চা খাতকে কৃষি খাতে রূপান্তর করা সরকারের ঘোষিত নীতির পরিপন্থী। একই সাথে এটি অকল্যাণকর ও অকার্যকর প্রস্তাব বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান।
বুধবার সকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবে ‘বাংলাদেশের চা শিল্প পুনর্গঠন: চা শ্রমিকের ওপর এর প্রভাব’ শীর্ষক এক পরামর্শ সভায় তিনি এ মন্তব্য করেন। এই পরামর্শ সভা যৌথভাবে আয়োজন করে সোসাইটি ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট (সেডা), পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) এবং ব্রাত্যজন রিসোর্স সেন্টার (বিআরসি)। পরামর্শ সভার শুরুতে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সেডার পরিচালক ফিলিপ গাইন। এতে বক্তব্য রাখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক তানজিম উদ্দিন খান, সোসাইটি ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্টের চেয়ারম্যান খুশি কবির, বিলসের নির্বাহী পরিচালক শ্রমিক নেতা সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ, বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি পঙ্কজ বান্দ ও সাধারণ সম্পাদক নৃপেন পাল। সভায় বেশ কয়েকজন চা শ্রমিকও বক্তব্য রাখেন।
সভায় সভাপতির বক্তব্যে হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, “প্রস্তাবনাটা চা-কে কৃষিতে রূপান্তরিত করা এবং সেটা একটা সংকীর্ণ প্রয়োজন। এটা কিন্তু সরকারের ঘোষিত নীতির বিপরীতে আসছে। এক কথায় প্রথমে বলতে হবে যে, এই কৃষিতে রূপান্তরিত করাটা সরকারের ঘোষিত নীতির পরিপন্থী। এটা একটা অকার্যকর প্রস্তাব, যেটা বাদ দিতে হবে। এটা নিয়ে আর তেমন কোনো আলোচনার প্রয়োজন নেই।” এখন আলোচনাটা হওয়া দরকার যে এই খাতকে অর্থনৈতিক বিকাশের প্রয়োজনে আরও গতিশীল কীভাবে করব, এই প্রশ্ন রেখে তিনি আরও বলেন, আলোচনাটি কেবল শ্রমিক বা মালিকপক্ষের একক সংকীর্ণ স্বার্থের নয়, বরং পুরো চা খাতের টেকসই বিকাশ, উৎপাদনশীলতা ও অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার একটি দায়িত্বশীল প্রক্রিয়া। গঠিত টেকনিক্যাল কমিটির গঠন সঠিক হয়নি এবং এতে বিদেশি ও ব্যক্তিগত বাণিজ্যের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা দেখা গেছে। নবগঠিত অ্যাডভাইজরি ও মনিটরিং কমিটিতে শিল্প মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি এবং অন্তত একজন শ্রমিক প্রতিনিধি অবিলম্বে যুক্ত করা প্রয়োজন। চা শিল্পের একটি স্বতন্ত্র ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রয়েছে। এই অঞ্চলে বসবাসকারী শ্রমিক জনগোষ্ঠীর নিজস্ব সংস্কৃতিকে ক্রিয়েটিভ ইকোনমির অঙ্গ হিসেবে চিহ্নিত করে মূল্যায়ন করা উচিত।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক তানজিম উদ্দিন খান বলেন, শিল্প পুনর্গঠনে টাস্কফোর্স থেকে যেভাবে সুপারিশগুলো এসেছে, সেখানে মাত্র ১০টি সুপারিশ প্রকাশ করা হয়েছে। বাকি ৪৯টি সুপারিশ কেন সর্বসাধারণের জন্য প্রকাশ করা হয়নি—এই ১০টি সুপারিশ দেখে মনে হচ্ছে তারা চা শিল্পকে কৃষি খাতে নেওয়ার নামে মূলত একটি পাবলিক-প্রাইভেট এন্টারপ্রাইজে পরিণত করতে চাচ্ছেন। চা বাগানের মালিকরা দাবি করছেন যে চা বাগান এখন আর আগের মতো লাভজনক নেই এবং এতে অনেক সংকট রয়েছে। এই সংকটকে পুঁজি করে তারা সরকারের কাছ থেকে অর্থায়ন নিশ্চিত করতে চাচ্ছেন। কৃষি খাতে নিয়ে আসার মূল উদ্দেশ্য হলো তারা বিভিন্ন ধরনের ভর্তুকি নিশ্চিত করবেন এবং কম সুদে ঋণ নেবেন। শুধু তা-ই নয়, সব দায়-দায়িত্ব সরকারের ঘাড়ে চাপানো হচ্ছে, যেখানে বাগানের কোনো দায়িত্ব থাকছে না।
