চূড়ান্তের পথে এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জের রূপরেখা। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী বছরের জানুয়ারিতে পাইলটিং শুরু করার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে কাজ করছে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় গঠিত কমিটি। আজ মন্ত্রণালয়ের এ সংক্রান্ত কমিটির বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। বৈঠকে এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ রূপরেখার চূড়ান্ত অনুমোদন হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
জানা গেছে, বৈঠকের পর তা চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রীর কাছে পাঠানো হবে। মন্ত্রণালয় আশা করছে, অক্টোবর মাসের মধ্যে এটি চূড়ান্ত করে আগামী জানুয়ারি মাসে পাইলট প্রজেক্ট চালু করার।
জানা গেছে, চাকরিপ্রার্থী ও নিয়োগদাতার মধ্যে সেতুবন্ধ তৈরি এবং দেশজুড়ে দক্ষতার ঘাটতি দূর করতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ‘এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ’ বা ‘কর্মসংস্থান বিনিময় কেন্দ্র’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। মেধাভিত্তিক ও ন্যায্য কর্মসংস্থান ব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এটিকে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন নীতিনির্ধারকরা। মূলত খাতভিত্তিক ও আঞ্চলিক অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করা এবং সারা দেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণে সরকারের বৃহত্তর কৌশলের অংশ হিসেবেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কার্যক্রম ও রূপরেখা
কর্মসূচির আওতায় জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠা করা হবে। এসব কেন্দ্র স্থানীয় পর্যায়ে চাকরি ও দক্ষতার সমন্বয় ঘটানোর অবকাঠামো হিসেবে কাজ করবে। সেখানে নিবন্ধিত প্রার্থীরা তাদের মেধা ও দক্ষতার ভিত্তিতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শূন্য পদে নিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা পাবেন। এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ শুধু চাকরিপ্রার্থীদের শূন্য পদের সঙ্গে সংযুক্ত করবে না, বরং শ্রমবাজারের চাহিদা ও কর্মীদের সক্ষমতার মধ্যে ব্যবধানও কমাবে।
শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, ‘এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ’ গঠনসংক্রান্ত কমিটি এর রূপরেখা চূড়ান্ত করতে কাজ করছে। ইতোমধ্যে কমিটি স্টেকহোল্ডারদের নিয়ে চারটি বৈঠক সম্পন্ন করেছে এবং তাদের মতামত গ্রহণ করেছে। আজকের বৈঠকে এটির চূড়ান্ত রূপরেখা অনুমোদিত হতে পারে।
সংশ্লিষ্টরা আরও জানান, কোনো চাকরিপ্রার্থীর প্রয়োজনীয় দক্ষতা না থাকলে এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে তাকে উপযুক্ত প্রশিক্ষণকেন্দ্রে পাঠানো হবে। প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে তাদের কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা বাড়ানোই এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। প্রথমে পূর্ণাঙ্গ অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠার চিন্তা থাকলেও পরবর্তীতে তা থেকে সরে এসে এক বছর বা ছয় মাসের পাইলট প্রজেক্ট হিসেবে এর কার্যক্রম চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পরবর্তীতে অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সারা দেশে এ কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হবে।
মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য
শ্রম ও কর্মসংস্থান সচিব আব্দুর রহমান তরফদার আমার দেশকে বলেন, ‘এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ’ প্রতিষ্ঠার কাজ চলমান। ইতোমধ্যে কয়েকটি বৈঠক হয়েছে এবং আপাতত এটি ছোট আকারে চালু করা হবে। থিংক ট্যাংক ও স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে শিগগির ধারণাপত্র তৈরি করা হবে। মূলত চাকরিদাতা ও প্রার্থীর মধ্যে মেলবন্ধন তৈরি করা এবং দেশের বিভিন্ন ট্রেনিং সেন্টারে রেফারেল হিসেবে আমাদের মন্ত্রণালয় কাজ করবে।
বেকারত্ব ও কর্মসংস্থানের বর্তমান চিত্র
সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে খোঁজ নিয়েও গত সাত মাসে মোট কতটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে, তার কোনো নির্ভরযোগ্য ও সমন্বিত সরকারি হিসাব পাওয়া যায়নি। ফলে সরকারের লক্ষ্যমাত্রা অনুসারে কর্মসংস্থানের কত শতাংশ অর্জিত হয়েছে—তারও সুনির্দিষ্ট উত্তর মিলছে না। বর্তমান পরিস্থিতিতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির তুলনায় বিদ্যমান কর্মসংস্থান রক্ষা করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দেশে প্রকৃত বেকারের সংখ্যা কত, তার সঠিক কোনো হিসাব না থাকায় সরকারের দেওয়া পরিসংখ্যান নিয়ে রয়েছে নানা প্রশ্ন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে বেকার মানুষের সংখ্যা ২৬ লাখ ৬০ হাজার এবং বেকারত্বের হার ৪ দশমিক ৬৩ শতাংশ। তবে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) এক প্রতিবেদনে আরো উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে; যেখানে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে প্রতি ১০০ জন শিক্ষিত তরুণের মধ্যে ৩৬ জনই বেকার।
বিশ্বব্যাংকের পর্যবেক্ষণ ও সুপারিশ
অন্যদিকে, বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের ভাইস প্রেসিডেন্ট জোহানেস জাট জানান, গত এক দশকে বাংলাদেশের শ্রমবাজারে ১ কোটি ৪০ লাখ তরুণ প্রবেশ করলেও কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে মাত্র ৮৭ লাখের। অর্থাৎ, কর্মক্ষম তরুণদের প্রায় অর্ধেকই চাকরি পায়নি। বিশেষ করে তরুণীরা কর্মসংস্থানে অধিক বাধার মুখে পড়ছে। বিশ্বব্যাংক মনে করে, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা বাড়ার প্রেক্ষাপটে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির পথে থাকা মৌলিক প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করতে দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষমাণ সামষ্টিক অর্থনীতি ও আর্থিক খাতের সংস্কার অত্যন্ত জরুরি।
সংস্থাটি আরো জানিয়েছে, তারা এমন অর্থনীতি গড়ে তুলতে দেশগুলোকে সহায়তা করছে, যেখানে প্রবৃদ্ধি স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থানে রূপ নেয়—উন্নত দেশ থেকে কাজ সরিয়ে নেওয়ার পরিবর্তে মানুষ যেখানে বসবাস করে সেখানেই সুযোগ সৃষ্টিতে সহায়তা করা হয়। বৃহৎ পরিসরে কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে ভৌত ও মানবসম্পদ অবকাঠামোয় বিনিয়োগ, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলা এবং বেসরকারি খাতের বিনিয়োগেও কাজ করে যাচ্ছে সংস্থাটি।