দেশের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা হবে আগামী সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ড. ইউনূসের সরকার চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশে এমন অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা বাংলাদেশকে অনিশ্চিত গন্তব্যে নিয়ে যেতে পারে। এ বিষয়ে বিস্তারিত ও নির্মোহ আলোচনা শুরু হওয়া প্রয়োজন, যাতে ভবিষ্যতে যারা সরকার গঠন করতে যাচ্ছে, তারা এ বিষয়ে প্রস্তুতি নিতে পারে এবং বিষয়টি মোকাবিলায় তাদের পরিকল্পনা জনগণকে জানাতে পারে।
আসুন দেখা যাক, রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতা নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কী কী অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিকারী ঘটনা ঘটতে পারে—
১. নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগে আন্দোলন
আগামী নির্বাচনে জয়ের বিষয়ে প্রধান দুই দলই আশাবাদী। সাম্প্রতিক জরিপগুলোয় দেখা যাচ্ছে, দুই দলেরই জনসমর্থন প্রায় সমান সমান। এদিকে নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসন কতটুকু নিরপেক্ষ থাকতে পারবে, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। দুই দলের শক্তি প্রায় সমান হওয়ার কারণে কারচুপির নির্বাচন হলে দ্রুতই রাজপথে জোরালো আন্দোলন দানা বাঁধবে। মনে রাখা প্রয়োজন, এক-এগারোর পটভূমি তৈরি হয়েছিল বিচারপতিদের বয়স বাড়িয়ে কেয়ারটেকার সরকারের প্রধান হিসেবে নিজেদের লোক বসানোর মাধ্যমে নির্বাচনকে প্রভাবিত করার চেষ্টার কারণে।
২. চাঁদাবাজি, দুর্নীতি ও স্থানীয় সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর দাপট ও অন্তঃকলহ
নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা প্রধান দুটি দলের একটি সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী, অপর আরেকটি দলের রয়েছে তৃণমূল পর্যায়ে সাধারণ মানুষের সমর্থন। তবে সম্প্রতি একটি দলের তৃণমূলের নেতাকর্মীদের ব্যাপকভাবে চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার খবর প্রকাশিত হচ্ছে। এই দলটি ক্ষমতায় এলে এবং এসব কাজে জড়িত নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি হতে পারে। এর প্রতিক্রিয়ায় ব্যাপক গণবিক্ষোভ এবং আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার মতো ঘটনা ঘটতে পারে। ২০০১ সালের অক্টোবরের নির্বাচনে জয়ী হয়ে খালেদা জিয়া ক্ষমতায় আসার পর নিজ দলের নেতাকর্মীদের চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কারণে নির্বাচনের পরপরই আইনশৃঙ্খলার ব্যাপক অবনতি ঘটে, যাকে অন্য কোনোভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে খালেদা জিয়াকে ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’ নামে সেনানিয়ন্ত্রিত অভিযান চালাতে হয়। এতে শতাধিক মানুষ নিহত হন, যাদের মধ্যে অধিকাংশই ছিলেন বিএনপির নেতাকর্মী। পরবর্তী সময়ে সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদের দমনের জন্য বিএনপি বাধ্য হয়েছিল র্যাব নামক বিশেষ বাহিনী গঠন করতে। এই দলটি এবার ক্ষমতায় এলে বর্তমান প্রেক্ষাপটে এ ধরনের কোনো অপারেশন চালাবে বা চালাতে পারবে কিনা, না চালালে কী ঘটতে পারে, তা নিয়ে চিন্তাভাবনা করা প্রয়োজন।
৩. বহির্বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক
বহির্বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে আগামী সরকার চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। এই চ্যালেঞ্জটি মূলত দুটি ফ্রন্ট থেকে আসতে পারে—
