দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিজয়ী শক্তি যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও ব্রিটেনের নেতৃত্বে ফিলিস্তিনিদের ওপর গণহত্যা চালিয়ে, তাদের বাড়িঘর জমিজমা থেকে তাড়িয়ে সেখানে ইহুদিদের জন্য গায়ের জোরে ইসরাইল নামক একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা হয়। জাতিসংঘকে ব্যবহার করে ১৯৪৮ সালের ১৪ মে সন্ত্রাসী কায়দায় ইসরাইল নামক রাষ্ট্রের গোড়াপত্তনের পরের দিন ১৫ মে মিসর, ইরাক, সিরিয়া, জর্ডান, সৌদি আরব, ইয়েমেন ও লেবানন ইসরাইল রাষ্ট্রকে অবৈধ ঘোষণা করে ইসরাইলের বিরুদ্ধে একযোগে যুদ্ধ শুরু করে। কিন্তু যুদ্ধে সম্মিলিতভাবে এসব আরব দেশ নতুন আর ক্ষুদ্র রাষ্ট্র ইসরাইলের কাছে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। কারণ আরবদের সেই সম্মিলিত হামলার মুখে ইসরাইল নামক রাষ্ট্র যখন শুরুতেই মুছে যাওয়ার উপক্রম হয়, তখন সামনে এগিয়ে আসে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, রাশিয়াসহ পশ্চিমা প্রভাবশালী দেশ। তারা জাতিসংঘের মাধ্যমে চার সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি কার্যকর করে। এই সুযোগে ইসরাইল যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে বিভিন্ন দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র সংগ্রহ করে এবং যুদ্ধবিরতি শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আরবদের ওপর হামলা চালায়।
এরপর ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত আরবরা ইসরাইল রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আরো তিনটি বড় যুদ্ধ পরিচালনা করে; কিন্তু প্রতিটি যুদ্ধে তারা পরাজিত হয় ইসরাইলের কাছে। এর কারণ আজ যেমন যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইল রাষ্ট্রকে রক্ষার জন্য যুদ্ধ করছে, ঠিক একইভাবে অতীতে প্রতিটি যুদ্ধে ইসরাইলকে রক্ষায় এগিয়ে আসে যুক্তরাষ্ট্রসহ ইসরাইলের পশ্চিমা মিত্ররা। পরপর চারটি যুদ্ধে আরবরা ইসরাইলের কাছে শুধু পরাজিত হয়েছে তাই নয়, বরং প্রতিবার যুদ্ধে সিনাই পর্বত, গোলান মালভূমি, পশ্চিমতীরসহ বিশাল আরব ভূমি দখল করে নেয় ইসরাইল, যার অনেক এলাকা পরে চড়ামূল্যে ইসরাইলের কাছ থেকে উদ্ধার করতে হয়েছে আরবদের। আরবদের বিরুদ্ধে বারবার যুদ্ধে ইসরাইল নামক রাষ্ট্রের অস্তিত্ব যখন মুছে যেতে বসে, ঠিক তখনই যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি তার অস্ত্র ও অর্থের ভান্ডার খুলে দিয়েছে ইসরাইলের জন্য। অন্যথায় ইসরাইল নামক রাষ্ট্র ১৯৪৮ সালের ১৪ মে ঘোষণার পরদিনই পৃথিবীর মানচিত্র থেকে মুছে যেত।
সর্বশেষ ১৯৭৩ সালে মিসর ও সিরিয়া মিলে ইসরাইলের বিরুদ্ধে আকস্মিক যৌথ হামলা শুরু করে। তখনো ইসরাইল নিশ্চিত পরাজয়ের মুখোমুখি হয় এবং ইসরাইল নামক রাষ্ট্রের অস্তিত্ব মুছে যাওয়ার উপক্রম হয়। এ অবস্থায় ইসরাইলের তখনকার প্রধানমন্ত্রী গোলল্ড মায়ার যুক্তরাষ্ট্রের কাছে কাতর মিনতি জানান ইসরাইল রাষ্ট্রের অস্তিত্ব রক্ষায়। যুক্তরাষ্ট্র তার অস্ত্রের দরজা খুলে দেয় ইসরাইলের জন্য। ফলে সেবারও যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রে জয়ী হয় ইসরাইল। ১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র আজ পর্যন্ত ইসরাইলকে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র সহায়তা করেছে। সর্বশেষ হামাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে তারা ইসরাইলকে ২১ বিলিয়ন ডলারের সহায়তা দিয়েছে। বর্তমানে প্রতিবছর যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইলকে সামরিক খাতে ৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের সহায়তা দিয়ে থাকে।
