হোম > মতামত > সম্পাদকীয়

তারেক রহমানের বিলম্বিত ‘হ্যাঁ’ বার্তা

এম আবদুল্লাহ

এম আব্দুল্লাহ

‘দিব্যচক্ষু’ বলে একটি শব্দ আছে। ‘দিব্যদৃষ্টি’ বা ‘দিব্যনেত্র’ সমার্থক শব্দ রয়েছে। অন্যভাবে বলা যায় ‘জ্ঞানচক্ষু’। অলৌকিক বা অতীন্দ্রিয় দৃষ্টি বলেন অনেকে। বাংলা অভিধানে আরেকটি শব্দ আছে, সেটা হলো ‘দূরদৃষ্টি’। ভবিষ্যতের পরিস্থিতি আগে থেকে বুঝতে পারার ক্ষমতাকে ‘দূরদৃষ্টি’ বলা হয়ে থাকে। পরিস্থিতি ও পরিণাম সম্পর্কে পূর্বানুমান করার ক্ষেত্রে ‘দূরদৃষ্টি’ ছাড়াও ‘বিচক্ষণতা’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়। রাজনীতিতে এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অদূরদর্শিতা বা অপরিণামদর্শী কোনো কৌশল রাজনীতিতে ভয়ংকর বিপদের কারণ হতে পারে। আবার সেটা যদি হয় নির্বাচনি রাজনীতি বা রাষ্ট্রক্ষমতা নির্ধারণী লড়াইয়ের ক্ষেত্রে, তাহলে তো বিপদ ও পরিণাম আরো মারাত্মক।

গণভোট ইস্যুতে বিএনপির নীতি-কৌশল দেখে হৃদয়ে রীতিমতো রক্তক্ষরণ হচ্ছিল। যে দলটি টানা প্রায় দেড় যুগ স্বৈরশাসনের নিষ্ঠুর নিপীড়নে পিষ্ট, সে দলটিকে অনুকূল সময়েও ভুল রাজনীতি বা কৌশলের কারণে ক্রমাগত ক্ষতিগ্রস্ত হতে দেখে কষ্টবোধটা বেড়ে গেছে। দলটির ভোটের রাজনীতির কৌশল ও হিসাব-নিকাশ কোনোভাবে মেলাতে পারছিলাম না। বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের প্রতিটি বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শুনছিলাম গণভোট প্রশ্নে তার অবস্থান জানার জন্য। কিন্তু না, ২২ জানুয়ারি থেকে ২৯ জানুয়ারি পর্যন্ত, কিংবা তারও আগে কোনো বক্তব্যেই তিনি গণভোট ইস্যু স্পর্শ করেননি। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে প্রথমবারের মতো বলেন, ‘বিএনপির হ্যাঁ ভোটের পক্ষে না থাকার কোনো কারণ নেই।’ মন্তব্যটির মধ্যে কোনো জোর নেই, আছে খানিকটা দ্বিধা। এরপর দলের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান ও স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে সংক্ষিপ্ত মন্তব্য করেন, ‘বিএনপি সংস্কার ও হ্যাঁ-এর পক্ষে।’

রাষ্ট্রকাঠামোর বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমূল সংস্কার আনার লক্ষ্যে ৩০টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের দীর্ঘ আলোচনা শেষে ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবে ঐকমত্য ও সিদ্ধান্ত হয়। এগুলো নিয়ে তৈরি করা হয়েছে জুলাই জাতীয় সনদ। এই প্রস্তাবগুলোর মধ্যে ৪৮টি সংবিধান-সম্পর্কিত। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন একই সঙ্গে জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধান-সম্পর্কিত প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নে গণভোটও হবে। চারটি পয়েন্টে ৪৮টি ছোট-বড় সংস্কারের প্রশ্নে ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ অপশনে রায় চাওয়া হয়েছে। গণঅভ্যুত্থানের ম্যানডেট নিয়ে ক্ষমতাসীন সরকার জনআকাঙ্ক্ষা ধারণ করে সংস্কারগুলোর পক্ষে গণরায় চেয়ে ক্যাম্পেইনও করছে। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জিতলে সংস্কারের পথ খুলবে। সংস্কার প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়িত হলে প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র ক্ষমতা কিছুটা কমার পাশাপাশি কিছু ক্ষেত্রে বাড়বে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা। ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করার জন্য চাইলেই সংবিধান কাটাছেঁড়া করা যাবে না। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন ব্যবস্থা টেকসই হবে। সব মিলিয়ে রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরি হবে।

