বাংলাদেশে খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা হলে সাধারণত উৎপাদন বৃদ্ধি, বাজারদর নিয়ন্ত্রণ কিংবা সরকারি খাদ্য মজুতের বিষয়গুলো সামনে আসে। কিন্তু এর সঙ্গে আরো একটি মৌলিক প্রশ্ন জড়িত: যে কৃষক দেশের মানুষের খাদ্যের জোগান নিশ্চিত করেন, তার নিজের জীবন ও জীবিকা কতটা নিরাপদ? কৃষক যদি উৎপাদন খরচ তুলতে না পারেন, ন্যায্য দাম না পান কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ঋণের বোঝায় পড়েন, তাহলে দেশের খাদ্যব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে কতটা টেকসই থাকবে?
আজ ১৬ অক্টোবর বিশ্ব খাদ্য দিবস। ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য ‘Innovate today. Nourish tomorrow.’—অর্থাৎ, ‘আজ উদ্ভাবন, আগামী দিনের পুষ্টি’। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) নির্ধারিত এই প্রতিপাদ্য আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ভবিষ্যতের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উদ্ভাবন, বিজ্ঞান ও টেকসই উৎপাদন ব্যবস্থার বিকল্প নেই। তবে উদ্ভাবনের সুফল যদি কৃষকের কাছে না পৌঁছায়, উৎপাদিত খাদ্য যদি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে থাকে এবং পুষ্টিকর খাবার যদি সবার জন্য নিশ্চিত না হয়, তাহলে খাদ্যব্যবস্থার প্রকৃত রূপান্তর ঘটবে না। বিশ্ব খাদ্য দিবস তাই কেবল উৎপাদন বাড়ানোর অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করার দিন নয়; বরং কৃষকের অধিকার, খাদ্যের ন্যায্য বণ্টন, পুষ্টি এবং কৃষিনীতির কার্যকারিতা পর্যালোচনারও উপলক্ষ।
উৎপাদন বাড়লেই কি খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত হয়?
খাদ্যনিরাপত্তাকে শুধু পর্যাপ্ত খাদ্য উৎপাদন বা বাজারে খাদ্যের উপস্থিতি দিয়ে বিচার করা যায় না। মানুষের খাদ্যে প্রবেশাধিকার, ক্রয়ক্ষমতা, পুষ্টিমান এবং সারা বছর নির্ভরযোগ্যভাবে খাদ্য পাওয়ার সুযোগও এর অবিচ্ছেদ্য অংশ। একটি দেশে পর্যাপ্ত ধান উৎপাদিত হতে পারে, অথচ নিম্ন আয়ের কোনো পরিবার প্রয়োজনীয় খাবার কিনতে না পারলে তাদের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত হয়েছে বলা যায় না। বাংলাদেশের জন্য এই চ্যালেঞ্জ আরো গুরুত্বপূর্ণ। খাদ্যের দাম বাড়লে দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো প্রথমে খাদ্যতালিকার বৈচিত্র্য কমাতে বাধ্য হয়। চালের সংস্থান হলেও মাছ, ডিম, দুধ, ডাল, ফল ও অন্যান্য পুষ্টিকর খাবারের পরিমাণ কমে যেতে পারে। এর প্রভাব পড়ে শিশুদের বৃদ্ধি, নারীদের পুষ্টি এবং শ্রমজীবী মানুষের স্বাস্থ্য ও কর্মক্ষমতার ওপর।
এফএওর ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর বাংলাদেশ বিষয়ক খাদ্যনিরাপত্তা মূল্যায়ন অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর সময়ে প্রায় ১ কোটি ৮১ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। মূল্যায়নে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, পরিবারের সীমিত ক্রয়ক্ষমতা, জ্বালানি ও জ্বালানিসংশ্লিষ্ট ব্যয় এবং বন্যার মতো অভিঘাতকে পরিস্থিতির অবনতির কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে, খাদ্য উৎপাদনের পাশাপাশি মানুষের খাদ্য কেনার সামর্থ্য নিশ্চিত করাও জরুরি। অতএব, খাদ্যনিরাপত্তার নীতি হতে হবে দ্বিমুখী: একদিকে উৎপাদককে ন্যায্য মূল্য ও উৎপাদনের প্রণোদনা দিতে হবে, অন্যদিকে ভোক্তার জন্য খাদ্য সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী রাখতে হবে। এই দুই লক্ষ্যকে পরস্পরবিরোধী হিসেবে দেখলে চলবে না।
