এবারের অমর একুশে বইমেলা পবিত্র রমজান মাসে হওয়ায় অন্য বছরের তুলনায় পাঠক ও দর্শনার্থী কিছুটা কম দেখা গেলেও প্রকাশকদের আশঙ্কা পুরোপুরি সত্য হয়নি। ক্রেতাশূন্য থাকার যে শঙ্কা ছিল, তার চেয়ে বেশি পাঠক ও দর্শনার্থী মেলায় আসছেন।
গতকাল শনিবার রাজধানীর বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ ঘুরে দেখা যায়, সকালের দিকে দর্শনার্থী তুলনামূলক কম থাকলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে ভিড়। ইফতারের আগ পর্যন্ত পাঠকরা বিভিন্ন স্টল ঘুরে বই দেখেছেন এবং পছন্দের বই কিনেছেন। ইফতারের পরও চলে কেনাকাটা।
মেলার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে গিয়ে দেখা যায়, কিছুটা ব্যস্ত সময় পার করছেন বাংলা একাডেমির ৩ নম্বর স্টলের বিক্রয়কর্মীরা। এ সময় স্টলের ইনচার্জ শাহ মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান আমার দেশকে বলেন, এবারের মেলায় স্বাভাবিকভাবেই অন্যবারের তুলনায় মানুষের উপস্থিতি কিছুটা কম। তবে শুরুতে যেটা প্রকাশকরা ভেবেছিলেন, সেই তুলনায় পরিস্থিতি অনেক ভালো। প্রতিদিনই কিছু না কিছু পাঠক বই কিনছেন। বিক্রিও ভালোই হচ্ছে।
ব্রাদার্স পাবলিকেশনের সেলস অ্যাসোসিয়েট মিমকে দেখা যায় দাঁড়িয়ে দুজন ক্রেতাকে বিভিন্ন বই সম্পর্কে ধারণা দিচ্ছেন। বইয়ের পাতা উল্টে দেখছেন দুজন ক্রেতা। এ সময় মিম আমার দেশকে বলেন, এবার কিছুটা কমই বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু যেরকম কথা উঠেছিল বিক্রি একদমই হবে না, সে রকমটা না। এখনো শুরুর দিকে। এর মধ্যে আবার ঈদের আগের সময়। তাই এখন দেখা যাচ্ছে ক্রেতা একটু কম। এরপরও অনেকেই ইফতারের আগে ও পরে বই কিনছে। তিনি আশাবাদী, সামনে আরো জমে উঠবে।
তবে একদম ব্যতিক্রম ভাবনা নোলক প্রকাশনের বিক্রয়কর্মী তাপস রায়ের। তিনি মনে করেন, দর্শনার্থী কম কিন্তু পাঠক কম নয়। তাপস আমার দেশকে বলেন, ‘রমজানের কারণে মেলায় আগের মতো ভিড় নেই, এটা সত্যি। কিন্তু ক্রেতাশূন্যও নয়। যারা বই পড়েন ও কেনেন তাদের জন্য কোনো বাধা নেই। তারা যেকোনো সময় বইমেলা আয়োজন হলেই বই কিনতে আসবেন। পাঠকরা ধীরে ধীরে আসছেন এবং বই কিনছেন। মাত্র তিনদিন গেল। এখনো অনেক স্টল ঠিকমতো প্রস্তুতই হয়নি। সে হিসেবে ভালোই মনে হচ্ছে। আমি মনে করি ঈদকে সামনে রেখে বেশ ভালো হবে।
মহাকাল প্রকাশনের প্রকাশক মৃধা মো. মনিরুজ্জামান অবশ্য হতাশার কথা বললেন। তিনি আমার দেশকে বলেন, ‘আজকে ছুটির দিন। অন্যান্য বছরে এ সময় পুরো মেলা থাকে লোকে-লোকারণ্য। কিন্তু এবার দেখুন, সেই তুলনায় মানুষই নেই। তবে রমজানের মধ্যে বইমেলা হওয়ায় আমাদের মধ্যে শুরুতে যে শঙ্কা ছিল এখন সেটা নেই। এখন দেখা যাচ্ছে, মানুষজন বাড়ছে। বইমেলাকে ঘিরে পাঠকদের আগ্রহ আছে, এটা আমাদের জন্য ইতিবাচক। তবে প্রচারের অভাবে অনেকে বইমেলা সম্পর্কে জানে না। তাই কম পাঠক।
তার মতে, রমজানের সময়সূচির সঙ্গে মানিয়ে অনেক পাঠক বিকালের দিকে বা ইফতারের আগে মেলায় আসছেন। ফলে আগের বছরের মতো ভিড় না থাকলেও বইপ্রেমীদের উপস্থিতিতে মেলার প্রাণচাঞ্চল্য পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি।
