ইসরাইল-ইরানের চলমান যুদ্ধ কঠিন ধাপে প্রবেশ করেছে। যুদ্ধের শুরুর দিকে মার্কিন ও ইসরাইলি বাহিনী ইরানের বিভিন্ন টার্গেটে ভারী হামলা চালিয়েছিল। হামলায় কিছু সামরিক ফ্যাসিলিটি ও মিসাইল নিক্ষেপ স্থাপনার ক্ষতি হয়েছে। কিন্তু যুদ্ধটা ধীরে ধীরে ভিন্নমাত্রায় চলে গেছে। অল্পসময়ের জন্য তীব্র হামলার জায়গা থেকে সরে এসে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে রূপ নিচ্ছে যুদ্ধটা। যেখানে টিকে থাকাটাই হবে বড় চ্যালেঞ্জ।
এই পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ একটা প্রশ্ন সামনে এনেছে। ইসরাইল কি দীর্ঘ লড়াইয়ে ইরানের বিরুদ্ধে টিকে থাকতে পারবে?
এটা ঠিক যে, ইসরাইলের অগ্রসর সামরিক প্রযুক্তি আছে। কিন্তু দীর্ঘ যুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি হওয়ার পর দেখা যাচ্ছে বেশ কিছু বড় ধরনের সীমাবদ্ধতা আছে ইসরাইলের। মিসাইল সুরক্ষা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা, জনবল, কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান এবং মিত্রদের ওপর অতিনির্ভরতাÑএসব বিষয়েই সীমাবদ্ধতা রয়েছে তাদের। বিষয়গুলো একসঙ্গে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ চালিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে ইসরাইলের বড় ধরনের সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
ইসরাইলের অন্যতম বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে তাদের মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেম। বহু বছর ধরে জটিল বহুস্তরের সুরক্ষা নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে ইসরাইল। রকেট, ড্রোন বা ব্যালিস্টিক মিসাইল ঠেকানোর জন্য তারা আইরন ডোম, ডেভিড’স স্লিং আর অ্যারোর মতো সুরক্ষা সিস্টেম গড়ে তুলেছে। তাত্ত্বিকভাবে এই সিস্টেমগুলো তাদের জোরালো সুরক্ষা দেওয়ার কথা।
কিন্তু মিসাইল সুরক্ষা নির্ভর করে ইন্টারসেপ্টর থাকা না থাকার ওপর। আকাশপথে অগ্রসর হুমকি মোকাবিলার জন্য এই ইন্টারসেপ্টর বা মিসাইলগুলোকেই কাজে লাগানো হয়। এগুলো খুবই অত্যাধুনিক অস্ত্র। সে কারণে মারাত্মক ব্যয়বহুলও বটে। এগুলো তাই তৈরিও করা হয় সীমিত সংখ্যায়।
বড় ধরনের হামলার মুহূর্তে একটি মাত্র মিসাইল ঠেকানোর জন্য বেশ কতগুলো ইন্টারসেপ্টর নিক্ষেপ করতে হয়, যাতে মিসাইল নিশ্চিতভাবে ধ্বংস করা যায়। এর অর্থ হলো ভারী বোমা হামলা শুরু হলে এই ইন্টারসেপ্টরের মজুত খুব দ্রুত শেষ হয়ে যাবে। বিভিন্ন প্রতিবেদনের সূত্রে জানা যাচ্ছে, ইরান এরই মধ্যে ৫ শতাধিক মিসাইল নিক্ষেপ করেছে। ড্রোন হামলা করেছে প্রায় দুই হাজার। এই মাত্রার ধারাবাহিক হামলার কারণে ইসরাইলের সুরক্ষা অস্ত্রের মজুতের ওপর মারাত্মক চাপ তৈরি হয়েছে।
