আগামী জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক আকাশে একধরনের নীরব কিন্তু দৃঢ় প্রত্যাশার বাতাস বইছে। মাঠপর্যায়ের গণসংলাপ এবং রাস্তায়-হাটে সাধারণ মানুষের অন্তরঙ্গ আলাপচারিতায় জামায়াতের প্রসঙ্গ আসছে। দীর্ঘদিনের প্রচলিত দুই দলের রাজনৈতিক চক্রব্যূহে আবদ্ধ মানুষ, যারা বিএনপি ও আওয়ামী লীগের শাসনামলের অভিজ্ঞতায় ক্লান্ত ও হতাশ, তারা এখন একটি তৃতীয় ও আদর্শভিত্তিক বিকল্পের কথাও বলছেন। ‘দুই দলকেই দেখা হয়েছে, এবার দেখি ইসলামী দলটি কী করতে পারে’—এটিই এখন রাস্তার রাজনীতির মৌলিক ও গভীর সত্য। সুষ্ঠু ও অবাধ ভোটগ্রহণ নিশ্চিত হলে এই জনসম্পৃক্ততা জামায়াতের জন্য সাফল্যের পথ প্রশস্ত করতে পারে। কিন্তু এই সম্ভাবনার পথ রুদ্ধংদেহি নয়। জামায়াতের সামনে সবচেয়ে বড় ও তাৎক্ষণিক চ্যালেঞ্জ হলো নির্বাচনি সহিংসতা রোধ এবং ভোটকেন্দ্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা। আদতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ডিসকোর্সের জন্য একটি ‘প্যারাডাইম শিফট (মাত্রা পরিবর্তন)’-এর সময় চলছে, মূলত ‘পলিটিক্স অব দ্য পাস্ট’ থেকে ‘পলিটিক্স অব দ্য ফিউচার’। দার্শনিক ফ্রান্সিস ফুকুয়ামার ‘দ্য এন্ড অব হিস্ট্রি (The End of History)’ থিসিসটি এখানে প্রাসঙ্গিক, তবে একটি বিপরীত মোড়ে—বাংলাদেশে রাজনৈতিক বিতর্কের ‘সমাপ্তি’ হওয়া দরকার ১৯৭১-এর ঐতিহাসিক বিবাদে এবং তার ‘পুনরারম্ভ’ হওয়া দরকার ২০৫১-এর অর্থনৈতিক ও সামাজিক রূপকল্পে। জামায়াতের সামনে সুযোগ হলো এই ‘রিস্টার্ট বাটন’ চাপার। এজন্য প্রয়োজন ‘কগনিটিভ ডিসোন্যান্স’ দূর করে একটি ‘নতুন বাস্তবতা’ নির্মাণ, যার কেন্দ্রে থাকবে ‘পারফরম্যান্স লেজিটিমেসি’ (কর্মদক্ষতাভিত্তিক বৈধতা)।
মার্ক্স বলতেন, শাসকশ্রেণি তার চিন্তাধারা প্রকৃতির নিয়ম বলে চালিয়ে দেয়। ১৯৭১-এর একচেটিয়া ন্যারেটিভও এমন একটি ‘আধিপত্য’, যা দীর্ঘদিন বাংলাদেশের রাজনীতিকে সংজ্ঞায়িত করেছে। জামায়াতকে এখানে ‘আইডেন্টিটি পলিটিক্স’-এর ফাঁদ থেকে বেরিয়ে ‘ইস্যুভিত্তিক রাজনীতি’-তে যেতে হবে। নিকোলো ম্যাকিয়াভেলির ‘দ্য প্রিন্স’ গ্রন্থের শিক্ষা এখানে সরাসরি প্রযোজ্য। তিনি বলতেন, ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে বা অর্জন করতে হলে ‘কীভাবে আছে’ এর দিকে তাকাতে হবে, ‘কীভাবে থাকা উচিত’ এর দিকে নয়। বাংলাদেশে বর্তমানে ‘যা আছে’ তা