পটুয়াখালীর আরএনপিএলের (আরপিসিএল-নরিনকো) বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য সরাসরি ক্রয় (ডিপিএম) পদ্ধতিতে কয়লা কেনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। দীর্ঘসূত্রিতা এড়িয়ে দ্রুত বাণিজ্যকভাবে উৎপদানের (সিওডি) জন্য এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎকেন্দ্রটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
সরকারের এ উদ্যোগকে উচ্চ আদালতের রায়ের লঙ্ঘন বলেছেন খাত সংশ্লিষ্ট ও সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবীরা। তাদের মতে, সরকারের এ উদ্যোগ এখতিয়ার বহির্ভূত। এতে কেন্দ্রটি পুরোদমে চালু করার ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি জটিলতায় পড়বে। চারবার দরপত্র ডেকেও কার্যাদেশ দিতে না পারা সরকারর বড় ধরনের ব্যর্থতা বলেও দাবি তাদের।
বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, গত বছর এপ্রিলে বিদ্যুৎকেন্দ্রটিতে পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হয়। কিন্তু কয়লার অভাবে ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্রটি বাণিজ্যিক উৎপাদনে যেতে পারছে না। এই কেন্দ্রটি নির্মাণে মোট ২ দশমিক ৫৪ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে ১ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলার ঋণ রয়েছে চীনের। ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে কিস্তি পরিশোধের চাপও রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
বিদ্যুৎকেন্দ্র সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, পটুয়াখালীর কয়লাভিত্তিক তাপ-বিদ্যুৎকেন্দ্রটি চালু করতে দীর্ঘমেয়াদে কয়লা সরবরাহের জন্য দরপত্র আহ্বান করেও তিনবার বাতিল হয়েছে। চতুর্থ দফায় সিঙ্গাপুর-ভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠান যোগ্য বিবেচিত হওয়ার পরও এটি বাতিল করা হয়। বারবার দরপত্র বাতিল করায় কয়লার সরবরাহ নিশ্চিত না হওয়ায় ক্ষতির মুখে পড়ে এ বৃহৎ বিদ্যুৎকেন্দ্রটি। চতুর্থ দফায় ডাকা দরপত্র বাতিল করে আবারও দরপত্র আহ্বানের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে রিট দায়ের করে ইয়াংথাই এনার্জি প্রাইভেট লিমিটেড।
আইনজীবীরা জানিয়েছেন, হাইকোর্ট সরকারের সিদ্ধান্তকে বাতিল করে সিঙ্গাপুর-ভিত্তিক প্রতিষ্ঠানকে কয়লা সরবরাহের কার্যাদেশ দেওয়ার নির্দেশনা দেন। সরকার এ রায় চ্যালেঞ্জ করে আপিল করলে আপিল বিভাগও হাইকোর্টের রায় বহাল রাখেন।
রিটকারীদের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আহমদ আজম খান গণমাধ্যমকে বলেন, প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়ে নানা ধাপে মূল্যায়নের পর আর্থিক ও কারিগরিভাগে যোগ্য কোম্পানিকে কাজ না দিয়ে দরপত্র বাতিল করা ও পুনঃদরপত্র আহবানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। দরপত্র বাতিল ও পুনঃআহ্বানের সিদ্ধান্ত অবৈধ ঘোষণা করেছেন আদালত। উচ্চ আদালতের রায়ের আলোকে সরকার পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে বলে জানান তিনি।
আরএনপিএল, বিদ্যুৎ বিভাগ ও বিপিডিবি সূত্র জানিয়েছে, কয়লা সংগ্রহে তিন ধরনের পদ্ধতির অনুসরণ করা যেতে পারে বলে বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। প্রথমত, সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি অনুসরণ করে খনি নির্বাচনের মাধ্যমে কয়লা সংগ্রহ করা; দ্বিতীয়ত, বিদ্যুৎকেন্দ্রটি চালুর ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা হিসেবে মাতারবাড়ি মজুদকৃত কয়লা ধারে এনে বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু করা এবং তৃতীয় পরিকল্পনায় অন্তবর্তী সময়ের জন্য লিমিটেড টেন্ডারিং মেথড (এলটিএম) পদ্ধতি অনুসরণ করে কয়লা কেনা।