ইন্টারসেপ্টরের মজুতে যে এরই মধ্যে টান পড়েছে, তার কিছু লক্ষণও দেখা গেছে। আগের বছরও ইরানের সঙ্গে তীব্র লড়াইয়ে জড়িয়েছিল ইসরাইল। সে সময় ইরানের ২৭০টিরও বেশি মিসাইল ঠেকিয়েছিল ইসরাইল আর আমেরিকা। ওই যুদ্ধে ইসরাইলের সুরক্ষা মিসাইলের বড় একটা অংশ শেষ হয়ে গেছে। কয়েক মাসের মধ্যেই বর্তমান চলমান যুদ্ধটা আবার শুরু হলো। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই অল্প সময়ের মধ্যে মজুতের ঘাটতি পুরোপুরি পূরণ করাটা প্রায় অসম্ভব।
তাছাড়া আক্রমণ করা ও হামলা ঠেকানোর ব্যয়ের মধ্যে যে ভারসাম্যের অভাব, সেটি পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে। ইরান যেসব ড্রোন আর মিসাইল নিক্ষেপ করছে, সেগুলো ইসরাইলের সুরক্ষা সিস্টেমের অস্ত্রের চেয়ে অনেক সস্তা। একটা একক ইন্টারসেপ্টর তৈরিতে শত শত বা হাজার হাজার, এমনকি মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত লাগতে পারে। অন্যদিকে এই ব্যয়ের সামান্য একটা অংশ দিয়েই বহু ড্রোন তৈরি করে ফেলা যায়।
যুদ্ধ দীর্ঘ হলে অর্থনৈতিক ভারসাম্যহীনতা থেকে লাভবান হবে হামলাকারী পক্ষ। ইরান বিপুলসংখ্যক সস্তা ড্রোন ছুড়ে ইসরাইলের বিপুল ব্যয়বহুল সুরক্ষা মিসাইল শেষ করে দিতে পারবে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই সুরক্ষা সিস্টেমের ব্যয়ের বোঝা ভারী হতেই থাকবে।
ইসরাইলের আরেকটা সীমাবদ্ধতা হলো তাদের সামরিক জনবল সংকট এবং ভৌগোলিক অবস্থান। ইসরাইল ছোট্ট একটি দেশ। ইরানের তুলনায় তাদের জনসংখ্যা অতি সামান্য। তাদের সামরিক বাহিনীকে অতিমাত্রায় রিজার্ভ সৈন্যদের ওপর নির্ভর করতে হয়। যুদ্ধ পরিস্থিতি এলেই শুধু এদের তলব করা হয়। দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ তাই অর্থনীতি আর ইসরাইলি সমাজের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে। বিপুলসংখ্যক রিজার্ভ সেনাদের তাদের চাকরি-বাকরি ও পরিবার ছেড়ে সামরিক বাহিনীকে সেবা দিতে হবে।
রিজার্ভ সেনাদের কাজে লাগানোর কারণে এরই মধ্যে ইসরাইলের মধ্যে অর্থনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। বেশ কিছু খাতে শ্রমিক সংকট দেখা দিয়েছে। পর্যটন খাত পুরোপুরি ধসে পড়েছে। বহু খাতে ব্যবসার গতি কমে গেছে। অস্থিতিশীলতা আর কর্মী সংকটের কারণে হাজার হাজার কোম্পানি বন্ধ হয়ে গেছে বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে।
যুদ্ধের অর্থনৈতিক ব্যয়ও দ্রুত বাড়ছে। ২০২৩ সালে যে গাজা যুদ্ধ শুরু হয়েছিল, সেখানে এরই মধ্যে বহু বিলিয়ন ডলার চলে গেছে ইসরাইলের। এক হিসাবে দেখা গেছে, গাজায় কয়েক বছরের যুদ্ধে ইসরাইলের ব্যয় হয়েছে ৫৫ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। এখন ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়ানোর মাধ্যমে ব্যয়ের আরেকটি বড় খাত উন্মুক্ত হয়েছে ইসরাইলের।
কিছু হিসাবে বলা হয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রথম দুদিনেই ইসরাইলের ব্যয় হয়েছে প্রায় ১ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলার। এই মাত্রায় ব্যয় হতে থাকলে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ ইসরাইলের আর্থিক সম্পদ পুরোপুরি শূন্য করে দেবে। প্রতিরক্ষা বাজেট এবং ঘাটতির পরিমাণ বাড়তে থাকলে জাতীয় অর্থনীতি মারাত্মক চাপে পড়বে।