১৯৪৭ সালের ২৯ নভেম্বর জাতিসংঘে যখন ফিলিস্তিনিদের আবাসভূমিতে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা না করে ইহুদিদের জন্য আলাদা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব পাস হয়, তখন ফিলিস্তিনিরাসহ আরব বিশ্ব তীব্র ক্ষোভে ফেটে পড়ে। জাতিসংঘকে ব্যবহার করে বিশ্ব মোড়লদের জোরপূর্বক এই উদ্যোগ কোনো আরব নেতা তখন মেনে নিতে পারেননি। পশ্চিমাদের সহায়তায় ফিলিস্তিনিদের তাদের বাড়িঘর থেকে উচ্ছেদ করার জন্য মাঠে নামে নবগঠিত ইসরাইলি মিলিশিয়া বাহিনী। ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ করার জন্য ইসরাইলি এই অস্ত্রধারী বাহিনী গণহত্যা, গণধর্ষণ ও ব্যাপক জ্বালাও-পোড়াও অভিযান চালায়। ইসরাইলই স্বীকার করেছে তখন কমপক্ষে ১৫ হাজার ফিলিস্তিনিকে হত্যা করা হয়।
অস্ত্রের মুখে তখন কমপক্ষে সাড়ে ৭ লাখ ফিলিস্তিনিকে তাড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হয় গাজায়। এ ছাড়া লাখ লাখ ফিলিস্তিনি আশ্রয় নেয় আজকের জর্ডান, সিরিয়া, লেবানন, মিসরসহ বিভিন্ন আরব দেশে। আজকের গাজার যে ২২ লাখ ফিলিস্তিনি উদ্বাস্তু, তাদের প্রায় সবার পূর্বপুরুষের বাড়িঘর ছিল আজকের ইসরাইল নামক রাষ্ট্রের ভূখণ্ডে। আজকের ইসরাইলের তেলআবিব, হাইফাসহ যেসব অঞ্চলে সুরম্য সব অট্টালিকা দেখা যায়, সেখানেই ছিল তাদের পূর্বপুরুষদের আবাসভূমি। বর্বর উপায়ে ইসরাইল নামক এই রাষ্ট্র সৃষ্টির পর থেকে শুধু আরব নয়, পুরো বিশ্বের মুসলমানদের হৃদয়ে আজ পর্যন্ত রক্তক্ষরণ চলছে । বিশ্বব্যাপী মুসলমান জনগোষ্ঠীর মনে ক্ষোভের অন্যতম একটি কারণ যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমাদের সহায়তায় ইসরাইল কর্তৃক ফিলিস্তিনিদের প্রতি দীর্ঘকাল ধরে চলা সীমাহীন জুলুম নির্যাতন আর দখলদারিত্ব। যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমাদের সহায়তায় সেই থেকে আজ পর্যন্ত ফিলিস্তিনিদের এলাকা দখল করে সম্প্রসারণ করে চলছে ইসরাইল রাষ্ট্রের সীমানা। আর ক্রমে সংকুচিত হচ্ছে ফিলিস্তিনিদের ভূখণ্ড। পশ্চিমতীর নামক যে এলাকার কথা শোনা যায়, সেটাই মূলত আজকের ফিলিস্তিন রাষ্ট্র কিন্তু ১৯৬৭ সাল থেকে নামেমাত্র এই ফিলিস্তিন রাষ্ট্রও ইসরাইলের দখলে ও নিয়ন্ত্রণে।
জন্মের পর থেকেই ইসরাইল নামক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধের কারণে মিসরের প্রথম রাজা ফারুক, প্রেসিডেন্ট জামাল আবদেল নাসের, প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত, সৌদি আরবের বাদশাহ আবদুল আজিজ ইবন সৌদ, সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট হাফিজ আল আসাদ, শুকরি আল কুয়াতলি, জর্ডানের বাদশাহ হোসেনসহ অনেকে স্মরণীয় হয়ে আছেন। পুরো আরব তখন ইসরাইলের বিরুদ্ধে এতই ক্ষুব্ধ ছিল যে, মিসরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত পরে ইসরাইলকে স্বীকৃতি দেওয়ার কারণে সৈনিকদের গুলিতে নিহত হন।
কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হলোÑআরবরা একসময় অবৈধ ইসরাইল রাষ্ট্রের অবসানের লক্ষ্যে দীর্ঘকাল ধরে যুদ্ধ করেছে, আজ সেই আরবদের চোখের সামনে গাজায় যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় ইসরাইল ২০২৩ সাল থেকে মানবেতিহাসের অন্যতম পৈশাচিক বর্বরতা, গণহত্যা, জাতিগত নিধন ও মানবতাবিরোধী অপরাধের নজির স্থাপন করেছে। ইসরাইল নিজেই ৭০ হাজার ফিলিস্তিনি হত্যার কথা স্বীকার করেছে কিন্তু সীমাহীন এই বর্বরতার বিরুদ্ধে আজকের আরব নেতারা মাঝেমধ্যে দু-একটি বিবৃতি ছাড়া ইসরাইলের বিরুদ্ধে নীরব। বরং যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ আর অস্ত্রে ইসরাইল যখন গাজায় ইতিহাসের নিকৃষ্ট বর্বরতার জন্ম দিয়ে চলছে, তখন ২০২৫ সালের মে মাসে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতার ডোনাল্ড ট্রাম্পকে লালগালিচা বিছিয়ে সাদরে আমন্ত্রণ জানায় এবং তার জন্য খুলে দেয় তাদের বিশাল অর্থের ভান্ডার। কাতার ডোনাল্ড ট্রাম্পকে খুশি করার জন্য উপহার দেয় ৪০০ মিলিয়ন ডলারের একটি বিলাসবহুল বোয়িং বিমান। ট্রাম্পের সেই সফরে এই তিনটি দেশ যুক্তরাষ্ট্রে ৩ হাজার ২০০ বিলিয়ন ডলার বা ৩ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ চুক্তি করে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০১৬ সালের নির্বাচনে প্রথমবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর প্রথম যে দেশটি সফর করেন, সেটিও ছিল সৌদি আরব । ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০১৭ সালের মে মাসের সফরে সৌদি আরবের কাছে ৪৬০ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রির চুক্তি করেন। বিশ্ব ইতিহাসে আজ পর্যন্ত এটাই সবচেয়ে বড় অস্ত্র বিক্রি চুক্তি।
চুক্তি স্বাক্ষরের পর যুক্তরাষ্ট্রের তখনকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন রিয়াদে সাংবাদিকদের বলেন, এ অস্ত্র চুক্তি ইরানকে মোকাবিলায় সহায়তা করবে সৌদি আরবকে। তিনি বলেন, আমাদের উভয়ের শত্রুদের প্রতি এ চুক্তি একটি শক্তিশালী বার্তা। এ অঞ্চলে নিরাপত্তা রক্ষায় নিয়োজিত মার্কিন সেনাদের জীবনহানিও কমিয়ে আনবে এ চুক্তি।
যে আরবরা একদিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমাদের অন্যায়ের বিরুদ্ধ ১৯৪৮ থেকে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত যুদ্ধ করেছে সেই আরবে আজ যুক্তরাষ্ট্রের ১৯টি বড় বড় সামরিক ঘাঁটি। আজ তাদেরই চোখের সামনে ইরানকে আরেকটি গাজা বানানোর পথে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল।
ইসরাইল রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ১৯৪৮ থেকে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ যুদ্ধে সবসময় নেতৃত্বের ভূমিকায় ছিল মিসর। কিন্তু সেই মিসরই ১৯৭৯ সালে প্রথম আরব রাষ্ট্র হিসেবে ইসরাইলকে স্বীকৃতি দেয়। ইসরাইলকে স্বীকৃতি দেওয়ার আগে ১৯৭৭ সালে মিসরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত ইসরাইলের সংসদে ভাষণ দেন । ইসরাইলকে স্বীকৃতির জন্য ১৯৮১ সালে তাকে জীবন দিতে হয়েছে।
এর অনেক বছর পর ১৯৯৪ সালে জর্ডান ইসরাইলকে স্বীকৃতি দিয়ে ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করে। ট্রাম্প প্রশাসনের উদ্যোগে ২০২০ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, মরক্কো ও সুদান ইসরাইলকে স্বীকৃতি দেয় আব্রাহাম একর্ডের অধীনে। অন্যান্য আরব দেশ এখনো ইসরাইলকে স্বীকৃতি না দিলেও গোপনে ও প্রকাশ্যে নানা ধরনের সম্পর্ক রয়েছে ইসরাইলের সঙ্গে।
আজকে মূলত আরব রাজাদের সিংহাসন পাহারা, নিরাপত্তার নামে এবং ইরানকে মোকাবিলায় পুরো মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করতে দিয়েছে। এসব ঘাঁটির পেছনে প্রতিটি আরব দেশকে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচ করতে হয়। বাহরাইন, কাতার, কুয়েত, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইরাক, জর্ডান, সিরিয়া ও ওমানে আটটির বেশি যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান ঘাঁটি রয়েছে। এসব ঘাঁটিতে মোতায়েন রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন ধরনের এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম, যুদ্ধবিমান, শক্তিশালী রাডার ব্যবস্থা, বিমানবাহী রণতরীসহ আধুনিক প্রযুক্তির অনেক সমরাস্ত্র ও রণতরী।
দীর্ঘকাল ধরে বিশ্বে সবচেয়ে বড় সমরাস্ত্র রপ্তানিকারক দেশ যুক্তরাষ্ট্র। আর যুক্তরাষ্ট্রের সমরাস্ত্রের প্রধান বাজার মূলত সৌদি আরবসহ কয়েকটি আরব দেশ।
আরবদের এত অস্ত্রের পাহাড় আর অঢেল অর্থের ভান্ডার থাকার পরও তাদের চোখের সামনে ইসরাইল গাজাকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছে এবং তারা নীরবে এই পৈশাচিকতা দেখেছে। অথচ সবাই এ কথা বিশ্বাস করে, আরবরা এক হয়ে এর বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিলে ইসরাইল এটা করতে পারত না এবং অনেক আগেই ফিলিস্তিন নামে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হতো। সবাই এও বিশ্বাস করে, আরবরা না চাইলে যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইল ও ইরানে হামলা করতে পারত না। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল হঠাৎ করে হামলা চালায়নি। দুই মাসের বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্র প্রকাশ্যে সামরিক প্রস্তুতি নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের কথামতো ইরান চুক্তি না করলে ইরানে হামলা করা হবে বলে স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছে। এ অবস্থায় আরব রাজারা যদি যুদ্ধের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিত, তাহলে কস্মিনকালেও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল এটা করার সাহস করত না। তেল অস্ত্রের মতো এত গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র থাকার পরও আরবরা তা কোনোই কাজে লাগাত পারল না। বরং ওয়াশিংটন পোস্টের খবরে বলা হয়েছে, ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জন্য ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে জোর লবিং চালিয়েছেন সৌদি আরবের মূল শাসক ও ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান বা এমবিএস। হামলার আগে থেকে তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বারবার ফোন করেছেন । ওয়াশিংটন পোস্ট লিখেছে, সৌদি যুবরাজ প্রকাশ্যে কূটনীতির মাধ্যমে ইরান সমস্যা সমাধানের কথা বললেও গোপনে তিনি ট্রাম্পকে উৎসাহিত করেছেন ইরানে হামলা চালানোর জন্য। শেষ মুহূর্তে তিনি ট্রাম্পকে অনুমতি দিয়েছেন হামলার জন্য। এই হলো মুসলিম নামাধারী আরব রাজাদের প্রকৃত পরিচয়।
সুইডেনের স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুসারে ২০১৩ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বে যত অস্ত্র বিক্রি করেছে, তার প্রায় অর্ধেক বিক্রি করেছে শুধু একটি দেশ তথা সৌদি আরবের কাছে। ২০১৪ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত লাগাতার পাঁচ বছর বিশ্বের শীর্ষ অস্ত্র আমদানিকারক দেশ ছিল সৌদি আরব। আর এসব অস্ত্রের প্রায় ৯০ ভাগ তারা আমদানি করেছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে।
২০২০ সালের স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৪ থেকে ২০১৮ সালে বিশ্বে যত অস্ত্র বিক্রি হয়েছে, তার ৩৫ ভাগ কিনেছে আরবের কয়েকটি দেশ।
২০১৪ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত সংযুক্ত আরব আমিরাত তার অধিকাংশ সমরাস্ত্র ক্রয় করেছে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে। ২০১৪ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত কাতার তার ৬৫ ভাগ অস্ত্র ক্রয় করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে।
২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় প্রথমে সৌদি আরবের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক স্বাভাবিক হতে থাকে। এরপর সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইনের মতো দেশও ইরানের সঙ্গে সুসম্পর্ক স্থাপনে এগিয়ে আসে। অন্যদিকে সৌদি আরবসহ বিভিন্ন আরব দেশ যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে চীন, রাশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনে জোর দেয়। এতে শঙ্কিত হয়ে পড়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল। হামাস-ইসরাইল যুদ্ধে কোনো আরব রাষ্ট্র গাজার পক্ষে দাঁড়ায়নি। শুধু একা ইরান যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের জুলুমের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে নিজেরা ক্ষতির শিকার হয়েছে। সর্বশেষ যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইলের সীমাহীন অন্যায় চাওয়ার কাছে ইরান মাথানত না করে একা রুখে দাঁড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের মতো সুপার পাওয়ারের বিরুদ্ধে। ইরানের আজকের এই প্রতিরোধ ইতিহাসে বীরত্বগাথা হিসেবে অমর হয়ে থাকবে। অন্যদিকে ফিলিস্তিন, ইরান, সুদান, ইয়েমেনে, লিবিয়া, ইরাকসহ বিভিন্ন ইস্যুতে আরব রাজাদের আজকের ভূমিকা ইতিহাস স্মরণ করবে মানবতার শত্রু হিসেবে।
লেখক : সহকারী সম্পাদক, আমার দেশ