ঠিত রাজবংশ সংক্ষিপ্ত ব্যবধান ছাড়া প্রায় দেড় শতক ধরে বাংলা শাসন করেছিলেন, তিনিও ছিলেন মূলত সুদূর সিজিস্তান থেকে আগত এক অভিজাত অভিবাসী। [আসসাখাবি, আদদাওউল লামি, কায়রো, ১৩০৩ হিজরি সংস্করণ, খণ্ড : ২, পৃষ্ঠা : ৩১৩।] আর নিঃসন্দেহে তিনি সঙ্গে আগত সুবিশাল ও প্রভাবশালী অভিবাসী দলের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।
আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, ইলিয়াস শাহি আমল ছিল বাংলার বুকে শান্তি ও সমৃদ্ধির এক সুবর্ণ সময়; ঠিক যে মুহূর্তে দিল্লি পড়েছিল চরম রাজনৈতিক টানাপোড়েন আর বিশৃঙ্খলার জাঁতাকলে। ১৩৮৮ খ্রিষ্টাব্দে ফিরোজ শাহ তুঘলকের ইন্তেকাল এবং তার ঠিক এক দশক পর তৈমুর লঙের ভয়াবহ আক্রমণ (১৩৯৮ খ্রিষ্টাব্দ) দিল্লিতে ভয়াল অস্থিতিশীলতা ও নৈরাজ্যের বীজ বপন করেছিল, যার রেশ পরবর্তী সৈয়দ ও লোদী বংশের শাসনকালজুড়েই অব্যাহত থাকে। এই শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি স্বভাবতই বহু মানুষকে বাংলার এই শান্তির আশ্রয়ে ছুটে আসতে বাধ্য করে। বস্তুত এভাবেই ইলিয়াস শাহি আমলে এই ভূখণ্ডে মুসলিম জনসংখ্যা ও বসতি স্থাপনের এক ধারাবাহিক ঊর্ধ্বগতি পরিলক্ষিত হয়।
ইলিয়াস শাহি আমলের প্রথম ভাগে ভ্রমণকারী বিশ্বপর্যটক ইবনে বতুতা পূর্ব বাংলা ও আসাম আসেন। তিনি অন্যান্য প্রসঙ্গের পাশাপাশি এ দেশে অস্বাভাবিক বিপুলসংখ্যক ভবঘুরে ফকিরের উপস্থিতির কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেন। [আগে দেখুন, পৃষ্ঠা: ১২৪-১৩০]। নিঃসন্দেহে তারা ছিলেন সেইসব ভাগ্যবিড়ম্বিত ও বাস্তুচ্যুত মুসলমান, যারা তৎকালীন বৈরী পরিস্থিতিতে দলে দলে বাংলায় এসে ভিড় জমিয়েছিলেন। ইবনে বতুতা আরো জানিয়েছেন, পূর্ব বাংলার তৎকালীন শাসক ফখরুদ্দিন সাদকাওয়ানে (চট্টগ্রাম) শাইদা নামক এমনই এক ফকিরকে নিজের প্রতিনিধি হিসেবে নিযুক্ত করেছিলেন। তবে পরিতাপের বিষয় হলো, শাইদা পরে অন্যান্য ফকিরের সঙ্গে আঁতাত করে ওই অঞ্চলের শাসনক্ষমতা কুক্ষিগত করার এক ব্যর্থ প্রয়াস চালান। [রিহলায়ে ইবনে বতুতা, পৃষ্ঠা : ৬১৫]। এই ঘটনাটি দৃঢ়ভাবে প্রমাণ করে, ইবনে বতুতার দেখা ফকিররা সাধারণ কোনো ভিক্ষুক ছিলেন না; বরং তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক পটভূমি ও সুদূরপ্রসারী অভিলাষ ছিল।
ইসলামের প্রাথমিক যুগের কিংবদন্তি বীর খালিদ ইবনে ওয়ালিদের বংশধর হিসেবে পরিচিত বিশিষ্ট পণ্ডিত ও ধর্মপ্রচারক শায়খ আলাউল হক ঠিক এই সময়েই বাংলায় আগমন করেন এবং তৎকালীন রাজধানী পাণ্ডুয়ায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। কথিত আছে, তিনি এত বিপুলসংখ্যক অনুসারী ও ফকিরের অন্নবস্ত্রের সংস্থান করতেন যে, তার এই ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তায় শঙ্কিত ও ঈর্ষান্বিত হয়ে সুলতান সিকান্দার শাহ (৭৫৯-৭৯২ হিজরি/১৩৫৮-১৩৯৮ খ্রিষ্টাব্দ) তাকে পূর্ব বাংলার সোনারগাঁওয়ে নির্বাসিত করেছিলেন। [পূর্বে দেখুন, পৃষ্ঠা : ১২৭-১২৮]। খুব সম্ভবত পূর্বোক্ত শাইদার বিদ্রোহের ঘটনাটি সিকান্দার শাহের জানা ছিল এবং তিনি পাণ্ডুয়ায় এমন কোনো ঘটনার পুনরাবৃত্তি নিয়ে গভীরভাবে চিন্তিত ছিলেন।
অবশ্য শায়খ আলাউল হক ছিলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন ধাতুতে গড়া এক নির্মোহ ব্যক্তিত্ব। পরবর্তী সময়ে তাকে সসম্মানে রাজধানীতে প্রত্যাবর্তনের অনুমতি প্রদান করা হয় এবং জীবনের শেষ দিনগুলো তিনি এই পাণ্ডুয়াতেই অতিবাহিত করেন। গিয়াসুদ্দিন আজম শাহ (৭৯২-৮১৪ হিজরি/১৩৮৯-১৪১০ খ্রিষ্টাব্দ) ইলিয়াস শাহি রাজবংশের সর্বশ্রেষ্ঠ শাসক হিসেবে বিবেচিত। তিনি পণ্ডিত ও সুফি-দরবেশদের প্রতি তার উদার পৃষ্ঠপোষকতার জন্য সুবিদিত ছিলেন এবং দেশ-দেশান্তর থেকে আগত জ্ঞানী-গুণীদের আপন দরবারে সসম্মানে বসবাস করতে সর্বদা উৎসাহিত করতেন।
অনুবাদ : মুহাম্মদ আরিফ বিল্লাহ