“বিদ্যুৎ যায় না, আসে—বুঝি না। দিনে-রাতে সবসময়ই লোডশেডিং। দিনের অর্ধেক সময়ই তো বিদ্যুৎ থাকে না।”
এভাবেই বিদ্যুৎ সংকটের কথা বলছিলেন নেত্রকোনার কলমাকান্দা এলাকার বাসিন্দা সুফল তালুকদার। শুধু সুফল তালুকদার নন, বিদ্যুৎ নিয়ে এমন অভিযোগ দেশের বেশিরভাগ এলাকার সাধারণ মানুষের।
আমদানি নির্ভরতার কারণে বাংলাদেশে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট দীর্ঘদিনের। তবে গত ২১ জুলাই কক্সবাজারের মহেশখালীতে মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বা এফএসআরইউতে অগ্নিকাণ্ডের পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। এরপর থেকে বাসাবাড়িতে লোডশেডিং বেড়েছে, পাশাপাশি গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে দেশের শিল্পপ্রতিষ্ঠানেও।
তীব্র গ্যাস সংকটের কারণে দেশের অনেক শিল্পকারখানায় উৎপাদন বন্ধ রাখা কিংবা শ্রমিকদের ছুটিতে পাঠানোর খবরও সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম হয়েছে। গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট নিয়ে আলোচনা গড়িয়েছে জাতীয় সংসদ পর্যন্ত।
এমন পরিস্থিতিতে সম্প্রতি শিল্প মালিকদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৈঠকে মঙ্গলবার রাত থেকে শিল্পকারখানায় গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতি অনেকটাই স্বাভাবিক হবে বলে প্রধানমন্ত্রী আশ্বস্ত করেছেন বলে জানিয়েছেন শিল্প মালিকরা।
শিল্পপ্রতিষ্ঠানে গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়ানোর এই বার্তার পর থেকেই আবাসিকসহ অন্যান্য খাতে বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতি কবে স্বাভাবিক হবে, সেই প্রশ্ন উঠেছে।
ঝিনাইদহের মুরগির খামারি এ বি এম রকিবুল হাসান বলেন, “শিল্প কারখানা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু আমাদেরও তো বিদ্যুৎ প্রয়োজন। যেভাবে লোডশেডিং হচ্ছে, তাতে আমাদের ব্যবসার অবস্থাও তো খারাপ।”
তীব্র গরমের মধ্যে দীর্ঘ সময় লোডশেডিংয়ে বিপাকে পড়া আবাসিক এলাকার বাসিন্দারাও বিদ্যুৎ বিভ্রাট কমানোর দাবি তুলছেন।
সরকারের পক্ষ থেকে অবশ্য আগেই জানানো হয়েছে, বর্তমানে সংকটের মাত্রা যে পর্যায়ে পৌঁছেছে, সেখান থেকে পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে আরও সময় লাগবে।
বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, “পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতেই আমরা বিভিন্ন উৎস থেকে বেশি দামে এলএনজি কিনছি, বিদ্যুৎ পরিস্থিতিও উন্নতি হতে শুরু করেছে।”
শিল্পকারখানায় গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়ছে
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সোমবার বৈঠক করেন বাংলাদেশের শিল্প মালিকদের বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা। বৈঠকের পর শিল্পকারখানায় গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতি মঙ্গলবার রাত থেকে উন্নতির কথা জানানো হয়।
ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) প্রশাসক মো. ফজলুল হক বলেন, “উনি (প্রধানমন্ত্রী) আশ্বস্ত করেছেন আগামীকাল থেকেই আমাদের মিল-কলকারখানা, সমস্ত ফ্যাক্টরিগুলোতে বিদ্যুতের এবং গ্যাসের যে চাহিদা ছিল, আগের মতো তার উন্নতি হবে।”
দেশে বিদ্যুৎ ও গ্যাস ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা মন্ত্রণালয় ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার পক্ষ থেকে মঙ্গলবার যে তথ্য দেওয়া হয়েছে, তাতেও গ্যাস সরবরাহের পরিমাণ বেড়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের পাশাপাশি আমদানিকৃত নতুন এলএনজি কার্গো আসায় দুটি ভাসমান টার্মিনাল থেকেও গ্যাস সরবরাহ বেড়েছে বলে জানা গেছে। ফলে টানা প্রায় দুই মাসের সংকটের পর দেশে গ্যাস সরবরাহে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে।
সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, গত ২১ জুলাই মহেশখালীতে এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর যে সংকট শুরু হয়েছিল, বর্তমান সরবরাহ পরিস্থিতি এখন তার আগের সময়ের কাছাকাছি।
অর্থাৎ, গত ২০ জুলাই দেশে গ্যাস সরবরাহের পরিমাণ ছিল ২৬৫ কোটি ঘনফুট। বর্তমান গ্যাস সরবরাহ এখনও পুরোপুরি স্বাভাবিক না হলেও প্রায় দুই মাস পর তা আবার ওই সময়ের কাছাকাছি পৌঁছেছে।
বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজসম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) গ্যাস সরবরাহ তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত দেশে গ্যাস সরবরাহ হয়েছে ২৬১ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে উৎপাদন হয়েছে ১৬২ কোটি ঘনফুট এবং রিগ্যাসিফায়েড লিকুইফাইড ন্যাচারাল গ্যাস (আরএলএনজি) থেকে এসেছে ৯৯ কোটি ঘনফুট।
পেট্রোবাংলার হিসাব অনুযায়ী, সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত দেশে গ্যাস সরবরাহের পরিমাণ ছিল ২৩৬ কোটি ঘনফুটের কিছু বেশি। অর্থাৎ এক দিনের ব্যবধানে গ্যাস সরবরাহ বেড়েছে প্রায় ২৫ কোটি ঘনফুট।
তবে সরবরাহের এই পরিমাণ এখনও দেশের মোট গ্যাস চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুটের তুলনায় অনেক কম। তারপরও সরবরাহ বৃদ্ধির মাধ্যমে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিকের দিকে যাবে বলে দাবি করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।
তিনি বলেন, আমদানিকৃত এলএনজি নিয়মিত বিরতিতে দেশে আসতে শুরু করায় এবং এফএসআরইউগুলো পূর্ণ সক্ষমতার কাছাকাছি কাজ শুরু করায় ২১ জুলাইয়ের আগে যে অবস্থায় ছিল, গ্যাস সরবরাহ অনেকটাই সেই জায়গায় পৌঁছেছে।
তিনি বলেন, “সরবরাহ নিশ্চিত করতে আমরা বিভিন্ন সোর্স থেকে উচ্চ মূল্যে এলএনজি কিনেছি। ফলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করাই আমাদের লক্ষ্য, সেটা আমরা করছি।”
জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সংকট মোকাবিলায় এলএনজি আমদানি বাড়িয়েছে সরকার। চলতি মাসে পৃথক উৎস থেকে নয়টি এলএনজি কার্গো আসার কথা রয়েছে। এর মধ্যে চারটি ইতোমধ্যেই দেশে এসেছে।
এছাড়া অক্টোবর থেকে জুন পর্যন্ত প্রতি মাসে দুটি করে মোট ১৮ কার্গো এলএনজি কেনার সিদ্ধান্ত হয়েছে বলেও জানানো হয়েছে।
গ্যাস বাড়লেও বিদ্যুৎ সংকট এখনই কাটছে না
তীব্র গ্যাস সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে দেশের বিদ্যুৎ খাতে। গত দুই মাসে নিয়মিত আড়াই হাজার থেকে সাড়ে তিন হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং হয়েছে।
বৈশ্বিক জ্বালানি পরিস্থিতির কারণে চলতি বছরের শুরু থেকেই বিদ্যুৎ নিয়ে ভোগান্তি শুরু হলেও গ্যাস সংকট তীব্র হওয়ার পর পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করে।
মূলত গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ না হওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। বাংলাদেশের গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে দৈনিক প্রায় ১২০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে সরবরাহ নেমে আসে ৮৫ থেকে ৯০ কোটি ঘনফুটে।
ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় মাত্রায় ঘাটতি তৈরি হয়। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে উৎপাদন কিছুটা বাড়িয়েও সেই ঘাটতি পুরোপুরি পূরণ করা সম্ভব হয়নি।
এমন পরিস্থিতিতে গ্যাস সরবরাহ বাড়ার খবরে বাসাবাড়িতে গ্যাস সরবরাহ এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হবে কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন সাধারণ মানুষ।
