হোম > সাহিত্য সাময়িকী > মুসলিম বিশ্বের ইতিহাস

আব্বাসী খেলাফতের শাহি রান্নাঘরে

আবদুল মান্নান গালিব

তেরো শতকের বাগদাদ ছিল সমগ্র বিশ্বের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক রাজধানী। তবে এই শহরের ঐশ্বর্য শুধু প্রাসাদ, গ্রন্থাগার বা বাজারে সীমাবদ্ধ ছিল না; এর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ লুকিয়ে ছিল রান্নাঘরেও। ভারতীয় মসলা, পারস্যের শুকনো ফল এবং আরব রন্ধনঐতিহ্যের সমন্বয়ে আব্বাসী যুগে গড়ে উঠেছিল এক সমৃদ্ধ খাদ্যসংস্কৃতি। খলিফাদের দস্তরখানে পরিবেশিত হতো নানা স্বাদের রাজকীয় পদ। আব্বাসী যুগের খাদ্যসংস্কৃতি, খলিফাদের প্রিয় খাবার এবং কয়েকটি ঐতিহ্যবাহী পদের রেসিপি নিয়ে লিখেছেন আবদুল মান্নান গালিব।

তেরো শতকের বাগদাদ—পৃথিবীর অন্যতম সমৃদ্ধ নগরী, বিশ্বসভ্যতার এক প্রধান কেন্দ্র। সেকালে আব্বাসী খলিফাদের দরবারের রাজনীতি ও সমরবিষয়ক ব্যস্ত আলোচনার খবর কমবেশি সবারই জানা। কিন্তু বাগদাদের গল্প শুধু খলিফার দরবারে সীমাবদ্ধ ছিল না; সমান ব্যস্ততা ছিল রাজকীয় রান্নাঘরেও। সেখানে প্রতিদিন তৈরি হতো বিচিত্র স্বাদের অসংখ্য পদ, যার সুবাস ছড়িয়ে পড়ত প্রাসাদের অন্দরমহলে। কী ছিল সেসব খাবার? কোন পদ ছিল খলিফাদের প্রিয়? কোন মসলার জাদুতে তৈরি হতো এসব খাবারের অনন্য স্বাদ? আব্বাসী রন্ধনঐতিহ্যের দিকে তাকালেই মিলবে এসব প্রশ্নের উত্তর।

খাদ্যবৈচিত্র্য ও খাবারের পদ

আব্বাসী রান্নাঘরে খাবারের বৈচিত্র্য ছিল রীতিমতো বিস্ময়কর। খাবারকে সাধারণত কয়েকটি শ্রেণিতে ভাগ করা হতো। ‘হাওয়ামিদ’ (টক-ঝাল তরকারি) ছিল একটি বিশেষ শ্রেণি, যেখানে মাংসের সঙ্গে মেশানো হতো ডালিম, তেঁতুল, খেজুরের শিরা কিংবা আঙুরের ভিনেগার। ‘সাওয়াজ’ (সরল পদ) শ্রেণির খাবারে মসলার ব্যবহার ছিল তুলনামূলক কম, তবে উপকরণের মান থাকত অত্যন্ত উন্নত। ভাজা ও শুকনো খাবারকে বলা হতো ‘কালায়া’ ও ‘নাওয়াশিফ’। আর তন্দুরে প্রস্তুত খাবারের ছিল আলাদা মর্যাদা; সেখানে মাংস দীর্ঘ সময় ধরে অল্প আঁচে রান্না করা হতো।

আব্বাসী দস্তরখানায় মাংসের প্রাধান্য ছিল স্পষ্ট। ভেড়া বা মেষের মাংসের চাহিদাই ছিল সবচেয়ে বেশি। বিশেষ করে, চর্বিযুক্ত অংশকে উৎকৃষ্ট বলে মনে করা হতো। মুরগি, কবুতর এবং অন্যান্য পাখির মাংসও রান্না করা হতো। মাছের জন্য ছিল আলাদা আয়োজন—তাজা মাছ, লবণে সংরক্ষিত শুকনা মাছ এবং মাছের আচার; সবই তাদের দস্তরখানে স্থান পেত। শাকসবজির মধ্যে পালং, বেগুন, পেঁয়াজ, কুঁদরি ও লিকের ব্যবহার ছিল নিয়মিত। মিষ্টান্নের ক্ষেত্রে ‘হালাওয়াত’-এর বৈচিত্র্য ছিল বিস্ময়কর—শক্ত মিষ্টি, নরম মিষ্টি, লুজিনাজ, ফালুজাহ, সাবুনিয়াসহ নানা ধরনের মিষ্টান্ন পরিবেশন করা হতো।

মসলা ও উপকরণ

আব্বাসী রান্নার প্রাণশক্তি নিহিত ছিল মসলার ব্যবহারে। সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হতো ‘আবাজির’—বিভিন্ন মসলার বিশেষ মিশ্রণ। এতে থাকত শুকনা ধনে, জিরা, দারুচিনি, গোলমরিচ, আদা ও মস্তকি। এছাড়া খাবারে সোনালি রঙ ও মনোরম সুগন্ধ আনতে ব্যবহার করা হতো জাফরান আর মিষ্টান্ন ও পানীয়ে যোগ করা হতো গোলাপজল। বিশেষ কিছু মিষ্টিতে কস্তুরী ও কর্পূরও মেশানো হতো।

