হোম > জাতীয়

লাশ চুরিতে কোটি টাকার বাণিজ্য

আবু সুফিয়ান

অন্ধকার রাত। রাজধানীর উপকণ্ঠের কোনো এক নির্জন গোরস্তান। মাটির গভীরে সবেমাত্র দাফন করা হয়েছে এক ব্যক্তির লাশ। কিন্তু চিরনিন্দ্রায় শায়িত ওই লাশ তুলতে ওতপেতে আছে একদল ‘লাশচোর’। শাবলের কোপে মাটি সরে যায়, কাফন ছিঁড়ে বের করে আনা হয় নিথর দেহ। এরপর শুরু হয় বীভৎসতা। মাংস অ্যাসিডে ঝলসে ও রাসায়নিক দিয়ে পুড়িয়ে হাড়গুলো আলাদা করা হয়। এ হাড়গুলোই কয়েক হাত বদল হয়ে যখন ধবধবে সাদা কঙ্কাল হিসেবে মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের পড়ার টেবিলে পৌঁছায়, তখন এর দাম গিয়ে ঠেকে ৩০-৪০ হাজার টাকায়।

২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে যখন বিশ্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও থ্রিডি সিমুলেশনের মাধ্যমে মানবদেহের নিখুঁত মানচিত্র তৈরি করছে, তখন বাংলাদেশের ১০ হাজার নবীন চিকিৎসকের পড়াশোনার হাতেখড়ি হচ্ছে কবর থেকে চুরি হওয়া লাশের হাড় দিয়ে। অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, যুগের পর যুগ ধরে চলা অমানবিক ও বীভৎস এ ‘কঙ্কাল বাণিজ্য’ এখন কয়েক কোটি টাকার এক সুসংগঠিত মাফিয়া সিন্ডিকেট।

সদ্য মৃত প্রিয়জনকে পরম মমতায় যখন স্বজনরা কবরে শায়িত করেন, তখন তারা কল্পনাও করতে পারেন না যে, অচিরেই নিথর দেহটি পরিণত হতে পারে পণ্য বা ব্যবসায়িক হাতিয়ারে। বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ১০ হাজার নতুন মেডিকেল শিক্ষার্থীর

অ্যানাটমি শিক্ষার অপরিহার্য অনুষঙ্গ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে মানুষের কঙ্কাল বা ‘হিউম্যান স্কেলেটন’। কিন্তু এই কঙ্কাল সংগ্রহের কোনো বৈধ বা রাষ্ট্রীয় প্রক্রিয়া না থাকায় গড়ে উঠেছে ভয়াবহ ও অমানবিক এক ‘লাশ চুরি’ সিন্ডিকেট। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও থ্রিডি প্রযুক্তির যুগে দাঁড়িয়েও একটি প্রাচীন ও অমানবিক প্রথা আঁকড়ে ধরে রাখার এ জেদ কেবল লাশের অবমাননাই করছে না; বরং হবু চিকিৎসকদের শিক্ষার শুরুতেই এক অনৈতিক বাণিজ্যের অংশীদার করে তুলছে।

ছাত্রনেতাদের ‘কঙ্কাল মাফিয়া’ সাম্রাজ্য

সূত্র বলছে, আওয়ামী লীগ আমলে মেডিকেল কলেজগুলোয় এই কঙ্কাল বাণিজ্যের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ছিল রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের হাতে। মেডিকেল কলেজকেন্দ্রিক ছাত্রলীগ নেতারা এ ব্যবসাকে কোটি টাকা আয়ের উৎস বানিয়েছিলেন। ২০১৬ সালে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের (মিটফোর্ড) শিক্ষার্থী ছিলেন মুর্তজা শাহরিয়ার। তিনি আমার দেশকে বলেন, “তৎকালীন মিটফোর্ড ছাত্রলীগের প্রভাবশালী নেতা হাসান আরিফ ছিলেন এই কঙ্কাল সিন্ডিকেটের অন্যতম হোতা। কঙ্কাল বাণিজ্যের সবচেয়ে বড় ‘মাফিয়া’ ছিলেন একই মেডিকেল কলেজের তৎকালীন শীর্ষ ছাত্রলীগ নেতা মজনু মিয়া। শেরপুর নিবাসী ছাত্রলীগের ওই নেতার নিয়ন্ত্রণে ছিল কঙ্কাল ডিস্ট্রিবিউশনের বিশাল নেটওয়ার্ক। এ সিন্ডিকেটের তিনটি ভাগ ছিলÑএকদল কবর থেকে লাশ সরাত, একদল লাশ গলিয়ে হাড় আলাদা করত আর ছাত্রনেতারা ছিল ‘ডিস্ট্রিবিউটর’।”