ইসরাইলের আরেকটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো বাইরের মিত্রদের ওপর তাদের অতিমাত্রায় নির্ভরতা। বর্তমানে সেই ভূমিকায় আছে যুক্তরাষ্ট্র। সামরিক অভিযানের জন্য ইসরাইলকে বেশ কিছু খাতে মার্কিন সহায়তার ওপর অতিমাত্রায় নির্ভর করতে হয়। এর মধ্যে রয়েছে গোয়েন্দা তথ্য, অস্ত্রের চালান এবং অগ্রসর মিসাইল সুরক্ষা সিস্টেম।
জানা গেছে, দক্ষিণ কোরিয়া থেকে মার্কিন থাড মিসাইল সুরক্ষা সিস্টেমের একটা অংশ মধ্যপ্রাচ্যে নিয়ে আসা হচ্ছে। এই সিদ্ধান্তে বোঝা যায় মার্কিন সিস্টেমের ওপর কতটা নির্ভর করতে হচ্ছে ইসরাইলকে। এই মোতায়েনের সিদ্ধান্ত ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, আমেরিকান বাহিনীকে হয়তো ইসরাইলের প্রতিরক্ষা ব্যয়ের বোঝা অনেকটাই বহন করতে হবে। এ ধরনের সহায়তা ছাড়া ইরানের মিসাইল হামলার বিরুদ্ধে নিজেদের সক্ষমতা ধরে রাখা ইসরাইলের জন্য অসম্ভব হবে।
এই অতিনির্ভরতা ইসরাইলের জন্য কৌশলগত অসহায়ত্ব তৈরি করেছে। মার্কিন সহায়তা যদি কমে আসে বা রাজনৈতিক কারণে সীমিত করা হয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে ইসরাইলের টিকে থাকার সক্ষমতা অনেকটাই কমে যাবে।
ইরানের সামরিক কৌশলও দীর্ঘ মেয়াদে চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে। তেহরান দ্রুত জয়ের চেষ্টা করছে না। তারা দীর্ঘমেয়াদি লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। ইসরাইলকে সরাসরি যুদ্ধে না হারিয়ে তাদের ওপর সময়ের পরিক্রমায় অর্থনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক বোঝা চাপিয়ে দেওয়ার কৌশল নিয়েছে ইরান।
এই কৌশলে বেশ কিছু পদ্ধতি অনুসরণ করা হবে। মিসাইল ও ড্রোন হামলা ইসরাইলের শহর এবং অবকাঠামোগুলোকে সার্বক্ষণিক চাপের মধ্যে রাখবে। প্রতিবেশী লেবানন থেকে হিজবুল্লাহর মতো গোষ্ঠীগুলো লড়াইয়ের আরেকটি ফ্রন্ট সক্রিয় রাখতে পারে। এর সঙ্গে সাইবার অভিযান ও নৌপরিবহনে বাধা দেওয়া অব্যাহত রাখলে সেটা বৈশ্বিক বাণিজ্য রুট এবং জ্বালানি বাজারের ওপর তীব্র চাপ তৈরি করবে।
এমনকি সীমিত হামলাও তখন কৌশলগত প্রভাব ফেলবে। যেমন গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো বা জ্বালানি ফ্যাসিলিটিতে একটি মাত্র হামলা করলেও সেটা বড় ধরনের অর্থনৈতিক ব্যাঘাত ঘটাবে। আধুনিক যুদ্ধে এই ধরনের মনস্তাত্ত্বিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব তৈরি করাটা সরাসরি ক্ষয়ক্ষতির মতোই গুরুত্বপূর্ণ।
ইসরাইলের অবস্থান জটিল হয়ে ওঠার আরেকটি কারণ হলো একাধিক ফ্রন্টের যুদ্ধ। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ইরানের মিত্র ও প্রক্সি গোষ্ঠী আছে। লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইরাকসহ অন্যান্য অঞ্চলের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে, যদি সেটি দীর্ঘ হয়। একসঙ্গে একাধিক ফ্রন্টে লড়াই করতে গেলে ইসরাইলের সামরিক সম্পদের ওপর চাপ আরো বাড়বে।
