ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন এখন দরজায় কড়া নাড়ছে। ঠিক ২৪ দিনের মাথায় ১২ ফেব্রুয়ারি বহুল প্রত্যাশিত ভোটাভুটি। দীর্ঘ দেড় যুগ পর একটি সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য ভোটাধিকারবঞ্চিত মানুষ মুখিয়ে আছে। নির্বাচন ঘিরে প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের ভোটের পাল্লা ভারী করার সর্বশেষ কলাকৌশল প্রয়োগে ব্যস্ত। ভোটের সমীকরণে রাজনৈতিক মেরূকরণের নানা তোড়জোড়ও শেষ হতে চলেছে। মান-অভিমানে ভাঙা-গড়ার খেলা শেষে চূড়ান্ত রূপ নিতে যাচ্ছে ভোটের জোট। দুদিন পরে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের পর্ব শেষ হলে লড়াইয়ের ময়দানে কারা থাকছেন, তা স্পষ্ট হবে।
সব নির্বাচনকে সামনে রেখেই রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের অভিযোগ থাকে। নির্বাচন কমিশন ও নির্বাচনি কর্মকর্তাদের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ নিয়ে কথা হয়। প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলো নানা কারণেই এটা করেন। অভিযোগের সত্যতা যেমন থাকে, তেমনি ভিত্তিহীন অভিযোগও ওঠে। চাপে রেখে সুবিধা আদায়ের চেষ্টা বাংলাদেশের নির্বাচনি রাজনীতিতে চেনা চিত্র। কিন্তু এবার উত্থাপিত অভিযোগ এবং এরই মধ্যে দৃশ্যমান কিছু চিত্র অনেকটাই ভিন্ন বার্তা দিচ্ছে। মাঠ পর্যায়ের নির্বাচনি কর্মকর্তাদের দক্ষতা ও আইনের প্রয়োগ নিয়ে জোরালো প্রশ্ন উঠেছে। রিটার্নিং কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্ত এতটা বড় দাগে ভুল প্রমাণিত হওয়ার নজির নেই বললেই চলে।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে লড়তে মনোনয়নপত্র জমা দেন ২ হাজার ৫৬৮ প্রার্থী। তার মধ্যে ৭২৩টি মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষণা করেছেন রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্ব পালনকারী জেলা প্রশাসকরা এবং বৈধ হিসেবে গ্রহণ করেন ১ হাজার ৮৪২ জনের মনোনয়নপত্র। আইন অনুযায়ী মনোনয়নপত্র বাতিল ও গ্রহণের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনে মোট ৬৪৫টি আপিল আবেদন জমা পড়ে। এর মধ্যে ৭০টি আবেদন জমা পড়েছে বৈধ প্রার্থীর বিরুদ্ধে। ওইসব আবেদনে ওই প্রার্থীদের প্রার্থিতা বাতিল চাওয়া হয়েছে। বাকিগুলো বাতিলের বিরুদ্ধে।
গত ১০ জানুয়ারি থেকে আপিল আবেদন শুনানি করছে ইসি। আজ ১৮ জানুয়ারি এ শুনানি শেষ হবে। প্রতিদিন ৭০টি আপিল আবেদন শুনানি করা হচ্ছে। সংবাদপত্রে প্রকাশিত এক রিপোর্টে জানা যাচ্ছে, সাত দিনের আপিল শুনানিতে বাতিল হওয়া ৭০ শতাংশ প্রার্থী তাদের প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন। ওই সাত দিনে ৫১০টি আপিল শুনানি করে ৩৫৪ জনের প্রার্থিতা ফেরত দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। এর সুফল পেয়েছে প্রায় প্রতিটি রাজনৈতিক দল।
অতীতের নির্বাচনগুলোয়ও রিটার্নিং কর্মকর্তা কর্তৃক বাতিল হওয়া মনোনয়নপত্র নির্বাচন কমিশনে টিকেছে। আবার গৃহীত মনোনয়নপত্র আপিলে বাতিল হয়েছে। তবে সে সংখ্যা এত ব্যাপকসংখ্যক ছিল না। যে তিনটি জাতীয় নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য বিবেচনা করা হয়, সেগুলোয় মনোনয়নপত্র বাতিল এবং আপিলে টিকে যাওয়ার হার এবারের তুলনায় অর্ধেকেরও কম ছিল।