খাবারে টক স্বাদের ব্যবহার ছিল অত্যন্ত পরিশীলিত। আঙুরের ভিনেগার, ডালিমের রস, আলুবোখারার শরবত এবং তেঁতুল ব্যবহার করা হতো স্বাদে ভিন্ন মাত্রা যোগ করতে। টকের মাত্রা বেশি হলে নিখুঁত ভারসাম্য আনতে মেশানো হতো মধু কিংবা খেজুরের গুড়। রান্নায় চর্বির উৎস হিসেবে ব্যবহৃত হতো ভেড়ার চর্বি ও তিলের তেল। পাশাপাশি কাঠবাদাম, পেস্তা এবং আখরোটের ব্যবহার ছিল তরকারি ও মিষ্টান্নে সমানভাবে।

এই উপকরণগুলোর তালিকাই যেন একটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথের মানচিত্র। ভারত থেকে আসত মসলা, পারস্য থেকে শুকনা ফল আর ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল থেকে আসত অলিভ অয়েল। আব্বাসী সাম্রাজ্যের বিস্তৃত বাণিজ্যজাল পৃথিবীর নানা প্রান্তকে যে সুতোয় বেঁধেছিল, তার সুগন্ধময় ফসল এসে জমা হতো বাগদাদের রান্নাঘরে।

রান্নার বিশেষ পদ্ধতি

আব্বাসী রন্ধনশিল্পের একটি অসাধারণ বৈশিষ্ট্য ছিল এর শৃঙ্খলা ও পরিচ্ছন্নতা। মাংস রান্নার আগে গরম পানি এবং লবণ দিয়ে ভালোভাবে ধুয়ে রক্ত ও গ্রন্থি পরিষ্কার করা হতো। মাংস ফুটতে শুরু করলে ওপরের ফেনা ও অতিরিক্ত চর্বি চামচ দিয়ে তুলে ফেলা হতো। রান্নার পুরো সময় অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে আঁচ নিয়ন্ত্রণ করা হতো।

তন্দুর বা মাটির বড় চুলায় রান্না ছিল অন্যতম বিশেষ পদ্ধতি। যেমন-‘হারিস’ রান্না করা হতো রাত থেকে ভোর পর্যন্ত ধীর আঁচে। কাবাব প্রস্তুতের ক্ষেত্রে মাংস আগে সেদ্ধ করে পরে ভাজা হতো, যাতে ভেতরটা নরম থাকে এবং বাইরের অংশ মচমচে হয়।

রান্নার শেষে গোলাপজল ছিটিয়ে দেওয়া ছিল প্রায় আবশ্যিক রীতি। খাবার পরিবেশনের আগে পাত্রের চারপাশ পরিষ্কার কাপড় দিয়ে মুছে নেওয়া হতো। রান্নার পাত্রে যাতে মাটি বা ধুলোর গন্ধ না লাগে, সে জন্য মাটির পাত্র ব্যবহারের আগে আগুনে ভালোভাবে পুড়িয়ে নেওয়ার পরামর্শ দিতেন তৎকালীন রন্ধনবিশারদরা। রান্নার জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হতো ডুমুর বা অলিভগাছের কাঠ। ধোঁয়া কম হওয়ায় এসব কাঠের বিশেষ কদর ছিল।

খলিফার পছন্দ ও বিশেষ পদ

সিকবাজ : এটি আব্বাসী দরবারের সবচেয়ে জনপ্রিয় পদগুলোর একটি ছিল। চর্বিযুক্ত মাংস, সুগন্ধি মসলা, পেঁয়াজ, বেগুন ও গাজর একসঙ্গে রান্না করে এবং তাতে জাফরান মিশিয়ে এই পদ প্রস্তুত করা হতো। সোনালি রঙের ও টক-মিষ্টি স্বাদের এই সুস্বাদু খাবারটি খলিফা হারুনুর রশিদ ও খলিফা মামুনের দরবারে নিয়মিত পরিবেশিত হতো।

জিরবাজ : এটিও ছিল একটি রাজকীয় পদ। মাংসের সঙ্গে ডালিমের বীজ, কালো কিশমিশ, তাজা বাদাম এবং পুদিনার সমন্বয়ে তৈরি এই খাবারটি যেমন ছিল রঙিন, তেমনি স্বাদেও ছিল বহুমাত্রিক।

হারিসা : এটি ছিল শীতকালের বিশেষ রাজকীয় পদ। গম, মাংস ও ঘি দীর্ঘ সময় ধরে একসঙ্গে চুলায় রান্না করে এটি তৈরি করা হতো। শরীরে উষ্ণতা জোগানো এই

আব্বাসী রান্নাঘরের সহজ কয়েকটি রেসিপি

ক. সিকবাজ (টক-মিষ্টি মাংসের ঝোল)