প্রতিযোগিতামূলক উম্মুক্ত পদ্ধতির টেন্ডার প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে বিকল্প পন্থায় সরাসরি কিনে বা ধার করে কয়লা এনে বিশাল এ বিদ্যুৎকেন্দ্রটি চালুর উদ্যোগকে রহস্যজনক হিসেবে খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, আরএনপিএলের বোর্ড সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কয়লা কেনার ক্ষেত্রে যে তিন ধরনের পদ্ধতি অনুসরণ করার কথা বলা হয়েছে। তা মূলত একটি বিশেষ সিন্ডিকেটের চাহিদা অনুযায়ী কয়লা সংগ্রহের দ্রুত বিকল্প। এ ধরনের উদ্যোগ টেকসই ও বাস্তবভিত্তিক নয়। এতে পুরো বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সূত্র জানিয়েছে, আরএনপিএল কর্তৃপক্ষ বিদ্যুৎকেন্দ্রটি চালু করতে গত ১০ ডিসেম্বর কোম্পানির ৬৮তম বোর্ড সভায় কয়লা কেনার একাধিক সিদ্ধান্ত অনুমোদন দিয়েছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রটির বাণিজ্যিক উৎপাদনে না আসা পর্যন্ত ইপিসি ঠিকাদার কনসোর্টিয়াম (টেপকো-সিএইচইসি-সিডব্লিউইসি) থেকে ভ্যারিয়েশন অর্ডারের মাধ্যমে জরুরি ভিত্তিতে কয়লা সংগ্রহের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বোর্ড সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সরকারি ক্রয় বিধিমালা (পিপিআর-২০২৫) অনুযায়ী সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি (ডিপিএম) অনুসরণ করে ইপিসি এবং ইন্দোনেশিয়ার কয়লাখনি থেকে সরাসরি কয়লা সংগ্রহের সম্ভাবনা যাচাই করা হবে। এ লক্ষ্যে বিদ্যুৎ বিভাগ, বিপিডিবি বিআরইবি, আরপিসিএল, নরিনকো ইন্টারন্যাশনালের একজন করে প্রতিনিধিকে নিয়ে ছয় সদস্যের একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছে। কমিটির সদস্যরা কয়লা সংগ্রহের জন্য যোগ্য খনি চিহ্নিত করতে ইন্দোনেশিয়া সফর করবেন।
এছাড়া ইপিসি ঠিকাদার থেকে কয়লা সংগ্রহের ক্ষেত্রে মূল্য ও শর্ত মূল্যায়নের জন্য বিপিডিবি, এমআইএসটি মন্ত্রণালয় ও আরএনপিএল-এর তিন সদস্যের একটি ভ্যারিয়েশন অ্যাসেসমেন্ট কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, কেন্দ্রটি চালু করতে যে ধরনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে তাতে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির উৎপাদন আরো ঝুঁকিতে পড়বে। এছাড়া কয়লা কেনাকে কেন্দ্র করে বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের নতুন সুযোগ তৈরি করে দেয়া হয়েছে। এটি অন্তর্বর্তী সরকারের সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের বিধি নিষেধের পরিপন্থী বলেও জানান বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত একজন কর্মকর্তা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইপিসি কন্ট্রাক্টর থেকে কয়লা সংগ্রহ করা এই প্রথম এবং তাদের শঙ্কা এভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন আরো বিপর্যস্ত ও ব্যয়বহুল। কারণ ইপিসি কন্ট্রাক্টর কয়লা আন্তর্জাতিক কয়লা ট্রেডার কোম্পানি হতে সংগ্রহ করবে। মূলত ইপিসি কন্ট্রাক্টের আড়ালে সিন্ডিকেট মনোনীত কোম্পানি সরবরাহ করবে। ইপিসি কন্ট্রাক্টর এবং প্রকল্পের ডিপিপি অনুযায়ী তাদের কাজ বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ। ইপিসি হতে কয়লা নিলে বেড়ে যাবে প্রকল্পের ঋণ।
পিপিআর বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিযোগিতামূলক আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে নানা ধাপে মূল্যায়নের পর আর্থিক ও কারিগরিভাগে যোগ্য কোম্পানিকে নির্বাচিত করা হয়। এমন অনুসরণ না করে তড়িঘড়ি করে এমন দরপত্র আহ্বান করা, স্পট পারচেজ/ডিপিএম পদ্ধতিতে করে সরাসরি একটি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে কয়লা সরবরাহ করতে দেওয়া, অথবা ইপিসি কন্ট্রাক্টরকে ব্যবহার করে কয়লা সংগ্রহ সবকিছু যেন সিন্ডিকেটের কারসাজি। যার মাধ্যমে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা হ্রাস, আমদানি-নির্ভরতা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন।
কয়লা কেনায় জটিলতার বিষয়ে আরএনপিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ এইচ এম রাশেদ আমার দেশকে বলেন, কয়লা সরবরাহের বিষয়ে উচ্চ আদালতের একটি রায় রয়েছে। মন্ত্রণালয়ের আইন শাখা রায়ের কপি পর্যালোচনা করছে। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে অন্তর্বর্তী সময়ের জন্য বিদ্যুৎকেন্দ্রটি দ্রুত বাণিজ্যিক উৎপাদনে (সিওডি) নিতেও আমাদের ওপর চাপ রয়েছে। আমরা যে উদ্যোগ নিয়েছি তা সাময়িক সময়ের জন্য। আপাতত কিছু পরিমাণ কয়লা জোগাড় করে এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে। দীর্ঘমেয়াদে উৎপদানের জন্য পরে সরকার বাস্তবভিত্তিক উদ্যোগ নেবে।