ওপরে বর্ণিত মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও নজরুল ইসলাম খানের বক্তব্যের পরও বিএনপির (নব্য বিএনপি বলাই শ্রেয়) সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাক্টিভিস্টরা ‘না’-এর পক্ষে নানা যুক্তি দেখাতে থাকেন। কেউ কেউ ফটোকার্ড বানিয়ে লেখেন—‘আমি না ভোট দেব, আপনি?’ টকশোতে বিএনপিকে প্রতিনিধিত্ব করেন এমন ব্যক্তিরা ‘হ্যাঁ’ ভোটের বিপক্ষে এবং সরকারের ‘হ্যাঁ’-র পক্ষে ক্যাম্পেইনের এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন উচ্চ কণ্ঠে। এসব দেখে মনে হচ্ছিল—বিএনপি আবারও ভুল পথে হাঁটছে। অবশেষে আনুষ্ঠানিক প্রচারণার অষ্টম দিনে শুক্রবার রাতে রংপুরের সমাবেশে প্রথমবারের মতো গণভোট ইস্যুতে মুখ খোলেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, ‘১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ধানের শীষে ভোট দেওয়ার পাশাপাশি পৃথক ব্যালটে দয়া করে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেবেন।’ আরো জোর দেওয়ার জন্য তিনি জানতে চান—‘মনে থাকবে তো।’ তার এ ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে সমবেত জনতা উচ্চ স্বরে সমর্থন ব্যক্ত করেন।

গণভোট ও সংস্কার নিয়ে শুক্রবার রাতে দেওয়া তারেক রহমানের বক্তব্যটি বিএনপির অতি উৎসাহী ও নির্বোধ সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাক্টিভিস্টদের জন্য হুবহু তুলে ধরছি। তারেক রহমান বলেন, ‘বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এসে সংস্কার কমিশন করে। বাংলাদেশের প্রায় কম-বেশি রাজনৈতিক দলগুলোকে সেখানে আহ্বান করা হয়। বিএনপিও সেখানে গেছে।’ তিনি বলেন, ‘মোটামুটিভাবে সংস্কার প্রস্তাব যেগুলো আমরা দিয়েছি, যা আমরা জনগণের সামনে অনেক আগে উপস্থাপন করেছিলাম, সেটাই কম-বেশিভাবে তারাও দিয়েছে। হতে পারে কোনো কোনোটির ব্যাপারে আমাদের সঙ্গে কিছু কিছু দ্বিমত আছে। কিন্তু আমাদের সঙ্গে যদি দ্বিমত থাকে, আমরা লুকোছাপা করিনি। আমরা জনগণের সামনে প্রকাশ্যে বলেছি—কোনটিতে আমরা সম্মতি দিয়েছি, কোনটিতে আমাদের অসম্মতি আছে।’

গণভোটে হ্যাঁ-তে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘অধিকার ফেরানোর জন্য আবু সাঈদ নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন, চট্টগ্রামে ওয়াসিম নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন। এ রকম হাজারো মানুষ রয়েছেন যারা নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন মানুষের ভোটের অধিকার, কথা বলার অধিকার, অর্থনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য।’ তিনি বলেন, ‘তাদের জীবন উৎসর্গকে মূল্যায়ন করতে হলে আমরা যে জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছি, সেই জুলাই সনদকেও আমাদের সম্মান করতে হবে। সেজন্যই আপনাদের সবাইকে অনুরোধ করব, ধানের শীষে যেমন সিলটা দেবেন ১২ তারিখে, একই সঙ্গে আপনাকে যে দ্বিতীয় ব্যালট পেপারটি দেবে ‘হ্যাঁ’ এবং ‘না’, সেখানে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে দয়া করে আপনারা রায় দেবেন।’

তারেক রহমানের এ বক্তব্যের সুরে বোঝা যায়, তিনি সংস্কার ও গণভোট প্রশ্নে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন। সুস্পষ্ট অবস্থান জানান দিতে বিলম্বের জন্যে এক ধরনের আত্মপক্ষ সমর্থনের প্রয়াস আছে বক্তব্যে। কেউ বিলম্বিত বোধোদয় বললেও তাকে দোষারোপ করা যাবে না। সংস্কার-প্রত্যাশী বিবেকবান গণতন্ত্রমনা বিপুল জনগোষ্ঠী অনেক আগেই ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে বিএনপির সুস্পষ্ট অবস্থান প্রত্যাশা করেছিল। কিন্তু দুর্বোধ্য কারণে বিএনপি নেতৃত্ব দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন। সময়ের এক ফোঁড় অসময়ের দশ ফোঁড় বলে একটা কথা আছে। ‘সময় গেলে সাধন হয় না’ বলে গেছেন লালন। ভোটের বাজারে যে গণভোট গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে, তা বুঝতে এত সময় লাগা কাম্য ছিল না। প্রতিপক্ষ বিএনপির বিরুদ্ধে জুৎসইভাবে কার্ডটি খেলেছে ইতোমধ্যেই। সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীর বাইরে বেশ কয়েকটি জেলায় সফর করতে হয়েছে নানা কারণে। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে মনে হয়েছে, গণভোট ইস্যুতে বিএনপির অস্পষ্ট বা নেতিবাচক অবস্থান দলটির জন্য বেশ ক্ষতির কারণ হয়েছে।