রিটার্নিং কর্মকর্তার হাতে প্রাথমিক বাছাইয়ে মনোনয়নপত্র বাতিল হলে প্রার্থী বড় ধাক্কা খান। নির্বাচনের মাঠে বিরূপ প্রভাব পড়ে। প্রার্থীর ইমেজ সংকট দেখা দেয়। অনেক নেতা-কর্মী সরে গিয়ে অন্য প্রার্থীর পেছনে ছোটেন। দোলাচলে পড়ে সমর্থকরা বিভ্রান্ত হন। আবার আপিল করে ফিরে আসতে আসতে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী প্রচার ও প্রস্তুতিতে পিছিয়ে পড়েন। অনেকখানি এগিয়ে যায় প্রতিপক্ষ। আপিল নিষ্পত্তি করে আসতে আরো নানা ধরনের ঝক্কি-ঝামেলা তো আছেই। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী প্রোপাগান্ডা চালান, সুযোগ নেন। যে ক্ষতিটা হয়ে যায়, তা অনেক ক্ষেত্রেই পূরণ করা সম্ভব হয় না।
সংবাদপত্রের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়ার বিরুদ্ধে করা আপিল আবেদন উদারনীতিতে বিবেচনা করছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। স্বতন্ত্র প্রার্থীর মনোনয়নপত্রে জমা দেওয়া এক শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষরে গরমিল, মামলার তথ্য গোপন, হলফনামায় স্বাক্ষর না থাকাসহ কিছু কিছু বিষয় ‘ছোটখাটো ভুল’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের আবেদন বিশেষভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে দ্বৈত নাগরিকত্ব ও ঋণখেলাপির বিষয়ে কঠোর অবস্থানে রয়েছে। ইসি মনে করছে, অনেক প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলে নির্বাচনে গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে, ভোটার উপস্থিতিও বেশি হবে।
নির্বাচন কমিশন কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে রিপোর্টে জানানো হয়েছে, নির্বাচন কমিশন ছোটখাটো ভুলত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখছে। আইনে ছোটখাটো ত্রুটি আমলে না নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে ঋণখেলাপিসহ মৌলিক বিষয়ে ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। তিনি বলেন, অনেক প্রার্থী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলে ভোটগ্রহণ উৎসবমুখর হবে।
নির্বাচন কমিশনে (ইসি) শুনানিতে দেখা গেছে, দলীয় প্রার্থীদের বৈধতার বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র প্রার্থী নামে বিদ্রোহীদের আপিল। তবে শক্তিশালী স্বতন্ত্র প্রার্থীর বিরুদ্ধেও দলীয় প্রার্থীদের কেউ কেউ আপিলে অভিযোগও করেছেন। আর এটি বেশি ঘটেছে বিএনপির ক্ষেত্রে। শুক্রবার আপিলকারীর সাক্ষী ভোটারকে ইসি চত্বরে মারধর করা হয়েছে।
এখন যে প্রশ্নটি সামনে এসে যায়, তা হলো, রিটার্নিং কর্মকর্তারা নির্বিচারে মনোনয়নপত্র বাতিল করলেন কেন? বাংলাদেশের সংবিধান ও গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে স্পষ্ট বলা আছে, কারা সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্য। সে যোগ্যতার মানদণ্ডগুলো রিটার্নিং কর্মকর্তারা কি সঠিকভাবে যাচাই করেছেন, নাকি অনুরাগ-বিরাগের বশবর্তী হয়ে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন? নির্বাচন কমিশন যে ৭০ শতাংশ মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করল সেগুলো রিটার্নিং কর্মকর্তা কোন বিবেচনা বা মানদণ্ডে বাতিল করেছিলেন? এটি কি তাদের দক্ষতা এবং আইন ও বিধিবিধান সম্পর্কে সম্যক জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার বহিঃপ্রকাশ?