ইসরাইলের সামরিক বাহিনী নিজেও স্বীকার করেছে, দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে টিকে থাকা কঠিন হবে। কর্মকর্তারা প্রকাশ্যেই বলেছেন, দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে জড়ানোর কোনো আকাঙ্ক্ষা তাদের নেই। তাদের কথা থেকে বোঝা যায়, ইসরাইল তুলনামূলক সংক্ষিপ্ত যুদ্ধে জড়াতে চায়। ইরানের সামরিক সক্ষমতা কমানো তাদের লক্ষ্য। দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ তারা চায় না।
তাদের এই অবস্থানের সঙ্গে ইসরাইলের ঐতিহাসিক সামরিক কৌশলের মিল রয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে ইসরাইল সবসময় দ্রুত, জোরালো অভিযানের কৌশল নিয়েছে। ছোট দেশ এবং সীমিত কৌশলগত গভীরতার কারণে তাদের পক্ষে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ চালানো অনেক বেশি কঠিন।
অন্যদিকে ইরানের ভৌগোলিক গভীরতা অনেক বেশি। তাদের জনসংখ্যাও বিশাল। দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে এটা তাদের বড় ধরনের সুবিধা দেবে। দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে ইসরাইলের দুর্বলতা, তাদের উচ্চব্যয় এবং জনবল সংকটের মতো ইস্যুগুলো পরীক্ষায় ফেলাটাই ইরানের যুদ্ধকৌশল বলে মনে হচ্ছে।
এগুলোর অর্থ এটা নয় যে, ইসরাইলের সামরিক শক্তির ঘাটতি আছে। ইসরাইলের সশস্ত্র বাহিনী এখনো প্রযুক্তিগতভাবে অগ্রসর। জটিল অভিযান চালাতে তারা সক্ষম। তাদের বিমান শক্তি, গোয়েন্দা সক্ষমতা এবং নিখুঁত আঘাত হানার ক্ষেত্রে এই অঞ্চলে তাদের সমকক্ষ খুব বেশি নেই।
কিন্তু বৃহত্তর ফ্যাক্টরগুলো বিবেচনা করলে বোঝা যায়, ইরানের বিরুদ্ধে দীর্ঘ যুদ্ধের জন্য ইসরাইলের সক্ষমতার ঘাটতি আছে। তাদের মিসাইল সুরক্ষার মজুত সীমিত। অর্থনৈতিক বোঝাও বাড়ছে। সামরিক জনবলে এরই মধ্যে টান পড়েছে। তাছাড়া দেশটা এখনো প্রবলভাবে বাইরের সহায়তার ওপর নির্ভরশীল।
যুদ্ধ যদি আরো তীব্র হতে থাকে, তাহলে ইসরাইলের কাঠামোগত সীমাবদ্ধতাগুলোও আস্তে আস্তে সামনে আসবে। যুদ্ধটা তাই শেষ পর্যন্ত প্রযুক্তির শ্রেষ্ঠত্বের জায়গায় থাকবে না। সেটা টিকে থাকার সক্ষমতার প্রতিযোগিতায় রূপ নেবে।
এ রকম একটা পরিস্থিতিতে কোন পক্ষ সবচেয়ে অত্যাধুনিক অস্ত্র দিয়ে হামলা চালাচ্ছে, সেটা আর জরুরি প্রশ্ন থাকছে না। বরং কোন পক্ষ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামরিক চাপের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ চালিয়ে নিতে পারেÑসেটাই হয়ে উঠবে বড় প্রশ্ন।
যুদ্ধের প্রাথমিক পর্যায়ে নিজেদের প্রমাণ করার যে বিষয়টি ছিল, তার চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করাটা তাই ইসরাইলের জন্য অনেক বেশি কঠিন হয়ে যাবে।