উপকরণ : চর্বিযুক্ত মাংস, পেঁয়াজ, বেগুন, গাজর, শুকনা ধনে গুঁড়ো, ভিনেগার, খেজুরের গুড়, সামান্য জাফরান, গোলাপজল ও লবণ।

প্রস্তুত প্রণালি : প্রথমে মাংসের টুকরোগুলো পানি ও লবণ দিয়ে সেদ্ধ করতে বসান। ফুটে উঠলে ওপরের ফেনা তুলে ফেলুন। এরপর এতে ধনে গুঁড়ো এবং আলাদাভাবে সেদ্ধ করে পানি ঝরিয়ে রাখা পেঁয়াজ, বেগুন ও গাজরের টুকরো যোগ করুন। মাংস সেদ্ধ হয়ে এলে স্বাদমতো ভিনেগার ও খেজুরের গুড়ের মিশ্রণ ঢেলে দিন। হালকা আঁচে প্রায় এক ঘণ্টা দমে রাখুন। নামানোর আগে জাফরান ও গোলাপজল ছিটিয়ে পরিবেশন করুন।

খ. মুশমুশিয়া (বাদামি মাংসের ঝোল ও কাবাব)

উপকরণ : চর্বিযুক্ত মাংস, লাল মাংসের কিমা, আস্ত কাঠবাদাম, ভেড়ার চর্বি (বা তেল), ধনে, জিরা, মস্তকি, আদা গুঁড়ো, জাফরান ও গোলাপজল।

প্রস্তুত প্রণালি : চর্বিযুক্ত মাংসের টুকরোগুলো প্রথমে সেদ্ধ করে নিন। আলাদাভাবে কিমা দিয়ে ছোট ছোট গোল কাবাব বা মাংসের বল তৈরি করুন এবং প্রতিটির ভেতরে একটি করে আস্ত কাঠবাদাম ঢুকিয়ে দিন। এবার পাত্রে ভেড়ার চর্বি বা তেল গরম করে সেদ্ধ মাংস ও কাবাবগুলো দিন। ওপর থেকে ধনে, জিরা, মস্তকি ও আদা গুঁড়ো ছিটিয়ে রান্না করুন। শেষে জাফরান মেশানো পানি ও গোলাপজল ছিটিয়ে নামিয়ে নিন।

গ. লুজিনাজ (বাদামের মিষ্টান্ন)

উপকরণ : গুঁড়ো চিনি, খোসা ছাড়ানো কাঠবাদাম গুঁড়ো, গোলাপজল ও পেস্তা কুচি।

প্রস্তুত প্রণালি : গুঁড়ো চিনি ও কাঠবাদাম গুঁড়ো একসঙ্গে মিশিয়ে নিন। এরপর সামান্য গোলাপজল দিয়ে মিশ্রণটি ভালোভাবে মেখে একটি নরম মণ্ড তৈরি করুন। মণ্ডটি রুটির মতো পাতলা করে বেলে নিন। তারপর ভেতরে বাদাম ও চিনির পুর দিয়ে রোল করে মুড়িয়ে ছোট ছোট টুকরো করে কেটে নিন। ওপর থেকে গুঁড়ো চিনি ও পেস্তা কুচি ছড়িয়ে পরিবেশন করুন।

ঘ. হারিসা (মাংস ও গমের মণ্ড)

উপকরণ : চর্বিযুক্ত মাংস, ভুসিমুক্ত পরিষ্কার গম, গলানো ঘি, জিরা ও দারুচিনি গুঁড়ো।

প্রস্তুত প্রণালি : বড় পাত্রে মাংস ও পানি দিয়ে সেদ্ধ করতে বসান। মাংস নরম হয়ে এলে হাড় আলাদা করে শুধু মাংসটুকু পাত্রে রাখুন। এবার আগে থেকে সেদ্ধ করে রাখা গম মাংসের সঙ্গে মিশিয়ে দিন। মৃদু আঁচে রান্না করতে করতে মাংস ও গম একত্রে মিশে মসৃণ মণ্ডে পরিণত না হওয়া পর্যন্ত অনবরত নাড়তে থাকুন। প্রস্তুত হয়ে গেলে ওপরে গলানো ঘি, জিরা ও দারুচিনির গুঁড়ো ছড়িয়ে গরম গরম পরিবেশন করুন।

সুলতানা শাজারাতুদ দুর

খেলাফতে রাশেদার শাম অভিযান : আজনাদাইনের যুদ্ধ

আলজাজারির বিস্ময়কর উদ্ভাবন

বঙ্গে মুসলিম অভিবাসন

আজনাদাইনের যুদ্ধ

বিশ্ব ইতিহাসের ‘টার্নিং পয়েন্ট’

স্বর্ণযুগের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও দার্শনিক আলফারাবি

প্রাচীন মসজিদের শহর মোহাম্মদাবাদ

ইবনে রুশদের বহুমাত্রিক জ্ঞানদক্ষতা

সেনাপতি খালিদের শাম আগমন