শহীদ আবরার ফাহাদকে কোনো রাজনৈতিক দলের পরিচয়ে সীমাবদ্ধ না রেখে বাংলাদেশের জাতীয় বীর হিসেবে স্মরণ করার আহ্বান জানিয়েছিলেন ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ওসমান হাদি। তিনি বলেছিলেন, আবরারের আত্মত্যাগের চেতনা দল-মতের ঊর্ধ্বে তুলে ধরে আধিপত্যবাদ ও আগ্রাসনের বিরুদ্ধে নতুন প্রজন্মকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে।
২০২৫ সালে ডাকসু আয়োজিত স্মরণসভায় আবরার ফাহাদকে স্মরণ করে এসব কথা বলেন শহীদ ওসমান হাদি।
বক্তব্যে ওসমান হাদি বলেন, ২০১৯ সালে আবরার হত্যার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত গায়েবানা জানাজা ও পরবর্তী মিছিলে ‘দিল্লি না ঢাকা, ঢাকা, ঢাকা’ স্লোগান ছিল বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত। তখন চারদিকে ভারতীয় দূতাবাসসহ বিভিন্ন মহলের নজরদারি ও চাপের মধ্যেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বুয়েটের শিক্ষার্থীরা এ ধরনের স্লোগান দিয়েছিলেন বলে উল্লেখ করেন তিনি।
ওসমান হাদি বলেন, ওই সময়কার পরিস্থিতি দেখে তার মনে হয়েছিল, ক্ষমতাসীনদের দীর্ঘদিনের ‘রাজত্ব’ হয়তো আর টিকে থাকবে না। পরে সেই পরিবর্তন বাস্তব হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
আবরারের পরিবারের সঙ্গে দেখা করার স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, গত বছর কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে আবরার ফাহাদের কবর জিয়ারতের পর তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করতে যান তারা। সেখানে আবরারের মায়ের সঙ্গে কথা বলার সময় তার গভীর মানসিক ট্রমার বিষয়টি উপলব্ধি করেন তারা।
ওসমান হাদি বলেন, আবরারের মাকে ‘জাতীয় আগ্রাসনবিরোধী দিবস’ ঘোষণা নিয়ে কিছু বলতে অনুরোধ করা হলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছিলেন, অন্যদেরও যেন তার ছেলের মতো পরিণতি না হয়। আবরারকে গুলি করে নয়, রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে সারারাত ধরে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছিল—এ বিষয়টি তার পরিবারের জন্য গভীর যন্ত্রণার কারণ বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
বক্তব্যে আবরারের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও কথা বলেন ওসমান হাদি। তিনি বলেন, বিতর্কের খাতিরে যদি ধরেও নেওয়া হয় যে আবরার কোনো সময় কোনো রাজনৈতিক দলের সমর্থক ছিলেন, তাতে তার হত্যার প্রতিবাদ বা ন্যায়বিচারের দাবি থেকে সরে যাওয়ার সুযোগ নেই। একইভাবে কোনো ছাত্রদল, অধিকার পরিষদ বা অন্য রাজনৈতিক দলের কর্মী-সমর্থক নিহত হলেও তার পক্ষেও ন্যায়বিচারের দাবি জানাতে হবে।
তার ভাষায়, ‘ইনসাফ’ মানে প্রতিপক্ষের ক্ষেত্রেও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। জুলুমের বিপরীতে আরেকটি জুলুম প্রতিষ্ঠা করা নয়। তাই আবরারকে কোনো একটি দলের সম্পদে পরিণত না করে পুরো বাংলাদেশের জাতীয় বীর হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার আহ্বান জানান তিনি।
তিনি বলেন, আবরারের আধিপত্যবাদবিরোধী চিন্তা শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বা বুয়েটের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। দেশের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও নতুন প্রজন্মের কাছে সেই চেতনা পৌঁছে দিতে হবে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ‘কোটি কোটি আবরার’ প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ওসমান হাদি আরও বলেন, আবরার কোনো একটি দলের নন, তিনি সারা বাংলাদেশের। তাই ছাত্রদল, এনসিপিসহ দেশের সব রাজনৈতিক দল ও শক্তিকে আবরারকে নিয়ে বড় কর্মসূচি আয়োজনের আহ্বান জানান তিনি।
বক্তব্যে বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ের নাম পরিবর্তন করে ‘শহীদ আবরার ফাহাদ এভিনিউ’ করার বিষয়টিও উল্লেখ করেন ওসমান হাদি। তিনি জানান, মাহমুদ ভাইয়ের দেওয়া সাত দফার একটি দাবি ছিল বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ের নাম শহীদ আবরার ফাহাদ এভিনিউ করা। সরকার সেই দাবি স্বীকৃতি দিয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
নামটি দীর্ঘ হওয়ায় সড়কটি সংক্ষেপে ‘আবরার এভিনিউ’ নামে পরিচিত করার আহ্বান জানান ওসমান হাদি। তিনি বলেন, মুখে মুখে ‘আবরার এভিনিউ’ নামটি ছড়িয়ে দিতে হবে, যাতে আবরারের স্মৃতি ও আধিপত্যবাদবিরোধী চেতনা মানুষের মধ্যে আরও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
তবে আবরার ফাহাদকে নিয়ে এসব কথা বলার কয়েক মাস পরই নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের এক কর্মীর গুলিতে নিহত হন ওসমান হাদি। ২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর ঢাকার পল্টন এলাকার বক্স কালভার্ট রোডে রিকশায় যাওয়ার সময় মোটরসাইকেলে আসা দুর্বৃত্তরা তাকে গুলি করে। গুরুতর আহত অবস্থায় প্রথমে ঢাকায় চিকিৎসা নেওয়ার পর উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ ডিসেম্বর রাতে তিনি মারা যান।
এমএমআর