একটি স্বাধীন দেশের প্রকৃত সমৃদ্ধি শুধু তার জিডিপির প্রবৃদ্ধি, কিংবা সুউচ্চ দালানের ওপর নির্ভর করে না, বরং তার মেরুদণ্ড গঠিত হয় সেই দেশের মেধাবী সন্তানদের প্রজ্ঞা আর উদ্ভাবনী শক্তির ওপর ভিত্তি করে। অথচ আজ আমাদের দেশের মানচিত্র থেকে সেই উজ্জ্বল নক্ষত্রগুলো একে একে খসে পড়ছে বিদেশের নীল দিগন্তে, যার ফলে আমরা শুধু একদল দক্ষ মানুষই হারাচ্ছি না, বরং একটি প্রজন্মের সোনালি স্বপ্নকেও বিসর্জন দিচ্ছি।
এই যে ধীরলয়ে চলা বুদ্ধিবৃত্তিক রক্তক্ষরণ, যাকে আমরা মেধা পাচার বলে সচরাচর অভিহিত করি, তা আসলে একটি জাতির তিলে তিলে গড়ে তোলা সম্ভাবনার অপমৃত্যু ছাড়া আর কিছুই নয়। আমাদের স্কুল, কলেজ আর বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেষ্ঠ মস্তিষ্কগুলো যখন বিদেশের গবেষণাগারে, কিংবা বহুজাতিক করপোরেট অফিসে নিজেদের ঘাম ঝরিয়ে অন্য দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করে, তখন আমাদের এই মাটির আসলে কত বড় ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে, তা পরিমাপ করার কোনো যন্ত্র এখনো তৈরি হয়নি। এই মানুষগুলো তৈরি করতে রাষ্ট্রের যে বিপুল সম্পদ, সময়, আর শ্রম ব্যয় হয়Ñতার সবটুকুর সুফল যখন কোনো উন্নত দেশ অনায়াসেই ভোগ করে, তখন তাকে শুধু সাধারণ অভিবাসন বলা যায় না, বরং তা হলো এক নীরব লুণ্ঠন।
আমাদের গভীরভাবে ভাবা উচিত, কেন তারা চলে যাচ্ছেন আর কেনই বা আমরা তাদের এই মাটির মায়ায় বেঁধে রাখতে পারছি না। কারণ কেউ স্বাচ্ছন্দ্যে নিজের শেকড় ছিঁড়ে অজানার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমান না।
একজন মেধাবী শিক্ষার্থী যখন দেখেন তার বছরের পর বছর হাড়ভাঙা খাটুনি আর মেধার চেয়ে লবিং, কিংবা অর্থশক্তির জোর অনেক বেশি, তখন তার ভেতরে যে হাহাকার তৈরি হয়, সেটিই তাকে দেশত্যাগের দিকে চূড়ান্তভাবে ঠেলে দেয়।
উন্নত জীবনের প্রলোভন, কিংবা সুন্দর আগামীর স্বপ্ন সবারই থাকে, তবে নিজের দেশে যদি ন্যূনতম সম্মান, নিরাপত্তা আর মেধার মূল্যায়ন নিশ্চিত করা যেত, তবে হয়তো অনেকেই এই বিচ্ছেদকে সানন্দে মেনে নিতেন না।
আমরা আধুনিক অবকাঠামো আর যান্ত্রিক উন্নয়নের নেশায় পড়ে আমাদের শ্রেষ্ঠ কারিগরদের কথা একেবারে ভুলে যাচ্ছি। যেখানে একটি দেশের অর্থনীতি সচল রাখতে দক্ষ জনশক্তির কোনো বিকল্প নেই। আমরা প্রতিবছর হাজার হাজার তুখোড় প্রকৌশলী, চিকিৎসক আর গবেষকদের অন্য দেশের হাতে স্রেফ উপহার হিসেবে তুলে দিচ্ছি, যা আমাদের জাতীয় দেউলিয়াত্বকেই নিদারুণভাবে প্রকাশ করে। এই চলে যাওয়ার দীর্ঘ মিছিলে যেমন আছে একরাশ হতাশা, তেমনি আছে এক ধরনের চরম অনিশ্চয়তা, যা আমাদের তরুণ সমাজকে প্রতিনিয়ত কুরে কুরে খাচ্ছে। যারা চলে যাচ্ছেন, তারা হয়তো সেখানে ব্যক্তিগতভাবে সফল হচ্ছেন, কিন্তু তাদের এই বিশ্বজয়ী সাফল্যে আমাদের দেশের ভাগ্যোন্নয়ন কতটুকু হচ্ছে, তা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করার সময় অনেক আগেই পেরিয়ে গেছে।
বিদেশের মাটিতে বসে দেশের জন্য মায়াকান্না করা, কিংবা রেমিট্যান্স পাঠিয়ে দায়মুক্ত হওয়া হয়তো সাময়িক স্বস্তি দেয়, কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে আমাদের সমাজে একটি বিশাল বুদ্ধিবৃত্তিক শূন্যতা তৈরি হচ্ছে, যা কোনো অর্থ দিয়েই পূরণ করা সম্ভব নয়।
