দেশের স্বাস্থ্য খাতের টেকসই উন্নয়ন এবং নাগরিকদের জন্য সাশ্রয়ী ও মানসম্মত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে সরকারি ও বেসরকারি খাতের কার্যকর অংশীদারত্বের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। একই সঙ্গে চিকিৎসা সরঞ্জাম উৎপাদন, স্বাস্থ্যসেবা খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতে সরকারের নীতিগত সহায়তা অব্যাহত থাকবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
মঙ্গলবার রাজধানীর গুলশানের হোটেল আমারিতে আয়োজিত ‘বাংলাদেশে স্বাস্থ্যখাতে উদ্যোক্তা হওয়ার পথ’ শীর্ষক আলোচনা ও কর্মশালায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ডা. জুবাইদা রহমান। এতে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন এবং প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী (প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায়) ডা. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার। এ ছাড়া স্বাস্থ্য খাতের বিশেষজ্ঞ, উদ্যোক্তা, চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনরা অংশ নেন।
অর্থমন্ত্রী বলেন, কেবল বাজেট বরাদ্দ বাড়ালেই স্বাস্থ্য খাতের কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন সম্ভব নয়। বিদ্যমান সম্পদের দক্ষ ব্যবহার, সমন্বিত পরিকল্পনা এবং সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতার মাধ্যমে কার্যকর স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এ লক্ষ্যে স্বাস্থ্য খাতের জন্য একটি দূরদর্শী পরামর্শমূলক জোট গঠনের উদ্যোগকে তিনি স্বাগত জানান।
তিনি বলেন, দেশে দক্ষ উদ্যোক্তা, আধুনিক ডায়াগনস্টিক সেন্টার, বেসরকারি হাসপাতাল এবং শক্তিশালী ওষুধ শিল্প রয়েছে। চলতি বাজেটে ওষুধ শিল্পের অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্টস (এপিআই) উৎপাদন সম্প্রসারণে বিশেষ সহায়তা এবং পৃথক শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এখন প্রয়োজন এই সক্ষমতাকে জাতীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থার সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করা।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে চিকিৎসা ব্যয়ের বড় অংশ এখনো মানুষের নিজস্ব পকেট থেকে বহন করতে হয়, যা বিশ্বের অন্যতম উচ্চ হার। এই ব্যয় কমিয়ে সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগের সমন্বয় অপরিহার্য।
স্বাস্থ্যসেবাকে প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার উল্লেখ করে আমির খসরু বলেন, সরকার প্রাথমিক ও প্রতিরোধমূলক চিকিৎসার ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। গ্রামীণ পর্যায়ে স্বাস্থ্যসচেতনতা বাড়াতে প্রায় এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি অতিরিক্ত সরকারি অবকাঠামো নির্মাণের পরিবর্তে বেসরকারি খাতের দক্ষতা ও সক্ষমতা কাজে লাগানোর নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, চিকিৎসা সরঞ্জাম উৎপাদনে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে চলতি বাজেটে বিভিন্ন প্রণোদনা রাখা হয়েছে। এসব উদ্যোগে ইতিমধ্যে ইতিবাচক সাড়া মিলতে শুরু করেছে। উপযুক্ত পরিবেশ ও কার্যকর নীতিমালা নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা বিশ্বমানের সাফল্য অর্জন করতে সক্ষম হবেন।
অর্থমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকারের উন্নয়ন দর্শনের অন্যতম ভিত্তি হলো বেসরকারি খাতের নেতৃত্বে প্রবৃদ্ধি অর্জন। সরকারের নীতিগত সহায়তা এবং উদ্যোক্তাদের উদ্ভাবনী উদ্যোগ একসঙ্গে কাজ করলে দেশের স্বাস্থ্য খাতে যুগান্তকারী পরিবর্তন সম্ভব হবে। জনগণকে মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার যে অঙ্গীকার সরকার করেছে, তা বাস্তবায়নে নিরলসভাবে কাজ চলছে বলেও জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে ডা. জুবাইদা রহমান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে দেশের স্বাস্থ্য খাত অবহেলা ও জবাবদিহির সংকটে রয়েছে। বর্তমানে স্বাস্থ্য ব্যয়ের প্রায় ৭২ শতাংশই জনগণকে নিজস্ব অর্থ থেকে বহন করতে হয়, যা অনেক পরিবারকে আর্থিক সংকটে ফেলছে। এই বাস্তবতা পরিবর্তনে স্বাস্থ্যব্যবস্থার কাঠামোগত সংস্কার এবং সুশাসন নিশ্চিত করার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, দেশের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো জনসংখ্যার তুলনায় স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীর স্বল্পতা। এই ঘাটতি কাটিয়ে উঠতে তরুণদের স্বাস্থ্য উদ্যোক্তা হিসেবে এগিয়ে আসতে হবে। সরকার নতুন উদ্ভাবন, গবেষণা এবং উদ্যোক্তা তৈরিকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে।
তিনি বলেন, দেশে অনেক দক্ষ চিকিৎসক নতুন চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে কাজ করছেন এবং বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প আন্তর্জাতিক মান অর্জন করেছে। এ খাতের সম্ভাবনাকে আরও কাজে লাগাতে সরকারি সহায়তা অব্যাহত থাকবে।
ডেঙ্গু পরিস্থিতি প্রসঙ্গে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, রোগটি মোকাবিলায় সরকার সর্বাত্মকভাবে কাজ করছে এবং আগের তুলনায় প্রস্তুতি ও সমন্বয় আরও জোরদার করা হয়েছে।
অনুষ্ঠানের বক্তারা বলেন, স্বাস্থ্য খাতের টেকসই উন্নয়নের জন্য উদ্ভাবন, দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টি, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং নতুন উদ্যোক্তা তৈরির বিকল্প নেই। সরকারি ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে দেশের স্বাস্থ্যসেবার মান আরও উন্নত করা সম্ভব।