সংবাদপত্রের খবর অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশন উদারনীতি নিয়েছে। যদি তা-ই হয়, সে উদারনীতি নেওয়ার নির্দেশনা রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কেন দেওয়া হলো না? রিটার্নিং কর্মকর্তাদের নিয়ে নির্বাচন কমিশনের কর্মশালা হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ সংশ্লিষ্টরা প্রয়োজনীয় সব নির্দেশনা সেখানে দিয়েছেন। মনোনয়নপত্র গ্রহণ ও বাতিলের মাপকাঠি সম্পর্কে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের সেখানেই সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন দেওয়ার কথা। যে প্রার্থীর মনোনয়নপত্র রিটার্নিং কর্মকর্তার হাতে বাতিল হলো, তিনি নির্বাচন কমিশন থেকে বৈধতা নিয়ে মাঠে ফিরে নির্বাচনি লড়াইয়ে নামছেন। ভোটের দিন পর্যন্ত আরো অনেক ইস্যুতে রিটার্নিং কর্মকর্তার দক্ষতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ পাবেন। পক্ষপাতদুষ্ট আচরণের যে অভিযোগ তারা তুলেছিলেন, তাতে প্রকারান্তরে ন্যায্যতা দিয়েছে কমিশন। প্রার্থী ও রিটার্নিং কর্মকর্তার মধ্যকার এই মনস্তাত্ত্বিক সমস্যার ফলে নির্বাচনি প্রচার, আচরণবিধি অনুসরণ এবং ভোটগ্রহণের দিনের আইন-কানুন কার্যকর করার ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে—এই আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
তিন দিন পর ২২ জানুয়ারি থেকে আনুষ্ঠানিক প্রচারে নামবেন প্রার্থীরা। তখন আচরণবিধি প্রয়োগ থেকে শুরু করে নির্বাচনসংশ্লিষ্ট অনেক বিষয়ে প্রার্থীরা সরাসরি রিটার্নিং কর্মকর্তার সঙ্গে বোঝাপড়া করবেন। মনোনয়নপত্রের মতো অন্যান্য ইস্যুতে রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্ত যেন প্রশ্নের মুখে না পড়ে। প্রার্থীদের মধ্যে পারস্পরিক দ্বন্দ্ব-সংঘাত মোকাবিলা এবং শান্তিপূর্ণ উপায়ে তা নিরসনের ক্ষেত্রে রিটার্নিং কর্মকর্তাই মুখ ভূমিকা রাখেন। পুলিশ সুপার জেলার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রধান। কিন্তু জেলা আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত কমিটির প্রধান জেলা প্রশাসক, যিনি নির্বাচনকালে রিটার্নিং কর্মকর্তা। আইনশৃঙ্খলাজনিত উদ্ভূত যেকোনো পরিস্থিতিতে জেলা পর্যায়ে প্রধান নির্বাচনি কর্মকর্তা হিসেবে রিটার্নিং কর্মকর্তার নিরপেক্ষ ভূমিকা নির্বাচনে সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখতে অতীব গুরুত্ববহ।
নির্বাচনি তফসিল ঘোষণার পর থেকে প্রার্থীসহ চাঞ্চল্যকর অনেকগুলো হত্যার ঘটনা এবং অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহারে উদ্ভূত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। প্রচারণা শুরু হওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরো অবনতি হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সহিষ্ণুতার অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। এখনই যদি এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা না যায়, তবে নির্বাচনে এর প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে বিভিন্ন সন্ত্রাসী দলের কাছে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র থাকার কারণে পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এ কারণে প্রার্থীদের অনেকে শঙ্কিত হয়ে পুলিশি নিরাপত্তাও চান, কেউ কেউ তা পেয়েছেনও। এসব ইস্যুতেও রিটার্নিং কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের আস্থা অর্জন করা জরুরি এবং ভরসার কেন্দ্রে পরিণত হওয়া বাঞ্ছনীয়।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনীতি বিশ্লেষক