হলো—অর্থনৈতিক সংকট, নিরাপত্তাহীনতা, প্রবাসীনির্ভরতা এবং পরিবর্তনকামী জনতা। সুতরাং ‘যা থাকা উচিত’ সেই আদর্শিক বিতর্কে ১৯৭১-এর দর্শনে সময় নষ্ট না করে, ‘যা আছে’ তার সমাধান নিয়ে আলোচনায় নামাই ‘ম্যাকিয়াভেলীয় বাস্তবতা’। মার্ক্সবাদী দৃষ্টিতে জামায়াতের এই রূপান্তরকে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সঙ্গে আপস হিসেবেও দেখা হতে পারে। কিন্তু অ্যান্টোনিও গ্রামশির ‘সাংস্কৃতিক আধিপত্য’ তত্ত্বমতে, বিরোধী শক্তি প্রতিষ্ঠিত আদর্শিক কাঠামোর ভেতর থেকেই পাল্টা-কথন (Counter-Narrative) তৈরি করে ক্ষমতা দখল করতে পারে। অর্থাৎ, ‘উন্নয়ন’, ‘নিরাপত্তা’, ‘রেমিট্যান্স'—এই শব্দগুলোই হতে পারে গ্রামশিয়ান অর্থে জামায়াতের পাল্টা-আধিপত্য গড়ার হাতিয়ার।
বস্তুত, বাংলাদেশের রাজনীতির মাঠ এখন ‘ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রতিযোগিতা’, ‘অতীত ব্যাখ্যার যুদ্ধ’ নয়। জনগণ, বিশেষত যুবক ও প্রবাসীরা, তাদের দৈনন্দিন জীবন, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন। যে দল এই উদ্বেগের সবচেয়ে স্পষ্ট, বিশ্বাসযোগ্য ও বাস্তবসম্মত সমাধান প্রস্তাব করবে, তার দিকেই জনসমর্থন ঝুঁকবে। জামায়াতের জন্য এটি ঐতিহাসিক ফুরসত। এই পরিবর্তনের ধারাকে কাজে লাগাতে হলে কয়েকটি কৌশলগত স্তরে সমান্তরালভাবে কাজ করতে হবে। যেমন—
মনোভাবের রূপান্তর : ‘রক্ষণাত্মক বিতর্ক’ থেকে ‘সৃজনশীল উদ্যোগে’ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানসিক পরিবর্তন। প্রতিটি প্রশ্ন, প্রতিটি মিডিয়া ইন্টারভিউ, প্রতিটি বক্তৃতার কেন্দ্রবিন্দু হবে ‘আমরা কী করব’, ‘১৯৭১ সালে কী হয়েছিল’ বা ‘অন্য দল কী বলেছে’ তা নয়, এটি একটি শক্তিশালী ‘ফ্রেমিং’ কৌশল। আপনি যে ফ্রেমে আলোচনা ডাকবেন, প্রতিপক্ষকেও সেখানে আসতে হবে। যখন আপনি ‘প্রথম ১০০ দিনে বিদ্যুৎ উৎপাদন ২০ শতাংশ বৃদ্ধি’ নিয়ে কথা বলবেন, তখন ঐতিহাসিক বিতর্ক স্বাভাবিকভাবেই প্রাসঙ্গিকতা হারাবে।
জামায়াতের উচিত এখনই মন্ত্রিসভা বা ‘শ্যাডো ক্যাবিনেট’ ও ‘১০০ দিনের রোডম্যাপ’ ঘোষণা করে দেওয়া। জনগণ শুনতে চায় না আপনি কতটা ভালো, দেখাতে চায় আপনি কতটা সক্ষম। আস্থা প্রতিষ্ঠার সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার হলো ‘কংক্রিট বিস্তারিততা’ (Concrete Specificity)।