সভার আলোচনাপত্রে বলা হয়েছে, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, ঋণের চাপ, কম উৎপাদনশীলতা ও রপ্তানি আয় কমে যাওয়া সহ নানান সংকট মোকাবিলায় সরকার ২০২৬ সালের জুলাইয়ে চা শিল্প পুনর্গঠনে একটি টাস্কফোর্স গঠন করে। টাস্কফোর্স চা-কে কৃষিপণ্য হিসেবে স্বীকৃতি, কম সুদে ঋণ, ভ্যাট কমানো, ২ হাজার ৫০ কোটি টাকার সহায়তা তহবিল এবং ১০ বছর মেয়াদি পুনঃরোপণ পরিকল্পনাসহ বিভিন্ন সুপারিশ করেছে। পরে এসব সুপারিশ বাস্তবায়নে ১২ সদস্যের উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি গঠন করা হয়। তবে এসব কমিটিতে চা শ্রমিক বা তাঁদের ট্রেড ইউনিয়নের কোনো প্রতিনিধি নেই। চা শিল্পে প্রায় এক লাখ ২ হাজার স্থায়ী ও ৪০ হাজার অস্থায়ী শ্রমিক রয়েছেন। অথচ শ্রম আইনে অংশগ্রহণকারী কমিটি, কল্যাণ কর্মকর্তা, নিয়োগপত্র, ছুটি, মুনাফায় অংশীদারত্ব, আবাসন, স্বাস্থ্য ও নিরাপদ কর্মপরিবেশসহ শ্রমিকদের জন্য যেসব অধিকার ও সুযোগের কথা বলা হয়েছে, সেগুলোর অনেক কিছুই চা-বাগানে যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে না।
ফিলিপ গাইন বলেন, পুনর্গঠনের আগে ভালো ও দুর্বল বাগানগুলোর ব্যবস্থাপনা, উৎপাদনশীলতা, আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণ চিহ্নিত করা জরুরি। একই সঙ্গে চা শ্রমিক ও তাদের ইউনিয়নকে পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় সরাসরি যুক্ত করতে হবে। তার প্রস্তাব, চা শিল্পের অর্থনৈতিক সংস্কারের পাশাপাশি শ্রমিকদের অধিকার ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করেই প্রকৃত পুনর্গঠন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে শ্রীলঙ্কার ভূমি সংস্কার, বেসরকারি ব্যবস্থাপনা ও ক্ষুদ্র চা-চাষের বিকাশের অভিজ্ঞতাও বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে।
তিনি আরও বলেন, আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত হলেও দিনের শেষে এটি একটি ধনীতান্ত্রিক রাষ্ট্র। এর বড় প্রমাণ মিলবে এই টাস্কফোর্সের চেহারা ও টেকনিক্যাল কমিটির গঠনের দিকে তাকালে। টেকনিক্যাল কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে যাঁকে রাখা হয়েছে, তিনি একজন ব্যাংকার ও ফিনটেক বিশেষজ্ঞ এবং ‘শপআপ’ নামক প্রাইভেট এন্টারপ্রাইজের প্রেসিডেন্ট। চা শিল্পকে কৃষি খাতে নেওয়ার প্রক্রিয়ায় যেখানে কৃষি বিশেষজ্ঞদের প্রয়োজন ছিল, সেখানে এই ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক প্রপোরশন রাখা হয়েছে। এমনকি নর্থইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির একজন মাস্টার্স ক্যান্ডিডেটকেও এই অসম টেকনিক্যাল কমিটির সদস্য করা হয়েছে, যা নজিরবিহীন। এই কমিটিতে শ্রমিকের বা লেবারের কোনো প্রতিনিধি নেই। উল্টো সিঙ্গাপুরের ডিবিএস ব্যাংকের চিফ সাস্টেইনেবিলিটি অফিসারসহ বিভিন্ন ব্যাংক ও ফিনটেক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের রাখা হয়েছে। এটি স্পষ্ট করে যে রাষ্ট্রব্যবস্থার কাছে সাধারণ শ্রমিক বা মানুষ প্রধান নয়, প্রধান হচ্ছে ব্যবসা ও ব্যবসায়ীদের স্বার্থ।