স্কুলশিক্ষক নূরজাহান বেগম যে ঘরে মারা গেছেন, সেই কক্ষটি দেখলে মনে হবে এটি ময়লার ভাগাড়! চারদিকে ময়লা ছড়ানো-ছিটানো। স্যাঁতসেঁতে কক্ষে উইপোকার ছড়াছড়ি। নূরজাহানের মাথার এক পাশে উইপোকাও প্রবেশ করেছিল। নোংরা, অগোছালো, দুর্গন্ধযুক্ত এমন একটি কক্ষে অতিপীড়িত বৃদ্ধার মৃত্যুতে অনেকেই স্তম্ভিত হয়েছেন।
অবাক হয়ে অনেকেই নিজেদেরই প্রশ্ন করেছেনÑউচ্চশিক্ষিত ও সরকারের বড় পদে চাকরি করার পরও আবর্জনাবেষ্টিত, অযত্ন-অবহেলায় কীভাবে একজন বৃদ্ধার এভাবে মৃত্যু হতে পারে! বিষয়টি ভেবে অনেকেই কূল পাচ্ছেন না। নূরজাহান বেগমের কক্ষটি থাকত তালাবদ্ধ। সাতদিন পরপর কিছু শুকনো খাবার ও ডাল-ভাত দিতেন তার মেয়ে কনিকা। রুমেও তিনি প্রবেশ করতেন না।
দরজার কাঁটাতেই তিনি খাবার রেখে আবার বের হয়ে আসতেন। বাসাটির ভাড়াটেরা জানালেন, সাতদিন আগেই নূরজাহান মারা গেছেন বলে তাদের ধারণা। পুরো বাসাটি ছিল নোংরা, অগোছালো, দুর্গন্ধযুক্ত ও ডাস্টবিনের নোংরা ছড়ানো-ছিটানো। এমন মৃত্যুতে পল্লবী এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তারা নূরজাহানের পরিবারের শাস্তি দাবি করেছেন।
গতকাল মঙ্গলবার সকালে পল্লবীর ছয় নম্বর সেকশনের ১২ নম্বর রোডের আট নম্বর বাসায় সরেজমিনে ভাড়াটে ও এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য জানা যায়। গত রোববার ৯৯৯ নম্বরে খবর পেয়ে নূরজাহান বেগমের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
নূরজাহান বেগম তিন সন্তানের জননী। বড় ছেলে আনিসুর রহমান সরকারের যুগ্ম সচিব। আরেক ছেলে আশিকুর রহমান বুয়েটের শিক্ষক। এক মেয়ে কনিকা স্থানীয় একটি স্কুলের শিক্ষিকা। এমন মৃত্যুতে সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, সমাজে নৈতিক মূল্যবোধের অভাবেই এমন ঘটনা ঘটছে। মানুষ তার পবিত্র দায়িত্ব থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করছে। এতেই দেশে বাবা-মায়ের প্রতি সন্তানদের অমানবিক আচরণের ঘটনা ঘটছে। আর ধর্মীয় তাত্ত্বিকরা বলছেন, নৈতিক শিক্ষা আসে ধর্মীয় শিক্ষা থেকে। দেশের মানুষ এই শিক্ষা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।
গতকাল মঙ্গলবার সকালে সরেজমিনে পল্লবীর ছয় নম্বর সেকশনের ‘সি’ ব্লকে গিয়ে দেখা যায়, নূরজাহান বেগমের বাসার সামনে লোকজনের ভিড়। সবাই এ ঘটনায় মর্মাহত। তারা বিষয়টি আরো গভীরভাবে জানার চেষ্টা করছেন।
ওই বাসার ভাড়াটে জহিরুল ইসলাম জানান, নূরজাহান বেগম এলাকায় ভালো মানুষ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি একটি স্কুলের শিক্ষিকা ছিলেন। দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ; কিন্তু সঠিক চিকিৎসাসেবা পাননি।
তিনি আরো জানান, তার তিন সন্তান খুব একটা খোঁজ-খবর নেননি। মূলত অবহেলাতেই তিনি মারা গেছেন।
নূরজাহানের বাসার সামনের বাসিন্দা সৈয়দ আবদুল্লাহ জানান, আমরা নূরজাহানের তিন সন্তানকে পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদ করার দাবি জানাচ্ছি। নূরজাহান বেগমের স্বামীও ছিলেন একজন সমাজসেবক। তার এমন মৃত্যু মেনে নেওয়া যায় না।
সোহেল নামে স্থানীয় এক বাসিন্দা জানান, ওই বৃদ্ধার একমাত্র মেয়ে কনিকা বাসার দরজায় কাঁটা লাগিয়েছিলেন। তিনি রুমেও প্রবেশ করতেন না। খাবারগুলো কাঁটাতে ঝুঁলিয়ে রাখতেন। নূরজাহান বেগম খাবারগুলো হামাগুড়ি দিয়ে নিয়ে খেতেন। এমন মৃত্যু আসলেই অমানবিক।
আরেক বাসিন্দা জানান, নূরজাহান বেগমের তিন সন্তানের এলাকার লোকজনের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক ছিল না। তারা দরজা দিয়ে বের হয়ে যেতেন; আবার ঢুকতেন। সামাজিকভাবে তারা বিচ্ছিন্ন ছিলেন। ঘটনার পর তারা এলাকাবাসীর রোষানলে পড়েছেন। পুলিশ তাদের উদ্ধার করে নিয়ে গেছে।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, দেশের পরিবারগুলোতে নীতিনৈতিকতা, আস্থা ও সম্মানের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এতে সন্তানরা বাবা ও মায়ের প্রতি কী দায়িত্ব আছে, তা বুঝতে পারছে না। ফলে এমন করুণ ঘটনা ঘটছে দেশে।
তিনি আরো জানান, দেশের সামাজিক মূল্যবোধকে জাগ্রহ করতে হবে। পরিবারের মধ্যে মানসিক বন্ধনকে শক্তিশালী করতে হবে।
বাবা-মায়ের প্রতি সন্তানের দায়িত্বের ব্যাপারে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণের বিষয়ে জানতে চাইলে মিসরের আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী আবুল কালাম আজাদ আজহারী জানান, ‘আল্লাহ বাবা-মায়ের সেবা করতে সরাসরি নির্দেশ দিয়েছেন। তারা যেন কোনো ধরনের ব্যথা না পান, সে জন্য নির্দেশও দিয়েছেন। ধর্মীয় জ্ঞান না থাকার কারণে দেশে অহরহ বাবা-মায়ের প্রতি অবহেলার ঘটনা ঘটছে।
জানতে চাইলে পল্লবী থানার ওসি হাসান বাসির জানান, এ ঘটনায় স্থানীয় এক বাসিন্দা বাদী হয়ে থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন। মামলাটির তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।