মেধা পাচারের এই ধারা যদি অব্যাহত থাকে, তবে অদূর ভবিষ্যতে আমাদের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে, কিংবা নতুন কোনো বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবনে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়বে।
সিস্টেমের প্রতিটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে যখন অবহেলা, দুর্নীতি আর স্বজনপ্রীতি বাসা বাঁধে, তখন মেধার অবমূল্যায়ন হওয়াটাই এক ভয়ংকর স্বাভাবিকতায় পরিণত হয়। আমরা শুধু হাত গুটিয়ে বসে থাকব না আর অপলক চেয়ে দেখব না যে আমাদের শ্রেষ্ঠ সম্পদগুলো অন্য দেশের প্রদীপের আলো হয়ে জ্বলছে অথচ আমাদের নিজের ঘর অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে। এই সংকটের সমাধান শুধু সান্ত্বনার উপদেশে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না, বরং এর জন্য প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় কাঠামোর আমূল সংস্কার আর মেধার যোগ্য স্বীকৃতির পরিবেশ সুনিশ্চিত করা। মেধাবীরা শুধু মোটা অঙ্কের বেতন, কিংবা বিলাসী জীবন চান না, বরং তারা চান কাজের স্বাধীনতা আর সৃজনশীলতা প্রকাশের উপযুক্ত ক্ষেত্র, যা আমরা দিতে চরমভাবে ব্যর্থ হচ্ছি।
আমাদের নীতিনির্ধারকদের উপলব্ধি করা প্রয়োজন, এই মেধা পাচার আসলে একটি জাতির মেরুদণ্ড চিরতরে ভেঙে দেওয়ার নামান্তর, যেখানে একটি চারাগাছকে যদি তার জন্মভূমিতে পর্যাপ্ত জল আর হাওয়া না দেওয়া হয়, তবে তিনি যেমন বাঁচার তাগিদে অন্য কোথাও আশ্রয়ের খোঁজ করবেন, তেমনি আমাদের মেধাবীরাও তাদের অস্তিত্ব রক্ষায় দেশান্তরী হচ্ছেন।
এই বিয়োগান্ত অধ্যায়ের দ্রুত সমাপ্তি ঘটানো এখন সময়ের দাবি, নতুবা একদিন আমরা দেখব আমাদের সব আছে, শুধু দেশ গড়ার মতো সেই সঠিক মানুষগুলো নেই।
মেধা পাচার রোধে আমাদের শুধু আবেগ দিয়ে চললে হবে না, বরং অত্যন্ত বাস্তবধর্মী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে, যেখানে একজন মেধাবী তরুণ বুক ফুলিয়ে বলতে পারবেন, তার যোগ্যতার মূল্যায়ন নিজের দেশেই পাওয়া সম্ভব।
দেশের প্রতি মমত্ববোধ তৈরি করার দায়িত্ব যেমন পরিবারের, তেমনি সেই মমত্ববোধকে আজীবন টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব রাষ্ট্রের ওপর একান্তভাবে বর্তায়। আমরা চাই না আমাদের আগামী প্রজন্ম শুধু বিদেশের নাগরিকত্ব পাওয়ার জন্য পড়াশোনা করুক, বরং আমরা চাই তারা এ দেশের মাটিতে নতুন কোনো বিপ্লব ঘটাক, যা পুরো বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দেবেন। এই মৌলিক প্রশ্নের উত্তর আমাদের বর্তমান কর্মতৎপরতার মধ্যেই লুকিয়ে আছে, কারণ মেধা হলো সেই আলোকবর্তিকা, যা সমাজকে সঠিক পথ দেখায়। আমরা যদি সেই বাতিঘরগুলোকেই একের পর এক নির্বাসনে পাঠিয়ে দিই, তবে ঘোর অন্ধকারের গহ্বরে নিমজ্জিত হওয়া ছাড়া আমাদের আর কোনো বিকল্প থাকবে না।
এখনো হাতে সময় আছে নিজেদের ভুলগুলো সাহসের সঙ্গে সংশোধন করে মেধাবীদের জন্য একটি সুন্দর, নিরাপদ আর বৈষম্যহীন স্বদেশ গড়ে তোলার, যেখানে প্রতিটি মস্তিষ্ক কাজ করবে শুধু নিজের মাতৃভূমির কল্যাণে। এই ভয়াবহ রক্তক্ষরণ যদি আমরা অবিলম্বে বন্ধ করতে না পারি, তবে জাতির সামগ্রিক উন্নতি শুধু একটি মরীচিকা হয়েই রয়ে যাবে, যা আমাদের স্বাধীনতার মূল চেতনার পরিপন্থী।
লেখক : শিক্ষার্থী, ইডেন মহিলা কলেজ, ঢাকা
ইংরেজি বিভাগ
shammishafiqj@gmail.com