(ক) উন্নয়ন সহযোগী ও পশ্চিমা দেশসমূহ : উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলো চাইবে একটি দক্ষ, গতিশীল ও দুর্নীতিমুক্ত সরকারের সঙ্গে কাজ করতে। ২০০১-০৬ টার্মের সরকারের দুর্নীতির দুর্নাম ছিল। সেই সময় পরপর পাঁচ বছর বাংলাদেশ পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্নীতিপরায়ণ রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষিত হয়েছিল, যদিও যে সংস্থা বিএনপি সরকারকে এ আখ্যা দিয়েছিল, তাদের নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তবে বাস্তবতা হলো দুর্নীতি ছিল এবং এখন এটি জাতীয় সমস্যা বা দুর্যোগে পরিণত হয়েছে। সেই সময় দুর্নীতির কারণে সরকারের গতিশীলতা মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছিল। বিদ্যুৎ সমস্যা সমাধানে সরকার চরমভাবে ব্যর্থ হয়, যার মূল্য দলটিকে পরে দিতে হয়েছিল। সরকারের দক্ষতার অভাবে সারা দেশে সিরিজ বোমা হামলা এবং ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূতের ওপর বোমা হামলার মতো ঘটনা ঘটে। ফলে পশ্চিমা বিশ্বে বাংলাদেশের ইমেজ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং এক-এগারোর মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। ওই দলটি ক্ষমতায় এলে আবারও একই পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। কারণ ষড়যন্ত্রকারীরা ওত পেতে আছে দেশে ও দেশের বাইরে।
অন্যদিকে জামায়াতের বিষয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর কিছু রক্ষণশীলতা থাকতে পারে। যদিও হাসিনা-পরবর্তী সময়ে পশ্চিমা রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে জামায়াতের ঘনঘন বৈঠকের খবর দেখা যাচ্ছে। এমনকি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদর দপ্তরে জামায়াতের আমিরকে দাওয়াত করেও নেওয়া হয়। পশ্চিমাদের প্রধান উদ্বেগ—নারী ও অমুসলিম নাগরিক উভয় ইস্যুতে দলটি খুবই ভালো করছে। তাদের নেতা-কর্মীদের সততা ও দক্ষতার সুনাম আছে। যদি তারা একটি দক্ষ, গতিশীল ও দুর্নীতিমুক্ত সরকার দেখাতে পারে, তাহলে পশ্চিমাদের সমর্থন ও সহযোগিতা পেতে পারবে।
(খ) ভারত : ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের চ্যালেঞ্জ বড় দুই দলের জন্য দুই রকম হবে। ২০১৪ সালের পর বিএনপি ভারতের বিষয়ে ধীরে ধীরে তার অবস্থান বদলাতে থাকে। খালেদা জিয়া জেলে যাওয়ার পর দলটির ভারতবিষয়ক ভাবনা এমন পর্যায়ে চলে যায় যে, তারা মনে করতে থাকে, ভারতের সমর্থনের অভাবেই দলটি ক্ষমতায় যেতে পারছে না। হাসিনা-পরবর্তী বাংলাদেশে ভারত দলটিকে আওয়ামী লীগে বিকল্প হিসেবে দেখতে চায়। ফলে বিএনপি ভারতের সমর্থন পাবে, তবে সেজন্য দলটিকে আওয়ামী লীগের মতোই দেশের বড় বড় স্বার্থ ত্যাগ করতে হবে। অপর দলটির বিষয়ে ভারতের প্রকাশ্য অবস্থান নেতিবাচক। তবে, সম্প্রতি জানা গেছে, দেশটির রাষ্ট্রদূত ওই দলের আমিরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। এ থেকে বোঝা যায়, দেশটি সব দলের সঙ্গেই কাজ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই দলটি ক্ষমতায় এলে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক শীতল থাকতে পারে বা মালদ্বীপের মতোও হতে পারে। উল্লেখ্য, মালদ্বীপের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ড. মোহাম্মদ মুইজ্জু ‘ইন্ডিয়া আউট’ কর্মসূচির মাধ্যমে নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়ে জয়ী হলেও ভারতের সঙ্গে দেশটির বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। জামায়াতের সরকারের কূটনৈতিক দক্ষতার ওপরেও এ সম্পর্ক নির্ভর করছে।
ওপরের আলোচনা থেকে দেখা যাচ্ছে, স্থিতিশীলতার চ্যালেঞ্জ দুই দলের জন্যই রয়েছে। আমরা আশা করব, এই বিষয়ে দল দুটি তাদের কর্মপরিকল্পনা ও কৌশল জাতির সামনে পেশ করবে।