কৃষকের ন্যায্যমূল্য: খাদ্যব্যবস্থার ভিত্তি
কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা কোনো বিশেষ গোষ্ঠীকে বাড়তি সুবিধা দেওয়ার বিষয় নয়; এটি জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তার পূর্বশর্ত। কৃষক যদি উৎপাদন ব্যয়, নিজের শ্রমের মূল্য এবং যুক্তিসংগত মুনাফা তুলতে না পারেন, তাহলে পরবর্তী মৌসুমে উৎপাদন অব্যাহত রাখার সক্ষমতা ও আগ্রহ—দুটিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর প্রভাব পড়ে কৃষিতে বিনিয়োগ, গ্রামীণ কর্মসংস্থান এবং ভবিষ্যতের খাদ্য সরবরাহের ওপর।
বাংলাদেশে ধান কাটার মৌসুমে প্রায়ই এমন পরিস্থিতি দেখা যায়, যখন কৃষক দ্রুত ফসল বিক্রি করতে বাধ্য হন। সংরক্ষণের অভাব, ঋণ পরিশোধের চাপ এবং নগদ অর্থের প্রয়োজন তাকে দর-কষাকষিতে দুর্বল করে। অন্যদিকে, বাজারের বিভিন্ন পর্যায়ে পণ্য হাতবদল হওয়ার ফলে উৎপাদক যে দাম পান, ভোক্তাকে তার চেয়ে উল্লেখযোগ্য বেশি দাম দিতে হতে পারে। তবে সব মধ্যস্বত্বভোগীকে সমস্যার কারণ হিসেবে দেখাও যথার্থ নয়; পরিবহন, সংরক্ষণ ও বিতরণে তাদের অনেকের প্রয়োজনীয় ভূমিকা রয়েছে। সমস্যা হলো, বাজারে প্রতিযোগিতার অভাব, অস্বচ্ছতা এবং অযৌক্তিক মুনাফার সুযোগ।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারি ধান-চাল সংগ্রহব্যবস্থার সংস্কার প্রয়োজন। সংগ্রহমূল্য নির্ধারণে উৎপাদন ব্যয়, কৃষকের শ্রম, মৌসুমি বাজার পরিস্থিতি এবং যুক্তিসংগত মুনাফা বিবেচনা করতে হবে। পাশাপাশি প্রকৃত কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ধান সংগ্রহ, নিবন্ধন ও ডিজিটাল লেনদেনের স্বচ্ছ ব্যবস্থা এবং স্থানীয় পর্যায়ে সংগ্রহকেন্দ্রের কার্যকারিতা বাড়াতে হবে। শুধু সংগ্রহমূল্য ঘোষণা করলেই হবে না; প্রকৃত কৃষক সেই দামে ফসল বিক্রির সুযোগ পাচ্ছেন কি না, তা নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি সংগ্রহের পরিমাণ, উপকারভোগী কৃষকের সংখ্যা, অঞ্চলভিত্তিক বণ্টন এবং সংগ্রহ প্রক্রিয়ার অভিযোগ নিষ্পত্তির তথ্যও নিয়মিত প্রকাশ করা প্রয়োজন।
কৃষক ও ভোক্তার স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য
কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষা করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কৃষককে লোকসানে রেখে ভোক্তার জন্য খাদ্য সস্তা রাখার নীতি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়। আবার কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির সব চাপ ভোক্তার ওপর ছেড়ে দেওয়াও গ্রহণযোগ্য সমাধান হতে পারে না। এ জন্য বাজারব্যবস্থায় প্রতিযোগিতা বাড়াতে হবে, সরবরাহ শৃঙ্খলের বিভিন্ন পর্যায়ে মূল্যবৃদ্ধির কারণ চিহ্নিত করতে হবে এবং অযৌক্তিক মজুতদারি ও কারসাজির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে কৃষক সমবায়, উৎপাদক সংগঠন, স্থানীয় কৃষিবাজার এবং কৃষক থেকে সরাসরি ভোক্তার কাছে পণ্য পৌঁছানোর উদ্যোগ সম্প্রসারণ করা যেতে পারে।