বিদ্যুৎ খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্যাস সরবরাহ কিছুটা বৃদ্ধি পাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদনও বাড়বে। তবে বিদ্যমান পরিস্থিতিতে এখনই বড় ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম।
বাংলাদেশে বর্তমানে বিদ্যুতের মোট চাহিদা প্রায় ১৭ হাজার মেগাওয়াট। কিন্তু গত দুই মাসে অধিকাংশ সময় পিক-অফপিক মিলিয়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ ছিল ১২ থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াটের আশপাশে। কখনও কখনও তা আরও কমেছে।
পাওয়ার গ্রিডের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সোমবারও দেশে দুই হাজার মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং হয়েছে। ওই দিন সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৯০৫ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে উৎপাদন করা গেছে ১৪ হাজার ৮৪৬ মেগাওয়াট।
জোনভিত্তিক বিদ্যুৎ চাহিদার হিসাবে, সোমবার পিক আওয়ারে সবচেয়ে বেশি লোডশেডিং হয়েছে ময়মনসিংহ জোনে। সেখানে এক হাজার ৬০১ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে লোডশেডিং হয়েছে ৪৯০ মেগাওয়াট।
এছাড়া ঢাকা, রংপুর, কুমিল্লা ও সিলেট জোনেও উল্লেখযোগ্য মাত্রায় লোডশেডিং হয়েছে।
রাতারাতি পরিস্থিতি বদলাবে না
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রেজাউল করিম বলেন, গ্যাস সরবরাহ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতেও গ্যাসের সরবরাহ বাড়ানো হচ্ছে। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনও কিছুটা বাড়ছে।
তিনি বলেন, “আমরা একটু একটু করে গ্যাস বেশি পাচ্ছি। সরবরাহ যেহেতু বেড়েছে, বিদ্যুতের লোডশেডিংও কমে আসছে। তবে রাতারাতি পরিস্থিতি বদলাবে না।”
গ্যাস সংকট কমে আসার সঙ্গে বিদ্যুৎ সংকটও কাটবে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।
তিনি বলেন, “গ্যাস সরবরাহ বৃদ্ধির সাথে সাথে বিদ্যুতের সমস্যাও অনেকটা কমছে। আমরা চেষ্টা করছি সময়ের সাথে সাথে বিদ্যুতের সরবরাহ পরিস্থিতিও স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে আনতে।”
গত কয়েকদিন ধরেই লোডশেডিং একটু একটু করে কমছে বলেও দাবি করেন প্রতিমন্ত্রী।
তাহলে বাসাবাড়ির সংকট কাটবে কবে?
গ্যাস সরবরাহ ২১ জুলাইয়ের আগের সময়ের কাছাকাছি পৌঁছালেও দেশের মোট চাহিদার তুলনায় এখনও প্রায় ১১৯ কোটি ঘনফুট ঘাটতি রয়েছে। ফলে শিল্পকারখানায় সরবরাহ বাড়ানো হলেও আবাসিকসহ অন্যান্য খাতে তাৎক্ষণিকভাবে পুরোপুরি স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফেরার সম্ভাবনা নেই।
একইভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাস সরবরাহ বাড়ার ইতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করলেও চাহিদা ও উৎপাদনের ব্যবধান এখনও বড়। ফলে লোডশেডিং কমতে শুরু করলেও রাতারাতি তা পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী এলএনজি কার্গো নিয়মিত আসা এবং এফএসআরইউগুলো পূর্ণ সক্ষমতার কাছাকাছি পরিচালিত হলে গ্যাস সরবরাহ আরও বাড়ার কথা। এর সঙ্গে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে জ্বালানি সরবরাহ বাড়লে বিদ্যুৎ উৎপাদনও বাড়বে।
অর্থাৎ শিল্পখাতে গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করার উদ্যোগ ইতোমধ্যে শুরু হলেও বাসাবাড়ির গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট পুরোপুরি কাটতে আরও সময় লাগবে—সরকার ও বিদ্যুৎ খাতের কর্মকর্তাদের বক্তব্যে আপাতত এমনই ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
তাই নেত্রকোনার সুফল তালুকদার কিংবা ঝিনাইদহের রকিবুল হাসানের মতো সাধারণ ভোক্তা ও ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য স্বস্তি ফিরতে হলে শুধু গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো নয়, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণ ব্যবস্থার ঘাটতিও একসঙ্গে কমাতে হবে।