শ্যাডো ক্যাবিনেট শুধু নাম ঘোষণা নয়, প্রতিটি প্রস্তাবিত মন্ত্রীর একটি ‘প্রোফাইল ও প্রোমিস কার্ড’ প্রকাশ করুন। উদাহরণস্বরূপ—
প্রস্তাবিত অর্থমন্ত্রী : অমুক, অক্সফোর্ড, কেমব্রিজ, হার্ভার্ড ডিগ্রিধারী, ১৫ বছর বিশ্বব্যাংকে কাজের অভিজ্ঞতা। তার প্রথম ১০০ দিনের তিনটি অঙ্গীকার—১. রেমিট্যান্স আসলে ২ শতাংশ অতিরিক্ত প্রণোদনা, ২. এসএমই (SME) লোনের সুদ ২ শতাংশ কমানো, ৩. নতুন শিল্প স্থাপনে অনুমোদন প্রক্রিয়া সাত দিনে আনা। এই স্তরের বিশদতা প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর অস্পষ্ট ইশতেহারের বিপরীতে একটি ‘কম্পিটিটিভ অ্যাডভান্টেজ’ তৈরি করে।
১০০ দিনের রোডম্যাপে প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের জন্য আলাদা, পরিমাপযোগ্য লক্ষ্য। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর রোডম্যাপে থাকতে পারে—দায়িত্ব নেওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে দেশের প্রতিটি থানায় একটি করে ‘ডিজিটাল গ্রিভিয়্যান্স বক্স’ স্থাপন, যেখান থেকে সরাসরি কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষে অভিযোগ পৌঁছাবে। ১০০ দিনের মধ্যে রাজধানীর রাস্তায় ৫০ শতাংশ বেশি সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন।
প্রবাসী : কৌশলগত মিত্র থেকে ‘রাষ্ট্রনির্মাতা অংশীদার’-এ রূপান্তর। প্রবাসীরা কেবল অর্থ প্রেরক নন, তারা একটি ‘বৈশ্বিক রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক’ এবং ‘রাজনৈতিক সংস্কারকের’ ভূমিকায় আছেন। তাদের ‘উনিশ দাবি’ একটি রূপায়ণযোগ্য এজেন্ডা। প্রবাসী মন্ত্রণালয়কে ‘সুপার-মিনিস্ট্রি’ বানানো। এর এজেন্ডা হবে—
১. অভিবাসন কূটনীতি : জাপান, কোরিয়া ও জার্মানির সঙ্গে সরকার-থেকে-সরকার চুক্তি করে ‘স্কিল-ম্যাচড’ কর্মী পাঠানোর ব্যবস্থা করা।
২. বৈধতা ও মর্যাদা : ‘৩০ মিনিটে এয়ারপোর্ট সার্ভিস’ একটি প্রতীকী স্লোগান। বড় কথা হলো, বিদেশে বাংলাদেশি দূতাবাসগুলোকে ‘সার্ভিস সেন্টার’-এ রূপান্তর করা, যেখানে আইনি সহায়তা, আর্থিক পরামর্শ ও জরুরি সহায়তা এক ছাদের নিচে মিলবে।
৩. বিনিয়োগ চ্যানেল : প্রবাসীদের সঞ্চয় শুধু ভোগে নয়, ‘উৎপাদনে’ লাগানোর ব্যবস্থা। ‘প্রবাসী বন্ড’ বা বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে সরাসরি বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি।
