শতাব্দীর পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের চিন্তাধারা, ব্যবসা-বাণিজ্যের পদ্ধতি, কর্মের পরিবর্তন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথের বিভিন্নতা লক্ষণীয়। একুশ শতকে খাদ্য উৎপাদন, মৎস্য আহরণ, খনিজ সম্পদ উত্তোলন এবং নবায়নযোগ্য শক্তির আধার হিসেবে ব্লু ইকোনমি এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। ব্লু ইকোনমি বা সুনীল অর্থনীতি হলো সমুদ্রসম্পদের টেকসই ব্যবহারের মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি লাভ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং উন্নত জীবন ও জীবিকা নির্বাহের একটি কৌশল, যা ১৯৯৪ সালে বেলজিয়ামের অর্থনীতিবিদ গুন্টার পাওলি ধারণা (ব্লু ইকোনমি বা নীল অর্থনীতি) দেন। সমুদ্র ও সমুদ্র উপকূলই হলো ব্লু ইকোনমির মূল কেন্দ্রবিন্দু।
খাদ্য, শক্তি এবং খনিজ সম্পদের গুরুত্বপূর্ণ উৎস সমুদ্র। সমুদ্রের ওপর নির্ভর করেই গড়ে উঠেছে ব্যবসা-বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ পথ। বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রায় ৯০ শতাংশ সমুদ্রপথে পরিবাহিত হয়। ভারী পণ্য, খনিজ, অপরিশোধিত তেল, গ্যাস ও অন্যান্য কাঁচামাল পরিবহনের জন্য এটিই সবচেয়ে সাশ্রয়ী ও কার্যকর মাধ্যম। বিশ্বব্যাপী বাণিজ্যের এই বিশাল অংশ সমুদ্রপথে হওয়ার কারণে এটি বিশ্ব অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত।
তবে সমুদ্র শুধু ব্যবসা-বাণিজ্য ও পরিবহনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; সমুদ্রের জলরাশির গভীরে লুকিয়ে আছে সম্পদের অপার সম্ভাবনা। যেমন—সামুদ্রিক মাছ, শৈবাল, তেল, গ্যাস, খনিজ সম্পদ ও নবায়নযোগ্য শক্তি। এছাড়া সমুদ্র উপকূলে লবণ উৎপাদন, জাহাজশিল্প এবং সমুদ্রকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে পর্যটন নগরী।
এই শক্তি ও উৎসকে কাজে লাগিয়ে তৈরি হতে পারে একটি দেশের অর্থনৈতিক ও খাদ্যচাহিদা পূরণের ভিত্তি।
আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ে ২০১২ সালে মিয়ানমার ও ২০১৪ সালে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশ সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তি করে এবং মোট ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার সমুদ্র এলাকা বাংলাদেশের অধিকারভুক্ত হয়, যা বাংলাদেশের সাগরকেন্দ্রিক অর্থনীতি ও ব্লু ইকোনমির একটি বড় সাফল্য হিসেবে ধরা হয়। বাংলাদেশে বঙ্গোপসাগরকে ব্লু ইকোনমির কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, এর জলরাশির গভীরে লুকিয়ে আছে অর্থনৈতিক উন্নয়নের বীজ।
বঙ্গোপসাগরে ৪৭৫ প্রজাতির মাছ, ৪৯৮ প্রজাতির ঝিনুক, ৫২ প্রজাতির চিংড়ি, পাঁচ প্রজাতির লবস্টার, ২০ প্রজাতির কাঁকড়া, ২২০ প্রজাতির সি-উইড এবং ৬১ প্রজাতির সি-গ্রাস চিহ্নিত করা হয়েছে। সব মিলিয়ে বঙ্গোপসাগর থেকে ২০০ প্রজাতির মাছ ও চিংড়ি মিলিয়ে ৪০ প্রজাতির মাছ নিয়মিত আহরণ করা হয়। এছাড়া প্রতিবছর প্রায় পাঁচ লাখ থেকে ৫ লাখ ৫০ হাজার টন ইলিশ আহরণ করা হয়। দেশের প্রায় তিন কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ব্লু ইকোনমির ওপর নির্ভরশীল এবং বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রায় তিন শতাংশ অবদান রাখে। ২০১৭-১৮ সালে ৪৩ লাখ ৩৪ হাজার টন উৎপাদিত মাছের মধ্যে ৬ লাখ ৫০ হাজার টন মাছ সরাসরি সমুদ্র থেকে এসেছে। ‘সেভ আওয়ার সি’র তথ্য অনুসারে, প্রতিবছর বঙ্গোপসাগর থেকে ৮০ লাখ টন মাছ আহরণ করা হয়, কিন্তু বাংলাদেশের জেলেরা মাত্র সাত লাখ টন ধরতে পারে। মৎস্য আহরণ বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজন প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতা এবং উন্নত মাছ ধরা যন্ত্রের সহজলভ্যতা। বঙ্গোপসাগরের গভীরে লুকিয়ে আছে জীববৈচিত্র্যের আধার; এছাড়া তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ।
ভবিষ্যৎ বৈশ্বিক জ্বালানি, খাদ্য উৎপাদন ও নিরাপত্তা নির্ভর করবে সমুদ্রের ওপর এবং অদূর ভবিষ্যতে সমুদ্র সীমানার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে উদীয়মান শক্তিধর দেশগুলোর মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা তৈরি হবে। কারণ প্রতিবছর তিন থেকে পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলারের কর্মকাণ্ড সংঘটিত হয় সমুদ্রকে ঘিরে।
২০১৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে ব্লু ইকোনমির অবদান ছিল ৩৫৯ বিলিয়ন ডলার, যা জিডিপির ২ শতাংশ এবং ৩০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান। তবে ২০২৪ সালে তা ৮৪৬ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়। এই বিরাট অংশের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া ও বাণিজ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে শক্তিশালী দেশগুলো সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের পাশাপাশি কৌশলগত সম্পর্ক তৈরি করবে।
ধারণা করা হয়, ২০৫০ সালে পৃথিবীর মোট জনসংখ্যা দাঁড়াবে প্রায় ৯০০ কোটিতে। এই বিপুল জনসংখ্যার খাদ্যের জোগান দিতে সমুদ্রের মুখাপেক্ষী হতে হবে। ভবিষ্যৎ বিশ্ব জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা নির্ভর করবে সমুদ্রের ওপর। ওশান এনার্জি হবে পরবর্তী বিপ্লব। সমুদ্রের বাতাস ও ঢেউকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ এবং সামুদ্রিক শৈবালকে কাজে লাগিয়ে খাদ্য, প্রসাধনী ও ওষুধ তৈরি করা হবে।
বঙ্গোপসাগরকে কেন্দ্র করে দেশের ব্লু ইকোনমি যদি সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা করা যায়, তাহলে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। আন্তর্জাতিক পর্যটনের জন্য কক্সবাজার এবং সেন্টমার্টিনের পাশাপাশি বঙ্গোপসাগরে ৭২০ কিলোমিটার উপকূল ও সাতটি দ্বীপকে আকর্ষণীয় ও ভ্রমণ-উপযোগী করে তৈরি করা প্রয়োজন। সমুদ্রে জীববৈচিত্র্যের ভারসাম্য রক্ষায় মাছ আহরণ নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি, কারণ অতিরিক্ত আহরণ সমুদ্র পরিবেশে বিপর্যয় ঘটাবে। আবার সমুদ্রের খনিজ সম্পদ উত্তোলন নিয়ন্ত্রণ না করলে সামুদ্রিক বৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়বে। সেইসঙ্গে সামুদ্রিক দূষণ কমিয়ে আনা প্রয়োজন। জাতিসংঘের তথ্যমতে, প্রতিবছর প্রায় ৮০ লাখ টন প্লাস্টিক সমুদ্রে পড়ে, যা সামুদ্রিক প্রাণীগুলোকে নীরবে হত্যা করছে। তাই খনিজ সম্পদ উত্তোলন, মৎস্য আহরণ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন।
লেখক : শিক্ষার্থী, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা কলেজ