এ ক্ষেত্রে সংরক্ষণ ব্যবস্থা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। ফসল কাটার পরপরই বিক্রি করতে বাধ্য হলে কৃষক অনেক সময় উপযুক্ত দাম পান না। গ্রামীণ গুদাম, শীতল সংরক্ষণাগার, হিমাগার এবং আধুনিক পরিবহন ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করলে পচন ও অপচয় কমবে। কৃষক পণ্য বিক্রির সময় বেছে নেওয়ার সুযোগ পাবেন, আর ভোক্তাও সরবরাহের আকস্মিক সংকটজনিত মূল্যবৃদ্ধি থেকে কিছুটা সুরক্ষা পাবেন। অন্যদিকে, নিম্নআয়ের পরিবারগুলোর জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি আরো কার্যকর করতে হবে। খাদ্যসহায়তা ও নগদ সহায়তা যথাসময়ে প্রকৃত উপকারভোগীর কাছে পৌঁছানো, পুষ্টিকর খাবারে প্রবেশাধিকার বাড়ানো এবং কর্মসূচির আওতা ও ফলাফল নিয়মিত মূল্যায়ন করা জরুরি।
জলবায়ু পরিবর্তনের মুখে কৃষির সুরক্ষা
বাংলাদেশের কৃষি জলবায়ু ও প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল। বন্যা, খরা, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, নদীভাঙন, উপকূলীয় লবণাক্ততা এবং আকস্মিক পাহাড়ি ঢল কৃষি উৎপাদন ও কৃষকের জীবিকাকে অনিশ্চিত করে তুলছে। হাওরাঞ্চলে আগাম বন্যায় বোরো ধানের ক্ষতি, উপকূলে লবণাক্ততার বিস্তার এবং উত্তরাঞ্চলে খরার চাপ কৃষির ভিন্ন ভিন্ন ঝুঁকি তুলে ধরে। এই ঝুঁকি মোকাবিলায় অঞ্চলভিত্তিক কৃষি পরিকল্পনা প্রয়োজন। বন্যা, খরা ও লবণাক্ততা সহনশীল জাতের সম্প্রসারণ, মাটির স্বাস্থ্য পরীক্ষা, সাশ্রয়ী ও দক্ষ সেচব্যবস্থা, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং নির্ভরযোগ্য আবহাওয়ার পূর্বাভাস কৃষকের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। হাওরাঞ্চলে আগাম বন্যার সতর্কতা, ফসল রক্ষায় বাঁধের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং পানি নিষ্কাশনের কার্যকর পরিকল্পনা বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে।
তবে জলবায়ু সহনশীল কৃষি মানে শুধু নতুন জাত বা প্রযুক্তি ব্যবহার নয়। কৃষকের আর্থিক সক্ষমতা, সহজ শর্তে ঋণ, কৃষিবিমা এবং দুর্যোগের পর পুনরায় উৎপাদনে ফেরার সুযোগও এর অংশ। ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের হাতে পর্যাপ্ত সঞ্চয় না থাকলে একটি বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ তার বহু বছরের বিনিয়োগ নষ্ট করে দিতে পারে। তাই কৃষিবিমার বাস্তবসম্মত সম্প্রসারণ, দুর্যোগ-পরবর্তী ঋণ পুনর্বিন্যাস এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের জন্য দ্রুত সহায়তার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে কৃষিজমি রক্ষা, জলাশয় সংরক্ষণ, নদী ও খালের স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখা এবং অপরিকল্পিত ভূমি ব্যবহারের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। কৃষির দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদনশীলতা রক্ষায় মাটির উর্বরতা ও পানিসম্পদের সুরক্ষা অপরিহার্য।
উদ্ভাবন হবে কৃষকের জন্য, শুধু প্রযুক্তির জন্য নয়