বেটার লেট দ্যান নেভার। দেরিতে হলেও অনুধাবন করার জন্য তারেক রহমানকে ধন্যবাদ। বিশ্বাস করি, নির্বাচন সামনে রেখে নীতি-কৌশল নির্ধারণে কোনো টিম বা ব্যক্তিবর্গের পরামর্শ গ্রহণ করেন তারেক রহমান। তারা যদি আগে গণভোটের ইস্যুটি এড়িয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকেন, তা যে কতটা আত্মঘাতী ছিল, সেটা এরই মধ্যে বুঝতে পারার কথা। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ, বামপন্থি ও দিল্লিপন্থি জাতীয় পার্টি ‘না’ ভোটের পক্ষে পরিষ্কার অবস্থান নিয়েছে। তাদের কারো দ্বারা প্রভাবিত হয়ে বিএনপি এতদিন দ্বিধা-দ্বন্দ্বে থেকে থাকলে সেটা যে কত বড় ভুল ছিল তা এখন অনুধাবন করা উচিত। দিব্যচক্ষু বা দূরদৃষ্টির অভাবে অপরিণামদর্শী কৌশলের খেসারত দিতে হতে পারে। নির্বাচনের আর মাত্র কয়েক দিন বাকি। এর মধ্যে গণভোট ও সংস্কার ইস্যুতে নিজের পরিষ্কার অবস্থানটা দলের সর্বস্তরে জানান দিতে হবে। এখনো মাঠপর্যায়ে বহু নেতাকর্মী গণভোট ইস্যুতে বিভ্রান্ত। তারা ‘হ্যাঁ’ ভোট মানে ‘মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে’ বা ‘জামায়াতের পক্ষে’ আর ‘না’ ভোট মানে ‘বিএনপি বা একাত্তরের পক্ষে’— এমন প্রচারণা চালাচ্ছে। এ ধরনের অনেক ভিডিও ক্লিপ ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মে ভাইরাল হচ্ছে। ভোটের প্রতিপক্ষ সেগুলো ব্যবহার করে বিএনপি ক্ষমতায় গেলে যে সংস্কার না করে আওয়ামী লীগের স্টাইলে দেশ চালাবে, সেই প্রচারণা চালাচ্ছে ব্যাপক ও কার্যকরভাবে।

বিএনপির অবস্থানগত অস্পষ্টতার কারণে হালে বিএনপির জন্য অতিশয় দরদি হয়ে ওঠা সংবাদমাধ্যমও এতদিন ‘হ্যাঁ’-এর বিপক্ষে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভূমিকা রাখছিল। বিএনপি বেজার হতে পারে এমন আশঙ্কায় কতিপয় সুবিধাবাদী চরিত্রের বুদ্ধিজীবীও ইনিয়ে-বিনিয়ে নেতিবাচক লেখালেখি করছিলেন। আশা করা যায়, তারা এবার থামবেন, রাষ্ট্র সংস্কারের পক্ষে ভূমিকা নেবেন। তারেক রহমানের বক্তব্যের মধ্য দিয়ে বিএনপির ফাঁড়া পুরোপুরি কেটে যায়নি। কোনো আসনে যদি বিএনপি প্রার্থী জেতেন আর ‘হ্যাঁ’ পরাজিত হয়, তা নিয়েও বিএনপিকে নিন্দা-মন্দের মুখোমুখি হতে হবে। আলোচনা-আলোড়নের ঝড় বইতে পারে। ফ্যাসিবাদী শাসনের রক্ষক-পাহারাদার অনেকেই কিন্তু সংস্কার চায় না। বিগত সময়ের ক্ষমতার নিয়ামক শক্তিগুলো তাদের দাপট ও লুটপাটের সুযোগ অটুট রাখতে ভঙ্গুর গণতন্ত্রের পুরোনো বন্দোবস্ত টিকিয়ে রাখতে সংস্কারের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। বাংলাদেশের আমলাতন্ত্র যে এখনো বিন্দুমাত্র বদলায়নি, সেটা তো একজন প্রভাবশালী উপদেষ্টার জবানীতেই আমরা শুনলাম।