৪. যুবশক্তির জাতীয়করণ : ‘বেকারত্ব’ থেকে ‘মানবপুঁজি’তে রূপান্তর। লাখ লাখ বেকার যুবক একটি বিস্ফোরণ না সম্পদ—এটি নির্ভর করবে আপনি তাদের কীভাবে দেখেন তার ওপর। জামায়াতের দৃষ্টিভঙ্গি হবে ‘মানবপুঁজি বিনিয়োগকারী’।
‘জাতীয় দক্ষতা বিনিময়’ প্রকল্প : জেলা ভিত্তিতে ‘স্কিল গ্যাপ অ্যানালিসিস’ করে বৈশ্বিক চাহিদা অনুযায়ী প্রশিক্ষণ দেওয়া। শুধু ‘নার্স’ নয়, ‘জেরিয়াট্রিক কেয়ার স্পেশালিস্ট’; শুধু ‘ড্রাইভার’ নয়, ‘ইলেকট্রিক ভেহিকল মেকানিক’।
গ্যারান্টি ও জবাবদিহিতা : প্রশিক্ষণ দেওয়া নয়, ‘চাকরির গ্যারান্টি’ দেওয়ার মনোবল দেখানো। ‘আমাদের প্রশিক্ষিত যুবকদের ৮০ শতাংশ পরবর্তী ছয় মাসের মধ্যে চাকরি পাবে, নয়তো পরবর্তী প্রশিক্ষণ বিনা মূল্যে’—এই ধরনের ডেটা-চালিত প্রতিশ্রুতি গেম চেঞ্জার হবে।
নিরাপত্তা : ‘আশ্বাস’ থেকে ‘প্রত্যক্ষদর্শী ফল’ পর্যন্ত। নিরাপত্তাহীনতা একটি তীব্র ব্যক্তিগত অনুভূতি। এটির সমাধান দৃশ্যমান ও দ্রুততম হতে হবে। এভাবে প্রথম ১০০ দিনের স্বরাষ্ট্র পরিকল্পনা হবে ‘দৃশ্যমান ফলাফলভিত্তিক’।
প্রথম সপ্তাহ : দেশের সব বড় শহরে ‘অপরাধ হটস্পট’ চিহ্নিত করে সেখানে ২৪/৭ পুলিশ ক্যাম্প।
প্রথম মাস : প্রতিটি জেলায় ‘মোবাইল কোর্ট’-এর মাধ্যমে অবৈধ অস্ত্র জমাদানকারীর জন্য আর্থিক পুরস্কার ও ক্ষমার ঘোষণা।
এই পদক্ষেপগুলো শুধু চোখে দেখার মতোই নয়, মিডিয়া কাভারেজের জন্য সহজ, যা জনমনে ‘কিছু পরিবর্তন হচ্ছে’—এই ধারণা দ্রুত প্রতিষ্ঠিত করবে।
যোগাযোগ : জটিলতা সরিয়ে সরল বার্তা। বড় পরিকল্পনা, কিন্তু সরল ভাষা। প্রতিটি নীতি তিনটি স্তরে উপস্থাপন—
১. স্লোগান/শিরোনাম : ‘প্রতিটি ঘরে বিদ্যুৎ, প্রতিটি হাতে কাজ।’
২. কংক্রিট সংখ্যা : ১০ লাখ যুবককে ১৮ মাসে প্রশিক্ষণ, ৫০০ ডলার গড় মাসিক আয়ের গ্যারান্টি।
৩. বাস্তবায়ন কৌশল : ‘চীন ও ভিয়েতনামের ১০০টি শিল্প ইউনিট স্থানান্তরের জন্য বিশেষ অর্থনৈতিক করিডোর।’
স্বাস্থ্য : ‘সরকারি সেবা’ থেকে ‘জনসাধারণের সম্পদ’-এ রূপান্তর। স্বাস্থ্যকে ‘পাবলিক গুড’ (জনসাধারণের সম্পদ) হিসেবে ভাবতে হবে। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ভূমিকা হবে একটি ‘ন্যাশনাল হেলথ আর্কিটেক্ট (জাতীয় স্বাস্থ্য স্থপতি)’-এর মতো। ১০০ দিনের স্বাস্থ্য পরিকল্পনার মৌলিক স্তম্ভ: প্রতিশ্রুতি—
প্রতিশ্রুতি-১ : ‘প্রবেশগম্যতা’ : প্রতিটি উপজেলায় একটি করে ‘টেলিমেডিসিন সেন্টার’ চালু, যেখান থেকে জেলা ও জাতীয় পর্যায়ের বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের সঙ্গে ভিডিও কনসালটেশন।