বিশ্ব খাদ্য দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য উদ্ভাবনের গুরুত্ব তুলে ধরেছে। কিন্তু কৃষিতে উদ্ভাবনের সাফল্য শুধু নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন বা যন্ত্রের ব্যবহার দিয়ে মাপা উচিত নয়; দেখতে হবে, তা কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমাচ্ছে কি না, উৎপাদনশীলতা বাড়াচ্ছে কি না, ফসলের ক্ষতি কমাচ্ছে কি না এবং কৃষকের আয় ও ভোক্তার পুষ্টিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনছে কি না। মানসম্মত বীজ, কৃষিযন্ত্রের সাশ্রয়ী ব্যবহার, নির্ভুল সার ব্যবস্থাপনা, মাটির স্বাস্থ্য পরীক্ষা, ডিজিটাল বাজারতথ্য এবং কৃষিপণ্যের প্রক্রিয়াজাতকরণে বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন। তবে প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতির সুবিধা যেন কেবল বড় কৃষক বা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। ক্ষুদ্র কৃষকের জন্য যৌথভাবে কৃষিযন্ত্র ব্যবহারের ব্যবস্থা, সহজলভ্য প্রশিক্ষণ এবং কৃষি সম্প্রসারণ সেবা জোরদার করতে হবে।
কৃষি গবেষণাগারে উদ্ভাবিত প্রযুক্তি মাঠপর্যায়ে পৌঁছানোও বড় চ্যালেঞ্জ। গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, কৃষক সংগঠন ও বেসরকারি উদ্যোগের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন। কৃষকের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও স্থানীয় জ্ঞানকে গবেষণার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে, যাতে প্রযুক্তি স্থানীয় পরিবেশ ও উৎপাদনব্যবস্থার উপযোগী হয়। তরুণদের কৃষিতে যুক্ত করার ক্ষেত্রেও নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দরকার। কৃষিকে শুধু প্রথাগত ফসল উৎপাদন হিসেবে না দেখে বীজ ও চারা উৎপাদন, নার্সারি, কৃষিযন্ত্র সেবা, দুগ্ধ ও পোলট্রি, মৎস্যচাষ, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্যাকেজিং এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। এ জন্য সহজ শর্তে অর্থায়ন, দক্ষতা উন্নয়ন, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং বাজারসংযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। নারী কৃষক ও কৃষিশ্রমিকদের অবদানও নীতিনির্ধারণ ও সহায়তা কর্মসূচিতে যথাযথ স্বীকৃতি পেতে হবে।
কৃষিনীতি বাস্তবায়নে জবাবদিহি চাই
বাংলাদেশের কৃষির সমস্যাগুলো নতুন নয়। উৎপাদন ব্যয়, বাজারের অস্থিরতা, সংরক্ষণের ঘাটতি, জলবায়ু ঝুঁকি এবং কৃষকের সীমিত আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা হচ্ছে। এখন প্রয়োজন ঘোষণার চেয়ে বাস্তবায়নে বেশি গুরুত্ব দেওয়া।
প্রথমত, নিয়মিত ও অঞ্চলভিত্তিক উৎপাদন ব্যয় নিরূপণ করে কৃষকের ন্যায্যমূল্য নির্ধারণের কার্যকর কাঠামো গড়ে তুলতে হবে।
দ্বিতীয়ত, সার, বীজ, সেচ ও জ্বালানির সরবরাহে অনিয়ম প্রতিরোধ করে মানসম্মত কৃষি উপকরণের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে হবে।
তৃতীয়ত, সরকারি খাদ্যশস্য সংগ্রহে প্রকৃত কৃষকের অংশগ্রহণ বাড়িয়ে পুরো প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করতে হবে।
চতুর্থত, ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের উপযোগী ঋণ, কৃষিবিমা এবং দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্বাসনব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে।