গত মঙ্গলবার রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে সড়ক, সেতু, জ্বালানি ও রেলপথ উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান সচিবালয়সহ সরকারি দপ্তরগুলোর আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও কর্মকর্তাদের আচরণে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, ‘আমলাতন্ত্র একটি জগদ্দল পাথরের মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটা জনগণের বুকে চেপে বসে আছে। কিছুই করা যায় না এখানে। কোনো রকম মানবিক দায়বদ্ধতা আমাদের এই আমলাতন্ত্রে নেই।’ আমলাতন্ত্রের কাজের ধরনের সমালোচনা করে উপদেষ্টা বলেন, ‘সবাই অফিসে আসেন, যান, গাড়িতে চড়েন। কিন্তু মানুষের জীবনের যে দৈনন্দিন সমস্যা, সে বিষয়ে তাদের কোনো ‘ইয়ে’ নেই। তারা শুধু চিঠি চালাচালি করেন; এই রুম থেকে ওই রুমে চিঠি যায়। সভা হয়, সমিতি হয়, লাঞ্চ হয়, স্ন্যাকস হয়; কিন্তু কাজের কাজটা কিছুই হয় না। যত কিছুই করার চেষ্টা করেছি, সবকিছুই আটকে আছে।’

এই পুরোনো বন্দোবস্তে কাজ করতে গিয়ে ভালো কিছু করার ঐকান্তিক প্রচেষ্টা থাকলেও অসহায়ত্বজনিত ক্ষোভ থেকে বিদায়লগ্নে উপদেষ্টা যে ক্ষোভ ঝাড়লেন, তা নতুন সরকারের সময় যে ভোজবাজির মাধ্যমে উড়িয়ে দেওয়া যাবে, তা নয়। ভবিষ্যতের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বা ডা. শফিকুর রহমান যিনিই হোন না কেন, এ ধরনের অসহায়ত্ব থেকে বের হতে হলে রাষ্ট্রকে খোলনলচে পাল্টাতে হবে। দুর্ভেদ্য প্রাচীর ডিঙাতে হলে জুলাই সনদে বর্ণিত সংস্কারই শুধু নয়, আরো অনেক সংস্কার প্রয়োজন পড়বে। সেটা করতে হবে দৃঢ়তার সঙ্গে।

১২ ফেব্রুয়ারির বহুল প্রতীক্ষিত নির্বাচনটি গতানুগতিক কোনো নির্বাচন নয়। এ নির্বাচন জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদদের রক্তে ভেজা। দৃষ্টি হারানো ও অঙ্গ হারানো হাজারো ছাত্র-জনতা-শিশুর কষ্টে নীল ভোটাভুটি। অবশ্যই এ নির্বাচনটি হতে হবে প্রশ্নহীন। সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও অবাধ নির্বাচন শেষে ক্ষমতার যে পালাবদল হবে, সেটি হতে হবে জুলাই-আকাঙ্ক্ষার পাটাতনের ওপর। প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে যে অসহিষ্ণুতা দেখা যাচ্ছে, তাতে শঙ্কা দানা বাঁধছে, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার কালো ছায়া পড়ছে। শেরপুরের ঝিনাইগাতীতে জামায়াতের এক নেতাকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনা ঠেকাতে পারেনি কাছাকাছি উপস্থিত থাকা সেনা ও পুলিশ বাহিনী। এক দিনে ছয়টি স্থানে সংঘর্ষ ও সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে।

জামায়াতের পক্ষ থেকে ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার শঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বাগেরহাটে বলেছেন, ‘আপনাদের সাবধান করে যাব, কেউ যদি আকাশ থেকে কালো চিলের রঙ ধারণ করে কারো ভোট ছোঁ মেরে নিতে চায়, ওর ডানাসহ ছিঁড়ে ফেলবেন।’ বিএনপির পক্ষ থেকেও কোনো কোনো নেতা শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। জামায়াতের নারী কর্মীদের হেনস্তা করার কয়েকটি ঘটনা বিএনপির ভোটের বাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। জামায়াতে ইসলামীর নারী কর্মীদের পোশাক খুলে নেওয়ার হুকুম এবং হিজাব ও নেকাব খুলে নেওয়ার চেষ্টা ভালো বার্তা দিচ্ছে না। তারেক রহমানকে এ বিষয়ে মাঠপর্যায়ে আরো কঠোর ও কার্যকর বার্তা দিতে হবে।