প্রতিশ্রুতি-২ ‘জবাবদিহিতা’ : সব সরকারি হাসপাতালে ‘সিটিজেন্স চার্টার’ (নাগরিক সনদ) প্রকাশ, যাতে সেবার মান, ওয়েটিং টাইম ও ফি’র বিস্তারিত উল্লেখ থাকবে।
প্রতিশ্রুতি-৩ ‘প্রতিরোধ’ : একটি ‘প্রিভেন্টিভ হেলথ ক্যাম্পেইন’ চালু, যার কেন্দ্রবিন্দু হবে স্কুল ও মসজিদ। পুষ্টি, স্বাস্থ্যবিধি ও মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতা।
জাতীয় দক্ষতা বিনিময় পরিকল্পনা
ধাপ-১ – ম্যাপিং: দেশের কোন অঞ্চলে কোন ধরনের মৌলিক দক্ষতা আছে, তা চিহ্নিত করা।
ধাপ-২ – আপস্কিলিং : জার্মানির ‘ডুয়েল ভোকেশনাল ট্রেনিং’ (দ্বৈত বৃত্তিমূলক শিক্ষা) মডেল অনুসরণ। শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরাসরি চুক্তি করে প্রশিক্ষণ দেওয়া।
ধাপ-৩ – গ্লোবাল প্লেসমেন্ট : দক্ষতা অনুযায়ী গন্তব্য নির্ধারণ—
এই পরিকল্পনা বাংলাদেশকে ‘গ্লোবাল সার্ভিসেস এক্সপোর্ট হাব’-এ পরিণত করবে। এই ঘোষণা খেলার স্তর পাল্টে দেবে, কারণ এটি ‘অ্যাবস্ট্রাক্ট প্রমিস’ থেকে ‘কংক্রিট এক্সপেক্টেশন’-এ রূপান্তর ঘটাবে। এই খেলা ভাবাদর্শের লেভেল থেকে নেমে নীতির লেভেলে চলবে—অতীতের দোষারোপ থেকে সরে ভবিষ্যতের দায়িত্ব নেওয়ার দিকে; জটিল বিতর্ক থেকে সরে সরল সমাধানের দিকে।
যাহোক, জামায়াতের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এটি একটি ‘পরিবর্তন’-এর চিহ্ন হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে। কিন্তু এই ‘পরিবর্তন’কে শুধু ‘প্রতিশ্রুতি’ না রেখে ‘পরিকল্পনার বিস্তারিত ব্লুপ্রিন্ট’ হিসেবে হাজির করতে হবে। মানুষ এখন আর কবিতা শুনতে চায় না—তারা চায় অ্যাকাউন্টিং, চায় টাইমলাইন, চায় গ্যারান্টি। যে দল প্রথম এই ভাষায় কথা বলবে, তার হাতেই থাকবে ভবিষ্যতের রাজনৈতিক রোশনি। এটি কোনো তত্ত্বগত পরিবর্তন নয়, এটি রাজনীতির ব্যবহারিক প্রক্রিয়ায় এক মহা রূপান্তরের আহ্বান।
তাছাড়া ড. ইউনূস মডেল থেকে ‘ইকোসিস্টেম থিংকিং’-এ উত্তরণ করা যেতে পারে। যেমন ড. মুহাম্মদ ইউনূসের শক্তি হলো ‘সোশ্যাল বিজনেস ক্যাপিটালিজম (সামাজিক ব্যবসায়িক পুঁজিবাদ)’ এবং ‘গ্রাসরুটস এমপাওয়ারমেন্ট (তৃণমূল পর্যায়ে ক্ষমতায়ন)’-এর ওপর ফোকাস। জামায়াতের তত্ত্ব এখানে একটি ধাপ এগিয়ে ‘ন্যাশনাল লেভেল ইকোসিস্টেম ইঞ্জিনিয়ারিং (জাতীয় পর্যায়ের পরিবেশগত ব্যবস্থা