পঞ্চমত, কৃষিপণ্য সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণে সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
ষষ্ঠত, কৃষি গবেষণা ও সম্প্রসারণের মধ্যে কার্যকর সংযোগ স্থাপন করে নতুন প্রযুক্তির সুফল মাঠপর্যায়ে পৌঁছে দিতে হবে।
সপ্তমত, খাদ্য অপচয় কমানো, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, পুষ্টিশিক্ষা সম্প্রসারণ এবং শিশুদের পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিতে হবে।
অষ্টমত, কৃষিনীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে কৃষক সংগঠন, কৃষিবিদ, গবেষক, কৃষি উদ্যোক্তা, নারী কৃষক এবং ভোক্তা প্রতিনিধিদের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
কৃষি খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি অর্থের যথাযথ ব্যবহার ও প্রকল্পের ফলাফল মূল্যায়ন করতে হবে। কৃষির নামে গৃহীত প্রকল্পের ব্যয়, অগ্রগতি ও সুফল সম্পর্কে জনসাধারণের জানার সুযোগ থাকতে হবে। কত টাকা বরাদ্দ হলো, তার পাশাপাশি কত কৃষক উপকৃত হলেন, উৎপাদন ব্যয় কতটা কমল, কৃষকের আয় কতটা বাড়ল এবং খাদ্যের প্রাপ্যতা ও পুষ্টিতে কী পরিবর্তন এলো—এসব সূচকের ভিত্তিতে নীতির সাফল্য বিচার করতে হবে।
কৃষকের মর্যাদাই খাদ্যনিরাপত্তার ভিত্তি
বিশ্ব খাদ্য দিবসে আমাদের সামনে মূল প্রশ্নটি হলো, আমরা কি এমন একটি খাদ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারছি, যেখানে প্রত্যেক মানুষ পর্যাপ্ত ও পুষ্টিকর খাবার পাবেন, আর যারা সেই খাবার উৎপাদন করেন, তারাও সম্মানজনক জীবনযাপন করতে পারবেন? এই লক্ষ্য অর্জনে উৎপাদন বৃদ্ধি জরুরি, কিন্তু তা একা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন ন্যায্য মূল্য, কার্যকর বাজারব্যবস্থা, সাশ্রয়ী খাদ্য, জলবায়ু সহনশীল কৃষি, প্রযুক্তির অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবহার এবং কৃষকের অর্থনৈতিক সুরক্ষা। রাষ্ট্রকে কৃষকের পাশে দাঁড়াতে হবে শুধু দুর্যোগের সময় নয়, বীজ বপন থেকে ফসল বিক্রি পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে। কৃষককে কেবল খাদ্য উৎপাদনকারী হিসেবে দেখলে চলবে না। তিনি দেশের অর্থনীতি, গ্রামীণ কর্মসংস্থান এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের খাদ্য ও পুষ্টির অন্যতম ভিত্তি। তার শ্রমের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা, উৎপাদনের ঝুঁকি কমানো এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে তার অংশগ্রহণ প্রতিষ্ঠা করা তাই অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার ও জাতীয় স্বার্থ—দুইয়েরই দাবি। বিশ্ব খাদ্য দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক—কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, সবার জন্য পুষ্টিকর খাদ্যের সুযোগ সৃষ্টি করা, কৃষিতে টেকসই উদ্ভাবন ছড়িয়ে দেওয়া এবং কৃষিনীতিকে আরো স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করা।
কৃষক বাঁচলে কৃষি বাঁচবে; কৃষি টেকসই হলে খাদ্যনিরাপত্তার ভিত্তি শক্তিশালী হবে।
লেখক: কৃষি সম্পাদক, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং সদস্য সচিব, জাতীয় কৃষক শক্তি
kbd.salim.ncp@gmail.com