মাথায় গোলাপ, চন্দ্রমল্লিকা ও জুঁই ফুলের রিং দিয়ে সেজে এসেছে শিশু রাইজা রাফা। তার সঙ্গে এসেছেন তার মা। তার মাথায়ও আছে ফুলের এ বিশেষ রিং। শাহজাদপুর থেকে রাফার বাবা সিহাব আলম এসেছেন পরিবারকে নিয়ে বই কিনতে। তিনি আমার দেশকে বলেন, পাশেই একটা কাজ ছিল। ভাবলাম এদিকে যেহেতু আসলাম, মেলা থেকে কিছু বই নিয়ে যাই। রাফার জন্য শিশুতোষ কিছু বই কিনব। আর আমাদের জন্য উচ্চারণ ও ভাষা নিয়ে বই কিনব।
দুপুরের দিকে মেলা চত্বরে দেখা যায়, অপেক্ষা করছেন দুই বন্ধু মোহাম্মদ হিমেল ও হাবিবুন নেসা মাইদা। তারা ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী। মেলায় কী কী বই কিনলেন জানতে চাইলে তারা আমার দেশকে বলেন, আসলে বই মেলা চলছে আমরা জানি না। এখন এখানে বন্ধুর সঙ্গে দেখা করার জন্য এসেছি। এসে দেখি মেলা চলছে। তাই ভেতরে আসলাম। আগে থেকে জানলে কী কী বই নেব সে বিষয়ে প্রস্তুতি নিয়ে আসতে পারতাম।
দুপুরের দিকে বাংলা একাডেমি চত্বরে পাঠকদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। প্রথমবারের মতো আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের স্টল বসেছে এবারের বই মেলায়। স্টলে এসেছেন ফাউন্ডেশনটির চেয়ারম্যান মুফতি আহমাদুল্লাহ। তার অটোগ্রাফসহ ‘ইমানের অপরিহার্য পাঠ’ বইটি কিনতে পাঠকদের দীর্ঘ সিরিয়াল দেখা যায়। এ সময় তিনি পাঠকদের সঙ্গে মতবিনিময় করে তাদের হাতে অটোগ্রাফসহ বই তুলে দেন।
এদিকে গতকাল বাংলা একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে শিশু প্রহরে ১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনের চেতনা ও দেশপ্রেমকে নতুন প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দিতে একুশ, দেশাত্মবোধক ও গণজাগরণের গানের প্রতিযোগিতার প্রাথমিক পর্ব সম্পন্ন হয়েছে।
প্রতিযোগিতায় বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ও শিশু-কিশোর শিল্পীরা অংশ নেয়। তারা ভাষা আন্দোলন, মাতৃভাষার মর্যাদা এবং দেশের প্রতি ভালোবাসা নিয়ে রচিত একুশ ও দেশাত্মবোধক গান পরিবেশন করে। প্রতিযোগীদের কণ্ঠে ভাষা শহীদদের স্মৃতি ও দেশের প্রতি গভীর আবেগ ফুটে ওঠে।
শিশু-কিশোর সংগীত প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম। এই সাংস্কৃতিক আয়োজন ঘিরে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী শিশু-কিশোরদের পাশাপাশি দর্শক সারিতে বসে গান উপভোগ করা দর্শকদের মধ্যেও ছিল ব্যাপক উৎসাহ। প্রতিযোগিতা দেখতে মিলনায়তনে ভিড় করেন বহু দর্শনার্থী ও সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষ।
প্রতিযোগিতায় ক বিভাগে থাকা আট বছর পর্যন্ত বয়স এমন ৮২ শিশু অংশ নেয়। তারা গেয়েছে ইচ্ছামতো গান। খ বিভাগে ৮-১২ বছরের ১৮৩ শিশু অংশ নেয়। এ বিভাগের প্রতিযোগীরা একুশের গান, দেশাত্মবোধক গান ও গণজাগরণের গান গেয়েছেন। আর গ বিভাগে ১২-১৫ বছরের ৮১ কিশোর-কিশোরী অংশ নেয়। এ বিভাগের প্রতিযোগীরাও একুশের গান, দেশাত্মবোধক গান ও গণজাগরণের গান গেয়ে মঞ্চ মাতিয়েছেন।