প্রকৌশল)’-এর হতে হবে। এটি হবে ‘উটিলিটেরিয়ানিজম (উপযোগবাদ)’-এর একটি রূপ, যেখানে ‘সর্বোচ্চ সংখ্যকের সর্বোচ্চ ভালো’ অর্জনের পথ হলো অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি। জামায়াতের কাঠামো হবে এটিকে একটি ‘সিস্টেমিক ফ্রেমওয়ার্ক’ হিসেবে উপস্থাপন করা। ‘বাংলাদেশ স্কিলিং মিশন’: আইটিআই, পলিটেকনিক ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের সমন্বয়ে একটি জাতীয় দক্ষতা নেটওয়ার্ক। ‘ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যাসিমিলেশন প্রোগ্রাম’: জাপানি, কোরিয়ান, জার্মান—যে দেশের শ্রমবাজার, সেই ভাষার প্রশিক্ষণ। এটি শুধু ভাষা শেখা নয়, ‘সাংস্কৃতিক পুঁজি (Cultural Capital)’ অর্জন। ফিলিপাইনের মতো নার্স, কেয়ারগিভার ও প্যারামেডিক তৈরি করে তাদের জন্য ‘গ্লোবাল সার্টিফিকেশন ও রিক্রুটমেন্ট পাইপলাইন’ তৈরি করা। আদতে এই পথটি যাত্রা শুধু জামায়াতের জন্য একটি নির্বাচনি কৌশল নয়, এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে একটি ‘প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট মেন্টালিটি (প্রকল্প ব্যবস্থাপনা মানসিকতা)’-এর দিকে নিয়ে যাওয়ার কোশেশ। জনগণ কেবল আবেগে নয়, বরং একটি যুক্তিসংগত পছন্দের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেবে। আর ‘মেটা-পলিটিক্স’-এর দিকে যাত্রা জামায়াতের সামনে যে সুযোগ, তা হলো ‘মেটা-পলিটিক্স (রাজনীতির রাজনীতি)’ পাল্টে দেওয়ার; অর্থাৎ রাজনৈতিক আলোচনার এজেন্ডা, ভাষা ও কাঠামোই পরিবর্তন করে দেওয়া। তাহলেই খেলা কোন লেভেলে চলে যাবে—পাঠক একবার ভাবুন!
আগস্ট-পরবর্তী বাংলাদেশ পরিবর্তন চায়। এই পরিবর্তনের ভাষা যদি জামায়াত স্পষ্ট, দৃঢ় ও বাস্তবসম্মতভাবে বলতে পারে, তবে সেটিই হতে পারে নতুন বাংলাদেশের ‘ফাউন্ডিং ন্যারেটিভ (প্রতিষ্ঠার বর্ণনা)’। আলোচনার এজেন্ডা বদলে দিন। যখন অন্যরা অতীত নিয়ে কথা বলে, আপনারা বলুন ভবিষ্যৎ নিয়ে। যখন তারা ব্যক্তিগত আক্রমণ করে, আপনারা উপস্থাপন করুন নীতির বিবরণী। মানুষ এখন সমাধান চায়, বাকযুদ্ধ নয়। যারা প্রথম বাস্তবতার ভাষায় কথা বলবে, তাদের কাছেই জনতা ঝুঁকবে। সময় অতি সংকটের, সুযোগ অতি স্বল্পস্থায়ী।
লেখক : সাবেক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, লেখক ও গবেষক, ফ্রাই ইউনিভার্সিটি বার্লিন, জার্মানি
sahidkamrul25@gmail.com