হোম > মতামত

রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে কেন হত্যা করা হয়েছিল?

আবু রূশ্দ

কেন প্রবাদপ্রতিম জনপ্রিয়তার অধিকারী হয়েও তিনি অকালে প্রাণ হারান তারই হাতে গড়া সেনাবাহিনীর কতিপয় সদস্যের হাতে? কারা ছিল সেই ঘাতক চক্রের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদতদানকারী এবং চক্রান্তের মূল পরিকল্পক?

এসব প্রশ্নের উত্তর আঁচ করতে পারলেও এর পক্ষে তথ্যপ্রমাণ খুঁজে পাওয়া বেশ দুষ্কর বৈকি। বিশেষ করে যেখানে জিয়া হত্যায় বাংলাদেশের একটি বিশেষ মহল জড়িত, যারা রাজনৈতিকভাবে বেশ শক্তিশালীও বটে, সেখানে অনেক কিছুই হারিয়ে গেছে ‘অপপ্রচারণার ইতিহাসে’।

জেনারেল জিয়াউর রহমান বীর উত্তম শুধু একটি নাম নয়, তিনি একটি ইতিহাস। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা ঘোষণা করা ছাড়াও ১৯৭৫ সালের পট পরিবর্তনের পর চরম অস্থিতিশীল ও নিরাপত্তা সংকটে আবদ্ধ বাংলাদেশকে তিনি নিজ পায়ের ওপর দাঁড় করিয়েছিলেন। স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ খাতে যেসব নৈরাজ্যকে কোনো কোনো বিশেষ জায়গা থেকে ইন্ধন দেওয়া হচ্ছিল, সেসব তিনি কঠোর হাতে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হন। কূটনৈতিক খাতে তিনি বদ্ধ দুয়ার খুলে দিয়ে বাংলাদেশকে বিশ্বসভায় পরিচিত করে তোলেন। ১৯৭৪ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের স্মৃতি যখন বাংলাদেশের মানুষের স্মৃতিপটে দাউ দাউ করে জ্বলছে, তখন তিনি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার পথে নিয়ে যেতে গ্রহণ করেন যুগান্তকারী কয়েকটি পদক্ষেপ।

খুবই অল্প সময় জেনারেল জিয়া ক্ষমতায় ছিলেন বা নেতৃত্ব দিতে পেরেছিলেন। কিন্তু ওই মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে তিনি মধ্যপ্রাচ্যসহ মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রপ্তানির দ্বার উন্মুক্ত করে দিয়ে যান। মুসলিম দেশগুলো দ্রুত বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন পেশার মানুষকে সাদরে গ্রহণ করতে থাকে। শুরু হয় রেমিট্যান্সপ্রবাহ। আজ বাংলাদেশের অর্থনীতি যে ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে, সেই বৈদেশিক রেমিট্যান্স জে. জিয়ার একক অবদান বৈ কিছুই নয়। এছাড়া অপর যে খাতে বাংলাদেশ বিশ্বে সুনাম অর্জন করেছে, সেই গার্মেন্ট খাতটিও জেনারেল জিয়ার হাত দিয়ে যাত্রা শুরু করে। পরবর্তী অনেক সরকার জিয়ার কঠোর বিরোধিতা করলেও এই দুটি অর্জনকে কাঁধে নিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে।