২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর কঙ্কাল বাণিজ্য সিন্ডিকেটে জড়িত মিটফোর্ড হাসপাতালের ওই ছাত্রলীগ নেতারাও আত্মগোপনে চলে যান। ফলে অভিযোগের বিষয়ে তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। রাজনীতির পটপরিবর্তন হলেও অমানবিক প্রথাটি আজও থামেনি; কেবল হাতবদল হয়েছে কঙ্কাল বাণিজ্যের।

চলতি বছরের মার্চে রাজধানীর উত্তরায় একটি ডেন্টাল কলেজের হোস্টেল থেকে ৪৭টি মাথার খুলি ও বিপুল হাড় উদ্ধার করে পুলিশ। এতে স্পষ্ট হয়, এই ব্যবসা এখন অনলাইন গ্রুপ ও বিশাল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। এর আগে ২০১৬ সালে কাফরুল থেকে ৩৫টি কঙ্কাল উদ্ধার করে পুলিশ। পাশাপাশি ২০২২ সালে কঙ্কাল সিন্ডিকেটের সঙ্গে ঢাকা মেডিকেলের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের জড়িত থাকার ঘটনা প্রমাণ করে যে, অবৈধ এ সরবরাহব্যবস্থা দীর্ঘদিনের।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকা মেডিকেল কলেজের কয়েকজন শিক্ষার্থী জানান, পড়াশোনা শেষে এ হাড়গুলো অনেক সময় প্রোপার ডিসপোজাল হয় না; নর্দমা বা ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া হয়, যা লাশের প্রতি চূড়ান্ত অসম্মান।

শিক্ষার্থীরা বলছেন, তারা অনিচ্ছা সত্ত্বেও এই হাড় কিনতে বাধ্য হন। কারণ, অ্যানাটমি ক্লাস এবং আইটেম পরীক্ষায় হাড় সামনে নিয়ে ডেমোনস্ট্রেশন না দিলে অনেক শিক্ষক ভালোভাবে নেন না।

বিশ্ব যখন থ্রিডিতে, বাংলাদেশ কবরে

চিকিৎসাবিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষের এই যুগে মানুষের কঙ্কাল নিয়ে পড়াশোনার ধারণাটি বিশ্বজুড়ে আমূল বদলে গেছে। ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে উন্নত দেশগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ভার্চুয়াল রিয়েলিটি ব্যবহার করে মানবদেহের জটিলতম স্নায়ুতন্ত্র ব্যবচ্ছেদ করছে। অথচ বাংলাদেশের মেডিকেল শিক্ষার্থীরা এখনো কবর থেকে চুরি হওয়া লাশের হাড়ের ওপর নির্ভরশীল।

চিকিৎসকরা জানান, বর্তমানে ‘কমপ্লিট অ্যানাটমি’র মতো বিশ্বখ্যাত থ্রিডি অ্যাপ্লিকেশনগুলো অ্যানাটমি শিক্ষার সংজ্ঞাই বদলে দিয়েছে। একটি স্মার্টফোন বা ট্যাবের পর্দায় মানুষের হাড়ের প্রতিটি খাঁজ, সূক্ষ্ম ছিদ্র এবং লিগামেন্টের অবস্থান অনেক বেশি নিখুঁতভাবে জুম করে দেখা সম্ভব। অথচ বাংলাদেশে অ্যানাটমি বিভাগগুলো আধুনিক শিক্ষা পদ্ধতি অনুকরণ না করে অতীতের প্রথা মেনে চলায় এই সিন্ডিকেট আজও টিকে আছে। তাদের যুক্তি, ‘আসল হাড় স্পর্শ না করলে শিক্ষা পূর্ণ হয় না।’ কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, যেখানে প্রযুক্তির মাধ্যমে হাড়ের ভেতরের গঠনও স্পষ্টভাবে দেখা সম্ভব, সেখানে কেবল স্পর্শের দোহাই দিয়ে লাশ চুরির মতো জঘন্য অপরাধকে পরোক্ষভাবে মদত দেওয়ার যৌক্তিকতা কতটুকু? নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সামান্য পরিবর্তনই পারে মেধাবী শিক্ষার্থীদের হাতে চুরিকৃত হাড়ের বদলে আধুনিক প্রযুক্তি তুলে দিতে।

প্রযুক্তির ব্যবহার বনাম ‘লাশ চুরি’