পর্দানশিন নারীরা ঘরে ঘরে গিয়ে প্রচার চালাবেন, তাতে বাধা দেওয়ার অধিকার গণতন্ত্রে বেমানান। নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘিত হলে তা কমিশন দেখবে। বিএনপি নেতাকর্মীরা কেন নারীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে, অপদস্থ করবে। এসব ঘটনায় জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান বিএনপির উদ্দেশে প্রশ্ন ছুড়েছেন—‘নির্বাচনের আগেই যদি আপনারা এটা করেন, নির্বাচনের পরে কী করবেন?’ ব্যালট সামনে রেখে এ প্রশ্ন কানে বাজলে প্রভাব অনিবার্য। কথায় কথায় সংঘাতে জড়ানো বা হঠকারী আচরণের ব্যাপারে জামায়াত নেতৃত্ব থেকেও আরো শক্ত বার্তা দিতে হবে। দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সন্ধিক্ষণে সবার কাছে সংযত ও সহনশীল আচরণ কাম্য। তা না হলে সামনের নির্বাচনটি ইতিহাসের সবচেয়ে সহিংস ও রক্তক্ষয়ী নির্বাচনে পর্যবসিত হবে।

যদিও নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেছেন, অতীতের অনেক নির্বাচনের তুলনায় এবারের নির্বাচনের মাঠের পরিবেশ অত্যন্ত চমৎকার। ভোটগ্রহণ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিরপেক্ষতার বিষয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে আরেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, নির্বাচনে পক্ষপাতিত্বের এক সুতো পরিমাণ বিচ্যুতিও বরদাস্ত করা হবে না। যদি কারও বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে তার পরিণতি হবে অত্যন্ত ভয়াবহ। এ ধরনের হুঁশিয়ারি আগের নির্বাচন কমিশনগুলো থেকেও শোনা যেত। এবার বক্তব্য নয়, অ্যাকশন দেখতে চায় মানুষ।

গত ২৭ জানুয়ারি রাজশাহীতে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট-২০২৬ উপলক্ষে সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মূল্যায়ন এবং ‘ইন এইড টু দ্য সিভিল পাওয়ার’-এর আওতায় মোতায়েনরত রাজশাহী সেনানিবাসে এক মতবিনিময় সভায় সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান পেশাদারিত্ব, নিরপেক্ষতা, শৃঙ্খলা, ধৈর্য ও নাগরিকবান্ধব আচরণের মাধ্যমে দায়িত্ব পালনের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন। জনগণ তা-ই চায়।

একই দিন পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সে সম্প্রতি যোগদানকারী ২৭তম বিসিএস (পুলিশ) ব্যাচের এএসপি প্রবেশনারদের উদ্দেশে বক্তব্য দেওয়ার সময় পেশাদারত্ব, নিরপেক্ষতা ও দায়িত্ববোধের প্রমাণ রাখতে সক্ষম হবে বলে জানিয়েছেন আইজিপি বাহারুল আলম। পুলিশ এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাহিনীর সদস্যদের মনোবল চাঙা করা এবং জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধারে আমরা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছি।

সেনাপ্রধান ও পুলিশ প্রধানের দৃঢ় ও বলিষ্ঠ বার্তায় আশ্বস্ত হতে চাই; কিন্তু তা যেন দৃশ্যমান হয়। শেরপুরে একজন নেতার প্রাণহানির ঘটনার দায় মাঠে থাকা সেনাবাহিনী ও পুলিশ কোনোভাবেই এড়াতে পারে না।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনীতি বিশ্লেষক।

বাংলাদেশের জনগণের মনোভাব ভারতকে বুঝতে হবে

ইরানে মোসাদের তৎপরতা যেভাবে বন্ধ করছে চীন

দলীয় দালালতন্ত্রে বন্দি রাজনীতি ও মিডিয়া

নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হতে দেওয়া যাবে না

বাংলার নির্বাচন ঐতিহ্য

নারীরা বদলে দিতে পারে ভোটের হিসাব

কেমন রাজনৈতিক দল চাই

বাংলাদেশ : হুমকির ভারসাম্য রক্ষা এবং প্রতিরক্ষা কূটনীতির সন্ধান

উত্তাপ-উত্তেজনা বনাম সহিষ্ণুতা-সহমর্মিতা

দেশজুড়ে এখন ভোট দিন ভোট দিন