নিরাপত্তা ও সশস্ত্র বাহিনীর কথা যদি ধরা যায়, তাহলেও জে. জিয়ার দেখানো পথকেই আমাদের বেস লাইন মানতে হবে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পর্যন্ত দেশে সেনাবাহিনীর কোনো ডিভিশন ছিল না; ছিল ঢাকা, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, রংপুর ও যশোরের মতো জায়গায় কয়েকটি ব্রিগেড মাত্র। তার ওপর কোনো আধুনিক সমরাস্ত্রও ছিল না সেনাবাহিনীর। রক্ষিবাহিনীকে বরং চাকচিক্যের মধ্যে রেখেছিল পূর্ববর্তী আওয়ামী লীগ সরকার। জিয়া দায়িত্ব নিলেন। খুব দ্রুত সফর করলেন চীন, আমেরিকাসহ মুসলিম দেশগুলো। সামরিক খাতে সূচিত হলো বিপ্লবের। চীন থেকে খুব কম সময়ের মধ্যে এলো ট্যাংক, কামান, মর্টার, রকেট লঞ্চারসহ সব ধরনের সমরাস্ত্র। আমেরিকাও বাড়িয়ে দিল সহায়তার হাত। পার্বত্য চট্টগ্রামে বিচ্ছিন্নতাবাদ দমনের জন্য সরবরাহ করল হেলিকপ্টার। সেনাবাহিনী ও বিমানবাহিনীর জন্য এলো রাডার, ওয়ারলেস সেট। মুসলিম দেশগুলো দিল প্রয়োজনীয় অর্থ। মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় গড়ে উঠল পাঁচটি পদাতিক ডিভিশন। সাজ-সাজ রব পড়ে গেল চারদিকে। মিলিটারি একাডেমিতে দ্রুত প্রশিক্ষণ দিয়ে সেনাবাহিনীর অফিসারদের তৈরি করা হলো কম সময়ের মধ্যে। পাার্বত্য চট্টগ্রামে ভিনদেশি শক্তির সহায়তায় চলা বিচ্ছিন্নতাবাদ দমনে সেনাবাহিনী শুরু করল কার্যকর অপারেশন। অন্যদিকে ময়মনসিংহ এলাকায় তথাকথিত কাদেরিয়া বাহিনী প্রতিবেশী দেশের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় বিডিআরের বিরুদ্ধে শুরু করল যুদ্ধ। জিয়া সেনাবাহিনীকে পাঠালেন দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায়। কাদের সিদ্দিকীর বাহিনীর হাতে শহীদ হলেন কয়েকজন অফিসার ও সৈনিক। কিন্তু সেনাবাহিনী রক্ষা করল দেশের সীমান্ত।

এদিকে নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীতেও ঘটলো দ্রুত পরিবর্তন। চীন থেকে এলো মিসাইল বোট, টর্পেডো বোট ও পেট্রোল বোট। ব্রিটেন থেকে এলো ফ্রিগেট। বিমানবাহিনীও পেল চীনের জঙ্গি বিমান, যুক্তরাষ্ট্রের প্রশিক্ষণ বিমানসহ অন্যান্য সরঞ্জাম।

জেনারেল জিয়া যেই অবকাঠামো ও নীতিমালা রেখে গেলেন, সেটার ওপর ভিত্তি করেই পরে সবাইকে এগোতে হয়েছে। অবশ্য আওয়ামী লীগ শাসনামলে সমরাস্ত্র সংগ্রহ ও চাকচিক্য বাড়ানোয় জোর দেওয়া হলেও মূল নিরাপত্তা নীতি সম্পূর্ণ পাশ কাটিয়ে যাওয়া হয়। বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ও ডকট্রিনের যা কিছু আছে, তা জে. জিয়ারই সূচিত। তিনি কম সময় পেয়েছিলেন। সবাইকে ঠিকমতো সুযোগ-সুবিধা দিতে পারেননি। কিন্তু ওই সময়ের মধ্যেই তিনি শক্ত ভিত্তিটা তৈরি করে দিয়ে যান। এছাড়া জাসদের গণবাহিনী ও মুজিব হত্যাকারীদের সেনা পরিষদের সদস্যরা সেনা ও বিমানবাহিনীতে ২১টি অভ্যুত্থান সংঘটিত করে। জিয়াকে হতে হয় কঠোর। সব বিদ্রোহ সফলভাবে দমন করে অপরাধীদের সামরিক আদালতে বিচারের ব্যবস্থা করা হয়। ওটা না করলে সেনাবাহিনী তো দূরের কথা বাংলাদেশও টিকে থাকত না।