মেডিকেল শিক্ষার্থীরা জানান, আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান এখন আর ‘আসল হাড়’-নির্ভর নয়। চীন, আমেরিকা ও ইউরোপের দেশগুলোয় এখন ৯৬% থেকে ৯৯% নির্ভুল ‘অ্যানাটমিক্যালি অ্যাকুরেট’ প্লাস্টিক কঙ্কাল মডেল ব্যবহৃত হয়, যা টেকসই এবং সম্পূর্ণ আইনসম্মত। পাশের দেশ ভারতেও প্লাস্টিক মডেল ও স্টিমুলেশন অ্যাপের ব্যবহার এখন প্রধান মাধ্যম। অথচ বাংলাদেশে চিত্রটি একেবারেই উল্টো। এখানে একজন নবীন শিক্ষার্থীকে একটি চুরিকৃত কঙ্কালের জন্য ৩০-৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত গুনতে হচ্ছে, যেখানে আন্তর্জাতিক মানের একটি ডিজিটাল অ্যাপ সাবস্ক্রিপশনের বার্ষিক খরচ মাত্র ছয় থেকে আট হাজার টাকা। উন্নত বিশ্বে কেবল যারা স্বেচ্ছায় মরণোত্তর দেহদান করে গেছেন, তাদের হাড়ই অত্যন্ত সম্মানের সঙ্গে মেডিকেল মিউজিয়ামে রাখা হয়। কিন্তু বাংলাদেশে লাশ চুরির বাজারকে উৎসাহিত করা হচ্ছে। প্রযুক্তি যেখানে সমাধানের পথ দেখাচ্ছে, সেখানে প্রশাসনের এ ধরনের স্থবিরতা কেবল লাশের অবমাননাই নয়; বরং চিকিৎসাবিজ্ঞানের মানবিক দর্শনের সঙ্গেও চরম বিশ্বাসঘাতকতা।

সমাধানের পথ কী?

চট্টগ্রাম ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ও সহকারী অধ্যাপক ডা. শেখ মোহাম্মদ ইরফান আমার দেশকে বলেন, ‘বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ১১ হাজার শিক্ষার্থী মেডিকেলে ভর্তি হন। এই বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর জন্য ১১ হাজার কঙ্কাল স্বাভাবিক উপায়ে সংগ্রহ করা অসম্ভব। আর এ সুযোগেই একটি চক্র কবর থেকে লাশ চুরির মতো অপরাধ করে।’

কঙ্কাল কেনা বা রাখার অধিকার কেবল মেডিকেল প্রতিষ্ঠানগুলোর থাকার ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, “দেশের প্রতিটি মেডিকেল কলেজের অ্যানাটমি বা ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগ যদি নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় পাঁচটি করে কঙ্কালের সেট রাখে, তবে তা দিয়ে অনায়াসে ১০-১৫ বছর চালানো সম্ভব। এতে প্রতি বছর নতুন কঙ্কালের প্রয়োজন হবে না। শিক্ষার্থীরা বাজার থেকে প্লাস্টিকের মডেল বা সিমুলেশন মডেল কিনে ব্যক্তিগত পড়াশোনা করতে পারে। আর যখন আসল হাড় দেখার প্রয়োজন হবে, তখন তারা কলেজের ল্যাব বা লাইব্রেরিতে থাকা ‘বোনস ব্যাংক’ থেকে সেটি ব্যবহার করবে।”

চিকিৎসকদের অনেকে বলছেন, লাশ পাহারা দিয়ে এই চুরি ঠেকানো সম্ভব নয়। সমাধান লুকিয়ে আছে নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও বিএমডিসি যদি ঘোষণা করেÑমেডিকেল পরীক্ষায় ‘আসল হাড়’ ব্যবহার নিষিদ্ধ এবং এর বদলে থ্রিডি স্টিমুলেশন বা প্লাস্টিক মডেল ব্যবহার হবে, তাহলেই লাশ চুরির এই কোটি টাকার মাফিয়া সিন্ডিকেট ভেঙে পড়বে।

এমবি

অর্থ নয়ছয়ের সুযোগ কম আগ্রহ নেই কর্মকর্তাদের

বিকল্প জ্বালানিতেই মুক্তি দেখছে সরকার ও বেসরকারি খাত

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ব্রিফিংয়ে আবারো হাসিনা প্রসঙ্গ

আগামীর রাজনীতিতে জ্ঞানের বিকাশ জরুরি: আইনমন্ত্রী

‘শুধু মাধবীর জন্য’ গ্রন্থে বাংলাদেশ ও গণতন্ত্র রক্ষার আকুতি: চিফ হুইপ

শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে ইবাদতের মন্ত্রণালয় মনে করি: শিক্ষামন্ত্রী

১৯৭৭ সালের জে-৬ থেকে মাল্টিরোল যুদ্ধবিমান জে-১০সিই, সুবিধা-অসুবিধা কী?

বিএনপির ইতিহাস ও বাংলাদেশের ইতিহাস প্রায় অভিন্ন: স্থানীয় সরকারমন্ত্রী

মরার পরে যে লোক বেশি জ্বালিয়েছেন তার নাম শেখ মুজিব: শাহরিয়ার কবির

সংখ্যালঘু নয়, নাগরিক পরিচয়েই সবাই সমান: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী