বাংলাদেশের সামনের নির্বাচন ঘিরে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলোÑদেশ কোন পথে এগোবে : গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পুনরুদ্ধার, নাকি স্বৈরতান্ত্রিক দমননীতির ধারাবাহিকতা। আওয়ামী লীগ দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থেকে উন্নয়নের কিছু চিত্র দেখালেও বাস্তবে দুর্নীতি, পরিবারতন্ত্র, বিচারবহির্ভূত হত্যা, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন এবং নির্বাচনকে প্রহসনে পরিণত করার দায় তাদের ঘাড়ে বর্তেছে। বিগত নির্বাচনগুলোতে বিরোধী দলকে মাঠে নামতে না দেওয়া, প্রশাসনকে দলীয়করণ করা এবং নাগরিক স্বাধীনতাকে সংকুচিত করা আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা। অর্থনৈতিক অগ্রগতির দাবি থাকলেও বৈষম্য ও বেকারত্ব বেড়েছে, ব্যাংক খাত থেকে অর্থ লোপাট হয়েছে, বিদেশি ঋণনির্ভরতা বেড়েছে। ফলে, আওয়ামী লীগের প্রতি জনমনে অবিশ্বাস গভীরতর হয়েছে। বিএনপি একসময় বিকল্প শক্তি হিসেবে ছিল; কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে তারা সংগঠন ভাঙন, নেতৃত্ব সংকট এবং দমন-পীড়নের কারণে কার্যকর রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে দুর্বল হয়ে পড়েছে। তবে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার ইস্যুতে তারা কিছুটা নৈতিক অবস্থান তৈরি করতে পেরেছে। তবু দুর্নীতির পুরোনো অভিযোগ ও নেতৃত্বে পরিবারতন্ত্র তাদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করেছে। সামনের নির্বাচনে তাই ইস্যু হওয়া উচিতÑস্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন, দুর্নীতি দমন, আইনের শাসন, শিক্ষার মান উন্নয়ন, স্বাস্থ্য ও পরিবেশ রক্ষা এবং বহির্বিশ্বের অযাচিত প্রভাব থেকে মুক্ত থেকে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া। ভোটাররা বুঝতে চাইবে কোন দল শুধু ক্ষমতায় যেতে চায় আর কোন দল দীর্ঘ মেয়াদে রাষ্ট্রকে ন্যায্য, স্বচ্ছ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে চায়।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী নিয়ে বিতর্ক থাকলেও সমালোচকরা মানেন, সংগঠন হিসেবে তারা তুলনামূলক শৃঙ্খলাবদ্ধ, স্বচ্ছ আর্থিক কাঠামো বজায় রেখেছে এবং স্থানীয় পর্যায়ে সামাজিক কাজ করেছে। তবে স্বাধীনতাবিরোধী ভূমিকার দায় এখন আর তাদের দেওয়া যায় না, কারণ একেবারে তরুণ প্রজন্মের কাঁধে রয়ে গেছে হালের জামায়াতের নেতৃত্ব, যা তাদের জাতীয় রাজনীতিতে পূর্ণ গ্রহণযোগ্যতা ইতোমধ্যে এনে দিয়েছে। বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মতো সুস্পষ্ট দুর্নীতি বা দমননীতি জামায়াত অনুসরণ করেনি। এখানেই বাংলাদেশের ভোটাররা এক ধরনের নৈতিক দ্বিধায় পড়ে : স্বাধীনতার প্রশ্নে জামায়াতকে অগ্রাহ্য করবে, নাকি দুর্নীতিগ্রস্ত শাসনব্যবস্থার হাত থেকে মুক্তি চাইবে। যাই হোক, বাংলাদেশের জনগণ কয়েক দশকে যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে তা হলোÑনেতাভিত্তিক রাজনীতি ও দমননীতির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা দলগুলো কখনোই জনগণের আশা পূরণ করতে পারেনি। তাই আগামী নির্বাচনে একটি নীতিভিত্তিক, গণতান্ত্রিক ও সৎ দল গড়ে তোলার দাবি প্রবল হয়ে উঠছে। যদি কোনো দল সত্যিকারের গণতন্ত্র, আইনের শাসন এবং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করতে না পারে, তবে দেশ শুধু ক্ষমতাসীনদের লুটপাটের বলি হয়েই থেকে যাবে।
আমি এমন একটি রাজনৈতিক দল চাই, যারা বাংলাদেশকে ন্যায়ভিত্তিক, গণতান্ত্রিক ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্রে রূপান্তর করতে সচেষ্ট হবে। এ দল হবে নীতিনিষ্ঠ, নেতানির্ভর নয়; তারা ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতিকে অতিক্রম করে প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্র ও নৈতিকতার ভিত্তিতে এগোবে। কল্পিত এই রাজনৈতিক দলের প্রতি আমার কিছু নীতিগত প্রত্যাশা রয়েছে, যা দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও ভবিষ্যৎ উন্নতির জন্য অপরিহার্য। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একটি রাজনৈতিক দল কেমন হওয়া উচিত, তা শুধু কিছু নীতির তালিকা নয়, বরং ইতিহাস, দর্শন এবং রাজনৈতিক অর্থনীতির আলোকে গভীরভাবে বিশ্লেষণযোগ্য একটি প্রশ্ন। আজকের রাজনৈতিক বাস্তবতায় আমরা দেখছি পরিবারতন্ত্র, দুর্নীতি, সুবিধাবাদ এবং ক্ষমতার অপব্যবহার এমনভাবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে, জনগণ গণতন্ত্রের প্রকৃত স্বাদ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। দলের ভেতরে গণতান্ত্রিক চর্চা ও ভিন্নমতের স্বাধীনতা থাকতে হবে। দলের নেতৃত্ব নির্বাচন হবে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এবং এতে নারী-পুরুষ, ধর্ম-বর্ণ, জাতি ও জেন্ডার নির্বিশেষে সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। সিদ্ধান্ত গ্রহণে কর্মী থেকে শীর্ষপর্যায় পর্যন্ত সবার মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে। ক্ষমতায় গেলে দলটির সুস্পষ্ট অবস্থান থাকবে, যাতে বিরোধী মত ও সমালোচনার স্বাধীনতা রক্ষা পায়। তাই একটি কল্পিত রাজনৈতিক দলকে শুধু ক্ষমতায় যাওয়ার হাতিয়ার হিসেবে দেখা যাবে না; তাকে হতে হবে নৈতিক দর্শন, গণতান্ত্রিক চেতনা এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের বাস্তবভিত্তির ওপর দাঁড়ানো। দার্শনিক জন লক তার স্যোশল কন্ট্রাক্ট-এ বলেছিলেন, জনগণের সম্মতি ছাড়া কোনো রাষ্ট্র বা প্রতিষ্ঠান টেকসই হতে পারে না। অথচ বাংলাদেশের অধিকাংশ রাজনৈতিক দলে ভেতরে গণতন্ত্রের কোনো অনুশীলন নেই। নেতা নির্বাচন প্রায়ই বংশানুক্রমিক বা স্বৈরতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় হয় আর ভিন্নমতাবলম্বীরা উপেক্ষা কিংবা দমন-পীড়নের শিকার হয়। হাবারমাসের ডেলিবারেট ডেমোক্রেসি অনুযায়ী, যুক্তিসংগত আলোচনার মাধ্যমে দলীয় নীতিনির্ধারণ করা উচিত, কিন্তু আমাদের বাস্তবতায় গণতন্ত্রকে সীমিত করা হয়েছে শুধু প্রহসনমূলক নির্বাচনের মধ্যেই। এতে যে শাসনব্যবস্থা তৈরি হয়, তা প্রকৃত গণতন্ত্র নয়, বরং এক ধরনের ইলেক্ট্রোরাল অথরিটারিয়ানিজম। তাই একটি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল হতে হলে তাকে বহুত্ববাদী কাঠামোতে গড়ে উঠতে হবে, যেখানে ভিন্নমতকে স্বীকৃতি দেওয়া হবে।
এখানেই আসে আইনের শাসন এবং বিচারবহির্ভূত হত্যার প্রশ্ন। হান্স কেলসেন তার ‘পিউর থিউরি অফ ল’-এ দেখিয়েছিলেন, আইনের শাসন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকতে হবে; অথচ বাংলাদেশে আইন প্রায়ই শাসকগোষ্ঠীর স্বার্থে নমনীয় হয়ে ওঠে। দার্শনিক হান্না আরেন্ট আমাদের সতর্ক করেছিলেন যে রাষ্ট্রের একচ্ছত্র ক্ষমতা ন্যায়বিচারকে ধ্বংস করে দিতে পারে, আর বিখ্যাত ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকোর ডিসিপ্লিনারি পাওয়ার আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে রাষ্ট্র শৃঙ্খলার নামে নাগরিক স্বাধীনতাকে নিয়ন্ত্রণ করে। বাংলাদেশের বাস্তবতায় বিচারবহির্ভূত হত্যা প্রায়ই ‘ন্যায়বিচার’ বা ‘অপরাধ দমন’-এর ছদ্মবেশে বৈধতা পেয়েছে, যা আসলে গণতন্ত্রকে ধ্বংস করে। তাই একটি কল্পিত রাজনৈতিক দলের প্রতিশ্রুতি হতে হবে নাগরিক অধিকারকে শ্রদ্ধা করা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা এবং রাষ্ট্রকে ‘বৈধ সহিংসতা’র যন্ত্রে পরিণত না করা।
রাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা নীতি প্রসঙ্গে বিখ্যাত ব্রিটিশ দার্শনিক থমাস হবস তার লেভিয়াথান -এ নাগরিক সুরক্ষার জন্য রাষ্ট্রকে বৈধ শক্তি হিসেবে কল্পনা করেছিলেন। কিন্তু বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা বলে, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনী অনেক সময় নাগরিক সুরক্ষার পরিবর্তে শাসকগোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষায় মশগুল থাকে। সমালোচনামূলকভাবে দেখা যায়, প্রতিরক্ষা নীতি শুধু সামরিক সরঞ্জাম অর্জনের মধ্যে সীমিত থাকলে রাষ্ট্র ধীরে ধীরে এক স্বৈর লেভিয়াথান-এ পরিণত হয়। তাই একটি কল্পিত দলের প্রতিরক্ষা দর্শন হতে হবে এমন, যা শুধু বাহ্যিক হুমকির মোকাবিলা নয়, বরং নাগরিক অধিকার, মানবিক নিরাপত্তা এবং অভ্যন্তরীণ শান্তি নিশ্চিত করে। রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও জনগণের নিরাপত্তার জন্য একটি মজবুত প্রতিরক্ষা নীতি প্রয়োজন। এ জন্য জনগণের অংশগ্রহণমূলক সামরিক প্রশিক্ষণ, দেশীয় প্রতিষ্ঠান দ্বারা উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি, ড্রোন, যুদ্ধবিমান, রণতরী ও সাবমেরিন নির্মাণের দিকে গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে দেশের প্রতিটি মানুষ যেন ২৪ ঘণ্টা নিরাপদে চলাচল করতে পারেন, সে জন্য অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। মোটা দাগে, এখানে শিক্ষার প্রসঙ্গও গুরুত্বপূর্ণ। পাওলো ফ্রেইরে তার পেডাগগি অফ দ্য অপ্রেসড-এ বলেছেন, শিক্ষা হতে হবে মুক্তির হাতিয়ার। অথচ বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা আজও মুখস্থনির্ভর, পরীক্ষানির্ভর এবং বাজারমুখী। এতে সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তির বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয় এবং শিক্ষা এক ধরনের ‘কর্মী সরবরাহকারী যন্ত্রে’ পরিণত হয়। একটি রাজনৈতিক দল যদি সত্যিই জাতি গঠনে ভূমিকা রাখতে চায়, তবে তাকে এমন শিক্ষাব্যবস্থা প্রণয়ন করতে হবে, যেখানে শিক্ষার্থীরা শুধু চাকরির উপযোগী নয়, বরং সৃজনশীল, নৈতিকভাবে দায়বদ্ধ এবং সমালোচনাশীল নাগরিক হয়ে উঠবে। শিক্ষাব্যবস্থা হতে হবে যোগ্য ও সৎ নাগরিক তৈরির উপযোগী। শুধু পরীক্ষানির্ভর নয়, বরং চরিত্র গঠন, দক্ষতা বৃদ্ধি ও চিন্তার স্বাধীনতাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। শিক্ষানীতিতে সব মহলের মতামতকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, যাতে তা হয় অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ভবিষ্যৎমুখী।
স্বাস্থ্যনীতির ক্ষেত্রেও একই যুক্তি প্রযোজ্য। অমর্ত্য সেন তার ক্যাপাবিলিটি অ্যাপ্রোচ-এ বলেছেন, স্বাস্থ্য মানুষের অন্যতম মৌলিক সক্ষমতা। কিন্তু বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবা একটি বাণিজ্যিক খাতে রূপ নিয়েছে, যেখানে মানসম্মত চিকিৎসা প্রায়ই শুধু বিত্তশালীদের নাগালে থাকে। করোনা মহামারিতে এ দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বলা যায়, স্বাস্থ্যসেবা যদি মুনাফাভিত্তিক হয়, তবে তা নাগরিকের মৌলিক অধিকারকে অস্বীকার করে। তাই একটি রাজনৈতিক দলের স্বাস্থ্যনীতি হতে হবে ন্যায্যতা, দক্ষতা, প্রাপ্যতা এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের ওপর ভিত্তি করে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ক্ষেত্রে পরিবেশবান্ধব বিকল্পকে গ্রহণ করতে হবে। সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে এবং জীবাশ্ম জ্বালানির বিকল্প নিয়ে গবেষণা ও প্রচার চালাতে হবে। জাতীয় বিদ্যুৎব্যবস্থাকে যুদ্ধকালীন আক্রমণ থেকে সুরক্ষিত রাখতে কৌশল প্রণয়ন জরুরি। অর্থনীতি, কৃষি ও শিল্প প্রসঙ্গে মার্কসের রাজনৈতিক অর্থনীতি প্রাসঙ্গিক। তিনি বলেছিলেন, উৎপাদন সম্পর্ক সমাজের কাঠামো নির্ধারণ করে। বাংলাদেশের কৃষি এখন বহুজাতিক কোম্পানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে, যেখানে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের বাজারজাতকরণ কৃষককে শোষণের ফাঁদে ফেলছে। কৃষিতে স্বনির্ভরতা ছাড়া প্রকৃত স্বাধীনতা আসবে না। তাই একটি নীতিনিষ্ঠ দলের লক্ষ্য হওয়া উচিত জৈব কৃষি, ক্ষুদ্র ও মাঝারিশিল্প উন্নয়ন এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণ। কৃষি, শিল্প ও বাণিজ্যে স্বনির্ভরতা এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে। ক্ষতিকর রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের পরিবর্তে জৈব চাষাবাদে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে তুলে দেশীয় উৎপাদন বাড়াতে হবে, পাশাপাশি আমদানি কমানো ও রপ্তানির বহুমুখীকরণকে নীতির অংশ করতে হবে। এখানে পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রসঙ্গ আসবে। উলরিখ বেক তার Risk Society তত্ত্বে বলেছেন, আধুনিক উন্নয়ন পরিবেশগত বিপর্যয়ের ঝুঁকি তৈরি করে। জলবায়ু পরিবর্তন ও উষ্ণতা রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণ আদায়, বৃক্ষরোপণ, সবুজায়ন এবং পরিবেশ রক্ষায় দেশব্যাপী কর্মসূচি হাতে নিতে হবে। বন্যা ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় টেকসই পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন। দুর্যোগের ক্ষতি কমাতে কর্মীদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে এবং জনগণকে প্রস্তুত করার জন্য প্রচার-প্রচারণা চালাতে হবে।
বাংলাদেশের জন্য জলবায়ু পরিবর্তন শুধু একটি তাত্ত্বিক বিষয় নয়; এটি সরাসরি মানুষের জীবন ও জীবিকা প্রভাবিত করছে। অথচ রাজনৈতিক দলগুলো এটিকে প্রায়ই আন্তর্জাতিক সহায়তা পাওয়ার কৌশল হিসেবে ব্যবহার করে। তাই একটি কল্পিত দলের জন্য জলবায়ু ন্যায্যতা, সবুজায়ন, নদী দখলমুক্তকরণ ও দূষণ নিয়ন্ত্রণ নীতির কেন্দ্রে থাকা জরুরি। দেশের খাল-বিল, নদী-নালা ও সমুদ্র দূষণ ও দখলমুক্ত রাখতে হবে। এ জন্য শুধু প্রচারণা নয়, বরং কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। দলের কোনো কর্মী দূষণ বা দখলে জড়িত হলে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে দলীয় শৃঙ্খলা ও সততা প্রতিষ্ঠিত হয়। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি প্রসঙ্গে ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের দার্শনিকরা (আডর্নো, হোর্কহাইমার) বলেছিলেন, প্রযুক্তি মুক্তির পাশাপাশি দমনের হাতিয়ারও হতে পারে। বাংলাদেশের বাস্তবতায় প্রযুক্তি প্রায়ই ভোক্তাবাদী ও বিদেশনির্ভর, যা আসলে জাতীয় উদ্ভাবনী ক্ষমতাকে দুর্বল করে। বলা যায়, শুধু আমদানিনির্ভর প্রযুক্তি নীতি জাতীয় নির্ভরশীলতা বাড়াবে। তাই দলটির প্রযুক্তি নীতি হতে হবে স্থানীয় উদ্ভাবন, স্বনির্ভর গবেষণা ও ক্রিটিক্যাল বিজ্ঞানচেতনার ওপর ভিত্তি করে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে শুধু ভোগ নয়, বরং উদ্ভাবন ও উদ্যোক্তা তৈরির হাতিয়ার হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ক্লাব প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যাতে তরুণ প্রজন্ম নিজেরা গবেষণা এবং উদ্ভাবনে উৎসাহিত হয়। বিদেশি প্রযুক্তির সুবিধা নিলেও নিজেদের উদ্ভাবনী ক্ষমতাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
সবশেষে আসে নারী, শিশু, বৃদ্ধ এবং সংখ্যালঘুদের সুরক্ষার প্রশ্ন। ফরাসি নারীবাদী লেখিকা সিমোন দ্য বোভোয়ার দেখিয়েছিলেন, নারীকে সবসময় ‘অন্য’ হিসেবে দেখা হয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নারীর অধিকার, সংখ্যালঘুদের অধিকার, কিংবা বয়স্ক নাগরিকদের মর্যাদা প্রায়ই শুধু রাজনৈতিক বক্তৃতার মধ্যে সীমিত থাকে। দার্শনিক লেভিনাস বলেছেন, নৈতিকতার শুরু হয় অন্যের মুখের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে। বলা যায়, একটি রাজনৈতিক দল শুধু সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি নয়, বরং সম-অধিকার ও মর্যাদার নিশ্চয়তাকে বাস্তবায়িত করবে। অতএব, বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে কোনো রাজনৈতিক দল যদি শুধু ক্ষমতা দখলের জন্য কাজ করে, তবে রাষ্ট্র ও সমাজ ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই একটি ভবিষ্যৎ দলকে গড়ে উঠতে হবে সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি, নৈতিক দর্শন, গণতান্ত্রিক চেতনা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং স্বনির্ভরতার ভিত্তিতে। তা না হলে রাজনীতি আবার ব্যক্তিনির্ভর, দুর্নীতিগ্রস্ত ও সুবিধাবাদী চক্রের হাতে বন্দি থাকবে। দেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে নিরপেক্ষভাবে সংরক্ষণ করতে হবে। নির্দলীয় ইতিহাস রচনার পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী স্থানগুলো রক্ষা ও উন্নয়নের জন্য নীতি থাকতে হবে। একই সঙ্গে ইকো ট্যুরিজম প্রচারের মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করতে হবে।
সবশেষে বলা যায়, সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত বাস্তবতায় এ নীতিগুলো হালনাগাদ করা যাবে। তবে মূল লক্ষ্য থাকবে একটি ন্যায়ভিত্তিক, গণতান্ত্রিক, স্বনির্ভর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলাÑযেখানে নাগরিকরা নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও সৃজনশীল জীবনযাপন করতে পারবেন। এই কল্পিত রাজনৈতিক দলটির প্রস্তাবিত নীতি নিঃসন্দেহে মানবিক, গণতান্ত্রিক ও অগ্রগামী। তবে সমালোচনামূলকভাবে বলতে হয়Ñবাংলাদেশের বিদ্যমান ক্ষমতার কাঠামো, দুর্নীতি, বৈশ্বিক পুঁজিবাদ ও অভ্যন্তরীণ স্বার্থসংঘাতের মধ্যে এ নীতিগুলো বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত কঠিন। ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের পণ্ডিতরা আমাদের সতর্ক করেছেÑঅনেক সময় গণতন্ত্র শুধু স্লোগান হয়ে ওঠে, বাস্তবে তা ক্ষমতার রূপকথা ছাড়া আর কিছু নয়। তাই এই কল্পিত দলটির প্রকৃত চ্যালেঞ্জ হবে নীতি ও বাস্তবতার মধ্যে সেতুবন্ধ তৈরি করা, যাতে রাষ্ট্র শুধু ক্ষমতার যন্ত্র না হয়ে প্রকৃত অর্থে জনগণের সেবক হয়ে ওঠে।
লেখক : সাবেক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, লেখক ও গবেষক, ফ্রাই ইউনিভার্সিটি বার্লিন, জার্মানি
যোগাযোগ : sahidkamrul25@gmail.com