এদিকে দক্ষিণ এশিয়ায় ইন্দো-সোভিয়েত ব্লকের বিরুদ্ধে গিয়ে জে. জিয়া চীন-আমেরিকা-মুসলিম বিশ্বেও যে অক্ষ তৈরি করেছিলেন, সামরিক ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষায় তা-ই তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ১৯৭১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন এত দূরে এসে এমনি এমনি ভারতের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধেনি। দক্ষিণ এশিয়ায় তার উপস্থিতি নিশ্চিত করতেই তারা তা করেছিল। ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত তাই চট্টগ্রাম বন্দরের নির্দিষ্ট এলাকায় রাশিয়ার বিশেষ বাহিনী মোতায়েন ছিল কথিত মাইন অপসারণের নামে। কিন্তু জিয়া দ্রুত চীন ও পশ্চিমা দেশের সঙ্গে জোটবদ্ধতায় গিয়ে সোভিয়েত রাশিয়া ও ভারতের স্বপ্ন বাস্তবায়নে বাধা হয়ে দাঁড়ান। তাকে হত্যা করা হয় ওই কারণেই। বাংলাদেশের যাতে কোনো শক্ত প্রতিরক্ষা নীতি ও বৃহৎ শক্তির সঙ্গে সামরিক জোটবদ্ধতা না থাকে, সেটা নিশ্চিত করতেই ঘাতকদের মাঠে নামানো হয় পরিকল্পনানুযায়ী। পলাশীর প্রান্তরে যেমন নবাবের ৫০ হাজার সৈন্য কামান নিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে ছিল, কোনো যুদ্ধ করেনি মাত্র কয়েক হাজার ব্রিটিশ সৈন্যের বিরুদ্ধে, তেমনি একটা পরিস্থিতি তৈরি করতে চেয়েছিল আধিপত্যবাদী শক্তি বাংলাদেশে। পরবর্তী সময়ে দেখা গেছে, সশস্ত্র বাহিনীতে সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো হলেও নিরাপত্তা সক্ষমতার বিষয়টিকে ঠিক সেভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি। বরং ঢাকায় একটি ‘অনুগত’ বা ‘বাধ্যগত’ সরকার রেখে সশস্ত্র বাহিনীকে তার মূল লক্ষ্য থেকে দূরে সরানো হয়েছে বারবার। চাকচিক্যের ঘেরাটোপে হারিয়ে গেছে ফাইটিং স্পিরিট। এটাই হলো পর্দার আড়ালের কুশীলবদের মূল লক্ষ্য।

এখন দেখা যাক কারা কীভাবে হত্যা করেছিল প্রবাদপুরুষ জেনারেল জিয়াকে? তারা কারা? কোন দেশের?

যারা জিয়া হত্যায় জড়িত ছিল এবং কীসের জন্য তাকে হত্যা করেছিল একটি দেশের গুপ্তচর সংস্থা, তা সহজেই বোঝা যায় সেই প্রতিবেশী দেশের স্বনামখ্যাত বিশ্লেষকদের লেখা থেকে। এক্ষেত্রে প্রথমেই উল্লেখ করা যায়, ভারতীয় প্রতিরক্ষা গবেষক পার্থ সারথি ঘোষের(১) কথা। রাষ্ট্রপতি জিয়াকে ক্ষমতাচ্যুত করে ভারত আসলে কাদের বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় আনতে চাইছিল, সে রহস্য পার্থ ঘোষ কোনো রাখঢাক না করেই ফাঁস করে দেন তার এক লেখায়।

রাষ্ট্রপতি জিয়া হত্যাকাণ্ডের পর বাংলাদেশে যখন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রস্তুতি চলছিল, সে সময় ২৯ আগস্ট ’৮১ সংখ্যার ভারতীয় Mainstream পত্রিকায় ‘Limits of Diplomacy: Bangladesh’ শিরোনামে তার এক নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। এ নিবন্ধে তিনি উল্লেখ করেন, “আসন্ন নির্বাচনের ফলাফল থেকে ভারত কী পাবে তা বিচার্য বিষয় নয়। কিন্তু মুজিব ও তার উত্তরসূরিদের সঙ্গে অভিজ্ঞতার আলোকে এটা বলা যায়, শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের মধ্যেই ভারতের একটি শক্ত ভিত রয়ে গেছে।” এবং যেহেতু আ.লীগের মধ্যেই কেবল ভারতের ‘ভিত’ রয়ে গেছে তাই এই আ.লীগকে যেকোনো উপায়ে ক্ষমতায় আনাই ছিল ভারতের লক্ষ্য।

এ ব্যাপারে ভারতের গৃহীত পদক্ষেপ সম্পর্কে অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে পার্থ সারথি ঘোষ মন্তব্য করেন, “কিন্তু ঘটনাপ্রবাহ ভারতের অনুকূলে নিয়ে আসায় কীভাবে প্রভাব খাটানো যায়? এটি নিশ্চিত যে, শুধু কূটনীতি দিয়ে তা করা সম্ভব নয়, বরং রাজনৈতিক ভিত্তি মজবুত করার জন্য আওয়ামী লীগকে গোপনীয়ভাবে যাবতীয় সাহায্য প্রদান করতে হবে এবং এরকম গোপন সাহায্য প্রদানের ক্ষেত্রে অতি অবশ্যই যেকোনো প্রকার নৈতিক সংস্কার বা নীতিকে বর্জন করতে হবে।” অর্থাৎ এ বিশ্লেষণ থেকে এ কথাই প্রমাণিত হয় যে, আ.লীগ ছাড়া অন্য কোনো রাজনৈতিক দলকে ভারত তাদের স্বার্থরক্ষাকারী বলে মনে করে না। এবং এই আ.লীগকে ক্ষমতায় আনার জন্যই তারা ‘গোপনীয়’ অনেক কাজ করেছে, যে ‘কাজের’ অন্যতম হলো রাষ্ট্রপতি জিয়াকে হত্যা করা। আর আ.লীগকে ক্ষমতায় আনাই হলো বাংলাদেশে ভারতের প্যারালাল নিরাপত্তা নীতি বহমান থাকা।

মূলত ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পট পরিবর্তনের পর ভারত বাংলাদেশে জাতীয়তাবাদী শক্তিকে হটিয়ে একটি ‘বন্ধুভাবাপন্ন’ রাজনৈতিক দলকে ক্ষমতায় আনার জন্য উঠেপড়ে লেগে পড়ে। এক্ষেত্রে আ.লীগই হচ্ছে সেই রাজনৈতিক দল এবং আ.লীগকে ক্ষমতায় আনার জন্যই ভারতীয় গুপ্তচর সংস্থা ‘র’ জিয়া হত্যার পরিকল্পনা প্রণয়ন করে। এ ব্যাপারে ১৫ মার্চ ’৮৯ সংখ্যা দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকায় ঋতু সারিন প্রদত্ত তথ্যের উল্লেখ করা যায়। জনতা দলীয় এমপি সুব্রামনিয়াম স্বামীর উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি উল্লেখ করেন ভারতীয় গুপ্তচর সংস্থা ‘র’ই মূলত জিয়াকে হত্যা করেছে।

এদিকে কলকাতা থেকে প্রকাশিত অপর একটি ইংরেজি সাপ্তাহিক ‘সানডে’ পত্রিকায় প্রকাশিত একটি রিপোর্টের উদ্ধৃতি দিয়ে ঢাকার ‘The New Nation’ পত্রিকার এক রিপোর্টে বলা হয়, “ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর অনুমোদনক্রমে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে হত্যার ষড়যন্ত্র করে এবং নিষ্ঠুরভাবে তাকে হত্যা করে।”(২) ওই রিপোর্টে বলা হয়, “মুজিব হত্যার প্রতিশোধ হিসেবে ভারতে জিয়া হত্যার ষড়যন্ত্র দানা বাঁধে। কিন্তু ষড়যন্ত্র যখন পেকে ওঠে, সেই সময় ইন্দিরা গান্ধীর কংগ্রেস সরকারের পতন ঘটে। মোরারজি দেশাই ক্ষমতায় আসেন। প্রতিবেশী রাষ্ট্রপ্রধানের বিরুদ্ধে হত্যা ষড়যন্ত্রের কথা শুনে তিনি ‘সন্ত্রস্ত’ হয়ে ওঠেন এবং হত্যা বন্ধ করেন। এরপর ১৯৮০ সালে ইন্দিরা গান্ধী আবার ক্ষমতায় এলে রাষ্ট্রপতি জিয়া নৃশংসভাবে নিহত হন।”

রাষ্ট্রপতি জিয়াকে হত্যার পেছনে ভারত জড়িত ছিল, এটা পারিপার্শ্বিক তথ্য-উপাত্ত থেকে প্রমাণিত। এ ব্যাপারে হাজারো তথ্য-প্রমাণ হয়তো অদূর ভবিষ্যতে উপস্থাপন করা সম্ভব হবে। তবে এখানে উল্লেখ করা মোটেও অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে, “জিয়া হত্যার সংবাদ সর্বপ্রথম প্রচার করা হয়েছিল আকাশবাণী-আগরতলার একজন সাংবাদিকের বরাত দিয়ে। প্রশ্ন হচ্ছে, সারা দুনিয়া জানার আগে আগরতলার সাংবাদিক কী করে খবর পেলেন চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে জিয়াউর রহমানকে হত্যা করা হয়েছে? জিয়া হত্যার দায়ে জড়িত দুই পলাতক সেনা অফিসার দীর্ঘকাল কোথায় কাদের আশ্রয়ে ছিল? এখনো একজন কলকাতা নগরীতে ব্যবসা-বাণিজ্য করছেন।”(৩) আমরা কি ২০০৯ সালের বিডিআর হত্যাকাণ্ডের পর ভারতের মিডিয়ায় ঠিক এভাবেই সর্বপ্রথম বিডিআর ডিজি হত্যার খবর প্রচারিত হতে দেখিনি?

অন্যদিকে জিয়া হত্যার মাত্র ১২ দিন আগে শেখ হাসিনা ভারত থেকে বাংলাদেশে ফিরে আসেন। “ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তনের মাত্র তিন দিন পরই ভারত সৈন্য নামিয়ে তালপট্টি দ্বীপটি দখল করে নেয়। সারাদেশ প্রতিবাদে ফেটে পড়লেও তিনি ছিলেন নিশ্চুপ। তার প্রত্যাবর্তনের ১৩ দিনের মাথায় দেশি-বিদেশি চক্রান্তকারীদের হাতে নিহত হলেন প্রাণপ্রিয় নেতা রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। হত্যাকাণ্ডের খবর পেয়ে সিলেট থেকে ঢাকা ফেরার সময় শেখ হাসিনা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সীমান্ত দিয়ে পাড়ি জমানোর প্রয়াস পান। সীমান্তরক্ষীরা বাদ সাধেন।”(৪)

উপরিউক্ত তথ্যাবলি ছাড়াও জিয়া হত্যায় ভারতের সংশ্লিষ্টতার পক্ষে যেসব প্রমাণ পাওয়া যায় সেগুলো হলো—

১. রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের এক দিন আগে ভারত বাংলাদেশ সীমান্তে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন করে।

২. জিয়া হত্যার দুদিন পর ১৯৮১ সালের ২ জুন আকাশবাণী পরিবেশিত সকাল ৭টা ৫৫ মিনিটের খবরে বলা হয়, বাংলাদেশ সীমান্তে ভারতীয় সেনাবাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় রাখা হয়েছে।

৩. আকাশবাণীর অন্য আরেক খবরে ভারতীয় সরকারের বরাত দিয়ে জানানো হয়, এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে সহায়তার জন্য ভারতীয় সেনাবাহিনীকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি।

৪. রাষ্ট্রপতি জিয়ার হত্যাকাণ্ডের সংবাদ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ভারতীয় কর্তৃপক্ষ নয়াদিল্লিস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশনে জানতে চান, শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে কি না?

আসলে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ প্রবর্তনসহ স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি ও বিশেষ করে স্বকীয় কৌশলগত নীতিমালা প্রণয়ন করেছিলেন বলেই তাকে হত্যা করা হয়। এই হত্যাকাণ্ডে নিঃসন্দেহে জড়িত ছিল ভারতীয় গুপ্তচর সংস্থা ও তাদের এদেশীয় দোসররা। দক্ষিণ এশিয়ায় তাদের আধিপত্যবাদী নীলনকশা বাস্তবায়নে বাধাপ্রাপ্ত হওয়ায় এবং বাংলাদেশের যে রাজনৈতিক দলটিতে ‘ভারতের ভিত্তি’ রয়ে গেছে সেই দলটিকে ক্ষমতাসীন করার জন্যই ‘র’-এর হাতে নিহত হন জিয়াউর রহমান। কিন্তু ফিনিক্স পাখি যেমন বারবার মাথা তুলে দাঁড়ায়, জিয়াউর রহমানের নামও তেমনি বাংলাদেশে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। তার অনুসৃত নীতিমালাও রয়ে গেছে দেশপ্রেমিক জাতীয়তাবাদী মানুষের হৃদয়ের অন্তস্তলে।

জিয়াউর রহমানকে হয়তো হত্যা করা হতো না, যদি তিনি দক্ষিণ এশিয়ার সামরিক ক্ষমতার ভারসাম্যে ইন্দো-সোভিয়েত ব্লকের বিরুদ্ধে গিয়ে চীন-আমেরিকা-মুসলিম বিশ্বের অক্ষে যোগ না দিতেন।

[জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ড নিয়ে নতুন করে আরও কিছু তথ্য এরই মাঝে পাওয়া যাচ্ছে। তবে সেগুলো যাচাই-বাছাই করে উপস্থাপন করতে হয়তো আরও সময় লাগবে।]

তথ্যসূত্র

১. পার্থ সারথি ঘোষ বর্তমানে দিল্লিস্থ ইনস্টিটিউট অব ইনিয়ান স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের সঙ্গে জড়িত। তিনি একসময় ‘র’-এর সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন বলে জানা যায়। বাংলাদেশ-ভারত ২৫ বছর মেয়াদি মৈত্রী চুক্তি প্রণয়নে পার্থ সারথির বিশেষ ভূমিকা ছিল। সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার, বাংলাদেশ সরকার তার ‘র’-এর সঙ্গে সম্পৃক্ততা সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবগত থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ বা BIISS-এর একজন লেখক হিসেবে তিনি দিব্যি BIISS পত্রিকার সঙ্গে একসময় জড়িত ছিলেন এবং যথারীতি ওই পত্রিকায় তার নামও ছাপা হয়েছে।

২. The New Nation: 29 September, 1988, RAW planned to kill Ziaur Rahman.

৩. শামছুর রাহমান, ‘বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক’; সাপ্তাহিক বিচিত্রা, ২২ বর্ষ ৯ সংখ্যা ২৩ জুলাই ’৯৩/৮ শ্রাবণ ১৪০০, পৃ. ৩৭

৪. শওকত মাহমুদ, ‘বাংলাদেশ রাজনীতিতে শেখ হাসিনার ১২ বছর’; দৈনিক দিনকাল ২০/৫/৯৩ সংখ্যা

(লেখক: সাবেক সেনা কর্মকর্তা, সাংবাদিক ও ‘বাংলাদেশ ডিফেন্স জার্নাল’-এর সম্পাদক)

সিরিয়ায় ওয়াইপিজির বিলুপ্তি ইরাকের জন্য সতর্কবার্তা

চিন্তার স্বাধীনতা বনাম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব

বিধ্বস্ত শিক্ষাব্যবস্থা

ভাষার কোনো বিদেশ নেই, নেই কোনো খাঁচা

নৌবিদ্রোহ ও রাজনীতির বিশ্বাসঘাতকতা

চ্যালেঞ্জের মুখে খামেনির নেতৃত্ব ও ইসলামি বিপ্লব

শব্দের রাজনীতি, ক্ষমতার ভয়

নতুন প্রধানমন্ত্রীর শুরুটা কেমন হলো

কূটনীতিক, পণ্ডিত ও বাংলাদেশের বন্ধু

কৃষি পর্যটন : টেকসই উন্নয়নের নতুন দিগন্ত